ভাষা দিবসের মাহাত্ম ও স্মৃতিস্তম্ভের পবিত্রতা

সালমা বিনতে শফিক

মঙ্গলবার , ৩ মার্চ, ২০২০ at ১০:২১ পূর্বাহ্ণ
129

অনেক প্রতীক্ষার আর আবেগের মুজিব বর্ষ পালনের প্রাক্বালে শহীদ দিবস, আর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। দেশ জুড়ে হাজার হাজার শহীদ মিনারে লক্ষ লক্ষ মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। ফুলেল শ্রদ্ধাঞ্জলি, প্রভাত ফেরিতে নগ্ন পায়ের দিগন্ত জোড়া মিছিল একান্তই আমাদের- বাঙালিদের; বাংলাদেশ নামের ভূখণ্ডটির অধিবাসীদের। প্রভাত ফেরিতে বাজে বেদনার সুর, একই সঙ্গে উচ্চারিত হয় আমাদের পূর্বসূরীদের গৌরবগাথা। পৃথিবী নামক গ্রহটির আর কোন জনপদে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে না।
সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর, ও কিশোর অলিউল্লাহসহ নাম না জানা অনেক শহীদের রক্তে লাল হয়েছিল ঢাকার রাজপথ প্রায় সাতদশক আগে। অথচ সেদিনের মিছিলের ছবি আজও জীবন্ত। ফাগুন হাওয়ায় ভেসে আসা সেই চেনা সুরে প্রাণ কেঁপে ওঠে, চোখ ভিজে ওঠে আজও। ওরা সেদিন আত্মাহুতি দিয়েছিল বলেই না আজ আমরা বাংলায় কথা বলছি, লিখছি, গান গাইছি।
কিন্তু কী বলছি, কিইবা লিখছি, আর গাইছিইবা কী! এখানে মমতা বা প্রাণের টান কতটুকু, আর দেখানেপনাই বা কতটুকু? নাগরিক সমাজে, গণমাধ্যমে, বড় বড় দপ্তরে বছর জুড়ে বড়ই অনাদরে পড়ে থাকে আমাদের মায়ের ভাষা। ফেব্রুয়ারি এলে তোড়জোড় পড়ে যায়, সাদাকালো পোশাক কেনার হিড়িক লেগে যায়। হাওয়া লাগে কেবল বাণিজ্যের পালে। প্রভাত ফেরিতে তো যেতেই হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি প্রকাশ করতে হবে। কপাল ভাল হলে জাতীয় গণমাধ্যমের পর্দায়ও দেখা যেতে পারে। তাইতো শহীদ বেদিতে পুস্পস্তবক অর্পণের সময় বেশ একটা হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। কারণ টেলিভিশনের চোখ আজকাল দিনরাত খোলা। ত্রিশের বেশী ‘চ্যানেল’। দেশব্যাপী যত আয়োজন চলে বেশীর ভাগই কোন না কোন টেলিভিশনের সংবাদ কর্মীগণ সংগ্রহ করেন, ধারণ করেন, এবং প্রচার করেন। টিভির পর্দায় নিজেকে এক ঝলক দেখার আশায় সহচরকে কনুইয়ের ধাক্কা দিয়েই ফেলেন অনেকে।
‘প্রাণডালা ছদ্ধাঞ্জলি’ নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক কবিতা পড়েছিলাম বছর কয়েক আগে। কবিতার সারমর্মটা এমন- ঘিয়া পাঞ্জাবি আর সোনালী রঙের ঘড়ি পরা বিশাল বপুর অধিকারী একজন। মানুষজনের ভিড় ঠেলে, পাশের লোকজনকে ধাক্কা দিয়ে শহীদ মিনারে পৌঁছে যান বরাবর রাত বারটা এক মিনিটে, একুশের প্রথম প্রহরে। অনেক কষ্টে ধাক্কাধাক্কি ও ভিড়ের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখা গাঁদা ফুলের তোড়াটি বেদিতে ছুঁড়ে দিয়েই স্ত্রীকে মুঠোফোনে বৃত্তান্ত জানিয়ে দেন। টিভি পর্দায় তাকে কেমন দেখাল জানতে চান তৎক্ষণাৎ।
গোল্ডেন চেনের ঘড়ি ঝিলিক দিচ্ছে টিভি ক্যামেরায়
রাত্রি তখন এক ঘটিকা।
শহীদ মিনার চত্বরের বয়োবৃদ্ধ কৃষ্ণচূড়ার ডাল নড়ে ওঠে
অতৃপ্ত আত্মা সফেদ ডানা মেলে
আবারও উড়াল দেয়
মুর্শিদাবাদের বাবলা গ্রামের পথে (ইকবাল হোসাইন চৌধুরী ২০১৩)
