ভিন্ন এস্রাজে ইউসুফ মুহম্মদ’র দোঁহা

রিজোয়ান মাহমুদ

শুক্রবার , ২৯ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:২২ পূর্বাহ্ণ

বাংলা কবিতায় পরিচিত একটি নাম কবি ইউসুফ মুহম্মদ। সত্তরের শেষ দিকে ছড়ায় হাত পাকালেও আশির শুরুতে কবিতায় তাঁর স্বতন্ত্র প্রকাশ । ইতিমধ্যে ৭টি কাব্যগ্রন্থ এবং ৫টি সম্পাদিত গ্রন্থ প্রকাশ করে তিনি কবিতার মধ্যাহ্ন গগনে প্রদীপ্ত সূর্যের মতোন উজ্জ্বল প্রাণবন্ত। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ, জল প্রবাহে পদচিহ্ন (১৯৮৮, ঢাকা), হাত বাড়ালেই বুকের নদী (১৯৮৯, চট্টগ্রাম), চন্দ্রকান্ত বৃষ্টির নিঃসঙ্গ দোঁহা-১ (২০০২,চট্টগ্রাম), বিষাদের রেখেছ কী নাম (২০০৩, কলকাতা), চন্দ্রকান্ত বৃষ্টির নিঃসঙ্গ দোঁহা-২ (২০০৫, কলকাতা), অর্ধেক পুতুল (২০০৭, ঢাকা), জানালায় ঘুম (২০১০, ঢাকা), দোঁহা (২০১৯, চট্টগ্রাম) এ সব গ্রন্থের ভেতরে ইউসুফ সদা জাগ্রত এক সত্তা। কল্পনা শক্তি, কাব্য প্রকরণ, কাব্য শৈলী এবং বিষয়ের নব উদ্বোধনে ইউসুফ নিরলস কাব্য সাধক, এক করিৎকর্মা কবি। কবিতা লিখতে লিখতে তিনি অবচেতনে ভাষা ও বিষয়ে নিজের জন্য একটি জায়গা তৈরী করে নিয়েছেন। তাঁর মধ্যে স্বভাব কবির বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। উপরোল্লিখিত কাব্যগ্রন্থে আছে জীবন যৌবনের জয়গান, এবং জীবনবাদী এক কবির স্বতন্ত্র ধরন। ইউসুফ ভাবানুষঙ্গের সিদ্ধপুরুষ। গভীর অভিনিবেশ এবং কল্পনাশক্তি তাঁকে পৃথক করে তুলেছে সমকালীন কবিতা থেকে।
তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থসমূহ পাঠকের কাছে এক অতুলনীয় সম্পদ। এসব গ্রন্থের মধ্যে আছে আবুল ফজল স্মারক গ্রন্থ, অ্যালবাম গণআন্দোলন (১৯৮২-৯০), সুচরিত চৌধুরী স্মারক গ্রন্থ (যৌথভাবে সম্পাদিত), অশোক বড়ুয়া রচনা সমগ্র, কবিতার রূপ কবিতার কথা। গল্প সামপ্রতিক এবং “তোলপাড়” একটি সাহিত্য সাময়িকী। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ তাঁকে সমধিক পরিচিতি এনে দিয়েছে। আমাদের মন ও মননের যে সৃষ্টিশীলতার জায়গা তাকে উসকে দিতে অনেক পটু ইউসুফ মুহম্মদ। ফলে উল্লিখিত কর্মযজ্ঞ ব্যাপকভাবে সমাদৃত ও প্রশংসিত হয়েছে সুধীমহলে। তিনি শুধুমাত্র একজন কবি নন, কবিতার বাইরেও তিনি সমাজের অন্ধি-সন্ধি নিয়ে সমাজ ভাবনার উদ্বোধক। এ সমস্ত করেই তিনি ক্ষান্ত হয়েছেন তেমন নয়; তাঁর যাবতীয় অস্থিরতার পাঠ আরো অনেক গভীর ও অগ্রবর্তী। স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী গণঅন্দোলনের ( ৮২-৯০) ডক্যুমেন্টারি সম্পাদনা