মরুর দেশে সুমিদের আর্তনাদ

কাজী রুনু বিলকিস

শনিবার , ৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:৫৮ পূর্বাহ্ণ

বঞ্চনা ও অভাবের জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মানুষ কতরকম ঝুঁকি নিয়ে থাকে। কত বিপদসংকুল পথ বেছে নেয়! একটু স্বচ্ছলতা, একটু মাথা গোঁজা, একটু ভাল জীবন! কাড়ি কাড়ি টাকা নয় স্ত্রী স্বামী সন্তান মিলে একটা স্বচ্ছলতার সংসার! ভূমধ্যসাগরে চাকরির সন্ধানে যাওয়া নৌকাডুবির গল্প আমরা শুনেছি। সারি সারি দিশাহীন তরুণদের লাশও আমরা দেখেছি। এবার আসছে নারী শ্রমিকদের লাশ! সারি সারি লাশ জীবিত ও মৃত। নিজের দেশেই নারীদের জীবন-মৃত্যু ও সম্ভ্রম রক্ষার লড়াই করতে হয় প্রতিনিয়ত। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জানানো হলো কোনোরকমে বিদেশ যেতে পারলেই বদলে যাবে জীবন। তিনবেলা খাওয়ার কষ্ট থাকবে না। মাথা গোঁজার নিরাপদ আশ্রয়, সন্তানের পড়ালেখা, চিকিৎসা সবই হবে হাতের মুঠোয়। আহা জীবন! পরিপূর্ণ জীবনের ডাক এতো শুধু স্বপ্ন নয় এটা তো সম্ভব! পুকুরচুরি নয় দীঘি চুরি নয়! নিজের শ্রমে ঘামে অর্জিত টাকা দিয়ে স্বপ্ন পূরণের দেশে যাবে।
কতটা সীমিত স্বপ্ন, কত অল্প ও ন্যায্য চাওয়া, নারী ও পুরুষের পৃথিবীতে সমতা আসুক এমন প্রত্যাশা আমরা অনেকেই করি। সমঅধিকারের কথাও বলি, নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগও আমরা দাবি করি। ২০১৫ সালে সৌদি আরবে নারী শ্রমিক পাঠানোর একটা চুক্তি হয়। চুক্তির একটা শর্ত ছিল দুইজন নারী শ্রমিক পাঠালে একজন পুরুষ শ্রমিক পাঠানো যাবে। যদিও সেই চুক্তি মানা হয়নি। আমাদের সব কাজের মধ্যে একটা যেনতেন ভাব সব সময় থেকেই যায়। সবকিছুর মত নারী শ্রমিক পাঠানোও একটি গুরুত্বহীন ব্যাপারে নামিয়ে আনা হলো। গৃহ শ্রমিক না যৌনকর্মী হিসেবে পাঠানো হচ্ছে সে বিষয়ে কি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন ছিল না? সৌদি আরবে দীর্ঘ দিন ধরে বাংলাদেশের বহু শ্রমিক কাজ করছে। সৌদিদের সম্পর্কে তাদের একটা পরিষ্কার ধারণাও আছে। ২০১৫ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত ৫ লক্ষের বেশি নারী শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে। তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে। অনেকটা গরিবের বউ সবার ভাবীর মত অবস্থা! কোনোরকম প্রশিক্ষণ কিংবা মানসিক প্রস্তুতি না দিয়ে অশিক্ষিত, দুর্বল দরিদ্র জনগোষ্ঠিকে নিয়ে নতুন এই খেলা শুরু হয়!
এরা শেষ সম্বল পোষা গবাদি পশু, স্বর্ণ, ভিটে বাড়ি বিক্রি করে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমাতে আগ্রহী হলো। ৮ হাজারেরও বেশি নারী শ্রমিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে দেশে ফেরত এসেছে। লাশ হয়ে এসেছে ৫৩ জন।
সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, “শতকরা হিসেবে সংখ্যাটা খুব নগণ্য। ৯৯ শতাংশ নারী ম্যানেজ করে নিয়েছেন, দেশে টাকাও পাঠাচ্ছেন।” সংখ্যার বিচারে খুব সামান্য হতে পারে। কিন্তু এদের জীবনের কি কোনোই মূল্য নেই, কত সংখ্যক নারী শ্রমিকের মৃত্যু হলে সরকার এ ব্যাপারে মনোযোগী হবে?
