ভালোবাসার পাণ্ডুলিপি

রহমান রনি

শুক্রবার , ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৫:১৭ পূর্বাহ্ণ
21

আন্দরকিল্লা ব্যস্তময় শহরের ব্যস্ত এলাকা। কান পাতলে প্রেসের মেশিনের শব্দ শোনা যায়। পুরো এলাকাতে ব্যস্ততা, অস্থিরতা বিরাজমান। এখানের মেশিন, অফিস ঘর, চায়ের দোকান, ইট-পাথর থেকে শুরু করে সোডিয়ামের আলো পর্যন্ত ব্যস্ত থাকে। ট্রাফিক পুলিশরা এখানে কখনো কখনো অবসর পায়। তাদের কর্মঘণ্টা বদল হতে হতে হাত বদল হয়ে যায় শত পোস্টার, রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক ব্যানার লিফলেট বই আরো কতো কী! মোড়ের চায়ের দোকানগুলো শাহেদ কখনো বন্ধ দেখেনি। সে তার জীবনে একবার কারফিউ দেখেছে এবং সেদিন দেখেছে দোকানগুলো তাড়াহুড়া করে বন্ধ করতে। সবার এতো এতো ব্যস্ততার মাঝে শাহেদ ধীরে সুস্থে হেঁটে যাচ্ছে। তার হাতে খুব যত্নের-স্বপ্নের পাণ্ডুলিপি। শাহেদ খুবই আবেগি। হঠাৎ তার মাথায় এলো সে লেখক হবে, ব্যস্‌ কোমরবেঁধে লেখালেখিতে নেমে পড়লো। পত্রিকায় প্রকাশিত কয়েকটি গল্প ইতিমধ্যে পাঠক ও সমালোচকের দৃষ্টিতে প্রশংসিত হয়েছে। তার বন্ধু অনুপম বলেছে বিশিষ্ট সাহিত্য সমালোচক ও প্রকাশক মোতালেব হোসেনের দৃষ্টি আর্কষণ করতে পারলে তার জীবন পাল্টে যাবে। সে বন্ধুর কথামত মোতালেব হোসেনের ঠিকানা বের করেছে।
এনায়েত বাজার মোড়ে এসে শাহেদ সিগারেট শেষ করে ঠিকানা মিলিয়ে নিলো। বিল্ডিংয়ের তিন তলায় উঠে দুইবার কলিং বেল চাপলো। একটু পর গোলগাল চেহারার ফর্সা একটি মেয়ে দরজা খুলে দিলো।
-কাকে চান?
-শাহেদ পাণ্ডুলিপির দিকে তাকিয়ে বললো, মোতালেব হোসেন আছেন?
মেয়েটি ইশারায় ভেতরে আসতে বললো। শাহেদ ভেতরে ঢুকে বসলো। মেয়েটি ভেতরে চলে গেলো। একটু পর এক গ্লাস পানি নিয়ে এসে শাহেদের সামনে বসলো। চোখে এখন চশমা দিয়েছে তখন ছিলো না। শাহেদ কথা বলার আগেই মেয়েটি বললো বাবা বসতে বলেছেন। আপনি কি পাণ্ডুলিপি নিয়ে এসেছেন?
-কিভাবে বুঝলেন?
-মনে হল।
শাহেদ পানির গ্লাস টেবিলে রেখে বললো, হুম।
-আপনি কি কবি?
-না।
-ঔপন্যাসিক?
-না।
-তাহলে?
-আমি গল্প লিখি। আমি একজন গল্পকার। আপনি কি স্যারের মেয়ে?
-জ্বী।
-আপনার নাম জানতে পারি?
-আমি নওরীণ। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স পড়ছি। আপনি কি শুধু গল্প লিখেন? নাকি অন্য কিছুও করেন।
-আপাতত কিছু করছি না। গল্পকার হওয়ার চেষ্টা করছি।
-ভালো।
মোতালেব হোসেন রুমে এসে বসলে নওরীণ চলে যায়। শাহেদ সালাম দিয়ে নিজের পরিচয় দেয়।
আমার কাছে কেন এসেছেন? মোতালেব হোসেন পকেট হতে রুমাল দিয়ে চশমাটা পরিষ্কার করে নেয়।
শাহেদ পাণ্ডুলিপিটা মোতালেব হোসেনের সামনে এগিয়ে দিয়ে বলে ভালো কিছু গল্প নিয়ে এসেছি। আশা করি আপনার ভালো লাগবে।
-গল্পগুলো কী নিয়ে?
-মূলত ভালোবাসার গল্প। তবে আমি চেষ্টা করেছি ভিন্নভাবে লিখতে।
-ঠিক আছে রেখে যান। আমি আপনাকে পরে জানাবো।
কথোপকথন এখানে শেষ। শাহেদ আর কিছু বলার সুযোগ পায় না। সে চলে আসে।
ডিসি হিলে বসে এক কাপ রং চা খেয়ে সিগারেট ধরালো। সামনে একুশে বইমেলা। বইটি যদি এবার মেলায় বের হয় সে নিশ্চিত তার লেখালিখির ভাগ্য পরিবর্তন হবে। টাকা পয়সা না পেলেও তার খ্যাতি হলেও সে সন্তুষ্ট। একবার খ্যাতি হলে তার গল্প সবাই পড়বে। সবাই তাকে চিনবে। তখন আর টাকা আয়ে কোন সমস্যা হবে না। শাহেদের স্বপ্ন বড় থেকে আরো বড় হতে থাকে।