করে তিনি যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন তা রাষ্ট্রীয় সচেতনতার পরিচায়ক। দৃশ্যমান ও স্মরণীয় অনেক কাজের সাক্ষী তিনি। মাঝেমধ্যে লোকমেলার আয়োজন করেছেন, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বাউল ও মরমী শিল্পীদের একত্রিত করে বাউল উৎসব করেছেন। শুধু বাংলাদেশের শিল্পী নন, সময় ও সুযোগ বুঝে মিসর, ইরান, তুরস্ক, ভারত ও নেপালের শিল্পীদের দাওয়াত করে বাংলাদেশের ঢাকা ও চট্টগ্রামের মাটিতে নিয়ে এসেছেন। তাঁদের লোকগান ও সুফী সংগীতের সুর সুধা পান করে ঝংঙ্কৃত ও ঋদ্ধ হয়েছেন চট্টগ্রামবাসী, শিল্পী সাহিত্যিক ও সাধারণ শ্রোতামণ্ডলী। একজন কবি-শিল্পীর ডাইভারসিটি এখানেই। জগৎটাকে ঘুরিয়ে দেখা, জীবনটাকে বারবার বাজিয়ে রাখা। ইউসুফের মানস সত্তাটি চারণ স্বভাবের এবং বৈষ্ণবীয় ঢংয়ের ফলে এক উদার মানবীয় সত্তা তাঁকে ধাবিত করেছে ঐতিহ্যের দিকে। তাঁর চলা ফেরা কথা বার্তায়, আলাপনে বোঝা যায় একজন খাটি সন্ত কবির স্বরূপ। ইউসুফ কবিতা লিখতে লিখতে বুড়ো হবেন দেহে, তবে মনে নয় কখনো। কবিতার বিষয় নির্বাচনে তাঁর আধুনিক মনস্কতার ভেতরে নিবিষ্ট একধরনের স্বর, জীবন অভীস্পা অদৃশ্য এক পথের সন্ধান দেয়। আঙ্গিকে তিনি কুশলী। মাঝে মধ্যে কোত্থেকে এসে ঢুকে পড়ে ভিন্ন মরমীপনা। সে একান্ত তার নিজের গড়া মরমীপনা। প্রত্যেক শব্দ ও পংক্তি পরম্পরায় এক ধরনের নির্লিপ্ত কোমল সংরাগ আচ্ছন্ন করে রাখে । তাঁর দর্শন, মানুষ, সমাজ, রাষ্ট্র কখনো কখনো ইতিবাচক অনুষঙ্গে নারীর শরীর হয়ে ওঠে উজ্জ্বল সুন্দর।
দোঁহা তাঁর ভাবনার একটি বিষয়। প্রচলিত কবিতার বাহিরে এসে তিনি স্বতন্ত্র দুই লাইনের অসীম বেদনাক্ত সংরক্ত কবিতার প্রেমে পড়েন। দোঁহা অর্থ দু’হুঁ, পূর্ববর্তী শব্দ: দু’দেশি এর পরবর্তী শব্দ দু’কথা। অর্থাৎ দুই চরণে ছন্দবদ্ধ পদ বৌদ্ধ দোঁহা। হিন্দি ভাষায় প্রচলিত দোঁহার পূর্ববর্তী শব্দ: দোহাতিয়া কিংবা দোহাত্তা। বৌদ্ধরা দুই চরণের ছন্দোবদ্ধ পদ নিয়ে তাঁদের জীবন ধর্ম, সংস্কৃতি আচার ও দর্শনের কথা বলতেন। যেন দুই চরণই জীবনের সারাৎসার। দোঁহার সংরাগে সংরক্ত হয়ে ওঠে গভীর জীবনবোধ, মানুষের রোজনামচা, ঈশ্বরের ভাবনা, সর্বোপরি এ সবের ভেতর দিয়ে প্রেমাষ্পদের নতুন নির্মিতি আত্মিক ও আধ্যাত্মিক ভবন। ভক্তিবাদী গুরু কবিরের উপদেশ সম্বলিত দোঁহার সাথে আমাদের পরিচয় ঘটে সুলতানি আমলে। ভারতবর্ষ কিংবা ভারতীয় উপমহাদেশে অসংখ্য সমপ্রদায় ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বসবাস। এসব সমপ্রদায়ের মধ্যে