ভিন্ন চোখে পহেলা বৈশাখ

মযহারুল ইসলাম বাবলা

শনিবার , ১৪ এপ্রিল, ২০১৮ at ৮:২৬ পূর্বাহ্ণ
874

সকল ধর্মমতের বাঙালি জাতিসত্তার একমাত্র পার্বণটি বাংলা নববর্ষ। পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপনকে অসাম্প্রদায়িক চেতনার একমাত্র উৎসব হিসেবে গণ্য করা হয় এবং প্রচারপ্রচারণাও করা হয়। বাস্তবিকই সকল সম্প্রদায়ের বাঙালির পক্ষে একমাত্র এই দিবসটি পালন করা সম্ভব। অথচ অসাম্প্রদায়িকধর্মনিরপেক্ষ বাংলা নববর্ষ পালনে ধর্মের সম্পৃক্ততাকে কিন্তু অস্বীকার করা যায় না। অতীত আমলে তিথিলোকনাথ পঞ্জিকা অনুসরণে পহেলা বৈশাখ নির্ধারিত হতো। পরবর্তীতে খ্রিস্টাব্দের ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ নির্ধারণ করা হয়, রাষ্ট্রীয় ভাবে। এতে পঞ্জিকার সাথে একদিন আগপিছ প্রায় ঘটে। আবার একই ১৪ এপ্রিলেও পঞ্জিকার সাথে মিলেও যায় চার বছর অতিক্রান্তে। পশ্চিম বাংলায় বঙ্গাব্দের নববর্ষ তিথিপঞ্জিকার অনুসরণে পালিত হয়। সে কারণে বাংলা নববর্ষ পালনের ক্ষেত্রে দুই বঙ্গে একদিন আগপিছ হয়ে থাকে। আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে পহেলা বৈশাখ ১৪ এপ্রিল উদ্‌যাপিত হলেও দেশের হিন্দু সম্প্রদায় কিন্তু তিথিলোকনাথ পঞ্জিকা অনুসরণে ১৫ এপ্রিল নববর্ষ পালন করে থাকে। অর্থাৎ ধর্মমতানুযায়ী। নববর্ষ পালনে ধর্মের এই যুক্ততা নিঃসন্দেহে অনভিপ্রেত। নববর্ষ পালনকে কেন্দ্র করে অনাকাঙিক্ষত ধর্মযোগ এবং দিনক্ষণের বিতর্কবিভাজনের অবসান জরুরি বলে মনে করি।

অতীতে, অর্থাৎ পাকিস্তানি আমলে বাঙালি মুসলমানেরা কেবল ব্যবসা কেন্দ্রে হালখাতা নবায়ন করে দিনটি পালন করতো। পারিবারিক এবং সামাজিক পরিমণ্ডলে মোটেও আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা নববর্ষ পালিত হতে দেখিনি। তবে হিন্দু সম্প্রদায় পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে আড়ম্বর নববর্ষ পালন করতো। দিনটি শুরু হতো ধর্মীয় আচারআনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে। যা আজও বলবৎ রয়েছে। হিন্দু নারীরা খুব সকালে স্নান শেষে গায়ে নতুন শাড়ি চড়িয়ে, শাঁখাসিঁদুর লাগিয়ে হাতে আমের শাখা, ঘট ইত্যাদি পূজার উপকরণ নিয়ে অভুক্ত অবস্থায় ছুটতো মন্দিরে। পূজা শেষে গৃহে ফিরে আহার করতো, তার পূর্বে নয়। বাড়িতে বাড়িতে উন্নত রান্না হতো। অতিথি আপ্যায়নে দইমিষ্টি, মৌসুমী ফলমূল পরিবেশন করতো। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখে আসছি ঢাকেশ্বরী মন্দিরে নববর্ষকেন্দ্রিক পূজাঅর্চনা হয়ে আসছে লোকনাথ পঞ্জিকা অনুসরণে, রাষ্ট্র ঘোষিত নববর্ষের দিনে নয়। বাঙালি জাতিসত্তার একমাত্র এই উৎসবকে ধর্মের বৃত্তে যুক্ত করে দিবসটির ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রটি কি ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে না! একমাত্র বাঙালির অসাম্প্রদায়িক পার্বণের তক্‌মাটা তাহলে থাকলো কোথায়?

