ভূত উৎসব

রেজাউল করিম

বুধবার , ৩০ অক্টোবর, ২০১৯ at ১০:১৫ পূর্বাহ্ণ
38

মামদো ভূত, রাক্ষুসে ভূত, ডাইনি, ঝাড়ু ভূত-আরো কতো রকমের ভূত যে রয়েছে তার ইয়াত্তা নেই। ‘এই ভূত সেই ভূত, ভূতে কতো ভয়/ ন্যাকা সুরে কথা বলে, জানো পরিচয়/ বড় অদ্ভুদ কিম্ভূত, ভূতে কতো রূপ/ ভয় পেয়ে গিন্নী, জ্বালে দেখ ধূপ/ কেউ বলে কদাকার, দেখে যায় মূর্ছা/ আজগুবি রটে কিছু, ঝাড় ফুকে খরচা/ ভূত যে ভালো নয়, এই কথা সত্যি/ মিলে যদি গেল কিছু, এতোটুক রত্তি/ ভূত আছে ভূত নেই, এই নিয়ে দ্বন্দ্ব/ ঘাড়ে যদি ভূত চাপে, আর নেই সন্দ। (সন্দেহ)’
যেকোনো উৎসব কিংবা আয়োজনে মুখর করে রাখে শিশু কিশোররা। পৃথিবীর চার প্রান্তের এমনই উচ্ছ্বাসমাখা অদ্ভুত উৎসবগুলোর মধ্যে হ্যালোইন অন্যতম। একে অনেকে বলে ভূতের রাত। বিশ্বব্যাপী প্রজন্মের কাছে হ্যালোইন উৎসবের জনপ্রিয়তা বেড়ে চলেছে। প্রতিবছর অক্টোবর মাসের শেষদিন হ্যালোইন উৎসব পালন করা হয়। ভূত সেজে অংশ নেয়।
বর্তমান হ্যালোইন ডের উৎপত্তি হয়েছিল প্রাচীন কেল্টিক ও গ্যালিক অধিবাসীদের উৎসব ‘সামহাইন’ থেকে। প্রায় দুই হাজার বছর আগে কেল্টরা বসবাস করত এখনকার আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য এবং উত্তর ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চলে। ১ নভেম্বর তারা নতুন বছর হিসেবে উদযাপন করত। এই দিনটি হলো গ্রীষ্মের শেষ ও শীতকালের শুরু। এর মধ্যেই ফসল কেটে ঘরে তোলার রেওয়াজ ছিল। কারণ এই নতুন বছর আগমনের পর ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রায়শই মানুষের মৃত্যু ঘটতো। কেল্টরা বিশ্বাস করত, নতুন বছরের আগের রাতে জীবিত এবং মৃতদের জগতের মধ্যে কোনো সীমানা থাকে না, মৃতদের আত্মা পৃথিবীতে ফিরে আসে । তাই কেল্টিক পুরোহিতদের মতে ভবিষ্যতে এই অন্যান্য জগতের আত্মার শান্তি ও অপ্রাকৃতিক দুরবস্থা থেকে বাঁচতে ৩১ অক্টোবর রাতে তারা সামহাইন উদযাপন করত। হ্যালোইন হিসেবে পরিচিতি লাভ করে এবং এক প্রকার ‘ভুতুড়ে’ রূপ ধারণ করে।
হ্যালোইন’ বা ‘হ্যালোউইন’ শব্দটি এসেছে স্কটিশ ভাষার শব্দ ‘অল হ্যালোজ’ ইভ থেকে। হ্যালোইন শব্দের অর্থ ‘শোধিত সন্ধ্যা বা পবিত্র সন্ধ্যা’। সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে ‘হ্যালোজ’ ইভ’ শব্দটি এক সময় ‘হ্যালোইন’-এ রূপান্তরিত হয়।
দুই হাজার বছর আগে বর্তমান আয়ারল্যান্ড, ইংল্যান্ড ও উত্তর ফ্রান্সে বসবাস করতো ক্যাল্টিক জাতি। এটি সবচেয়ে খারাপ রাত, যেই রাতে সকল প্রেতাত্মা ও অতৃপ্ত আত্মা তাদের মাঝে ফিরে আসে। এদের সঙ্গে যদি মানুষের দেখা হয় তবে সেই মানুষের ক্ষতি হতে পারে। সেজন্য এই রাতে বিভিন্ন রকম ভূতের মুখোশ ও কাপড় পরে কাটাতো। আর রাতের বেলা আগুনের পাশে মুখোশ পরে বৃত্তাকারে একসঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে মন্ত্র বলা, নিজের পরিবার ছোট হলে অন্যের বাড়িতে থাকাসহ সামাজিকভাবে একত্র হত।