নিয়ত হানাহানি দ্বেষ লেগে থাকতো। কিন্তু এসব হিংসা বিদ্বেষ প্রসূত হানাহানির মধ্যে মানবতাবাদী ও সমম্বয়বাদী ধারা বহমান ছিল। সে সময়ে জাতিভেদ প্রথা ও বিদ্যমান ধর্মান্ধতা ও কঠোরতার বিরুদ্ধে ইসলামের আগমনের মধ্যযুগে পরোক্ষ প্রভাবে যে এক ভক্তিবাদী আন্দোলন গড়ে ওঠে, কবির ছিলেন সে আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় একজন। তিনি ছিলেন উদার সমম্বয়বাদী দর্শনে লালিত, জাত প্রভাবের ঊর্ধ্বে একজন মুসলমান।
তাঁর প্রকৃত বড় নাম ছিল শেখ কবীর উদ্দিন মোমিন আনসারী। তিনি ছিলেন নিরক্ষর, পেশায় তাঁতি। তিনি ভারতের ভক্তিবাদের সাথে সুফী অতিন্দ্রীয়বাদের সঙ্গে মিলন ঘটিয়ে নিজস্ব এক গোষ্ঠী গঠন করেছিলেন। এই ধারার সাথে সম্মতি প্রকাশ করে বহু হিন্দু মুসলমান তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। কবীর কোন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন না।তাঁর মতে ঈশ্বর এক। তাকে আমরা রাম বা রহিম যে নামেই ডাকি না কেন, তিনি সর্বমানব সমপ্রদায়ের ।
কবীর ছিলেন মরমী সাধক, লালনও অনুরূপ ঘরানার। মানুষ ভজনই যার ছিল নিত্য কর্মসাধনা । তিনি ছিলেন মধ্যযুগীয় ভারতের এক বিশিষ্ট অতিন্দ্রীয়বাদী কবি ও সন্ত। তাঁর রচনা ভক্তি আন্দোলনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। কবীরের কিছু দোঁহা এ রকম :
(ক) না দেখি কিছু ভাব্ত ভজনে না দেখি কিছু পুঁথিতে
কহে কবীর, শুন হে ভাই, যা আছে সব রুটিতে
(খ) মুসলমানে রহিম বলে
হিন্দু পড়ে রামনামা
দুজন মরে লড়াই করে
মর্মকথা নেই জানা।
(গ) মসজিদে যদি থাকেন খোদা
বাকী জগৎটা কার?
মূর্তিতে যদি রামের আবাস
তবে বাহির কি আছে তার?
কবীর চেয়েছিলেন সমপ্রীতি ও বন্ধনের মধ্যে মানুষের মুক্তি। সমস্ত অন্ধতা, জড়তা ও সামপ্রদায়িকতার মধ্যে মানুষ সংকীর্ণ হয়ে ওঠে। দোঁহা সে সময়ে মানব বন্ধনের কথা বলেছিল, অসীমের গান গেয়ে। দোঁহার নির্দিষ্ট কোন কাঠামো নেই। অক্ষর বিন্যাসের ধরন কি হবে তা বলা নেই। অথচ বিষয়ে রয়ে গেছে মানুষের বন্দনা ও মুক্তির উপায়। এ যাবৎ দোঁহা তেমন করে কারো রচনায় লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেনি। আমাদের ভারতবর্ষে দোঁহার চর্চা, দোঁহাকারের ভজন প্রায় নিষ্প্রভ। অথচ সে লক্ষণগুলোর সামাজিক নৈরাজ্যিক অসময় এখনো বিদ্যমান। আমরা আধুনিক সমাজে বাস করেও ধর্মীয় ভাব উন্মাদনায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত। নাগরিক হিসাবে আমাদের বসবাস হয় মুসলমান রাষ্ট্রে না হয় হিন্দু রাষ্ট্রে। মুসলমান অধ্যুষিত