কলকাতায় পহেলা বৈশাখ দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। আমাদের দেশের ন্যায় এত ব্যাপক আড়ম্বরআনুষ্ঠানিকতা সেখানে দেখিনি। বিশেষ বিশেষ মাঠে বিকেলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতে দেখেছি। আমাদের শহরগুলোতে বর্ণিল সাজে পথেপথে মানুষের ব্যাপক ঢল দেখা গেলেও, কলকাতায় তেমনটি দেখিনি। বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় ব্যবসা কেন্দ্রে, পারিবারিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে পরস্পর শুভেচ্ছা বিনিময় করে। সকল বয়সীদের নতুন পোশাকসাজে সজ্জিত হয়ে খুব সকালে মন্দিরে ছুটতে দেখেছি। কলকাতায় বাঙালি মুসলমানরা কিন্তু বাংলা নববর্ষ পালন করে না। কেন করে না এমন প্রশ্ন করেছিলাম বেশ ক’জনকে। তাদের প্রত্যেকের জবাব একই। তারা এদিনটিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় পার্বণ হিসেবেই গণ্য করে। এদিনের সূর্যোদয় থেকেই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আচারআনুষ্ঠানিকতার আধিক্যে তারা বিবেচনাই করতে পারে না এদিনটি বাঙালি জাতিসত্তার একমাত্র অসাম্প্রদায়িক পার্বণ। তাই বংশ পরম্পরায় তারা বাংলা নববর্ষ পালন করে না, হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় পার্বণ বিবেচনায়।

বঙ্গাব্দের নববর্ষ উদ্‌যাপনে ধর্মনিরপেক্ষতার বিপরীতে ধর্মযোগ কাঙিক্ষত হতে পারে না। যত দ্রুত সম্ভব এই পার্বণকে ধর্মমুক্ত করে দিনটির ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা অতি আবশ্যক। তাহলেই বাঙালি জাতিসত্তার একমাত্র অসাম্প্রদায়িক উৎসব রূপে বাংলা নববর্ষ তার ধর্মনিরপেক্ষতাকে অক্ষুণ্ন রাখতে সক্ষম হবে। আমরা অতি আবেগে আমাদের ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে দিনটিকে প্রচার করি, বিবেচনাও নিশ্চয় করি। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে বাংলা নববর্ষ প্রকৃতই ভূমি রাজস্ব বিভাগের শুভ নববর্ষ। বঙ্গাব্দের প্রবর্তন করেন মোগল সম্রাট আকবর। খাজনা আদায়ের মোক্ষম সময় বিবেচনায়। মোগল আমলে ভূমির পূর্ণ অধিকার ছিল কৃষকপ্রজার, জমিদারদের নয়। জমিদার ছিল বটে তবে তারা কেবলই খাজনা সংগ্রাহক। ভূমির মালিকানা জমিদারদের ছিল না। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা প্রবর্তনে কৃষকপ্রজা ভূমির অধিকার হারায়। ভূমির অধিকার প্রাপ্ত হয় ইংরেজ কর্তৃক নিয়োগ প্রাপ্ত জমিদার। এই জমিদার শ্রেণি খাজনা সংগ্রাহকের পাশাপাশি ভূমির মালিকানার স্বত্বও পেয়ে যায়। সামন্তবাদী শোষণের গোড়াপত্তন ঘটে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা প্রবর্তনে।

লর্ড ক্লাইভ ১৭৬৫ সালে ১২ আগস্ট বার্ষিক ২৬ লক্ষ টাকা রাজকর পরিশোধের চুক্তিতে মোগল সম্রাট শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করেন। লর্ড ক্লাইভ ১৭৬৬ সালে খাজনা আদায়ের উদ্দেশ্যে পহেলা বৈশাখ শুভ পুণ্যাহ উৎসবের সূচনা করেন। তারই ধারাবাহিকতায় কৃষকদের চৈত্র সংক্রান্তির দিবসের মধ্যে খাজনা পরিশোধ করতে হতো। খাজনা পরিশোধ করতে ব্যর্থ কৃষকদের হালের বলদ, লাঙ্গল, তৈজসপত্র পর্যন্ত বিক্রি করতে হতো। আর যারা খাজনা পরিশোধে নিরুপায় তাদের ভাগ্যে ঘটতো জমিদারদের নির্মম শোষণনির্যাতন। কৃষকপ্রজা নিগ্রহে আদায়কৃত খাজনার বদৌলতে জমিদারেরা পহেলা বৈশাখে পালন করতো লর্ড ক্লাইভ প্রবর্তিত পুণ্যাহ উৎসব। এই পুণ্যাহ উৎসবই আজকের ঐতিহ্যের স্মারক বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপন। পহেলা বৈশাখের সেই পুণ্যাহ উৎসব সামন্ত জমিদারদের উৎসব ছিল। সমষ্টিগত কৃষকপ্রজার জন্য দিনটি ছিল খাজনা পরিশোধে নিঃস্ব হবার দুর্দিন। আমরা যে বর্ণিল উৎসবে মেতে উঠি সেটা অতীতের পুণ্যাহ এবং জমিদার শ্রেণির উৎসবের ধারাবাহিকতায়, সমষ্টিগত মানুষের উৎসব অতীতেও ছিল না, আজও নয়। সমাজের অধিপতি শ্রেণির আরোপতি উৎসব অনুসরণ না করার খেসারত দেবার ভয়ে বাধ্য হয়ে সাধারণ মানুষ জমিদারদের নির্দেশ পালনে উৎসবে অংশগ্রহণে বাধ্য ছিল। কবি রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত পূর্ব বাংলার শিলাইদহ, সাহজাদপুর, পতিসরের জমিদার রূপে জমিদারের কাছারি ঘরে পুণ্যাহ উৎসব করেছিলেন। কিন্তু আমন্ত্রিতদের সম্প্রদায়গত আসন বৈষম্যে হতবাক কবি আসন সমতার নির্দেশ দিয়েছিলেন নায়েবকে, কঠোর কণ্ঠে। হিন্দুমুসলমানদের আসন বৈষম্যের অবসানের পরই কবিজমিদার রবীন্দ্রনাথ পুণ্যাহ উৎসবে অংশ নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনে তিনি বাংলা নববর্ষ কখনো পালন করেননি। আজও শান্তিনিকেতনে পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ পালিত হয় না।

