মদিনা শরীফে পবিত্রতম

জন্নাতুল বাকী কবরস্থান

বুধবার , ২২ জানুয়ারি, ২০২০ at ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ
27

মক্কা মোকাররমার জান্নাতুল মু’আল্লা এবং মদিনা মুনাওয়ারায় জান্নাতুল বাকী কবরস্থান উম্মতে মোহাম্মদীর কাছে অতি পবিত্রতম স্থান বলে বিবেচিত। জান্নাতুল বাকী কবরস্থান নবী পাক (স.) মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরতের পর থেকে সূচনা। কিন্তু মক্কা মোকাররমায় জান্নাতুল মু’আল্লা কবরস্থান কুরাইশ বংশের সেই প্রাচীনকাল থেকে। পবিত্র কাবার উত্তর দিকে প্রায় ১ কি.মি. দূরত্বে জান্নাতুল মু’আল্লা কবরস্থান। কুরাইশ বংশের মূল কবরস্থানটি একদম উত্তরে। ইংরেজি ইউ সাইজ বিশিষ্ট পাহাড়ের অভ্যন্তরে বলা যাবে। এখানে আবদুল মুত্তালিব আবু তালেব সহ পর্যায়ক্রমে তাঁর আগের অনেকে শায়িত। এর কিছুটা দক্ষিণ দিকে উম্মে খাতুন মোমেনীন হযরত খাদিজা (র.) শায়িত রয়েছেন। তাঁরই তথা নবী পাক (স.)’র পুত্র হযরত কাশেম ও হযরত তৈয়ব (তাহের) মাতার পূর্ব পার্শ্বে মতান্তরে দক্ষিণ সংলগ্ন শায়িত। এখানে আরও শায়িত থাকার কথা মহান সাহাবাগণ। প্রায় ১ একরের দু’দিকের পাহাড়ি এ এরিয়াটি গত ১৫/২০ বছর যাবৎ সৌদি সরকার মজবুত বেষ্টনী দিয়ে রেখেছে। বিশেষ বিশেষ দিবসে খুলে দেয়া হয়। এর দক্ষিণে পূর্বে প্রায় ২০/৩০ একর এরিয়া নিয়ে এ পবিত্র কবরস্থান সম্প্রসারিত। এখানে পশ্চিম পার্শ্বে শহীদ হওয়া হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জুয়াইব (র.) ও তাঁর মাতা হযরত আসমা (র.) শায়িত।
নবী পাক (স.) মদিনা মুনাওয়ারা হিযরত করার পর কবরস্থানের অভাব অনুভব করতেছিলেন। মদিনা শরীফের আশে পাশে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নজনের কবর ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল।
হযরত ইমাম হাকেম বর্ণনা করেন, নবী পাক (স.) সাহাবাগণের দাফনের জন্য একটি কবরস্থান তালাশ করছিলেন। তিনি মদিনা শরীফের আশে পাশে একটি জায়গা খুবই অনুভব করছিলেন। অতঃপর এ স্থানটি (জান্নাতুল বাকী) কবরস্থান হিসেবে নির্ধারণের ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে আদেশ জারি করা হয়েছে। অতএব নবী পাক (স.) বাকীর স্থানটি কবরস্থান হিসেবে চিহ্নিত করলেন। বাকীর এ স্থানটিকে তৎকালীন সময়ে ‘খারখাবাহ’ বলা হত। এখানে অধিক পরিমাণে ‘গারকাদ’ নামের ঘাস পাওয়া যেত। সে কারণে বাকীওল গারকাদ নামে অধিক পরিচিত ছিল। উপরোক্ত হাদীস শরীফের ভাষ্য মতে বুঝা যায় যে, নবী পাক (স.)’র মোবারক ইচ্ছা এবং আল্লাহর আদেশ দ্বারা এ পবিত্র কবরস্থান প্রতিষ্ঠিত। তাঁর প্রিয় সাহাবীগণের জন্য নির্ধারিত স্থান।
