মন্দ ঋণ বেড়েছে ॥ ঋণ খেলাপি সংস্কৃতি রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি

শুক্রবার , ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ

নানামুখী উদ্যোগ সত্ত্বেও ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কমেনি। উল্টো এ সময়ে ব্যাংকগুলোর ২২ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকার ঋণ নতুন করে খেলাপি হয়েছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৪৭৩ কোটি টাকাই মন্দ খেলাপি। গত এক বছরে ব্যাংকিং খাতে মন্দ ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৩৮ কোটি টাকা। যদিও গত জানুয়রিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর খেলাপি ঋণ বাড়বে না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণেরও ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। গত নয় মাসে শুধু পরিমাণ নয়, খেলাপি ঋণের হারও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে এ হার ১১ দশমিক ৯৯ শতাংশে ঠেকেছে। পত্রিকান্তরে সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়েছে।
দেশের ব্যাংকিং খাতের বড় সমস্যা খেলাপি ঋণ। বর্তমান অর্থমন্ত্রী এ খাতকে খেলাপি ঋণের বৃত্ত থেকে মুক্ত করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। ঋণ বিন্যাসের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে ঋণ শ্রেণিকরণের সময়। জারি করা হয়েছে ঋণ পুনঃতফসিলের বিশেষ নীতিমালা। এ নীতিমালার আওতায় রেকর্ড সংখ্যক ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। তবু খেলাপি ঋণ কমানো যায় নি। বরং নতুন করে এটি আরো বেড়েছে। উপরোক্ত প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকাতে পৌঁছা উদ্বেগজনক তথ্য সন্দেহ নেই। এ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে অস্থায়ী ভিত্তিক ও ছাড়মূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে ঋণ খেলাপি হওয়া কমানো যাবে না। কমাতে হলে খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। খেলাপি সংস্কৃতি রোধে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার কারণে খেলাপি ঋণ আজ বিপর্যয়কর পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকটটি সৃষ্টি হয়েছে মূলত: ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের কারণেই। দুঃখের বিষয় এসব ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে, উল্টো নানাভাবে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। এতে অন্যরাও ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করার মতো দুষ্কর্মে উৎসাহিত হচ্ছে। কাজেই খেলাপি ঋণের বিস্তার রোধ করতে হলে খেলাপিদের কঠোর শাস্তি প্রদান নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কেবল আইন প্রয়োগ নয়, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলোও দূর করতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের সংস্কার দরকার। বিশেষজ্ঞরা খেলাপি ঋণ রোধ ও আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন সময়ে কিছু সুপারিশ করে এসেছেন। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ব্যাংকিং খাতের জন্য ন্যায়পাল নিয়োগ, মন্দ ঋণ আদায়ের জন্য ‘ডেট রিকভারি বা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন, অর্থ ঋণ আদালতে কোন রায় হলে সরাসরি জব্দ করার সুযোগ, অর্থ ব্যাংক নিয়ন্ত্রণের পুরো ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রদান, রাষ্ট্রের মালিকানাধীন ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে আনা, একীভূতকরণের সুযোগ সৃষ্টি, সর্বোপরি একটি ব্যাংকিং কমিশন গঠন। অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থে বিবেচনায় বিষয়গুলো আমলে নেওয়া আবশ্যক। দেখা যাচ্ছে, দেশে ঋণ বাড়ার মূলে রয়েছে, ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অপারগতা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আপত্তি উপেক্ষা করে সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় একের পর এক বাণিজ্যিক ব্যাংকের অনুমোদন দিয়েছে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। তারা ডিউ ডিলিজেন্স উপেক্ষা করে ইচ্ছেমত ঋণ অনুমোদন করছে। ফলে বিপুল পরিমাণ ঋণ খেলাপি হয়েছে ও হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ হলো, খেলাপি ঋণের একটা বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে সংবাদ মাধ্যমের খবরে ওঠে এসেছে। কাজেই অর্থনীতিতে খেলাপির প্রভাব কতটা গভীর তা সহজেই অনুমান করা যায়। বিশ্বের সব দেশেই ব্যাংকিং খাতকে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বিবেচনা করা হয়। সে খাতই যদি নড়বড়ে হয়ে পড়ে তাহলে ব্যবসা বাণিজ্য তথা সার্বিক অর্থনীতি ঝুঁকিতে না পড়ে পারে না। এর আলামত এরই মধ্যে নানাভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কাজেই বড় ধরনের সমস্যা এড়াতে যত দ্রুত সম্ভব তত দ্রুত ব্যাংকিং খাতকে সঠিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে প্রয়োজন খেলাপি ঋণ বন্ধ করা। আর এটা করতে হবে প্রতিরোধ পর্যায়েই। ঋণ প্রস্তাব থেকে শুরু করে অনুমোদন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াই নিয়মানুগতভাবে সম্পন্ন করতে হবে। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের সতর্কতা না থাকলে চলবে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারিত্ব একান্ত প্রয়োজন। ব্যাংকিং খাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের তেমন নিয়ন্ত্রণ নেই। এর বড় কারণ সংস্থাটিকে এড়িয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগের নানা সিদ্ধান্ত আরোপ। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্তৃত্ব বহুলাংশে খর্ব করছে। তাই অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক খাতে যথাযথ নজরদারি করতে পারছে না। ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম-বিশৃঙ্খলা বন্ধে একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ ব্যাংকের এখতিয়ার বৃদ্ধি এবং স্বায়ত্ত শাসন নিশ্চিত করার পরামর্শ দিচ্ছেন। এটিও সরকারের বিবেচনায় নিতে হবে। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যত বড় মত পার্থক্যই থাক ঋণ খেলাপিদের তোষণের ব্যাপারে ঐক্য রয়েছে। এ কারণে দল-মত নির্বিশেষে উপর্যুপরি সব সরকারের আমলেই ঋণ খেলাপিরা নিরাপদে থেকেছে। এ সংস্কৃতি চলতে দেওয়া যায় না। তাই ক্যাসিনো বিরোধী অভিযানের মতো ব্যাংকিং খাতেও শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা আবশ্যক।

x