ভিলেন হতে হতে নায়ক বনে গেলেন আর্চার

স্পোর্টস ডেস্ক

মঙ্গলবার , ১৬ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ

জন্ম ক্যারিবীয় দ্বীপ বার্বাডোজে। বেড়ে উঠাও সেখানে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে দেশের প্রতিনিধিত্বও করেছেন। সেই জোফরা আর্চারই এবার ইংল্যান্ডের হয়ে স্বপ্নের শিরোপা হাতে তুললেন। মাত্র ২৪ বছর বয়সেই বিশ্বকাপ ট্রফি ছুঁয়ে দেখার সৌভাগ্য হয়ে গেল এই ক্যারিভীয়ান ইংলিশের। অথচ ইংল্যান্ডের এই বিশ্বকাপ দলে থাকারই কথা ছিল না আর্চারের। প্রথমে ঘোষণা হওয়া ১৫ জনের চূড়ান্ত স্কোয়াডে ছিলেন না এই পেসার । শেষ মুহূর্তে দলে আসেন একেবারে চমক জাগিয়ে। জন্ম ওয়েস্ট ইন্ডিজে হলেও ২০১৫ সাল থেকে ইংল্যান্ডেই আছেন আর্চার। খেলছেন কাউন্টি ক্লাব সাসেক্সের হয়ে । সেখানে দুরন্ত পারফরম্যান্স করেই কড়া নাড়তে থাকেন ইংলিশ জাতীয় দলে।
তবে বিদেশি খেলোয়াড় হওয়ায় জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চড়ানোয় কিছুটা সমস্যা ছিল। আগে নিয়ম ছিল, জাতীয় দলে খেলার যোগ্য হতে হলে বিদেশি কোনো খেলোয়াড়কে কমপক্ষে ৭ বছর ইংল্যান্ডে থাকতে হবে। বিশ্বকাপের ঠিক আগে লর্ডসে বোর্ড মিটিংয়ের পর সেটা কমিয়ে করা হয় তিন বছর । শুধু তাই নয় বছরের কমপক্ষে ২১০ দিন থাকতে হবে ইংল্যান্ডে। আর এমন শিথিল শর্তে কপাল খুলে যায় আর্চারের। তারপরও নাটকীয়তা হয়েছে। সুযোগ থাকলেও বিশ্বকাপ দলে প্রথমে তাকে রাখেনি ইংলিশরা। শুরুতে নাম আসেনি। তবে নির্বাচকদের রাডারে ঠিকই ছিলেন আর্চার। বিশ্বকাপের ঠিক আগ মুহূর্তে আইরিশদের বিপক্ষে ওয়ানডেতে ইংল্যান্ড দলে অভিষেক হয়ে যায়। পরে তো ঢুকে পড়েন বিশ্বকাপ দলেও।
তারপরের সময়টা কেটেছে তার স্বপ্নের মতো। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই জায়গা পেয়েছেন ইংল্যান্ড একাদশে। পুরো টুর্নামেন্টে ১১ ম্যাচে ১১ ম্যাচেই বোলিং করে উইকেট নিয়েছেন ২০টি। তবে এমন পারফরম্যান্সের পরও হয়তো সেভাবে আলোতে আসতে পারতেন না। ইংল্যান্ড যদি বিশ্বকাপ না জিততো। আর সেটাতেও যদি তার হাতের ছোঁয়া না থাকতো। আর্চার তো ইংলিশদের এই বিশ্বজয়ের গল্পের অন্যতম কুশীলবই। ফাইনালে ১০ ওভার বল করে ৪২ রানে ১টি উইকেট নিয়েছেন। সেটাকে হয়তো ওত বড় অর্জন বলা যাবে না। তবে আসল কাজটা করেছেন আসল জায়গায়। সুপার ওভারে গড়ানো ম্যাচে অনভিজ্ঞ আর্চারের হাতেই বল তুলে দিয়েছিলেন অধিনায়ক ইয়ন মরগ্যান। জিততে হলে নিউজিল্যান্ডের দরকার ছিল ১৬ রান। ২৪ বছর বয়সী আর্চার এমন চাপের মুখেও মাথা ঠান্ডা রেখে বল করতে পারবেন তো । তেমন শংকা যেন উড়ে বেড়াচ্ছিল লর্ডসের আকাশে বাতাশে। ওভারের প্রথম বলে স্ট্রাইক নেন নিউজিল্যান্ডের বাঁহাতি অলরাউন্ডার জিমি নিশাম। অতিরিক্ত চাপে শুরুর বলটি নিশামের ব্যাট থেকে অনেক দূরে করে বসেন আর্চার। আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনা দুই হাত প্রসারিত করে জানিয়ে দেন এটি ওয়াইড বল। ফলে ৬ বলে ১৫ রানে নেমে আসে সমীকরণ। তবে পরের বলেই দারুণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে ইয়র্কার করেন আর্চার। তবু সে বল থেকে ২ রান নিতে সক্ষম হন নিশাম। ৫ বলে বাকি থাকে ১৩ রান। দ্বিতীয় বলেই বিশাল এক ছক্কা হাঁকিয়ে বসেন নিশাম। ২ বলে ৯ রান করে ফেলায় শেষের ৪ বলে কিউইদের বাকি থাকে ৭ রান। তারপরও ভড়কে যাননি আর্চার।
ছন্দে থাকা নিশাম তৃতীয় বলে নেন আরও ২ রান। সমীকরণ নেমে আসে ৩ বলে ৫ রানে। চাপ যেন ক্রমশ বাড়ছিল অর্চার সহ পুরো ইংরেজ শিবিরে। চাপের মুখে আর্চার চতুর্থ বলটি করেন দারুণ এক স্লোয়ার। যে বলে আবার ২ রান নেন নিশাম। এমন মুহুর্তে দাঁড়িয়েও মাথা গরম না করে শেষ ২টি বল জায়গামতই ফেলেন আর্চার। ফলে কিউইরা ২ রানের বেশি নিতে পারেনি। সুপার ওভারও টাই হয় এবং আর শিরোপা উল্লাসে মেতে উঠে ইংল্যান্ড। নিজ দেশের পক্ষে খেলতে না পাররেও ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপ খেলতে এসে হয়ে যেতে পারতেন ভিলেন। কোন ক্রমে যদি শেষ বলে মার্টিন গাপটিল দুই রান নিয়ে ফেলতে পারতেন তাহলে ইংরেজদের কাছে সারা জীবনের জন্য ভিলেনে পরিনত হতেন এই অর্চার। কিন্তু অধিনায়ক মরগ্যান আর উইকেট রক্ষক জস বাটলারের ক্ষীপ্রতার সাথে ভাগ্যের পরশ যোগ হলে রান আউট হয়ে যান মার্টিন গাপটিল। আর তাতেই কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ভিলেন হওয়া থেকে পরিণত হন নায়কে। যে নায়ককে খুঁজছিল ইংল্যান্ড গত ৪৪ বছর ধরে। এমন একজন নায়ক যিনি ক্রিকেটের জনকদের অন্তত একবার বিশ্বকাপ পাইয়ে দেবে। শেষ পর্যন্ত ভিনদেশি অর্চারই হলেন ইংলিশদের স্বপ্ন পুরনের স্বপ্নের নায়ক।

x