‘গারকাদ’ ঘাসটি সাবানের কাজ দিত। সর্ব সাধারণ এ জায়গাটি থেকে তাদের দেহের এবং কাপড়ের ময়লা পরিষ্কার করার জন্য এ ঘাস বাড়িতে নিয়ে যেত। গরম পানিতে জাল দিয়ে এ ঘাসটির নিঃসরিত পানিকে পরিষ্কারের কাজে ব্যবহার করত। এ কারণে জায়গাটি বাকীওল গারকাদ নামে পরিচিত।
হযরত আবু রাফে (রহ.) বলেন, “নবী পাক (স.) সাহাবাগণের দাফন করার জন্য এখানে একটি কবরস্থান করার জন্য জায়গা খুঁজতেছিলেন। অতঃপর এ বাকী নামের স্থানটিকে শেষ পর্যন্ত তিনি কবরস্থান (মাকবারাহ) বলে ঘোষণা দেন।”
এখানে সর্বপ্রথম মুহাজির সাহাবী হযরত ওসমান ইবনে মজউন (রহ.) কে দাফন করা হয়। খোদ নবী পাক (স.) তাঁর কবরের পাশে ইট রেখে বলতেছিলেন, তিনি আমাদের অগ্রজ। ১৩ জন ব্যক্তির পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর পুত্রসহ তিনি হাফসার দিকে প্রথম হিজরত করেন। মদিনা মুনাওয়ারা হিযরতকারী সাহাবীগণের মধ্যে প্রথম দলভুক্তদের অন্তর্ভুক্ত একজন। তিনি বদরী সাহাবীও ছিলেন। হিজরতের ৩০তম মাসের সাবান মাসে ইন্তেকাল করেন। হযরত আয়েশা (রহ.) বলেন, হযরত ওসমান ইবনে মজউন ইন্তেকাল করলে নবী পাক (স.) তাঁর মৃত দেহে চুমু দেন এবং কাঁদছিলেন। আমি দেখেছি তাঁর দু’চোখের পানি গাল বেয়ে পড়ছিল। অতঃপর কোন মোহাজির সাহাবী ইন্তেকাল করলে দাফনের জন্য নবী পাক (স.)কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলতেন আমাদের অগ্রবর্তী ওসমান ইবনে মজউনের কবরের পাশে দাফন কর।
আনসার সাহাবীদের মধ্যে প্রথম দাফন করা হয় হযরত আবু উসামাহ আসয়াদ ইবন যুরারাহ (রহ.)কে যিনি ‘আস আদুল খায়র’ নামে পরিচিত ছিলেন। আনসার নেতাদের অন্যতম। নবী পাক (স.)’র হাতে আনসারী সাহাবীদের মধ্যে সর্বপ্রথম বায়আত গ্রহণ করে ইসলাম কবুল করেন। যথাক্রমে মক্কা মোকাররমার মিনায় ৩টি বাইআত যথা-আকাবার প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বাইয়াত উপস্থিত ছিলেন। তিনিই আনসার সাহাবীদের প্রথম ব্যক্তি, যাকে জান্নাতুল বাকীতে দাফন করা হয়। নবী পাক (স.) মদিনা মুনাওয়ারায় আগমনের পরবর্তী জুমাবার নামাজ আদায়কারী ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি প্রথম ছিলেন।
রওজা পাকের মাত্র ৩/৪শ মিটার পূর্ব দিকে এ জান্নাতুল বাকী শুরু। এ কবরস্থানের চতুর্দিকে রয়েছে বাড়িঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আবাসিক হোটেল ইত্যাদি। সৌদি সরকারের বিশেষ তত্ত্বাবধানে পূর্ব ও দক্ষিণে বহুগুণে প্রশস্ত করা হয়েছে। পশ্চিম পার্শ্বে একমাত্র প্রকান্ড গেইট। গেইট দিয়ে প্রবেশ করলেই মাত্র শত মিটারের মধ্যে দক্ষিণ পূর্ব দিকে আহলে বায়েতের ৬ জন মহান সাহাবা শায়িত। তৎমধ্যে হযরত মা ফাতেমা (র.) ও হযরত আব্বাস (র.) শায়িত। পূর্ব সংলগ্ন হযরত ইমাম হাসান (র.), হযরত ইমাম জয়নাল আবেদীন (র.), হযরত ইমাম বাকের (র.) ও হযরত ইমাম জাফর সাদেক (র.) পর পর শায়িত।
