মস্তিষ্কের টিউমার নিরাময়ে হোমিওপ্যাথি

ডা.প্রধীর রঞ্জন নাত

শনিবার , ৯ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:৪৩ পূর্বাহ্ণ
23

মস্তিস্কের ভিতরে বা উপরে একটি অস্বাভাবিক বৃদ্ধিকে ব্রেন টিউমার বলা হয়। সবসময়েই সাংঘাতিক না হলেও সব মস্তিস্কের টিউমারই গুরুতর। কারণ টিউমার বৃদ্ধির ফলে মস্তিস্কে চাপের উদ্ভব ও তদসংলগ্ন মস্তিষ্কের অঞ্চলে সংকোচনের সৃষ্টি হয়। ব্রিটেনের এক জরিপে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে ৬ জন প্রতি বছর ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে থাকে। টেনটোরিয়াল মেনিনিউমা নামক একটি পর্দা দিয়ে আমাদের ব্রেন দুটি কম্পার্টমেন্টে বিভক্ত। একটি হলো ওপরের প্রকোষ্ঠ বা সুপারেটেনটোরিয়াল কমপার্টমেন্ট, আরেকটি হলো নিচের প্রকোষ্ঠ বা ইনফ্রেটেনটোরিয়াল কম্পার্টমেন্ট একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের ওপরের প্রকোষ্ঠ ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ টিউমার হয়ে থাকে এবং নিচের প্রকোষ্ঠ ১৫ থেকে ২০ শতাংশ টিউমার হয়। শিশুর ক্ষেত্রে ওপরের প্রকোষ্ঠ ৪০ শতাংশ এবং নিচের প্রকোষ্ঠ ৬০ শতাংশ টিউমার হয়ে থাকে।
ব্রেন টিউমারের কারণ : মানব দেহে কিছু জিন আছে, যা টিউমার হতে বাধা দেয়। এদের বলে টিউমার সুপ্রেসর জিন, কোনো কারণে টিউমার দমনকারী জিন যদি নিষ্ক্রিয়তা হয়, তা হলে ব্রেন টিউমার হয়ে থাকে। যেমন- পি-৫৩ জিন-এর পরিবর্তনের ফলে ব্রেন টিউমার হয়ে থাকে। তাছাড়া হোল হিল বা মাথায় রেডিয়েশন দিলে ব্রেন টিউমার হয়ে থাকে।
ব্রেন টিউমার কত ধরনের : ব্রেন টিউমার দু’ধরনের- (১) ব্রেন টিউমার যা ক্যানসার জাতীয় নয় (২) ম্যালিগনাল টিউমার বা ক্যানসার জাতীয়। ক্যানসার জাতীয় টিউমার আবার দু’ধরনের- (১) প্রাইমারি ম্যালিগনাল যা স্থানীয়ভাবে উৎপত্তি হয়। (২) আরেকটি হলো (মেটাসটেসিস- গৌণ বৃদ্ধি), যা অন্য জায়গা থেকে ব্রেইনে ছড়িয়ে পড়ে। আবার যে কোষ থেকে টিউমার উৎপত্তি হয়, সেই কোষের নাম অনুযায়ী টিউমার এর নাম করা হয়। যেমন- এস্ট্রোসাইটোমা, এপেনডোমোমা, মেনিনিউমা, পিটুইটারি টিউমার ইত্যাদি।
টিউমারের প্রকার : মস্তিষ্কের টিউমারগুলো খুলির ভিতরকার টিসুগুলো থেকে উদ্ভূত মুখ্য বৃদ্ধি। দেহের অন্যান্য জায়গা যেমন- ফুসফুস বা স্তন থেকে রক্ত স্রোতের মাধ্যমে স্থানান্তরিত (মেটাসটেসিস-গৌণ বৃদ্ধি) হয়েও এই টিউমার হতে পারে। মায়ের গর্ভাবস্থায় ভিটামিনের অভাব ও বৈদ্যুতিক শক্তির ক্ষেত্রে দীর্ঘ অনাবৃত অবস্থার সাথে সম্ভাব্য সংযুক্তি দেখা যায়। প্রায় ৬০ শতাংশ হল গ্লাইওমা যা মস্তিস্কের পদার্থ থেকে উদ্ভূত। অন্যান্য মুখ্য টিউমারগুলো হল মস্তিস্ককে আবৃত করে রাখা মেনিনজিয়্যাল ঝিল্লি থেকে উদ্ভূত মেনিনজিওমা, শাব্দিক স্নায়ু থেকে উদ্ভূত শাব্দিক স্নায়ুর অর্বুদ ও পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে উদ্ভুত পিটুইটরি টিউমার। কয়েকটি নির্দিষ্ট ধরনের মস্তিষ্কের মুখ্য টিউমার শিশুদের আক্রমণ করে। মস্তিষ্কের পশ্চাদ্দেশে ইহাদের অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। এইগুলো হল মেডুলোব্লাসটোমা ও লঘু মস্তিস্কের অ্যাসট্রোসাইট্রোমা-এই দুই প্রকারের গ্লাইওমা। গৌণ বৃদ্ধি বা স্থানান্তরিতগুলো সর্বদাই সাংঘাতিক ও একাধিক যন্ত্রে হয়।