আমরা আমাদের ঐতিহ্যের স্মারকরূপে পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ আড়ম্বরআনুষ্ঠানিকতায় পালন করে থাকি, সেটা ওই লর্ড ক্লাইভের প্রবর্তিত পহেলা বৈশাখের পুণ্যাহ উৎসবের ধারাবাহিকতায়। পাকিস্তানি আমলে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে দিবসটি পালিত হলেও স্বাধীনতার পর ক্রমে ক্রমে বৃদ্ধি পেয়ে এখন মহাউৎসবে পরিণত হয়েছে। গণমাধ্যমগুলোতে ‘বৈশাখি ধামাকা’ ‘বর্ণিল বৈশাখ’ বিভিন্ন আকর্ষণীয় চটকদার শব্দের সম্ভারে পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার ও প্রকাশ করে মাসাধিকাল ধরে। বিজ্ঞাপনের হিড়িকে গণমাধ্যমে যেন জোয়ার বয়ে যায়। ক্রেতা আকর্ষণে উৎপাদকেরা ঢালাও বিজ্ঞাপন প্রচার ও প্রকাশ করে, মুনাফার অভিপ্রায়ে। তাদের কিন্তু ক্রেতারা নিরাশ করে না। চৈত্র মাস জুড়ে শহরের বিপনী বিতানে প্রচণ্ড ভিড় ও বেচাবিক্রি সেটাই প্রমাণ করে। নববর্ষকে কেন্দ্র করে পুঁজিবাদী তৎপরতা দৃশ্যমান। মুনাফার লিঞ্ঝায় নববর্ষ উদ্‌যাপনকে পুঁজিবাদ বেছে নিতে বিলম্ব করেনি। উস্‌কে দিচ্ছে সকল শ্রেণির মানুষকে ভোগবাদিতার অভিমুখে। মুসলমানদের ঈদ, হিন্দুদের দুর্গাপূজা, বৌদ্ধদের বৌদ্ধপূর্ণিমা, খ্রিস্টানদের বড়দিন পৃথক পৃথক সম্প্রদায়গত উৎসব। কিন্তু বাংলা নববর্ষ সকল ধর্মমতের বাঙালির উৎসব বলেই পণ্য, পোশাক, খাদ্য ইত্যাদি ভোগবিলাসের সামগ্রীর ব্যাপক বেচাবিক্রির অপূর্ব সুযোগ হাতছাড়া করে কোন্‌ বোকায়! পুঁজিবাদ তাই সক্রিয় ভূমিকায় মানুষকে উস্‌কে দিয়েছে মুনাফার অভিলাষে ভোগবাদিতার অভিমুখে। পুঁজিবাদী প্রবণতা তাই সর্বত্রে বিরাজ করছে বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপনকে ঘিরে।

মানতেই হবে আমাদের সুবিধা ভোগী শ্রেণি ব্যতীত দেশের মোট জনসমষ্টির সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কিন্তু উৎসবে শামিল হতে পারে না তাদের অর্থনৈতিক কারণে। যে উৎসব সকল মানুষকে স্পর্শ করতে পারে না, সে উৎসব জাতীয় উৎসব হিসেবে কি গণ্য করা যায়? যে উৎসব ধর্মমুক্ত নয়, সে উৎসবকে অসাম্প্রদায়িকধর্মনিরপেক্ষ উৎসব বলার যৌক্তিকতা আছে কি? এ সমস্ত প্রশ্নের একমাত্র সমাধানটি হচ্ছে সকল মানুষের সমঅধিকার, সমমর্যাদা, শ্রেণিসমতা প্রতিষ্ঠা। যেটি বিদ্যমান ব্যবস্থায় সম্ভব নয়। তাই সর্বাঙ্গে জরুরি বিদ্যমান ব্যবস্থার পরিবর্তন। সেটা যতদিন সম্ভব না হবে ততোদিন বছরান্তে, উৎসব আসাযাওয়া করবে, সীমিত শ্রেণির ভোগউপভোগে। সমষ্টিগত মানুষ নীরব দর্শকের ন্যায় চেয়ে চেয়ে দেখবে। তাই ব্যবস্থাটাকে পাল্টানো ছাড়া বাংলা নববর্ষসহ সকল উৎসবপার্বণ সকল মানুষের উৎসবে কখনো পরিণত হতে পারবে না।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

x