অতঃপর বাম পাশে তথা প্রবেশের রাস্তার সামনের দিকে নবী পাক (স.)’র তিন কন্যা যথা হযরত ছৈয়দা উম্মে কুলসুম, হযরত ছৈয়দা রুকাইয়া ও হযরত ছৈয়দা জয়নব পর পর শায়িত। এর বাম পাশে তথা উত্তর পাশে নবী পাক (স.)’ মহান স্ত্রীগণ তথা নয় জন উম্মে খাতুন মোমেনীন এখানে শায়িত। নবী পাক (স.)’র অন্য স্ত্রী তথা উম্মে খাতুন মোমেনীন হযরত মাইমুনা মক্কা মোকাররমা থেকে মদিনা মুনাওয়ারার পথে ১৫/১৬ কি.মি. আসলে বর্তমান মহাসড়কের পশ্চিম পার্শ্বে শায়িত।
উম্মে খাতুন মোমেনীনগণের সামান্য উত্তর পার্শ্বে শায়িত রয়েছেন হযরত আকিল ইবনে আবু তালিব (র.), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফর (র.) হযরত আবু সুফিয়ান ইবনে হারেশ ইবনে আবদুল মুত্তালিব (র.)। এর সামান্য পূর্ব দিকে শায়িত রয়েছেন হযরত ইমাম মালেক ও হযরত ইমাম নাফে (র.)। এর পূর্ব দিকে তথা যেয়ারতকারীগণের চলাচলের রাস্তার দক্ষিণ সংলগ্ন হযরত ওসমান ইবনে মজউন (র.) সহ অনেক সাহাবার কবর ছিল। তৎমধ্যে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (র.), হযরত সা’দ ইবনে আবু ওক্কাস (র.) নবী পাক (স.)’র পুত্র হযরত ইব্রাহীম (র.), হযরত আস আদ ইবনে যুরারাহ (র.)সহ অনেক সাহাবাগণের কবর ছিল। কিন্তু বর্তমানে নবী পাক (স.)’র পুত্র হযরত ইব্রাহিম (র.)’র কবর চিহ্নিত বুঝা যায়। ইন্তেকালকালীন তাঁর বয়স হয়েছিল মতান্তরে ১৬ মাস। এর সামান্য আগে চলাচল রাস্তার উত্তরে ঘেরা হাররার শহীদগণের কবর। তাঁরা এজিদের পেটুয়া বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছিলেন।
যেয়ারতকারীগণের চলাচলের রাস্তায় আরেকটু পূর্ব দিকে আমিরুল মোমেনীন হযরত ওসমান গণি (র.) শায়িত। তিনি ১১ বছর ১১ মাস খেলাফতের দায়িত্ব পালন করে হিজরি ৩৫ সনের ১৮ যিলহজ্ব শুক্রবার আততায়ির হাতে পবিত্র কুরআন মাজীদ তেলাওয়াত কালীন সময় শহীদ হন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
এর উত্তর দিকে নবী পাক (স.)’র দুধ মা হযরত হালিমা সাদিয়া (র.) শায়িত। এর আরও পূর্ব দিকে হযরত আবু সায়িদ আল কুদরী (র.) শায়িত।
জান্নাতুল বাকীর কবরস্থানের উত্তর পাশে নবী পাক (স.)’র দু’জন ফুফু আম্মার কবর রয়েছে। হযরত সুফিয়া বিনতে আবদুল মুত্তালিব ও হযরত আতিকা বিনতে আবদুল মুত্তালিব।
বস্তুতঃ জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে একাধিকবার ছোট ছোট গম্বুজ নির্মিত ও ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। ১১২০ হিজরি সনে ক্ষমতাসীন সরকার কবরসমূহের উপর যাবতীয় চিহ্ন ধ্বংস করে দেয়। কবরসমূহের উঁচু নিচু সমান করে দেয়। পরবর্তীতে তুর্কি সুলতানগণের আমলে এখানে আবারও আহলে বায়েত উম্মে খাতুন মোমেনীনসহ অনেকের কবরসমূহের উপর ছোট ছোট গম্বুজ নির্মাণ করেন বলে জানা যায়। কিন্তু ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান সৌদি সরকার মক্কা