মমতাজউদ্‌দীন আহমদ কী চাহ শঙ্খচিল

অভীক ওসমান

শুক্রবার , ১৪ জুন, ২০১৯ at ৫:৪০ পূর্বাহ্ণ
281

মধুমতি তীরে গৌতমের করুণ মুরলী বাজে
‘আমার জীবনের চরম আফসোস আমি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি নাটক লিখতে পারিনি।’ আশিতম জন্মদিবসে নাট্যকার, শিক্ষাবিদ ও সংস্কৃতি যোদ্ধা মমতাজউদ্‌্‌দীন আহমদ বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এই হতাশার বাণী উচ্চারণ করেন। বঙ্গবন্ধুর মতো এমন অসামান্য উদার নির্ভীক মানুষ এই বাংলাদেশে আর জন্মগ্রহণ করেননি। সিরাজদৌল্লা, টিপু সুলতানকে নিয়ে নাটক লেখা হয়েছে, কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কোনো নাটক লেখা হয়নি।
বিটিভির ‘কীর্তিমানের গল্পকথা’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক সাজ্জাদ কাদিরের প্রশ্নের জবাবে তিনি আর্দ্র নাটকীয় সংলাপে বলেছেন, ‘আমার সময়, শক্তি নেই, আমার সংলাপ হারিয়ে গেছে। তাই আমি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নাটক লিখতে পারছি না।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমার মা দাদীরা বলেছেন, আমার জন্মের সময় নাকি আমি চোখ মেলে চারপাশটা দেখছিলাম। যেমন বাংলাকে দেখেছিলেন মধুমতী তীরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমাদের খোকা।’
মধুমতী তীরে খোকার সঙ্গী গৌতমের বংশী বাদন শুনে বঙ্গবন্ধু জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোর বাঁশিতে এত করুণ সুর বাজে কেন? গৌতম জবাব দেন, আমার বাংলাদেশ এক দুখিনী বাংলাদেশ। মমতাজউদ্‌্‌দীন আহমদ ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন, ‘আমার মরণ যেন হয় এই গৌতমের বাঁশি শুনে শুনে।’ আমার জীবন উজ্জ্বল করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
জননী জন্মভূমি স্বর্গাদপি গরিয়সি
মমতাজউদ্‌্‌দীন আহমদ শুধু বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসতেন না। তিনি বাংলাদেশ, বাংলাদেশের প্রকৃতি ও জনগণকে অসম্ভব আবেগে ভালোবাসতেন। তিনি তার মা দাদী চাচার প্রতি অসম্ভব ভালোবাসা পোষন করতেন। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘খুব ছোটবেলার কথা বলি- দাদী ছিলেন আমার সেল্টার। মায়ের চেয়ে দাদীর আশ্রয়টাই বেশি পেয়েছি। খুব কাঁদতাম। প্রত্যেক বিকেলবেলা কান্না আসত। দাদী আবিষ্কার করলেন, একটা উপায়েই ছেলের কান্না বন্ধ করা যাবে। গোধূলিবেলায় রাস্তা দিয়ে লাস্ট যে গরুটা যাবে, তার লেজ দিয়ে আমাকে যদি ঝেড়ে দেওয়া যায়, তাহলে কান্না থামবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেখুন বাংলাদেশের নদীগুলোর কী সুন্দর নাম! যেমন- মধুমতী, মেঘনা, যমুনা, আড়িয়াল খাঁ, কর্ণফুলী। এদের প্রবাহমানতা কতসুন্দর। স্নিগ্ধ শ্যামলা অপরূপ মনোরম বাংলাদেশ। নদীর দেশ, ধানের দেশ, গানের দেশ। আমি তাকে ভালো না-বেসে কী পারি! জননী জন্মভূমি আমাকে অনেক দিয়েছে। আমি তার কৃতজ্ঞ এক সন্তান। আই লাভ মাই কান্ট্রি।’