সৌদিদের বর্বরোচিত আচরণের কারণে অনেক দেশ কিন্তু নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে। বাংলাদেশেও নারী মুক্তি কেন্দ্রসহ অন্যান্য সংগঠন এমন কি সাধারণ নাগরিকদের পক্ষ থেকে নারী শ্রমিক না পাঠানোর দাবি উঠেছে। উন্নয়নের গল্প শুনি সারা দিনরাত। মধ্য আয়ের দেশে রূপান্তরিত হচ্ছে বাংলাদেশ! উন্নয়নের মহাসড়কে পাখা মেলে উড়ছে বাংলাদেশ। তবুও কেন আমাদের আত্মমর্যাদার ব্যাপারটা মাথায় আসছে না? কেন আমরা প্রভাবশালী দেশগুলোর সাথে অসম চুক্তিতে রাজি হয়ে যাই? কেন নিজেদের স্বার্থ এবং আত্মমর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিতে পারি না?
এই দরিদ্র মেয়েগুলোর কেউ কেউ গর্ভবতী হয়ে ফিরছে। তাদেরকে এখন তাদের পরিবারও গ্রহণ করছে না। হত্যা নির্যাতন ধর্ষণের শিকার যদি একজন নারীও হয় তাহলে এ ব্যাপারে যথাযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়? নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত না করে কেন নারী শ্রমিককে বিদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হলো?
সুমি নামে একজন নারী শ্রমিকের আকুতি ভাইরাল হয়েছিল ফেসবুকে “ওরা আমারে মাইরা ফালাইব। আমারে দেশে ফিরাইয়া নিয়া যান আমার সন্তান ও আমার পরিবারের কাছে। আর কিছুদিন থাকলে আমি মরে যাব।” সরকারের উদ্যোগে এক সুমিকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে আরও অসংখ্য সুমির আর্তনাদ গুমরে মরছে মরুভূমিতে। সুমি জীবিত এসেছে কিন্তু অনেকেই আসছে লাশ হয়ে। পঙ্গু হয়ে ফিরছে। মানসিক ভারসাম্য হারিয়েও ফিরছে। ফেরত আসা নারী শ্রমিকেরা গণমাধ্যমকে জানিয়েছে- সৌদির ঘরে ঘরে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে নারীরা। এই নারী শ্রমিকদের নির্যাতন বা লাশ হয়ে ফেরার ঘটনা এক একটি সংখ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাছাড়া ফেরৎ আসা নারী শ্রমিকদের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই সরকারের কাছে। লাশ হয়ে আসা ৫৩ জনের মধ্যে ২১ জন আত্মহত্যা করেছে বলে মৃত্যুসনদে লেখা আছে।
বিভিন্ন নির্যাতনের অভিযোগে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন যখন গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে তখন অর্ধেক পারিশ্রমিক দিয়ে বাংলাদেশের সাথে সৌদি আরব গৃহকর্মীর চুক্তি করেছে।
অভিবাসন নিয়ে কর্মরত বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের কর্মকর্তারা বলেছেন শুধু নারী শ্রমিক পাঠানোর জন্য রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা বাড়তে বাড়তে এখন ৬২১টিতে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু নারী শ্রমিকরা বিদেশে কোনো নির্যাতনের শিকার হলে বা মারা গেলে তখন আর কোনো দায়-দায়িত্ব নিচ্ছে না। অভিযুক্ত কোনো এজেন্সিকে সরকার আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিয়েছে এমন নজিরও নেই। অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে ৯৯ শতাংশ নারীকর্মী শারীরিক, মানসিক এবং যৌন নির্যাতন থেকে শুরু করে প্রতিটি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। কেউ বলে, কেউ বলে না। এটা বন্ধ করতে হলে সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে এবং উভয় দেশের মধ্যে চুক্তি থাকতে হবে কীভাবে নারীকর্মীদের স্বার্থ রক্ষা করা যায়।
আমরা চাই না অবিরন বেগমরা লাশ হয়ে ফিরে আসুক। নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত না করে কোনো নারী শ্রমিককে যেন আর বিদেশে পাঠানো না হয়।

x