ব্রেন টিউমারের প্রাথমিক লক্ষণ : মাথাব্যথা ও চোখে ঝাপসা দেখা। তবে সব ধরনের মাথাব্যথাই ব্রেন টিউমারের জন্য নয়। মাথাব্যথা ১ শতাংশেরও কম, কারণ হলো – ব্রেন টিউমার। এ জন্য মাথাব্যথা খুব ভোরে শুরু হয়। মাথাব্যথার সঙ্গে খিঁচুনি হতে পারে। খিঁচুনি সাধারণত হাত-পা বা অন্য কোনো স্থান থেকে শুরু হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পরে। পিটুইটারি গ্ল্যান্ড টিউমার হলে রোগীর দৃষ্টিশক্তি কমে যায়। রোগী তখন সামনের অংশ দেখতে পায়। দুপাশের দৃশ্য দেখেন না এবং এক পর্যায়ে অন্ধ হয়ে যান। রোগীর ব্রেন সামনের অংশে বা ফ্রোনটিয়াল লোব-এ টিউমার হলে স্মৃতিশক্তি হ্রাস পায়। অ্যাবনর্ম্যাল ব্যবহার করে। দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যায়। মোটরেরি টিউমার হলে উল্টোদিকে প্যারালাইসিস হয়ে থাকে। ক্রেনিয়াল কবোটি এর নিচের প্রকোষ্ঠ টিউমার হলে রোগী হাঁটতে গেলে ইমব্যালেন্স হয়; কানে শোনেন না, কথা স্পষ্ট করে বলতে পারেন না। টিউমার বেশি বড় হয়ে গেলে রোগীর হঠাৎ মৃত্যু হতে পারে। মস্তিস্ক কশেরুকা মজ্জাগত তরল প্রবাহ টিউমার দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হলে মস্তিষ্কে শোথ (হাইড্রোসিফেলাস) হতে পারে।
রোগ নির্ণয় : ব্রেন টিউমারের অবস্থান ও ইহার বৃদ্ধি নির্ণয় করার জন্য অনেক রকমের কৌশল প্রয়োগ করা যায়। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হল- সি টি স্ক্যানিং, এম আর আই, বিশেষ এক্স-রে পাঠ ও অ্যাঞ্জিওগ্রাফি।
প্রতিরোধের উপায় : ব্রেন টিউমার প্রতিরোধের ক্ষমতা মানুষের নেই। তবে ধুমপান থেকে বিরত থাকলে ফুসফুস ক্যানসার হবে না এবং তা থেকে ব্রেনেও স্থানান্তর হবে না। তাছাড়া রেডিয়েশন পরিত্যাগ করা। যেমন- সেল ফোন এর ব্যবহার কমানো, ব্রেন রেডিয়েশন না দেওয়া। রেডিয়েশন ফিল্ড থেকে দূরে থাকা। তাছাড়া খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিলে এবং নিয়মিত ফলমূল, শাকসবজি খেলে সেল মিউট্রেশন কমে যায়।
ক্যানসার প্রতিরোধী খাবার : যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনষ্টিটিউটের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, কিছু খাবার প্রতিদিন গ্রহণ করলে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকটা কমে যায়। এ খাবারগুলোকে গবেষকরা ঘোষণা দিয়েছেন ক্যানসার প্রতিরোধী খাবার বলে। যেমন- হলুদ-কমলা রঙের সবজি ও গাজর এবং ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফলমূলঃ এগুলোতে আছে পর্যাপ্ত বিটাক্যারোটিন, কম ফ্যাটযুক্ত দুধে আছে ক্যালসিয়াম রিবোফ্ল্যাবিন, ভিটামিন এ, সি, ডি ইত্যাদি উপাদান এবং পেঁয়াজ ও রসুন-এগুলো ক্যানসার প্রতিরোধক হিসেবে দেহে কাজ করে।
হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান : বিজ্ঞানী চিকিৎসক হ্যানেম্যান এর যুগান্তকারী আবিষ্কার ক্রনিক মায়াজম, সাইকোটিক এর প্রভাবেই ব্রেন টিউমার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। ব্রেন টিউমার অত্যন্ত জটিল রোগ। ওষুধ প্রয়োগে মস্তিষ্কের চাপ কমানো দরকার। হোমিওঅ্যান্টিক্যান্সার ওষুধ দেয়া যেতে পারে। টিউমারের চারদিকের টিসুর স্ফীতি কমিয়ে সাময়িকভাবে লক্ষণগুলো উপশমের জন্য কোর্টিসোন ওষুধটি উপকারী। অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে লক্ষণ সাদৃশ্যে নির্দিষ্ট মাত্রায় নিম্নলিখিত ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। যথা- (১) আর্সেনিক (২) লাইকোপোডিয়াম (৩) ব্যারাইটা কার্ব, (৪) ক্যালি আয়োড, (৫) ফসফরাস, (৬) হাইড্রাসটিস, (৭) সালফার, (৮) কার্সিনোসিন, (৯) ক্যালকেরিয়া কার্ব (১০) ক্যালকেরিয়া ফ্লোর, (১১) কোনিয়াম, (১২) থুজা, (১৩) বেলেডোনা, (১৪) ম্যাগ ফস, (১৫) ভাইটাম, (১৬) জানসীন, (১৭) ইপিকাক, (১৮) কেলিফস, (১৯) অ্যানাথেরাম মিউর, (১৯) মার্ক অরেটাস, (২০) সিনের‌্যাবিয়া, (২১) গ্রাফাইটিস, (২২) প্লাম্বাম মেট, (২৩) সিকিউটা ভিরোসা, (২৪) ব্যাকোপা মনিয়ারী ২৫) কুপ্রাম মেট ২৬) হেলিবোরাস ২৭) নাইগ্রা ২৮) ক্যালকেরিয়াফস ২৯) রুটা ৩০) টিউবারকুলিনাম উল্লেখযোগ্য। তারপরেও চিকিৎসকের পরামর্শে সেবন করা উচিত।
লেখক : হোমিও চিকিৎসক ও প্রাবন্ধিক

x