নিরন্তর সংগ্রাম
১৯৩৫ সালে জন্মগ্রহণ করা মমতাজউদ্‌দীন আহমদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখেছেন। তার স্কুল শিক্ষক যোগেশ বাবু তাকে সাঁওতাল বিদ্রোহের নায়ক ইলা মিত্রের কথা শুনিয়েছেন। তাতে তিনি তাপিত হয়েছেন। ১৯৫২ সালে এসে বলছেন, আমার পঞ্চাশটি বর্ণমালার উপর যখন আঘাত আসলো। আমার বর্ণমালা যখন রক্তাক্ত হলো। আমার ভাই রফিক, জব্বার, বরকত, সালাম শাহাদাত বরণ করলেন। ‘তোরা ঢাকা শহর রক্তে ভাসাইলি।’ তখন আমি আর থাকতে পারিনি। এটা সর্বজন বিদিত যে, মমতাজউদ্‌দীন আহমদ প্রথম অন্যান্যদের নিয়ে রাজশাহী কলেজ ক্যাম্পাসে শহীদ মিনার স্থাপন করেন। ১৯৫৬ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীকে জয়ী করার জন্য মমতাজউদ্‌দীন আহমদ পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে যান। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন আমলে গ্রেপ্তার হন।
যখন তিনি নাটক লিখছেন না, তখন কলাম লিখেছেন। স্যারের ভাষায়, ‘৯ বছর ধারাবাহিকভাবে লিখেছি। জনকণ্ঠ তখন ফুল হাইটে। বুধবারে আমার, গাফ্‌ফার চৌধুরীর লেখা প্রকাশ হতো। হকাররা বলত, বুধবারে জনকণ্ঠ বেশি বিক্রি হয়। প্রথম দিকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক লেখা লিখতাম। পরের দিকে রাজনৈতিক ছিল বেশি। প্রথম দিকে সাধু ভাষায় ও পরে চলিত ভাষায় লিখতাম। কিছু রম্য ধারাবাহিক ছিল। যেমন- তুওহে নুরুল ইসলাম্থ।’
আমি কবি হতে আসিনি, আমি নেতা হতে আসিনি
নজরুল তিনি পড়িয়েছেন বলে মনে হয় না। তবে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের পিতা নাট্যকার আজিমুদ্দীন সাহেব একটা কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। তখন সেই কলেজে একবার নজরুল পড়িয়েছিলেন। থ্রিলার উপন্যাসের চরিত্রের সংলাপের মতো ফিসফিস করে মমতাজউদ্‌্‌দীন আহমদ বলছেন, ‘নজরুলের সাথে আমার দেখা হয়েছিল। কেন জানি তিনি আমাকে শেষ কথাটি বলতে চেয়েছিলেন। দুখু মিয়া তার যন্ত্রণার কথা বলতে চেয়েছিল।’ তিনি প্রতিটি কথোপকথনে, প্রতিটি সাক্ষাৎকারে নজরুলের নিম্নোক্ত চরণ দিয়ে নিজেকে তুলে ধরতে চেয়েছেন :
‘বিশ্বাস করুন আমি কবি হতে আসিনি, আমি নেতা হতে আসিনি- আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলাম- সে প্রেম পেলাম না বলে আমি এই প্রেমহীন নীরস পৃথিবী থেকে নীরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম…’
সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম
জীবনের উপসংহারে, তার কথোপকথনসমূহে দর্শক শ্রোতাকে বন্ধুগণ সম্বোধন করে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করতেন : ‘রূপনারানের কূলে/জেগে উঠিলাম,/জানিলাম এ জগৎ/স্বপ্ন নয়।/রক্তের অক্ষরে দেখিলাম/আপনার রূপ,/চিনিলাম আপনারে/ আঘাতে আঘাতে/বেদনায় বেদনায়;/সত্য যে কঠিন,/ কঠিনেরে ভালোবাসিলাম,/সে কখনো করে না বঞ্চনা।/আমৃত্যুর দুঃখের তপস্যা এ জীবন,/সত্যের দারুণ মূল্য লাভ করিবারে,/মৃত্যুতে সকল দেনা শোধ করে দিতে।’ তরুণদের প্রতি মমতাজউদ্‌দীন আহমদের বাণী হচ্ছে : ‘সত্যকে পূজা করুন, নকলকে পূজা করবেন না। সারাজীবন সত্য অনুসন্ধিৎসু হও।’