মোকাররমা ও মদিনা মুনাওয়ারাসহ হেজাজ অধিকারে নেওয়ার পর আবারও এখানে ছোট ছোট ইমারতসমূহসহ পুরো জান্নাতুল বাকী কবরস্থানকে সমান করে ফেলা হয়। এমনটা করে ফেলা হয় জান্নাতুল মু’আল্লা কবরস্থানেও। তাঁরপরেও আশেকে রাসূলগণ আহলে বায়েত উম্মে খাতুন মোমেনীনসহ ২০/৩০টি কবরে পাথর দিয়ে চিহ্নিত করে রাখে। ইহাই বর্তমান যেয়ারতকারীগণের বুঝবার সহায়ক। বর্তমান কালে ফজর ও আসরের নামাজের পর পর এখানকার প্রধান গেইট কিছুক্ষণের জন্য খুলে দেয়া হয়; যাতে যেয়ারতকারীগণ প্রবেশ করতে পারে।
জানতে পারা যায় ২০/৩০ বছর আগে মক্কা মোকাররমাবাসী সরকারের কাছে আপত্তি জানায়, যে হারে এখানে হজ্ব ও ওমরাহ্‌কারীকে মৃত্যুবরণ করলে স্রোতের মত দাফন করা হচ্ছে তাতে মূল মক্কা মোকাররমাবাসীগণ ইন্তেকাল করলে তাঁদের এখানে জান্নাতুল মু’আল্লাতে দাফনের সমস্যা সৃষ্টি হবে। এতে সৌদি সরকার হজ্ব ও ওমরাহ্‌কারীগণ ইন্তেকাল করলে তাঁদের দাফনের জন্য হুদুদে হারম তথা হারমের সীমার ভিতর পবিত্র কাবার ৮/১০ কি.মি পূর্ব উত্তর দিকে ‘সুরাইয়া’ নামক স্থানে বিশাল এরিয়া নিয়ে নতুনভাবে কবরস্থানের ব্যবস্থা করে। এখানেই হজ্ব ও ওমরাহ্‌কারীগণ ইন্তেকাল করলে দাফন করা হচ্ছে। অপরদিকে মদিনা মুনাওয়ারাবাসীগণ এ আপত্তির খবর অবগত হওয়ার পরও কোন আপত্তি না করায় মদিনা মুনাওয়ারায় যেয়ারতকারীগণ ইন্তেকাল করলে তাঁদেরকে আজও জান্নাতুল বাকীতে দাফন করা হচ্ছে।
মতান্তরে নবী পাক (স.)’র ৭০ হাজার মহান সাহাবা এ জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে শায়িত। জান্নাতুল বাকীর ৭০ হাজার কবরবাসী কেয়ামত দিবসে বিনা হিসাবে বেহেশতে প্রবেশ করবে। নবী পাক (স.) নিয়মিত দিন রাত জান্নাতুল বাকীতে যেতেন। দোয়া এস্তেগফার করতেন। তাঁর প্রিয় সাহাবাগণের কবরের পাশে গিয়ে হাজির হতেন। হযরত জাবের (রহ.) থেকে বর্ণিত নবী পাক (স.) বলেন, যে ব্যক্তি হারামায়নুস শরীফায়ন (পবিত্র মক্কা অথবা পবিত্র মদিনা) এই উভয় স্থানের কোন একটিতে মৃত্যুবরণ করবে সে ব্যক্তি কিয়ামত দিবসে নিরাপদ (জান্নাতী) হয়ে উঠবে।
সৌদি সরকার পূর্ব ও উত্তর দিকে বৃহত্তর পরিসরে জান্নাতুল বাকী কবরস্থানকে বর্ধিত করার পরেও যথাযথ বলে মনে হয় না। মদিনা মুনাওয়ারা শহরের একদম মধ্যখানে তথা রওজা পাকের নিকটে এ পবিত্র কবরস্থানকে কতটুকু বাড়ানো যাবে তারও সীমা আছে। গত ৪০/৫০ বছরের ব্যবধানে যেয়ারতকারী তথা যেয়ারতের উদ্দেশ্যে মদিনা মুনাওয়ারায় আগমন করার সংখ্যা অনেক গুণ বেড়ে গেছে। ফলে ইন্তেকাল হওয়ার সংখ্যাও বেড়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক। মহান আল্লাহ পাক আমাদেরকে কোন এক পবিত্র নগরীতে ইন্তেকাল, জানাযা,দাফন পাবার সৌভাগ্য লাভ করুন। আমিন॥
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক ও কলাম লেখক