মন ভাল নেই

তাজনীন সুমনা

শনিবার , ১৯ অক্টোবর, ২০১৯ at ৩:৫১ পূর্বাহ্ণ
23

সপ্তাহে একদিন এমন রুটিন মাফিক মন খারাপ হওয়াটা অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে! মন খারাপ না হওয়াটাই অস্বাভাবিক। কেন মন খারাপ হয় ভাবতে গিয়ে দেখলাম, কারণ ছাড়াই হয়! এর কিছু করার নাই, বিশেষ বোদ্ধা যারা তারা হয়ত বলবেন… শক্ত মাইর দিলে ঠিক হয়ে যাবে। হতে পারে, কিন্তু মাইরটা দিবে কে? কেউ নাই, তাই মন খারাপই মারতে থাকে সানন্দে!! যাইহোক, আবহ সংগীত গাওয়া শেষ… মূলভাষ্য এই, এমনসব মনখারাপের দিনে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি। উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরির পর কোনো দোকানে ঢুকে কেনাকাটা করতে থাকি। এখানে একটা মজার বিষয় আছে, দোকানে গিয়ে মনে হয় সবকিছুই খুব প্রয়োজনের বস্তু, সবই লাগবে (!!!) তাই ব্যাগের টাকাকড়ি শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেনা শেষ হয় না। বাড়ি ফিরে দেখা যায় একই বস্তু ঘরেই আছে, আর সাথেএমন সব বস্তুর আমদানি হয়েছে যা আক্ষরিক অর্থে অচল মাল! কেন যে মন খারাপ হয়…! তাতে যত না মনের ক্ষতি ততধিক ক্ষতি অর্থ-কড়ির।
মনখারাপের আরো একটা খারাপদিক এই, সোজা কোনো চিন্তা করার মনটার সুইচ-অফ হয়ে থাকে। ভালমনে চিন্তা করলে দেখি এইসব মন খারাপের সময় যত এলোমেলো হাঁটিচলা, এই হাঁটাটা অন্যকোথাও কাজে লাগানো যেত। এইসব দেশে সবই কাজে লাগে, অকাজের ব্যাপারগুলো আরো বেশি কাজে লাগে! সত্যি! তার উপর যেসব ফালতু খরচ করে পরে আফসোস করি, সেই টাকাটা কোনো চ্যারিটি ফান্ডে দিলে আরো অনেক বেশি কাজের হয়। এতে দুটো কাজ হতে পারে, যাদের খুব প্রয়োজন সাহায্যের তারা কিছুটা উপকৃত হয় আর অন্যটা ব্যক্তিগত, সেটা হল কারো জন্য সামান্যকিছু হলেও কিছু করতে পারার শান্তি। আর এই সহজ সত্যটা ঠিক সময়ে মনে পড়ে না বলেই তো যত এলোমেলোতা।
বিপত্তি এড়ানোর সহজপন্থা বলে কোনো বই হয়তো লেখা হয়েছে, আমার পড়া হয়নি। আর নিশ্চিত করে বলতে পারি সেই বইতে মন খারাপ ঘটিত কোনো বিপত্তির কথা অবশ্যি অবশ্যি লেখা নাই। থাকলে আর কেউ না হোক পৃথিবীর কয়েকটা মানুষের উপকার তো হতই হত। (আমি একজন, অন্য দুজনের কথা জানি, বলা যাবে না তাদের নাম।) তবে তেমনসব পুস্তকে যাদের কথা বলা হয়ে থাকে, তাদের দেখা যায় পথে আর শপে, দেখতে ঠিক মানুষের মত অথচ আচরণ … …, আচরণ দেখে প্রাণীই মনে হয় তাদের। তারা অকারণ রাগে ফুঁসতে থাকে, সুযোগ পেলেই বিশ্রি ঝগড়া লাগিয়ে দেয়, দোকানীরা এমনসব প্রাণীদের অত্যাচারে টতস্থ থাকে। কেন যে তারা এমন করে তারাও জানে না। মনবিজ্ঞানীরা জানেন, তাদের ভাষ্যমতে ডিপ্রেশন থেকে আস্তে আস্তে এই রাগের উৎপত্তি। সবার উপর, সবকিছুর উপর ভয়ংকর রাগ, নিয়ন্ত্রণহীন, নামহীন …। এমন যারা, তাদের উপর বিতৃষ্ণা বা ঘৃণা হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক । হয়ও তাই, কিন্তু একটু যদি ভাবি তাদের কথা তখন বুঝি তাদের সহজ সহমর্মিতাবোধ ছাড়া আর কিছুই করার নাই আমাদের। কেউ যদি তাদেরসাহায্য করতে পারে তো সেটা তাদের ডাক্তার এবং স্বয়ং তারাই। ধর্মগ্রন্থে বলা আছে , যে নিজে সাহায্য করে না, তার সাহায্য ঈশ্বরও করতে পারেন না !