রাজনীতি সংস্কৃতি, সুনীতি-দুর্নীতি
মমতাজউদ্‌্‌দীন আহমেদ রাজনীতির সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন। তিনি স্টুডেন্ট পলিটিক্সে লিডার ছিলেন। কিন্তু তিনি ছাত্রদের অপরাজনীতির সাথে সংযুক্তি চান না। তার মতে সংস্কৃতির সাথে রাজনীতির কোনো সংঘর্ষ নেই। ছাত্ররা তার কাছে বন্ধুর মতো, আনন্দের মতো। তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক আমি ইহাদেরই লোক।’ তিনি আরো বলেন, ‘প্রবীণ বয়সে যখন দেখি কাদের মোল্লাদের গাড়িতে আমার জাতীয় পতাকা উড়ছে। তখন ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। আমাদের ছাত্র-যুব সমাজ কেন ঝাঁপিয়ে পড়ছে না।’ তাদেরকে অবশ্যই ধর্ম-নিরপেক্ষ, জঙ্গিবাদ বিরোধী লড়াইয়ে সামিল হতে হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী অনেকক্ষেত্রে আমাদের বুদ্ধিজীবীরা সঠিক দায়িত্ব পালন করেননি। শিক্ষানীতি সম্পর্কে মমতাজউদ্‌্‌দীন আহমদ বলেন, ‘ধনী-গরিবের জন্য একটাই শিক্ষানীতি হওয়া উচিত। ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষানীতি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন দরকার।’ তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের উপর নাটক সঙ্গীত সাহিত্যে ব্যাপক কাজ হয়েছে।’
দুর্নীতি-সুনীতি সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘দুর্নীতি রোধে গৃহিনীরা বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারেন।’ একুশে টেলিভিশনের উপস্থাপক মোহসেনার এক প্রশ্নের জবাবে মমতাজউদ্‌্‌দীন আহমদ বলেন, ‘যদি বাধ্য হয়ে কোনো দুর্নীতিবাজদের সাথে ভাত খেতে হয়। তখন মরমে মরে যাই। যারা ফরমালিনযুক্ত খাদ্য দিয়ে আমাদের শিশুদের হত্যা করছে। মানুষের কিডনি নষ্ট করছে। তাদের সাথে কোনো আপোষ নেই।’
গৃহিনী সচিব সখা : মধ্যরাতে এককাপ চা
আমাদের জানা মতে চট্টগ্রামের সাব-এরিয়া নিবাসী ডা. কামরুজ্জামানের বড় কন্যা কামরুনেচ্ছাকে তিনি ভালোবেসে বিয়ে করেন। চট্টগ্রাম কলেজের বাংলা বিভাগের এক সমাবেশে স্যার বক্তৃতা দেওয়ার সময়। সম্বোধনকালে বলেন, ‘সুধি সজ্জনমণ্ডলী, আমার ছাত্র-ছাত্রীগণ এবং অবশ্যই একজন আমার স্ত্রী এখানে উপস্থিত আছেন।’ স্যার এমন উইটি ছিলেন। স্যারের বড় শ্যালিকা আমাদের সময় প্রিলিমিনারিতে পড়তেন।
সারা জীবন তার স্ত্রী সহিষ্ণুতা দেখিয়েছেন। উৎসাহ যুগিয়েছেন। স্যার লিখছেন। মধ্যরাতে এককাপ চা হাতে কামরুনেচ্ছা আহমদ। তারপর সৃষ্টি, বাংলা নাটকের সৃজনশীলতা এগিয়ে গেছে। কামরুনেচ্ছা স্যারকে পাঁচশ টাকা হাত খরচের একটা চেক দিতেন। স্যার ৫০০ টাকার আগে ১ বসিয়ে ১৫০০ টাকা তুলতেন। কী মধুর প্রতারণা। তিনি কথায় কথায় বলতেন, ‘আই এম হ্যাপি হাজবেন্ড।’
