ভালোবাসায় বসন্ত বরণ

ঋত্বিক নয়ন

শনিবার , ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৪:৪৪ পূর্বাহ্ণ
68

‘আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে? তাই হেরি তা-ই সকল খানে? আছে সে নয়ন তারায়, আলোক ধারায় / চাই না হারায় / ওগো তাই দেখি তা-ই যেথায় সেথায় / তাকাই আমি যেদিক পানে।’ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই শুধু নয়, বসন্ত এলে প্রাণের তাগিদে প্রাণের মানুষকে খুঁজে ফিরে সবাই। মনে রঙ, বনে রঙ, সকলেই যেন রঙের মানুষ, রঙিলা বাতাসে উড়াই অন্তরের ফানুস। বসন্ত মানেই যৌবন-কথা। বসন্ত মানে সৃজন, জাগরণ আর উদ্বোধন। আমাদের প্রাণের ভেতরে যে আরেকটি প্রাণ আছে, জীবনের ভেতরে যে আরেকটি জীবন আছে, আত্মার গহীনে যে রূপ-অরূপের আকাঙ্খা আছে, জীবন ও প্রকৃতির সমান্তরালে তাকে অনুভব ও উৎসরণের নামই বসন্ত। আমাদের কথার ভেতরে কিছু কথা আছে, কথার অন্তরালে কিছু সূক্ষ্ম বার্তা আছে, প্রাত্যহিকের যাপিত গদ্যের ছায়ায় অদৃশ্য সুর ও গান আছে এবং সীমাবদ্ধ বাঁধনের তারে অসীমের তরঙ্গ স্পর্শ আছে। এই অদৃশ্য তরঙ্গের স্পন্দন, জীবনের দোলা, বাণী আর সুরের মূর্চ্ছনায়-রূপে-রসে, মনে ও প্রকৃতিতে জমে উঠে মায়ার খেলা-প্রাণের খেলা। যার কান আছে সে শোনে, যার চোখ আছে সে দেখে এবং যার হৃদয় আছে সে টের পায় কেউ আসছে, কেউ জেগে উঠছে। কে সে? কার এই জাগরণ? সীমার ভেতরে অসীমের মূর্তিতে কার এই সম্ভোগ অভিসার? কার এই নিরব জিকির, গোপন আহ্বান? দেহে-মনে-পুলকে-শিহরণে-বোধে-মননে এই আহ্বানকে স্পর্শ করার যে ইচ্ছা-সময়, বাঙালি তারইতো নাম রেখেছে বসন্ত। আর প্রকৃতির বসন্তকে জীবনের লৌকিক ও আত্মিক আনন্দের গভীরতম স্পর্শে-অনুরাগে, রূপলোকের প্রতিমার ছোঁয়ায় শিহরিত-স্পন্দিত করার মনন আয়োজনের নামই বসন্ত উৎসব। বাঙালি আদি ও অকৃত্রিম হৃদয় ছোঁয়ায় বরণ করতে প্রস্তুত। ঋতুরাজ বসন্তের আগমন নিরবে নিভৃতে হবার জন্য নয়, তাকে বরণ করে নিতে এই বিশাল প্রকৃতি যেমন তার সবটুকু দিয়ে অর্ঘ্য সাজিয়েছে, তেমনি নগরবাসীও বসন্তকে বরণ করে নিতে ভিড় করেছিল কাল সিআরবির শিরীষতলা, খাস্তগীর স্কুলের সামনে, আন্দরকিল্লা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ, পাহাড়তলী আমবাগান শেখ রাসেল পার্ক, শিল্পকলা কিংবা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জারুল তলায়। খোঁপায় গাঁদা ফুল গুঁজে, বাসন্তী শাড়িতে নিজেকে সাজিয়ে যে মেয়েটি একলা প্রহর গুণছিল ভালোবাসার, তার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙার আগেই মধুর বসন্তের রঙে নিজেকে রাঙিয়ে প্রিয়তম পুরুষটি কাল বাড়িয়ে দেয় তার বিশ্বস্ততার হাত নিঃশব্দে।
