ভয়ানক প্রাণী

রেজাউল করিম

বুধবার , ৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:৩৬ পূর্বাহ্ণ

জুরাসিক পার্ক সিনেমায় অনেক রকম প্রাণীর সন্ধান মিলে। জুরাসিক পার্ক স্টিভেন স্পিলবার্গ পরিচালিত বিজ্ঞান কল্পকাহিনিমূলক চলচ্চিত্র। মিশেল ক্রিস্টনের একই নামের উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে নির্মিত এই চলচ্চিত্র ১৯৯৩ সালে মুক্তি পায়। ক্লোন পদ্ধতিতে তৈরি করা ডাইনোসরের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা আইলা নুবলার দ্বীপে একটি বিনোদন পার্ক গড়ে তোলে। আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের আগে জন হ্যামন্ড (রিচার্ড অ্যাটেনব্রো) কয়েকজন বিজ্ঞানীকে পার্ক পরিদর্শনের জন্য আমন্ত্রণ জানান। তারা দ্বীপে এসে ডাইনোসর দেখে বিস্মিত হন। কিন্তু ষড়যন্ত্রের কারণে কিছু ডাইনোসর তড়িতাহিত খাঁচা ভেদ করে বাইরে চলে আসে। বিজ্ঞানী ও কলাকুশলীরা ডাইনোসরের হাত থেকে বাঁচার জন্য দ্বীপ থেকে পালানোর চেষ্টা করে। এ নিয়েই জুরাসিক পার্কের কাহিনি গড়ে উঠেছে।
১৯৯০ সালেই স্পিলবার্গ ছবি নির্মাণের জন্য উপন্যাসের স্বত্ব লাভ করেন এবং চিত্রনাট্য অভিযোজনের জন্য স্বয়ং ক্রিস্টনকে নিয়োগ করেন। চিত্রনাট্যের চূড়ান্ত রূপ দেন ডেভিড কোয়েপ, যিনি মূল উপন্যাসের প্রত্যক্ষ বর্ণনা ও সহিংসতা অনেক কমিয়ে আনেন এবং চরিত্রেও বেশ কিছু পরিবর্তন আনেন। ডাইনোসরের অ্যানিমেশন তৈরির জন্য স্পিলবার্গ স্ট্যান উইনস্টন স্টুডিওকে ভাড়া করেন। এই স্টুডিওর শটগুলোর সাথে পরবর্তীতে ইন্ডাস্ট্রিয়াল লাইট অ্যান্ড ম্যাজিকের চিত্রগুলোর সমন্বয় সাধন করা হয়। বিজ্ঞানীরা ডাইনোসরের যে রূপটি আবিষ্কার করেছেন ঠিক তা-ই ফুটিয়ে তুলতে চলচ্চিত্র কুশলীদেরকে সহায়তা করেন জীবাশ্মবিজ্ঞানী জ্যাক হর্নার। অবশ্য বিবর্তন তত্ত্বে কিছু পরিবর্তনের কারণে বেশ কিছু বিশেষত ভেলোসিরেপ্টরের চিত্রায়নকে এখন পুরোপরি সঠিক বলা যায় না। ১৯৯২ সালের ২৪ আগস্ট থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত কাউয়াই, ওয়াহু এবং ক্যালিফোর্নিয়াতে শূটিং হয়।
কম্পিউটারের মাধ্যমে কৃত্রিম চিত্র প্রস্তুতির ক্ষেত্রে জুরাসিক পার্ক এক নতুন মাত্রা যোগ করে। ছবির অ্যানিমেশন ও ইফেক্ট সব সমালোচকের কাছেই প্রশংসিত হয়, কিন্তু চরিত্র উন্নয়ন ও ছবির অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। মুক্তি পাওয়ার ছবিটি মোট ৯১৪ মিলিয়ন ডলার আয় করে, যা ছিল সে সময় পর্যন্ত সর্বকালের সবচেয়ে বেশি উপার্জনকারী ছবি। বর্তমানে আয়ের দিক দিয়ে এর স্থান ১০ম। অবশ্য স্ফীতির সাপেক্ষে পরিবর্তন করলে উত্তর আমেরিকায় এর অবস্থান ১৭তম। জুরাসিক পার্ক চলচ্চিত্রে এক নতুন ফ্রাঞ্চাইজির জন্ম দেয়। ১৯৯৭ সালে দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড নামে জুরাসিক পার্কের দ্বিতীয় পর্ব মুক্তি পায়, ২০০১ সালে মুক্তি পায় জুরাসিক পার্ক ৩। জুরাসিক পার্ক ৪ বর্তমানে নির্মিত হচ্ছে। জুরাসিক যুগের কথা বলতে গিয়ে অনায়াসে এই ছবির দৃশ্যপট ভেসে উঠে। জুরাসিক যুগে সবচেয়ে বড় মাংসাশী ডাইনোসর প্রজাতি ছিল টি-রেক্স। এ পর্যন্ত টি-রেঙ বা তাদের পূর্বসূরি ডাসপ্লেটোরাস হর্নেরি (ডি-হর্নেরি)-র যতগুলি জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়েছে তার অধিকাংশরই দৈর্ঘ্য ৩-৩৫ ফুট। ১৯৯১ সালে কানাডায় আবিষ্কৃত ‘স্কটি’ ৪২ ফুটেরও বেশি। প্রায় তিন দশক আগে কানাডায় মিলেছিল