ও সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেখানে- সেখানে মুসলমান রাষ্ট্র, আর হিন্দু যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ সেখানে হিন্দু রাষ্ট্র। মুসলমান রাষ্ট্রে হিন্দুর বসবাস যেমন সংকীর্ণ তেমনি হিন্দু রাষ্ট্রেও মুসলমানের অস্তিত্ব বিপন্ন। ভারতবর্ষে এন আর সি করা হচ্ছে একটা সমপ্রদায়কে বিতাড়নের লক্ষে। হিন্দু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সেবক সংঘের উস্কানীতে অন্য ধর্মীয় সমপ্রদায়ের উৎখাতে এবং বর্তমান রাষ্ট্র কাঠামোর ক্ষমতার দাপটে মুসলমানরা বহিরাগত। এ যদি ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা হয়, তাহলে সংখ্যালঘিষ্টদের অবস্থা কি হবে, তা কেউ ভাবছে না। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ সবাই মানুষ। বিনি সুতোর মালায় গাঁথা একজীবন ধর্ম।
ইউসুফ মুহম্মদ দোঁহায় ভজনা করেছেন মানুষ ও মানবতার, কিছুটা মূর্ত, কিছুটা বিমূর্ত চেতনায়। তাঁর মানুষেরা সর্বাধুনিক হৃদপোড়া কিন্তু সমান নয়। বহির্গত স্বভাবে প্রত্যেক মানুষ প্রত্যেকের নিকটবর্তী হলেও অন্তর্গত স্বভাবে এখনো এই ভেদরেখা টেনে চলেছে। অর্থাৎ নিষ্কলুষ মানবতার চর্চা নিদারুণ চালাকির সংকটে পড়ে নিঃশ্বাস বন্ধ হবার যোগাড়যন্ত্রে ব্যস্ত।
ইউসুফের কিছু দোঁহা,
(১) মেঘের কার্ণিশ বেয়ে নেমে আসে ডানা-অলা রোদ/চরাচরে ক্রোধ, বৃষ্টি দেয় নিঃশব্দ প্রবোধ (২) কোথাও মানুষ নেই, মানুষের আদলে বেড়াচ্ছে/কীট-পতঙ্গ সাপের ফণা বিষধর থুতু (৩)দৃষ্টি হারিয়েছ! হারানো পথের সাথে পায়ের সংযোগ/পাষাণী হৃদয় এক মৃত্যু-কূপে গীটার বাজায়/স্পর্শহীন বেদনা অঙ্গার হলে জীবনে পূর্ণতা আস্তে- (চন্দ্রকান্ত বৃষ্টির নিঃসঙ্গ দোঁহা) (৪) দেবদারু গাছে দোলে বাতাসের ঝুল/বালিকা কুড়ুতে যায় বালকের ভুল। ৫। আমার আমাকে নিয়েছি খুঁজিয়া তোমার চোখের বিজ্ঞাপনে/চোখ ইশারায় হৃদয় মথিয়া নিজেকে দেখেছো সঙ্গোপণে। তোমার আছে পূর্ণাঙ্গ রোদ তোমার আছে জ্যোৎস্না/তোমার জন্য ভেসে থাকা খেয়া ঘাটের দোষ না। (৭) কার দেহে কে বহন করে কার দহনের ছাই/দূরের কাছের আমার আমি একলা ফিরে যাই। (৮) যুবকের বুক পকেট সাজিয়ে রাখে যুবতীর হাত/নিধুবনে কাঁদে বাউল্ত কানুর বাঁশি, বাঁশের বরাত। (৯) স্পর্শহীন নাভিমূলে ডানাঅলা চিতার আগুন/উষ্ণ জলে গজদন্ত পুড়ে ছাই, পুড়িয়া দ্বিগুণ। (১০) আল্লাহ রসূল, মীন কেতন ঈশ্বর, সাক্ষী রাই-কৃষ্ণ নাম/তথাগত বুদ্ধ, ক্রুশবিদ্ধ যীশু, হরে হরে রাম। কী যে তুর্য/অর্ধেক গোলার্ধে অন্ধকার প্রাণ খোলে আলোর প্রস্তুতি