প্রতিবছরের মতো এবছরও আদি ও অকৃত্রিম হৃদয় ছোঁয়ায় নগরবাসী বসন্তকে বরণ করেছিল। কলেজ শিক্ষিকা লিপি তালুকদার বলেন, আমরা রক্তে রাঙা ফাগুন বলি। রক্তে দ্রোহের জন্ম দেয় যে ফাগুন, সেই বসন্ত আবার সৃষ্টিরও সূচনা। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে উৎসবের মধ্য দিয়ে মননের সংস্কৃতির উন্নয়ন। মননের সংস্কৃতির পরিচর্যা। অসামপ্রদায়িক সমাজ গড়ার প্রত্যয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী রুহিয়া ইসলাম মাহী বলেন, আমরা নগর সংস্কৃতির মধ্যে ভালো যেগুলো আছে সেগুলো গ্রহণ করব। তবে কোনোভাবেই আমাদের চিরায়ত সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে নয়। আমাদের আবহমান সংস্কৃতি যদি হারিয়ে যায়, জাতি হিসেবে আমাদের অস্তিত্বই তো থাকে না। ফাগুনের প্রথম দিনটি নগরজীবনে প্রতিবারের মতো এবারও এসেছে উৎসবের রঙ নিয়ে। নগরীতে বসন্ত উৎসবের প্রতিটি স্থানে ১৪ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই বসেছিল মানুষের সম্মিলন। বাংলার চিরায়ত গান, নাচ, আবৃত্তি, কথামালাসহ নানা আয়োজনে শুরু থেকেই মুখর উৎসব অঙ্গন। এবার বসন্তের প্রথম দিনটি ছিল ভালোবাসা দিবসও। তাই আনন্দ আয়োজনেও ছিল ভিন্নমাত্রা।
সম্মিলিত বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদ : নগরীর জামালখান মোড়ে সম্মিলিত বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদের আয়োজনের উদ্বোধন করেন সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন। প্রথমবারের মতো শুরু হওয়া এই আয়োজনে মোহনবীণার সুর সকালে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। ড. অনুপম সেন বলেছেন, পঞ্চাশ-ষাটের দশকে যখন আমরা ঔপনিবেশিক শাসনে পর্যুদস্ত সেই সময় সংস্কৃতিকর্মীরা এগিয়ে এসেছিল। রমনার মাঠসহ ঢাকায় অনেক উৎসব দেখেছিলাম মানুষকে জাগানোর জন্য। গতকাল নগরীর জামালখান ডা. এম এ হাশেম চত্বরে সম্মিলিত বসন্ত উৎসবের উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন। বেলুন উড়িয়ে উৎসবের উদ্বোধন করেন তিনি। স্বাগত বক্তব্য দেন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান। এরপর রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করেন রক্তকরবীর শিল্পীরা। শিল্পী দোলন কানুনগোর মোহন বীণার সুরে শুরু হয় উৎসব। এ উৎসবে খ্যাতিমান শিল্পী ফকির শাহাবুদ্দিন একক সংগীত ও অভিনয় শিল্পী তারিন একক নৃত্য পরিবেশন করেন। উপস্থাপনায় ছিলেন বাচিকশিল্পী দিলরুবা খানম ও দেবাশীষ রুদ্র।

প্রমা আবৃত্তি সংগঠন :
সিআরবির শিরীষতলা মুক্তমঞ্চে প্রমা আয়োজন করে বসন্ত উৎসবের। প্রমা আবৃত্তি সংগঠন আয়োজিত এ উৎসবে অংশ নিয়েছেন চট্টগ্রামের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বিশিষ্ট শিল্পী। দুই পর্বের এ আয়োজন সকাল ৮টায় বরেণ্য নৃত্য শিল্পী প্রমা অবন্তীর নৃত্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। এরপর দি ভায়োলিনিস্ট চিটাগংয়ের যন্ত্রসঙ্গীত, রক্তকরবীর সম্মেলক সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। সকাল ৯টায় প্রমার সভাপতি রাশেদ হাসানের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ পালের সঞ্চালনায় উৎসবের উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক। বিশেষ অতিথি ছিলেন-দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান, প্রমার সহ-সভাপতি কংকন দাশ। প্রথম পর্বে ওডিসি অ্যান্ড টেগোর ডান্স মুভমেন্ট সেন্টারের দলীয় নৃত্য, সঙ্গীত ভবনের সম্মেলক সঙ্গীত, ঘুঙগুর নৃত্যকলার দলীয় নৃত্য, প্রমার বৃন্দ আবৃত্তি, করবী দাশের একক সঙ্গীত, উদয় শংকর দাশের আবৃত্তি, লাকী গুপ্তার একক সঙ্গীত, উপলব্ধির বৃন্দ আবৃত্তি, প্রীতিলতা সাংস্কৃতিক অঙ্গনের দলীয় নৃত্য, ইকবাল পিন্টু, দিদার, শাহরিয়ার খালেদের একক সঙ্গীত। দ্বিতীয় পর্বে প্রমার শিশু বিভাগের বৃন্দ আবৃত্তি, আমন্ত্রিত আবৃত্তি শিল্পীদের একক আবৃত্তি, ঐকতান সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর দলীয় নৃত্য, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গুরুকূলের দলীয় নৃত্য, অভ্যুদয়ের সম্মেলক সঙ্গীত, স্কুল অব অরিয়েন্টাল ডান্সের দলীয় নৃত্য, নটরাজের দলীয় নৃত্য। এছাড়া ছিল লাকী দাশ, সোমা রায়, সিদ্দিক হোসেন মামুন, মো. হেলাল উদ্দিন, শঙ্কর দে, তাপস চৌধুরী, জাহেদ হোসেন, শ্রেয়সী রায়, মানস পাল চৌধুরী, ফাহমিদা রহমান, রুনা পারভিনের একক সঙ্গীত পরিবেশনা।
বোধন : পাহাড়তলী শেখ রাসেল পার্কে বোধন আবৃত্তি পরিষদ চট্টগ্রামের আয়োজনে বসন্ত উৎসব উদযাপিত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার ‘নিবিড় অন্তরতর বসন্ত এল প্রাণে’ শিরোনামে বোধনের বসন্ত উৎসব শুরু হয় সভাপতি সোহেল আনোয়ার ও কবি দারা মাহমুদের ‘দিন আসে’ কবিতা আবৃত্তির মধ্য দিয়ে। এরপর সংগীতশিল্পী শ্রেয়সী রায়ের পরিচালনায় অভ্যুদয়ের শিল্পীরা সমবেত সংগীত পরিবেশন করেন। এরপর দলীয় নৃত্য পরিবেশনায় বসন্তের আগমনী বার্তায় প্রাণে উচ্ছ্বাস ছুটে যায় নৃত্যরূপ, ওডিসি অ্যান্ড ট্যাগোর ড্যান্স মুভমেন্ট সেন্টার, সুরাঙ্গনের নৃত্যশিল্পীরা। একক সংগীতে বসন্তের উদ্বেলিত মূহুর্ত এনে দেন শিল্পী শ্রেয়সী রায়, মোস্তফা কামাল, গীতা আচার্য্য, ইমন শীল ও করিম মানিক। দলীয় সংগীতে অংশ নেয়-ধ্রুপদ ও সুরপঞ্চম। ভায়োলেনিস্ট চিটাগাং এর একঝাঁক মুখ বসন্তের রঙিন দ্বার প্রসারিত করে। আবৃত্তি করেন-সুবর্ণা চৌধুরী ও পলি ঘোষ। বিকালে বর্ণাঢ্য বসন্তবরণ শোভাযাত্রার মাধ্যমে শুরু হয় দ্বিতীয় অধিবেশন। এরপর যন্ত্রসংগীত পরিবেশন করে বংশীধ্বনি। সংগীত পরিবেশন করে-সংগীত ভবন, নবধারা। দলীয়নৃত্যে অংশ নেয় এবি নৃত্যাঙ্গন, নৃত্য রং, নৃত্য নিকেতন। ভায়োলিন পরিবেশনায় ছিলেন আনিস মাহমুদ। একক সংগীতে ছিলেন কাবেরি সেনগুপ্তা, মাহবুবুর রহমান সাগর, রিশু তালুকদার, সুভ্রত ধর, প্রিয়া ভৌমিক, চন্দ্রিমা ভৌমিক। একক আবৃত্তি করেন রাশেদ হাসান, মসরুর হোসেন, দেবাশীস রুদ্র, এহতেশামুল হক, ইসমাইল সোহেল, অনুপম শীল। কথামালায় অংশ নেন কবি কামরুল হাসান বাদল। উৎসব মঞ্চ জমিয়ে তুলে বন্দর ব্যান্ড।