প্রসংগান্তরে চলে যাচ্ছি কি? যদিও আজ কি যে প্রসঙ্গ তাই ভাল ঠাউর হচ্ছে না ! মন খারাপ প্রসংগ ? কেন মন খারাপ হয় সেটা যদি জানা যেত , তাহলে হয়ত কোনো কাজ হত। কারনটাই মুখ্য , আর সব গৌ্‌ণ। অসুখের কারণ জানা গেলে পর ঔষধ নির্ধারণ সম্ভব, এই যুক্তি সববেলাতেই প্রযোজ্য। ছোট ছোট, মামুলি, নিতান্ত সব কারণে মন খারাপ। বলতে গেলে হাস্যকর ঠেকবে, মানতে গেলে অসহ্য। কিন্তু এসব যে কী প্রকান্ড আকার ধারণ করে কারুর দিন-রাত এমনকি অস্তিত্বকেও হাঁ করে গিলে ফেলতে পারে, তা কি কেউ বোঝে? আমি বুঝি, সত্যিই বুঝি।
একটাসময় বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়েছিলাম, বেশিদিনের কথা না এটা। রোজকার দায়িত্বপালনটাই একটা চাপ হয়ে গিয়েছিল। হ্যাঁ, এমন চিন্তাও এসেছিল, কি হবে বেঁচে থেকেৃ সেই তো একই একই রুটিন দিনের পর দিন, নির্ঘুম অন্ধকারযাপন রাতের পর রাত। বাচ্চারা সমঝে চলছে, বিরক্ত করছে না, তবুও কী যে একটা নাই-নাই, হারাই-হারাই অনুভূতি! একজন নৈরব্যক্তিক জড়পদার্থে পরিণীত হওয়া একটু একটু করে। বাচ্চা ব্যথা পেল, ওষুধ লাগিয়ে দিয়ে দায়িত্ব শেষ। তাকে আদরের কোনো বালাই নাই। ঘরের জরুরী কিছু কাজ সারতে হবে বা তারচেয়েও জরুরী অফিসিয়াল কোনো
ডেডলাইন, তাতেও তেমন গা-নাই রা-নাই। করছি তো, যতটুকু করার এর বেশি করতে গেলে ভাইরাসে জর্জরিত কম্পিউটারের মত হ্যাং করব মানে করতাম। বিছানায় কাঁথা মুড়ি দিয়ে হ্যাঙ্গাতাম, পড়ে থাকতাম, ঘুমাতাম না কারন আসত না ঘুম। অথবা কখনো কখনো লাগাতার ঘুম, খুব অসুবিধা না হলে কারুর রানতাম না, খেতাম না, কেউ খেল কিনা দেখতামও না। নিজেকে ভাগ্যবান বলতেই হয়, কারণ এমনসব সময় আত্মহননের সম্ভাবনা থাকে। আমারও ছিল, এক্ষেত্রে দুরবর্তী কাছের মানুষদের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রাখতে পারি, ওরা সহায় ছিল ছায়ার মত। যাদের এমন সহায় নেই তাদের কি হবে তাহলে? কারণ, এইসব বিষণ্নতা তো বলে কয়ে আসে না যে মানুষ এর জন্য তৈরী থাকবে! তার উপর ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এই রোগে ভোগে বেশি। তার একটা বড় কারণ মেয়েরা মেয়ে বলে। মানে তাদের মনঃদৈহিক গঠনের জন্যই বিষণ্নতা সহজে সাম্রাজ্য গাঁড়তে পারে।