সাথে/পাখির আজানে কখন ফিরিবে নতুন সকাল, কাঁচা-সূর্য। (১১) বাউল বৃক্ষের তলে লতানো গাঁট/অবসন্ন দেহ খোলে পৌষ-পার্বণে মাঠ। (১২) তার জন্য কলস পূর্ণ ছিল, চেয়েছে অর্ধেক চোখ অল্প/ যৌথ কষ্ট আমাদের উড়ে যায় জলে, কার সাথে করে গল্প। (১৩) যে আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়্ত- যার কাছে গেলে কৃষ্ণ হয়ে যাই/ভ্রুণ-ভাঙা শিশুর ভেতরে আমি আমাকেই খুঁজে খুঁজে পাই।
ইউসুফের দোঁহার মধ্যে আছে গভীর মানব ভাবানুবাদ এবং নির্জলা প্রেমানুষঙ্গ। ফলে দোঁহাগুলোর বিষয় ও ভাবে ফুটে উঠেছে প্রচলিত সুফিবাদ ও মরমীবাদের ভিন্ন দ্যোতনা। কিছু দোঁহা উৎকৃষ্ট ভাব-চেতনায় নিমজ্জিত হয়ে অনুভবের দ্রাক্ষারসে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। কিছু দোঁহা স্খলিত, পতিত, অবক্ষয়িত মানবতার ইঙ্গিত। তিনি মানুষের মাঝে মানুষ দেখেন না, মানুষের আদলে কীট-পতঙ্গ সাপের ফণা বিষধর থুতু দেখতে পান। দৃষ্টি হারানো মানুষ পাষাণী হৃদয়ে মৃত্যুকূপে গীটার বাজায়, তখন অন্য ব্যঞ্জনা পাঠক হৃদয় উসকে দেয়। তিনি বলেন, মানুষ পুড়তে পুড়তে খাঁটি মানুষে রূপান্তরিত হয়। জীবনে পূর্ণতা আসে দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণায় লীন হওয়ার ভিতরে। এখানে ইউসুফকে পাওয়া যায় রুমী ও তুরস্কের মর্মী চেতনার কবি ইউনুচ এমেরের মরমী চেতনার ভেতরে । উল্লেখিত দোঁহার কোনো কোনোটিতে কবিরের মত ধর্মজ সংকট উপস্থিত নেই, তবে এক ধরনের মানব চেতনার সংকট ইউসুফের দোঁহার ভেতরে আবিষ্কৃত হয়। যার উত্তরণও তিনি বাৎলে দেন। ইউসুফের দোঁহা দু’চরণে সীমাবদ্ধ থাকেনি, মাঝে মধ্যে চার পাঁচ পংক্তিতে শেষ হয়েছে। কবিরও ঠিক একই কাজ করেছেন। মাঝে মধ্যে দু’চরণের দোঁহা পাঁচ চরণে শেষ করেছেন।
জাপানী হাইকো যেমন তিন চরণ বিশিষ্ট ৫+৭+৫ মাত্রায় সীমাবদ্ধ। অনুভূতি প্রকাশে দোঁহার সে রকম কোনো ছাঁচ নেই। দোঁহাতে যেমন প্রেম, জীবন বোধ ও ধর্মীয় ভাব-সম্পদের বিষয় জড়িয়ে আছে, হাইকো তেমন নয়। জাপানী হাইকোর মূল বিষয় হলো প্রকৃতি বা নিসর্গের ছোট্ট শব্দের রঙে প্রকৃতি আঁকাই হাইকোর উদ্দেশ্য। এখানে মানুষ প্রকৃতির শান্ত স্নিগ্ধ জোয়ার ভাটায় চিত্রময় উদ্ভাস লক্ষ্যগোচর হয়। আবার এ যুগে এসে হাইকো অনেকটা পরিবর্তিত। এখন জীবন ঘেঁষে, তার উত্থান পতন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও প্রকাশিত হাইকো কবিতায়। মানুষ ও মানবতার সংকটের চিত্রাভাষ নব অনুষঙ্গে বহমান।