৮৫তম জন্মদিনের এক আনন্দ আয়োজনে তিনি বলেন, ‘খুব ভালো লাগছে। অভিভূত হয়ে গেলাম। প্রচণ্ড হতাশ হয়ে গিয়েছি। চিন্তা করতে পারি না, পড়তে পারি না, ভাবতেও পারি না। ঘর ভর্তি বই, স্পর্শ করতে পারি না। ৪৪ বছরের নিয়ম- ডায়েরিটাও লিখতে পারি না এখন। এমনকি নিজের হাতে খেতেও পারি না। শিশুর মতো হয়ে গেছি আমি। আমার বাঁচার কোনও যোগ্যতা নেই, আমি আবর্জনা মাত্র।’ এরপর আবেগতাড়িত হয়ে তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রতিটি ধুলিকণা আমার। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, মঠ- সব আমার। পৃথিবীর সেরা দেশ আমার দেশ।’ অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে স্ত্রীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘যেতে দাও কুমু, আমার সময় হয়ে গেছে।’ কুমুর বন্ধন এতোটাই দৃঢ় ও নির্ভরশীল।
যদ্যপি আমার গুরু
‘জাস্টিস হাবিবুর রহমান ছিলেন আমার শিক্ষক। আর এমন একটা মানুষ, যার জন্মই হয়েছে শিক্ষকতার জন্য। খুবই হিউম্যান বিয়িং। প্রফেসর মিজান সাহেব, এলিফ্যান্ট রোডের মোস্তফা মহসীন মন্টু; ওর বাবা। প্রফেসর আহমদ হোসেন বাংলা একাডেমির সেক্রেটারি ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বোডের্র সেক্রেটারি। উনি আমার শিক্ষক, বাংলার। খুবই আদর্শবাদী মানুষ। পরবর্তী সময়ে ড. এনামুল হক আবার এলেন রাজশাহী কলেজের বাংলা ডিপার্টমেন্টের হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট হয়ে, আমাকে ইনফ্লুয়েন্স করেছেন। প্রিন্সিপাল পেয়েছি সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ শামসুল হক তাঁকে। আমাকে পুত্রাধিক স্নেহ করতেন। কবীর চৌধুরী নাটক শিখিয়েছেন।
মুনীর চৌধুরীর সঙ্গে তো অনেক স্মৃতি। তাঁর জীবনের শেষ বক্তৃতাটি আমার সামনে দিয়েছিলেন। ইট ওয়াজ ইন দ্য মান্থ অব ফেব্রুয়ারি, নাইনটিন সেভেনটি ওয়ান। চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন। তাঁর ভাই ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের শিক্ষক। আমি বাংলা ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান। প্রতিদিন ড্রাইভ করে আসতেন। চেয়ার ছেড়ে দিতাম, আমার শিক্ষক। একদিন বললাম, স্যার, আমার অনার্সের ছাত্ররা আপনার কথা শুনতে চাচ্ছে। একটা বক্তৃতা যদি দেন। বললেন, আমি ভাড়াটে লেকচারার নাকি? ভাড়া খেটে বেড়াই? সাত দিন সময় দেবে। পড়াশোনা করি। তারপর বলব। ভাবুন একবার, মুনীর চৌধুরীর মতো একজন শিক্ষক কথা বলতে সাত দিন চেয়েছেন! আমার জীবনবোধের শলাকা তীক্ষ্ণ করায় অবদান যদি কারো থাকে, তাহলে তিনি হচ্ছেন মুনীর চৌধুরী।
এই প্রেক্ষাপটে তার শিক্ষক মুনির চৌধুরী সম্পর্কে তার ভাষ্য উদ্ধৃতি করা সমীচীন, ‘জেলের স্বল্প আলোতে রাজবন্দী মুনির চৌধুরী কবর নাটক মঞ্চস্থ করলেন। জাতীর জীবনের শ্রেষ্ঠ ট্র্যাজিডি হচ্ছে, মুনির চৌধুরীর নাটক কবর আছে, কিন্তু একাত্তরে তার কবর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এক রক্তাক্ত প্রান্তর-এর নাট্যকার মুনির চৌধুরী একাত্তরে আরেক রক্তাক্ত প্রান্তরে হারিয়ে গেলেন।