সময়ের পরিক্রমায় ক্যাল্টিক জাতির এই ‘সাহ-উইন’ উৎসবই এখনকার দিনের ‘হ্যালোইন’ উৎসব। এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে দুটো ব্যাপার জড়িত। একটা হল ট্রিক অর ট্রিট, আর আরেকটি হল জ্যাকের বাতি। শিশুরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে আর দরজা নক করে বলে ট্রিক অর ট্রিট, তখন তাদের ঝুলিতে কিছু ক্যান্ডি বা খাবার-দাবার দেয়া হয়। অনেকে আবার বাড়ির উঠোনটাকে ভৌতিকই বানিয়ে ফেলে। কেউ মাকড়সার জাল বানিয়ে তাতে টাঙিয়ে দেয় কঙ্কাল। আর মিষ্টি কুমড়ো দিয়ে ভূত বানানো তো খুবই জনপ্রিয়। বড় বড় মিষ্টি কুমড়োর ভেতরটা ভালো করে পরিষ্কার করা হয়। তারপর কুমড়োর খোলের গায়ে বানানো হয় চোখ-মুখ। আর ভেতরে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় বাতি। ছোটদের এই ভৌতিক উঠোন পেরিয়ে যেতে হবে ট্রিট নিতে। হ্যালোইনের রাত সবাই শুধু ট্রিক অর ট্রিটেই কাটিয়ে দেয় না। অনেকে আবার চলে যায় কোনো ভৌতিক স্থানে ঘুরতে। অনেকে বনে আগুন জ্বালিয়ে পার্টি করে রাত পার করে দেয়। কেউ কেউ আবার ভূতের সিনেমা দেখেই উদযাপন করে হ্যালোইন।
মৃতের দেবতা ‘সামান’ সব মৃত আত্মাদের পৃথিবীতে আহ্বান জানান। এদিন উড়ন্ত ঝাড়ুতে করে হ্যালোইন ডাইনি ‘সারা’ উড়ে বেড়ায় আকাশজুড়ে। কখনওবা সবুজ খসখসে দেহের ডাইনি বুড়ি কড়া নাড়ে কোনো বাড়ির দরজায়। হ্যালোইনের দিনটি সম্পর্কে লোকজ ধারণা এটি। হ্যালোইন উৎসব পালনের শুরুটা ছিল মধ্যযুগে। যত ভূত-প্রেত আছে, সবাই নাকি এ রাতে চলে আসে লোকালয়ে। আর সেই সব ভূত-প্রেতদের খুশি করতে না পারলে তো বিপদ। আর সেজন্যই এই রাতটিতে পালন করা হয় হ্যালোইন উৎসব।
হ্যালোইন পালন করা নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় মাতামাতির শেষ নেই। রাতটি উদযাপন করতে সেখানে প্রস্তুতি চলে মাসজুড়েই। এখন তো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই হ্যালোইন উদযাপিত হয়। ইউরোপ-আমেরিকায় তো বটেই, পালিত হয় জাপানে, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডে এমন কি বাংলাদেশেও। দিনটি এমনকি ঘটা করে পালন করে ইউনিসেফও। তাদের সঙ্গে যুক্ত শিশুদের অনেকেই এদিন ভূত সেজে ট্রিক অর ট্রিট খেলার ছলে সংগ্রহ করে তহবিল। হ্যালোইনের রাত সবাই ভূত, ডাইনি, ড্রাকুলা, ভেম্পায়ারের মুখোশ ও অন্য ধরনের ভৌতিক ছদ্মবেশ ধারণ করে। সাধারণত লোকেরা নাচ, গান, উপহার দেওয়া, বিশেষ খাবার (ক্যান্ডি, কেক) খাওয়া, গেম খেলা এবং ঘুরাফেরা করে থাকে। বাংলাদেশে শুধু পাঁচ তারকা হোটেল নয়, অনেক পার্ক ও উদ্যানে নানা আয়োজনে ভৌতিক পরিবেশে এই রাতটি উদযাপন করা হয়।

x