এদিকে নগরীর আন্দরকিল্লা চসিক নগর ভবনের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে ‘নিবিড় অন্তরতর বসন্ত এলো প্রাণে’ স্লোগানে বোধনের আরেক অংশ বসন্ত উৎসবেও ছড়িয়েছে ভালোবাসার রং। বিকালে বসন্ত বরণ শোভাযাত্রা, আবৃত্তি, কথামালা, সঙ্গীত, নৃত্য, যন্ত্র সঙ্গীত, ঢোল বাদন ও পিঠাপুলির সমারোহে দিনব্যাপী এ উৎসব সাজানো হয়েছিল। গতকাল শুক্রবার সকালে শিমুল নন্দীর একক আবৃত্তি পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠানমালা। উদ্বোধন করেন প্রফেসর রীতা দত্ত। এসময় মঞ্চে ছিলেন বোধন সভাপতি আব্দুল হালিম দোভাষ, প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য সুভাষ বরণ চক্রবর্তী, নারায়ণ প্রসাদ বিশ্বাস, সুজিত রায় ও সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক প্রণব চৌধুরী। এরপর মোহনবীণা বাজিয়ে মঞ্চে ভিন্নতা আনেন শিল্পী দোলন কানুনগো ও টিটন বিশ্বাস। সঙ্গীত ভবন, গীতধ্বনি, অদিতি সঙ্গীত নিকেতনের শিল্পীরা দলীয় পরিবেশনায় অংশ নেন। ওডিসি অ্যান্ড টেগোর মুভমেন্ট ও ঘুঙ্‌গুর ললিতকলা কেন্দ্রের শিল্পীরা নৃত্য পরিবেশন করে। কথামালায় অংশ নেন-প্যানেল মেয়র চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী ও কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লব, প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা সুমন বড়ুয়া, কবি কামরুল হাসান বাদল।
খুলশী ক্লাবের বসন্ত বরণ ও ভ্যালেন্টাইন নাইট : বর্ণাঢ্য আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো খুলশী ক্লাব লিমিটেডের বসন্ত বরণ উৎসব ও ভ্যালেন্টাইন নাইট। গতকাল শুক্রবার নগরীর ফয়’স লেক এলাকায় ক্লাবের নিজস্ব মাঠে এই আয়োজন করা হয়। সকালে নাচে গানে ঋতুরাজ বসন্তকে স্বাগত জানিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। মাঠে বসে পিঠাপুলিসহ নানা দেশীয় পণ্যের মেলা। যার আয়োজনে ছিলো চট্টগ্রাম উইম্যান চেম্বার। এরপর সন্ধ্যায় শুরু হয় ভ্যালেন্টাইন নাইট উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শিল্পী আনিকা ও সুইটির কন্ঠে একে একে পরিবেশিত হয় জনপ্রিয় সব গান। এরপর বিচিত্রা বসাক তাঁর যাদুশিল্পের দক্ষতায় মুগ্ধ করেন সবাইকে। শেষে ক্লাবের পক্ষ থেকে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয় খুলশী ক্লাবের সদস্য আলমগীর হোসেন সৈকতকে। জাতীয় পর্যায়ে সফল আত্মকর্মীর জন্য তাঁকে ক্লাবের ফাউন্ডার ভাইস প্রেসিডেন্ট রফিক উদ্দীন বাবুল ভু্‌ঁইয়া এই সম্মাননা তুলে দেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন হিমাদ্রী রাহা।