আমরা এমন একটা পৃথিবীতে বাস করি, যেখানে কবিতা শিল্প এবং সংস্কৃতি ছাড়া জীবনের পূর্ণতা নেই। মানুষ চিন্তাশক্তি নিয়ে জন্ম নিয়েছে। সর্বজীবে অতিলৌকিক শক্তির অস্তিত্ব অনুভব করেছে মানুষ। এভাবে শক্তি ও মানস কাঠামোকে ধীরে ধীরে প্রেম ভালোবাসার ধারণায় স্থিত করে প্রকাশ করেছে ভাব। যুগে যুগে প্রেম ও ভাব বিভিন্ন ধর্ম বিশ্বাসে রূপান্তর বলে জেমস জয়েস তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ মনো মিথ (Mono Myth) এ ব্যক্ত করেছেন, মানুষের মনে বোনা সুরসমষ্টিই যে যুগ- যুগান্তরে পূর্বের লোক সাহিত্যে ছিল তা আজ
নৃতাত্ত্বিকভাবে লোক বিজ্ঞানীরা স্বীকার করেন। মরমী সংগীত হলো সুফিবাদের বহিঃপ্রকাশ, যা মূলত তাওহীদ অর্থাৎ স্রষ্টার একত্ববাদের রিসালতের ওপর ভিত্তি করে রচিত এবং বাউল মতবাদ হচ্ছে স্রষ্টাই জীব, জীবই স্রষ্টা ইত্যাদি বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। একে আবার ভারতীয় বেদান্তের অদ্বৈতবাদ দ্বারা প্রভাবিত বলে ড. আশরাফ সিদ্দিকী অভিমত ব্যক্ত করেন। অন্যদিকে বাংলাদেশে সুফিবাদের প্রবেশ তুর্কী বিজয়ের বহু পূর্বে ছিল বলে হিজরি তৃতীয় শতাব্দির বিখ্যাত আরব পর্যটক সোলায়মান ছয়রাফীর ভ্রমণ সংক্রান্ত কাহিনী থেকে জানা যায়।
ইউসুফ মুহম্মদ এ ধারায় না গেলেও, তাঁর দোঁহার কথনে ও উপস্থাপনায় মরমী একটি ভঙ্গি দিতে চেয়েছেন, যেটির আংশিক স্বাদ তাঁর দোঁহায় বিদ্যমান। ইউসুফ আধুনিক মনস্ক জীবন-যাপন করেন, বিভিন্ন আধুনিক সুবিধাসহ। অতএব আত্মা নিংড়ানো প্রাচীন দোঁহার যে সার্বজনীন মরমী সত্তা ইউসুফের দোঁহার মধ্যে অনুপস্থিত। আবার এ কালে এসে অবিকল না থাকাটাই শ্রেয় ও সংগত। এ যুগে এসে অন্ত্যমিলের দোহনে যে দোঁহা তিনি মানুষ ও মানবতার প্রেম ভালোবাসার অকুণ্ঠ সমর্থনে ধীরে ধীরে তাবিজ-কবচের মতো বলতে থাকেন, তার অনিবার্যতা এ- আধুনিক জীবন ব্যবস্থায় বিদ্যমান। বিশুদ্ধ সুফিবাদ সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। সুফিবাদ একটি ইসলামি আধ্যাত্মিক দর্শন। আত্মা সম্পর্কিত আলোচনাই এর মুখ্য উদ্দেশ্য। আত্মার বিশুদ্ধতা নিয়ে নিরাকারের সংগে আকারের বিশুদ্ধ নতুন সম্পর্ক স্থাপন হলো এ দর্শনের মর্মকথা। ইউসুফের দোঁহা সম্পূর্ণরূপে উক্ত সুফিবাদ আচ্ছন্ন থাকেনি, যা কাব্য হৃদয়ের কলফক পরিশুদ্ধ করে। কিন্তু তিনি তার নির্যাস দিয়ে অনুরূপ এক ভাবনির্ভর সুফিবাদের সৌরভ নিয়ে আসেন। ইউসুফের ভজন আমাদের আচ্ছন্ন করে তন্দ্রায়, আবার তন্দ্রা থেকে জাগায় শব্দের রুহুতে যখন জীবন যেখানে যেমন। মাঝে মধ্যে তাঁর পঙ্‌্‌ক্তি মালার অজর আগ্রাসন এ কালের মরমীবাদ ভিন্ন এস্রাজে বেজে ওঠে।

x