এ তো গেল বিষণ্নতার ঠিকুজিকুষ্ঠি। কিন্তু এই বেয়াড়াটা ঢিঁট করার উপায় কি? আদৌ কি কোনো উপায় আছে? সেটা কাজে দেয় কি? খুব সহজকিছু উপায়ে একে মোকাবেলা করা সম্ভব। প্রথম যেটা বুঝতে হবে বা মানতে হবে, তাহল সমস্যাটাকে সমস্যা বলেই চিহ্নিত করা। তারপর কেউ মুক্ত হতে চায় এর থেকে, তখন অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেয়া। কঠিন বা কোমল তার ধরন বুঝে সেটার সাথে মোকাবেলা করা, এবং মোকাবেলাই সঠিক শব্দ কারণ প্রয়োজনে ওষুধও খেতে হতে পারে। তবে নিজে নিজে সামলে উঠতে চাইলে, নিজেকে কদিন জোর করে সময় দেয়া। একাএকা চুপচাপ থাকা মানে নিজের সাথে থাকা না বা নিজেকে সময় দেয়া না। নিজেকে সময় দেয়ার মানে হল নিজের সবকিছুকে ভালবাসা। সবার আগে মনটাকে ভাল রাখার ব্যবস্থা করা। তারপর ছোটোখাটো কিছু কাজ করা, যা করে আনন্দ পাওয়া যায়। তারপর দুয়ে দুয়ে চার করে, নতুন নতুন (স্বাস্থ্যসম্মত) কাজে নিজেকে জুড়ে দেয়া।
একটা পরিচিত মেয়ের স্বীকারোক্তি বলার লোভ হচ্ছে, বলেই ফেলি-“আমি এখন আর আমার বন্ধুদের জন্য অপেক্ষা করি না যে তারা আমাকে এই কষ্ট থেকে উদ্ধার করবে। একটা সময় আমিই তো ওদের দূরে ঠেলেছি সুতরাং এখন ওদের কাছে যাওয়ার সাহস আমার নাই, কোনো একদিন যাব ক্ষমা চাইবোৃ তার আগে নিজের কাছে ক্ষমা চাই দিনগুলোকে মাটি করার জন্য, নিজের মন, শরীর, চুল আর ত্বকের কাছেও ক্ষমা চাই তাদের অযত্ন আর অবহেলা করার জন্য। এখন থেকে নিজেকে
ভালবাসবো, অন্ততঃ চেষ্টা করবো।”
আমিও তাই চেষ্টা করছি, নিজেকে সময় দিচ্ছি। কত কি চারপাশে ছড়ানো, কত কত দৃশ্য, কিছু দৃশ্য স্রেফ দেখার, কিছু কিছুর অংশ আবার অজান্তেই হতে হয়। তেমন এক দৃশ্য, এক বৃদ্ধ তার লাইফ-সাপোর্ট অক্সিজেন সিলিন্ডার টেনে চলছে। একটু উঁচু ফুটপাথে সেই ভারি সিলিন্ডার টেনে তুলতে তার যে কষ্ট হচ্ছে তা দেখে তাকে সাহায্য করতে চাইলে, তিনি বললেন সাহায্য নেবেন না। বললেন ‘আমি অভ্যস্ত’। ভেতর এই কথাটারই অনুরণন হচ্ছে… আমি অভ্যস্ত! হ্যাঁ, যা নিয়ে প্রতিদিন প্রতি মুহুর্ত চলতে হয়, যা কষ্টকর হওয়া স্বত্ত্বেও টেনে বেড়াতে হয়, তাতে অভ্যস্ত তো হতেই হয়। কিন্তু বিষণ্নতায় অভ্যস্থ হওয়াটা হবে অক্সিজেন বাতাস থেকে না টেনে নিয়ে তার সিলিন্ডারের বোঝা বয়ে বেড়ানো, কারণ বিষণ্নতা থেকে মুক্ত হয়ে শ্বাস নেয়া সম্ভব, প্রকৃতি তার সন্তানদের জন্য কত কি ছড়িয়ে রেখেছে চারপাশে, তার নির্যাসে জীবনকে উদযাপন করা যায়, একটু শুধু সময় চাই সেটা চেয়ে দেখতে, চাখতে আর মাখতে।

x