ভ্যাট নিয়ে ঝামেলায় মাঝারি-নিম্ন শ্রেণির আবাসিক হোটেলগুলো

সোহেল মারমা

বৃহস্পতিবার , ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৩:৫৭ পূর্বাহ্ণ
45

অনিয়মের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা থেকে বেরিয়ে আসছে না কিছু আবাসিক হোটেল, বোডিং ও গেস্ট হাউজের মালিক। বিশেষ করে মাঝারি ও নিম্নসারির আবাসিকের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ রয়েছে। তারা বলছেন, সরকার ওইসব আবাসিকের ওপর অন্যায়ভাবে ভ্যাট চাপিয়ে দিয়েছে। এতে ভ্যাট, লাইসেন্সসহ বিভিন্ন ফি পরিশোধ করতে গিয়ে তারা মহাঝামেলায় আছেন। ওই শ্রেণির হোটেলগুলোতে বর্তমানে ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম আবাসিক হোটেল মালিক সমিতির সভাপতি হাবিবুর রহমান আজাদীকে বলেন, সরকার সেমিপাকা, টিনসেড বোর্ডিং থেকে শুরু করে ফাইভ স্টার হোটেল পর্যন্ত সব হোটেলের আয়ের উপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট নির্ধারণ করে দিয়েছে। এতে ননস্টার বা ওয়ান স্টার পর্যায়ের আবাসিক হোটেলগুলো চরম জুলুমের শিকার হচ্ছে।
হাবিবুর রহমান বলেন, ননস্টার ও ওয়ান স্টার আবাসিক হোটেল/বোর্ডিং মালিকদের উপর নতুন মুসিবত হচ্ছে ‘মূসক’ বা মূল্য সংযোজন কর আরোপ। মূলত যারা ভবন মালিক তারাই নিজস্ব ভবনে আবাসিক হোটেল/বোর্ডিং ব্যবসা করে থাকে। আর যারা ভবন মালিক নন, তারা অন্যের ভবন সেলামী বা অগ্রিম টাকা ভবন মালিককে দিয়ে ৩/৫ বছরের জন্য নবায়নযোগ্য ভাড়ানামাচুক্তিতে আবাসিক হোটেল পরিচালনা করে থাকে। অথচ ভাড়াটিয়া নন স্টার ও ওয়ান স্টার আবাসিক হোটেল ব্যবসায়ীদের আরও ১৫ শতাংশ হারে মূসক প্রদানে বাধ্য করা হচ্ছে।
এছাড়া সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসনসহ মোট ১২ টি লাইসেন্সের ফি তাদের পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে লাইসেন্স সময়মতো নবায়ন করা সম্ভব হয় না। তবে দেরিতে হলেও তারা লাইসেন্স নবায়ন করে থাকেন বলে জানান সংগঠনটির সভাপতি হাবিবুর রহমান।
নন স্টার ও ওয়ান স্টার আবাসিক হোটেল এবং বোর্ডিং এর ভ্যাট ৫ শতাংশ ধার্য করাসহ বিভিন্ন হোটেলগুলোর আয়কর, অডিট নামক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি হোটেল ব্যবসায়ীদেরকে দীর্ঘমেয়াদী এসএমই লোন দেওয়া হলে আবাসিক হোটেলগুলো নিয়ে বর্তমানে যেসব সমস্যা তৈরি হচ্ছে সেগুলো অনেকাংশ কেটে যাবে বলে জানান তিনি।
জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা সংগঠন ক্যাবের সূত্রে জানা গেছে, সময়মতো লাইসেন্স নবায়ন না করা, হোটেলের রেজিষ্ট্রারে বোর্ডারের (অতিথিদের) সংখ্যা কম দেখানো, বোর্ডারের হাতে বিলের রশিদ ধরিয়ে না দেয়া, একই হোটেলে দুটো রেজিষ্ট্রার রাখাসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে চলছে অধিকাংশ আবাসিক হোটেলগুলো। এছাড়া কোনো কোনো জায়গায় হোটেল ও গেস্ট হাউস খুলে লাইসেন্সবিহীন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
লাইসেন্স কর্তৃপক্ষও ওইসব হোটেলগুলোর এসব অনিয়ম সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে বলে জানায় জেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষ।
জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রেজওয়ানা আফরিন আজাদীকে বলেন, লাইসেন্সবিহীন কার্যক্রমম সময়মতো নবায়ন না করা, অসামাজিক কার্যকলাপসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত হোটেলগুলোর একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। ওই তালিকা অনুযায়ী বিভিন্ন সময় তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হচ্ছে। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায় তারা আবারও একই ধরণের অপরাধ করছে।
এটা নিয়ে নিজেরাও সমস্যার মধ্যে আছে জানিয়ে রেজওয়ানা আফরিন আরও বলেন, ইতিমধ্যে ওইসব হোটেল মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তাদের করা তালিকাটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
তবে আগের তুলনায় এখন বেশিরভাগই মালিক দেরিতে হলেও তাদের লাইসেন্স নবায়ন করছে বলে জানান সহকারী কমিশনার রেজওয়ানা আফরিন।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাব (কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) ভাইস প্রেসিডেন্ট নাজের হোসাইন আজাদীকে বলেন, ইচ্ছেমতো পণ্য ও সেবার দাম কয়েকগুন বেশি নেওয়া, সংকটকালীন সময় রুম ভাড়া বেড়ে যাওয়াসহ ভোক্তা স্বার্থবিরোধী নানা কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে আবাসিক হোটেলগুলোর মালিকেরা। নাজের হোসাইন বলেন, ভোক্তা টাকা দিয়ে ওইসব সেবা তাদের কাছ থেকে কিনে নিচ্ছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী তারা কাঙ্খিত সেবা পাচ্ছে না। তাদের সেবার বিষয়টি নিশ্চিত করা দরকার। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনও তেমন তদারকি করছে না বলে জানান তিনি।
ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে আবাসিক হোটেলগুলোর বিষয়ে ভোক্তা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আইন করা হয়নি। এতে হোটেলগুলোতে ভোক্তা বিরোধী কর্মকান্ডের অভিযোগের বিষয়ে তাদের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। তবে সম্প্রতি ওই আইনের একটি সংশোধনী প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবে ভোক্তা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আইন জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
আইনটি পাশ হলে ভোক্তা বিরোধী কর্মকান্ডের অভিযোগের ব্যাপারে আইন অনুযায়ী আবাসিক হোটেলগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে বলে জানান ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট নাজের হোসাইন।
জানা গেছে, তৎকালীন জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিনের আমলে অসামাজিক কার্যকলাপ পরিচালনা, বাড়তি দাম নেওয়া, লাইসেন্সবিহীন, লাইসেন্স নবায়ন না করাসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে জেলা প্রশাসন ১৪৪টি হোটেল চিহ্নিত করেছিল।
তালিকাভুক্ত হোটেলের বিরুদ্ধে লাইসেন্স ছাড়া খাদ্যের মান ও ভ্যাট আদায়ে অনিয়মের অভিযোগ ছিল। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নিলেও তা নবায়ন না করে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল। ওইসব হোটেলগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও একটি পর্যায়ে ওই উদ্যোগ স্তিমিত হয়ে আসে।

x