দু’ তিন দিন পর সে মোতালেব হোসেনের বাসায় গেলো কিন্তু উনাকে পেলো না। নওরীণ তাকে বসতে বললো। শাহেদ বসেই সরাসরি বলে ফেললো চা হলে ভালো হয়। নওরীণ চা নিয়ে এসে শাহেদকে বললো আপনি ভালো গল্প লিখেন।
শাহেদ কাপ হতে চোখ তুলে নওরীণের দিকে তাকালো।
-নওরীণ হেসে বলে গল্পগুলো আমি পড়েছি। খুব ভালো লিখেছেন। তবে…
-কী।
-বাবা এটি বই হিসেবে প্রকাশ করবে কিনা জানি না।
-কেন আপনার এমন মনে হলো?
-আপনি ভালোবাসার গল্পগুলো লিখেছেন বিশ্বের অস্থিরতা, দেশের নানা অসঙ্গতির মিশেলে। দুটোই আপনি ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। কিন্তু আপনি নতুন যে নিরীক্ষা করেছেন অনেকে সেটা মেনে নিবে না।
-আপনি কিভাবে নিয়েছেন?
-নওরীণ হেসে বলে, আমার খুব ভালো লেগেছে। নতুনত্ব যেকোন কিছু আমার ভালো লাগে।
-আর যারা গল্প লিখে তাদের? শাহেদ প্রশ্নটি করে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে।
নওরীণ কথাটির পাশ কাটিয়ে বলে জানেন আমার খুব ইচ্ছে কেউ আমার জন্য ভালোবাসার একটি চিঠি লিখুক।
শাহেদ কিছু বলতে যাবে তার আগেই নওরীণ বলে বাবার আসতে আজ দেরী হবে।
শাহেদ চলে আসে। তার মন আজ অনেক খুশি। নওরীণের গল্পগুলো ভালো লেগেছে জেনে তার অনেক আনন্দ হচ্ছে। নওরীণের হাসি, মায়মায়া চেহারা শাহেদের মনে দাগ কেটে যায়।
পরের সপ্তাহে মোতালেব হোসেনের সাথে শাহেদের দেখা হয়। মোতালেব হোসেন বললো গল্পগুলো নিয়ে আরো ভাবতে তারপর দেখা করতে। শাহেদ গল্পের পাণ্ডুলিপি নিয়ে চলে আসে। তার একটুও খারাপ লাগে না। নওরীণের ভালো লেগেছে শোনার পর তার গল্পের প্রতি আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গেছে। শাহেদ গল্পগুলো আবার পড়তে থাকে। প্রতিটা শব্দে সে নওরীণের স্পর্শ পাই। গল্পগুলো তার কাছে জীবন্ত হয়ে উঠে। গল্পের প্রেমিক-প্রেমিকার প্রেম, খুঁনসুটি সব তার কাছে ভালো লাগে। সে নওরীণের জন্য প্রচণ্ড আবেগ ভালোবাসা দিয়ে একটি চিঠি লিখে। প্রতিটা লাইনে তার হৃদয়ের কথাগুলো শব্দ দিয়ে গেঁথে দিয়েছে।
চিঠিটা নিয়ে সে মোতালেব হোসেনের বাসায় দু’একবার গিয়েছে কিন্তু নওরীণকে পায়নি। তার মন বিষাদে ছেঁয়ে যায়। মায়া ভরা মুখটি তার চোখে বার বার ভেসে ওঠে।
পরেরদিন আন্দরকিল্লায় প্রেসে শাহেদের সাথে মোতোলেব হোসেনের দেখা হয়। শাহেদকে দেখে মোতালেব হোসেন উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলেন তোমার গল্পগুলো বই মেলায় বই আকারে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
এমন খুশির কথায় শাহেদের মনে কোন প্রতিক্রিয়া হয়নি। সে জানতে চাই নওরীণ কোথায়? সে সাহস করে জিজ্ঞেস করে ফেলে। স্যার, দু’একবার বাসায় গেলাম নওরীণকে দেখলাম না।
-কেন? কোন প্রয়োজন?
-না এমনিতেই।
-ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। ছেলে আমেরিকায় থাকে। সামনের মাসে দেশে আসলে বিয়ে হবে। ওর মামার বাসায় গেছে বিয়ের কেনাকাটা করতে।
শাহেদ শুনে স্তম্ভিত হয়ে যায়।
মোতালেব হোসেন বলেন তাহলে কাল এসো একবার। তোমার সাথে চুক্তিটি করে ফেলবো।
-স্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছি বই বের করবো না।
-কেন?
-সবকিছু প্রকাশ করতে নেই।এই বলে শাহেদ রাস্তায় বের হয়ে আসে। সে চায় না গল্পগুলো আর কেউ পড়ুক। নওরীণের জন্য লেখা চিঠিটা পকেট হতে বের করে দুমড়ে-মুচড়ে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে নীরবে হেঁটে চলে যায়।
ভালোবাসার গল্পগুলো হয়তো আর কখনো প্রকাশিত হবে না। মানুষ জানবে না অপ্রকাশিত ভালোবাসার পাণ্ডুলিপিতে কী গল্প ছিলো।