বাবলা গ্রাম। শহীদ বরকতের জন্মভূমি, পিতৃপুরুষের আদি ভিটা। ‘প্রাণডালা ছদ্ধাঞ্জলি’ কবিতাটি পড়ে সেদিন মনে হয়েছিল- ফাগুন এলেই বুঝি বরকত ও তাঁর সহযোদ্ধাদের আত্মা ঘোরাঘুরি করে বাংলার আকাশে-বাতাসে। ওঁরা কী তবে আমাদের চেয়ে চেয়ে দেখেন, যেমন করে মার্চ ও ডিসেম্বরে আমাদের উদযাপন দেখতে আসেন স্বাধীনতার জন্য আত্মাহুতি দেওয়া ত্রিশ লক্ষ প্রাণ! ওঁরা কী আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি নিয়ে স্বস্তি আর আনন্দ পান! নাকি ভাবগাম্ভীর্যের বদলে উৎসবের ঘনঘটা দেখে নীরবে কেঁদে চলেন! বাংলা সফর শেষে ওঁরা স্বর্গলোকে ফিরে যান কী নিজ নিজ দেশগাঁয়ে, ওঁরা কী আমাদের অভিসম্পাত দেন!
শুধু কী ‘গোল্ডেন চেন’? একদিনের বাঙালিরা পোশাকি প্রগতি ও নান্দনিকতা ফুটিয়ে তোলার অভিপ্রায়ে ভিড় জমায় স্মৃতিস্তম্ভের সীমানায়, কবিতার আসরে, বক্তৃতার মঞ্চে। বর্ণমালা, কবিতা ও শহীদ মিনার খচিত উত্তরীয় জড়িয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। টেলিভিশনের পর্দায়ও সরাসরি দেখানো হয় তাদের অনেককে। শহীদের আত্মা কী বাংলা মায়ের এই হঠকারী সন্তানদের চিনতে পারে না!
বিশালাকৃতির পুস্পস্তবক আর আকাশ ঢেকে দেওয়া ব্যানার প্রদর্শনের প্রতিযোগিতাই যেন এই দিবসের মুলমন্ত্র, দিবস পালনের মুখ্য উদ্দেশ্য! এবারের শহীদ দিবসের জন্য তৈরি অনেক ব্যানারে (*ব্যানারের বাংলা প্রতিশব্দ যদিও পতাকা, পতাকা ব্যবহার করা এখানে হয়তো সমীচীন হবে না) ভাষা শহীদদের স্থলে বীরশ্রেষ্ঠদের ছবি ছাপানো হয়েছে বলে শোনা যায়। শহীদ মিনারে ফুল দেওয়াকে কেন্দ্র করে হাতাহাতি, ধাক্কাধাক্কির এক পর্যায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে যুবকের মৃত্যু হয় বলেও জানা যায়। অস্ত্রধারী তরুণ-যুবাও তাহলে প্রভাত ফেরির পদযাত্রায় অংশগ্রহণ করে!
অর্ধশতক পাড়ি দিতে চলেছে অনেক ‘দাম দিয়ে কেনা’ আমাদের প্রাণের বাংলাদেশ। আজও কেন এমন হয়? শোক দিবসে কেন এমন উৎসবের উন্মাদনা? যে-বয়সে সালাম বরকতরা প্রাণ দিয়েছিল ভাষাকে বাঁচাতে, সেই বয়সে আমাদের আজকের তরুণ যুবকেরা কী করছে? কেউ প্রাণ দিচ্ছে, কেউবা প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। এমনতো কথা ছিল না; না বাহান্নোতে না একাত্তরে।
প্রভাত ফেরিতে লক্ষ মানুষের ভিড়ে একজনও দুর্নীতিবাজ, ঋণখেলাপি, রাষ্ট্রীয় আইন অমান্যকারী, অসাধু ব্যবসায়ী, অসৎ রাজনীতিবিদ, শিক্ষক ও সরকারী কর্মচারী, এবং অসামাজিক ও অমানবিক কার্যকলাপে নিয়োজিত ব্যক্তি যদি থেকে থাকে তাহলে সালাম বরকতদের স্মৃতির প্রতি অবমাননা করা হবে, তাঁদের আত্মা কষ্ট পাবে। শহীদের অতৃপ্ত আত্মার দীর্ঘশ্বাসে ভারী হওয়া আকাশ-বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নিতে পারবে না আমাদের সন্তানেরা (নগরের বাতাসে দিনরাত ভেসে বেড়ানো বিষাক্ত সীসার কথা নাইবা বলি আজ এখানে)। ছেলেমেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে, ওদের কল্যাণের কথা চিন্তা করে স্মৃতিসৌধের পবিত্রতা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের প্রতিটি বিবেকবান দেশপ্রেমিক নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব। মুজিব বর্ষ সফল হোক, সফল হোক আমাদের গৌরবময় স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী। বাংলার জয় হোক।