নাটক, ও বন্ধু আমার
নাটক সম্পর্কে স্যার এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আমাদের গ্রামে নাটক হতো, খেমটা নাচ, ঝুমুর নাচ, কবিগান হতো। চাচা, মামা অভিনয় করতেন। জেঠাতো বড় বোনও অভিনয় করতেন। সে সময় রাম-সীতার কথা হতো, বনবাসের কথা হতো। খুব আগ্রহ নিয়ে দেখতাম।
জহির রায়হান, আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী, আনিসুর রহমান, আহমেদুর রহমান আমার ক্লাসফ্রেন্ড। খান আতার সঙ্গে যোগাযোগ হলো, দেখলাম এফডিসি হচ্ছে আমার সামনে। সুমিতার সঙ্গে পরিচয় হলো। ঢাকা বেতার দেখলাম। শামসুর রাহমানকে দেখলাম। অনেক বড় হয়ে গেল না মনটা? কালচারাল অ্যাক্টিভিটিজের সঙ্গে যুক্ত হলাম। দ্যাট ইজ দ্য ভাস্ট ডেভেলপমেন্ট অব মাই লাইফ।
কার্জন হলে নাটক করলাম। পরিচালকরা ছিলেন- মুনীর চৌধুরী, নুরুল মোমেন, আসকার ইবনে শাইখ। মুনীর চৌধুরী খুব পছন্দ করতেন। ভালো একাডেমিশিয়ান। খুব আদর্শবাদী ও আশাবাদী মানুষ ছিলেন।
প্রেরণা-অনুপ্রেরণা
তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল- নাটক লেখায় কার অনুপ্রেরণা বেশি কাজ করেছিল। তাঁর ভাষায়, ‘শেকসপিয়ার। তাঁর সংলাপে যে গোয়ার্তুমি আছে, প্রসন্নতা আছে। এত আধুনিক দিক আছে, এই জিনিসটা আগে ধরতে পারলে আমি আরো সমৃদ্ধ হতে পারতাম। চেখভের রসিকতার প্যাটার্নটা ভালো লেগেছে। বুড়িগঙ্গা, চিলপাড়্থ, জংলি, হৃদয়-ঘটিত ব্যাপার স্যাপার- এ চারটিতে তাঁর অনুপ্রেরণা রয়েছে। সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর অবস্থান, অবক্ষয় নিয়ে ইবসেন ভাবিয়েছে। তবে সংলাপ আর চরিত্রের সাহস দিয়েছে শেকসপিয়ার। বাঙালি হাসতে চায়, বাংলা নাটকে তাই প্রহসনের সংখ্যা বেশি। গ্রিক নাট্যকাররা আমাকে শিখিয়েছেন, ট্র্যাজিডি মানে টুপ করে পাতার পতন নয়, হিমালয় থেকে পতন।’
চিটাগাং টু দ্য ফোর
বলা হয়ে থাকে তার সংগ্রাম ও শিক্ষকতা জীবনের সেকেন্ড হোম চট্টগ্রাম। প্রিয় পাঠক আসুন এ বিষয়ে স্যারের সংলাপ শুনি। ১৯৬০ সালে। চট্টগ্রাম কমার্স কলেজের টিচার। জলোচ্ছ্বাস হলো। বহু লোক মারা গেল। পতেঙ্গা সমুদ্রপাড়ে গিয়ে দেখি, বহু মানুষ মরে অঙ্গার হয়ে গেছে লবণ পানিতে। খুব বিষণ্ন হয়ে গেলাম। কলেজের প্রিন্সিপাল আবদুস সোবহান খানকে বললাম। বললেন, মমতাজ সাহেব! আপনি বরং কিছু লেখেন। একটা চ্যারিটি শো করি। ডিভিশনাল কমিশনার ছিলেন ডি কে পাওয়ার, বাংলার প্রথম চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশের নায়িকা জহরত আরাকে বিয়ে করেছেন। পাওয়ারের ফান্ডে টাকা জমা রাখব। তখনই প্রথম নাটক লিখলাম- তবু আমরা বাঁচব, মঞ্চস্থ হলো। অ্যান্ড ইট ওয়াজ এ লিটল বিট অব সাকসেস। ১৯৬১ সালে চট্টগ্রাম রেলওয়ের ওয়াজি উল্লাহ ইনস্টিটিউটে মঞ্চস্থ হলো। আমার সাহস বেড়ে গেল।