তার খণ্ডিত দেহাবশেষ। হাড়গুলিকে জোড়া লাগানোর পরে সেটিকে টিরানোসরাস রেক্স (টি-রেক্স) প্রজাতির বৃহত্তম নমুনা বলে চিহ্নিত করেছেন আলবেরটা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিজ্ঞানীরা। পশ্চিম কানাডার সাসক্যাচুয়ানে জীবাশ্মটির সন্ধান মেলার পরে আবিষ্কারের রাতে উৎসব করে আবিষ্কারকেরা। সেই দলের অন্যতম সদস্য স্কট পার্সনসের কথায় বিশ্বের বৃহত্তম এই মাংসাশী ডাইনোসরের জীবিত অবস্থায় ওজন ছিল প্রায় ৮,৮০০ কিলোগ্রাম। তিনি জানান, আবিষ্কারের পরে ধীরে ধীরে হাড়ের গায়ে জমে থাকা মাটি আর বালির আস্তরণ সরাতেই দুই দশকের বেশি সময় লেগেছে জীবাশ্মবিদদের। তারপর প্রতিটি হাড়ের টুকরো জোড়া লাগানো হয়েছে।
কঙ্কালটি পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীদের ধারণা, বড় কোনও আঘাতের ফলেই মৃত্যু হয়েছিল ‘স্কটি’র। শুধু আকার বা ওজনে নয়, বয়সের নিরিখেও ‘স্কটি’ টি-রেক্স গোত্রের প্রাচীনতম বলে জানিয়েছেন পার্সনস। তাঁর কথায়, শীঘ্রই রয়্যাল সাসক্যাচুয়ান মিউজিয়ামে দর্শকদের জন্য রাখা হবে স্কটিকে। অসাধারণ অনুভূতিপ্রবণ ছিল টিরানোসরাস রেক্স, বলছেন বিজ্ঞানীরা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং হিংস্র মাংসাশী প্রাণী ছিল তারাই। টিরানোসরাস রেক্স। নাম শুনলেই পিলে চমকে ওঠে কিছুটা। কিন্তু তারাই নাকি আবার নাম লিখিয়েছে সেরা অনুভূতিপ্রবণের দলে। নতুন গবেষণা দাবি করছে এমনটাই।
সমপ্রতি আমেরিকার মন্টানায় খোঁজ মিলেছে টিরানোসরাস রেক্স বা টি রেক্সের নতুন একটি প্রজাতির। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, ডাসপ্লেটোরাস হর্নেরি বা ডি হর্নেরি নামে টি রেক্সের এই আদিমতম এই প্রজাতি একদিকে যেমন ছিল হিংস্র, অন্যদিকে তেমনই ছিল অনুভূতিপ্রবণ। তাদের নাক খুবই সেনসিটিভ। শুধু তাই নয়, এই নাক দিয়ে নাকি ডিমের রক্ষণাবেক্ষণ, শাবকদের আদর করা, বাসা বানানোর মতো যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ করত তারা। গবেষকরা জানাচ্ছেন, নাক, মুখ উদ্দীপনা তৈরি করত। আজ থেকে প্রায় সাড়ে সাত কোটি বছর আগে পৃথিবীতে রাজত্ব করত ডি হর্নেরি প্রজাতির ডাইনোসররা। এদের জীবাশ্ম থেকে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন হর্নেরি প্রজাতির ডাইনোসররা লম্বায় ছিল প্রায় ২৯.৫ ফুট।
বহুদিন ধরেই টি রেক্স প্রজাতির ডাইনোসরদের দৈহিক গঠন নিয়ে গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের দাবি, ডাইনোসরদের সমস্ত প্রজাতির মুখেই মুখোশের মতো চ্যাপ্টা বর্মের আকারের ত্বক থাকে। যা তাদের মূলত চোয়াল এবং নাককে ঘিরে রাখত। সমপ্রতি ডি হর্নেরির ত্বকের রহস্য ভেদ করে গবেষকরা জানাচ্ছেন, এদের মুখ ও নাকের ত্বকে স্নায়ুর পরিমাণ অত্যধিক থাকাই অনুভূতিপ্রবণতার একমাত্র কারণ। ডি হর্নেরির মুখের ত্বকের এই স্নায়ুপথকে ফোরামিনা বলে। যা আজকের অ্যালিগেটর গোত্রের মধ্যেও দেখা যায়। যাকে বলে ইন্টিগুমেন্টারি সেনসরি অর্গ্যান। ২০১১ সালের ইয়েলে পিবডি মিউজিয়ামের ন্যাচরাল হিস্ট্রি ইন কানেকটিকাটের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ইন্টিগুমেন্টারি সেনসরি অর্গ্যান আসলে এক ধরনের নার্ভ বাম্পস। এই বাম্পসগুলি খুবই অনুভূতিপ্রবণ। একেক প্রজাতির প্রাণীর ক্ষেত্রে অনুভূতির ক্ষেত্রটা আলাদা। টিরানোসরাসের মাথা ছোটো হলেও লম্বাকৃতির। প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্কের ওজন ৬৯ থেকে ৭৬ টন।

x