আমার থিয়েটার-জীবনের, নাটক রচনার, নাটকের জীবনের একটা বড় অংশজুড়ে রয়েছে চট্টগ্রাম। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় চট্টগ্রামেই ছিলাম। আমরা ঠিক করলাম, শিল্পী-সাহিত্যিক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করব। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করব, কবিগান হবে। আমার ওপর দায়িত্ব এলো নাটক লেখার। ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ- এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম…এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। উদ্দীপ্ত হয়ে লিখলাম এবারের সংগ্রাম। লোকনাট্য ধরনের।
সেভেনটি-ওয়ানে, ফিফটিন মার্চে- মনে আছে। মাঠে যখন এলাম, শহরের অর্ধেকটা পূর্ণ হয়ে গেছে। আন্দরকিল্লা, সিনেমা প্যালেস লোকেলোকারণ্য। আলাদা করে মাইকের ব্যবস্থা করা হলো। মঞ্চস্থ হলো লোকনাট্য। চরিত্র হচ্ছে- ইয়াহিয়া খান, ভুট্টো, মওলানা ভাসানী, বাংলার মানুষ। বিলিভ মি, দেড় লাখ লোক। পিন ড্রপ সাইলেন্সের মধ্যে অভিনয় হয়েছে। তখন থেকে আমার দীক্ষা হয়েছে বাংলার নাটকের মুক্তিমঞ্চের ঘেরাটোপে নয়। বাংলার নাটকের মুক্তি যাত্রা ও লোকনাট্যে।
আমার বিশ্বাস, এখনো যদি কেউ নবাব সিরাজদ্দৌলা নিয়ে যাত্রা করে, তাহলে শিল্পকলার ভালো কোনো নাটকের চেয়ে বেশি দর্শক পাবে। বাংলার দর্শক চেয়ার-টেবিল চায় না। এই দেড় লাখ মানুষ দেখে আমার সাহস বেড়ে গেল। লিখলাম, স্পার্টাকাসবিষয়ক জটিলতা, বর্ণচোরা।
২৩ মার্চ কলেজ মাঠে ৫০ হাজার লোক আমার নাটক দেখছে। এমন সময় খবর পাওয়া গেল, সোয়াত জাহাজ থেকে পাকিস্তানি আর্মিরা আর্মস নামাচ্ছে। মানুষ যে যা কিছু পেল হাতের কাছে, তা-ই নিয়ে ছুটে গেল বন্দরে, সোয়াত ভেঙে ফেলবে বলে। বোকামি, কিন্তু উত্তেজনাটা তো সত্যি ছিল। এ উত্তেজনাকে ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। এখানেই নাটকের প্রভাব উল্লেখযোগ্য। এখানে আরেকটা বিষয় হচ্ছে, এসব নাটক করতে করতেই বাংলাদেশটাকে হৃদয়ের গভীরে স্থাপন করে ফেলেছিলাম।
বহুমাত্রিক : টেলিভিশন, রেডিও, চলচ্চিত্র ও অভিনয়
নাটক ছাড়াও স্যারের বহুমাত্রিক প্রতিভা ছিলো। তিনি বলছেন- নাইনটিন সিক্সটি-ফোর থেকে। শুরুতে চট্টগ্রাম থেকে নাটক লিখে পাঠাতাম। আমার সর্বাধিক নাটক প্রযোজনা করেছেন আবদুল্লাহ আল মামুন, মোস্তফা কামাল সৈয়দ, নওয়াজেশ আলী খান। টেলিভিশনে এ পর্যন্ত ৩৫ থেকে ৩৭টা নাটক হয়েছে। দু-একটা অনুবাদ ছাড়া সবই মৌলিক।
রেডিওতে অভিনয় শুরু করেছি নাইনটিন সিক্সটি-টুতে। লিখেছিও। চট্টগ্রাম বেতারের প্রথম নাটকটি আমার লেখা। বাংলাদেশ হওয়ার পর ঢাকা বেতারে প্রচারিত হওয়া প্রথম নাটক আমার। বাহাদুরির কিছু নয়, হয়তো ঘটনাচক্রে ঘটে গেছে।
তারিক আনাম খান, কবরী অভিনীত লাল সবুজের পালা্থ। পাঁচ-ছয়টা সিনেমায় অভিনয় করলাম। চিত্রা নদীর পাড়ে করতে এসে শুনলাম ছবির জন্য তানভীর মোকাম্মেল টেলিভিশন, সাইকেল বিক্রি করে দিয়েছেন। ২০ হাজার টাকা দিলেন। বললাম, না, নেব না। তিনি এত কিছু করতে পারলেন আর আমি সম্মানীটা ফিরিয়ে দিতে পারব না? শঙ্খনীল কারাগার করলাম। শুনলাম এ ছবির জন্য আমাকে জুরি বোর্ড পুরস্কৃত করেছে। পরে দেখলাম সবাই পেয়েছে, শুধু আমি পাইনি। পলিটিক্স জানি না। সিনেমায় অভিনয় করে আমি কোনো পুরস্কার পাইনি। হাছন রাজা, বিরাজ বৌসহ আরো কিছু সিনেমায়ও অভিনয় করেছিলাম। লালন শাহ, হাসন রাজার মধ্যে আমি অনেক কিছু খুঁজে পেয়েছি। হাসন রাজার থালা-বাসন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করেছি।
মনের মতো চরিত্র পেলে খুব ভালো লাগে। শঙ্খনীল কারাগারে ধর্ষক শিক্ষকের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলাম। শিল্পকলায় একটা মঞ্চনাটক দেখতে জাহানারা ইমাম এসেছিলেন। আমাকে দেখে ধ্যুত, ধ্যাত…দুশ্চরিত্র বেটা…অসভ্য… বলছিলেন। বললাম, আপা, আপনি চাইলে আমাকে জুতা দিয়ে মারতে পারেন। তিনি আমার অভিনয়টা খুব পছন্দ করেছিলেন। স্ক্রিনে দেখে স্ত্রী পর্যন্ত তিন দিন কথা বলেনি- ছিঃ ছিঃ! এই চরিত্র তুমি কেন করলে? তবে আমার ধারণা, শ্রেষ্ঠ অভিনয় করেছি চিত্রা নদীর পাড়ে ছবিতে।
মহান শিল্পীর মহা প্রয়াণ
সময় টেলিভিশন প্রয়াণ পরবর্তীতে মমতাজউদ্‌্‌দীন আহমদকে ‘স্বপ্নবাজ মানব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে তাকে জিজ্ঞেস করা হলে স্বপ্নের বাংলাদেশটা কেমন দেখতে চান। ‘একজন মানুষকেও বস্ত্রহীন, খাদ্যহীন, স্বাস্থ্যহীন ও শিক্ষাহীন দেখতে চাই না। দরিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ চাই।’
শিক্ষাবিদ, নাট্যকার, অভিনেতা, সাংস্কৃতিক যোদ্ধা বায়ান্ন ও একাত্তরের স্বারস্বত জাতীয় বীর মমতাজউদ্‌্‌দীন আহমদ সারাজীবন নাটকীয়ভাবে রসবোধসম্পন্ন জীবনযাপন করে গেছেন। কিন্তু আমাদের মনে হয়। ‘বাহিরে যার হাসির ছটা,/অন্তরে তার চোখের জল?’ তিনিই তো লিখেছেন অসামান্য জীবনকথা, ‘চার্লি চ্যাপলিন-ভাঁড় নয় ভব ঘুরে নয়।’ কী নিদারুণ অভিমানে অনেক অভিযোগ গোপন রেখে চলে গেলেন অতৃপ্ত মহান শিল্পী সহাস্য সাহসী মমতাজউদ্‌্‌দীন আহমদ।
ড. মইনুল ইসলামের ভাষায়, ‘জাতির শিক্ষা ও সংস্কৃতিজগতের এ বিশাল মহীরুহের বিদায়লগ্নে হয়তো তাঁর প্রাপ্য শ্রদ্ধার্ঘ্যের কিছুটা কমতি ঘটেছে। অবশ্য তিনি নিজেই নাকি তাঁর মৃত্যুর পর বেশি আড়ম্বর না করার নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন।’ আশা করি আমাদের আগামী প্রজন্ম তাঁকে স্মরণ ও অনুসরণ দুটোই করবে।
সূত্র :
১. বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘কীর্তিমানের গল্পকথা’ শীর্ষক সাক্ষাৎকার
২. চ্যানেল টুয়েন্টি ফোর, একুশে টেলিভিশন, এটিএন বাংলায় দেয়া সাক্ষাৎকার
৩. বাংলা উৎসব, চট্টগ্রাম কলেজ, ২০১২
৪. কালের কন্ঠ, ২০১৫
৫. নাট্যাচার্য মমতাজউদ্দীন আহমদ, অভীক ওসমান, দৈনিক আজাদী, ২০১৮
৬. মনিরুল মনির, কবি ও প্রকাশক, খড়িমাটি

x