ভালোবাসার কথা

সালমা বিনতে শফিক

শনিবার , ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ১১:১৬ পূর্বাহ্ণ
150

তেরই ফেব্রুয়ারির খবরে প্রকাশ, একদিনে পাঁচ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হয়েছে দেশজুড়ে। এবছর বসন্ত ও ভালোবাসা দিবস হাত ধরাধরি করে এসেছে; একদিন আগে পরে নয়। কিন্তু সেটা তো চৌদ্দ তারিখ। তের তারিখে ফুলের বাজার যদি পাঁচ কোটি হয়, চৌদ্দতে তাহলে তা দশ কোটি ছাড়িয়ে যাবার কথা। বাঙালি যে আমরা! সহকর্মীর সঙ্গে আলাপ করছিলাম এই নিয়ে সকালবেলায়। ঠিক আলাপ নয়, মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তা চালাচালি- আমার বাড়িতে এক টাকার ফুলও এল না, পাঁচ কোটি টাকার ফুল কোথায় গেল! (এটা নিতান্তই কথার কথা। সত্যি বলতে কী- মা দিবস আর প্রিয় মানুষদের জন্মদিন ছাড়া অন্য কোন দিবসের কথা আমার দিনপঞ্জিতে থাকে না। কিন্তু সেইসব দিবসগুলোতে দামী উপহার সামগ্রী আদান প্রদানের কোন প্রচলন নেই বললেই চলে)।
এমন সময় খণ্ডকালীন গৃহকর্মীর প্রবেশ। অন্য দিনের চেয়ে একটু দেরি হয়ে গেল আজ। দেরি হবার কারণ ব্যাখ্যা করে- পথিমধ্যে ছোটখাট একটা যুদ্ধের মতো চলছিল। শেষটা না দেখে নড়তে পারছিল না।
কোন এক রমণী প্রিয় বান্ধবীর জন্য ভালোবাসার উপহার নিয়ে যাচ্ছিলেন। কেবল ফুল নয়, কয়েক রকমের ফল, সুন্দর মোড়কে বাঁধা বিশেষ কিছু। কিন্তু পথিমধ্যে পতি তার বাঁধ সাধেন। তিনিও সঙ্গে যেতে চান। রমণীটি পতিকে সঙ্গে নিতে কিছুতেই রাজি নন। কিন্তু উনি যাবেনই। এক পর্যায়ে রাগ করে মোড়ক খুলে ফেলেন; বেরিয়ে আসে থলের বেড়াল। প্রাপকের স্থানে একজন পুরুষের নাম লেখা, এবং বিশেষ সেই উপহারটা আসলে পুরুষেরই হাতঘড়ি। স্বামী বেচারার চক্ষু চড়কগাছ।
যাত্রাপথে অনেকে চলা থামিয়ে উপভোগ করেন বাসন্তী ভ্যালেন্টাইন দিবসের সকালে প্রদর্শিত বিনা টিকেটের এই খণ্ডনাটক। কেউ কেউ মন্তব্যে অংশ নেন, অনেকটা ফেইসবুকের ‘লাইক শেয়ার কমেন্টের’ মতো।
নাটকের আরও কিছু দৃশ্য বাকী আছে। অনেক চোটপাট করে স্বামী বেচারা ছিন্নভিন্ন মোড়কে বাঁধা হাতঘড়িটি নিজের কব্জায় নিয়ে নেন। স্ত্রীকে বলেন- যা ফুল ফল নিয়ে দেখা করে আয় নাগরের সঙ্গে। মাটি তো দুভাগ হয় না, আকাশও ভেঙে পড়ে না। এমন সাধের বাসন্তী ভালোবাসার সকালটা আক্ষরিক অর্থেই মাঠে মারা যায়।
এই নাটকের পাত্রপাত্রী কারা, জানতে ইচ্ছে করছিল। আমাদের পাড়ার কেউ না তো? গৃহকর্মী ভুল ভাঙায়- গলির শেষ মাথার রাস্তার ওপাড়ে বস্তিতে থাকে ওরা; স্বামী স্ত্রী দুজনেই পোশাক কারখানায় কাজ করে। উৎসাহী দর্শকদের কেউ কেউ বলে ওঠে- মেরে ঘর থেকে বের করে দে। কেউবা স্বামীটির ধৈর্যের তারিফ করে। কেউ আবার এক কাঠি এগিয়ে গিয়ে ফোঁড়ন কাটে- গলায় দেবার দড়িও জোটে না! — এমন টানটান মুহূর্তে আমার সংবাদদাতাকে দৃশ্যপট থেকে সরে আসতে হয়। কারণ আমার কাজ শেষ করে আরও দুদুটো বাড়িতে যেতে হবে তাকে।
ওপরের গল্পটি শোনার পর হয়তো পাঁচ দশ কোটি টাকার পুস্প বাণিজ্যের রহস্যের কিছুটা কূলকিনারা হল। সতের আঠারো কোটি মানুষের এই ছোট্ট বদ্বীপে পাঁচ কোটি টাকার পুস্প বাণিজ্যের খবর শুনে অবাক হওয়ার মতো সত্যিই কিছু নেই। তাই বলে সবাইতো আর নকল কিংবা ভ্রান্ত ভালোবাসা উদযাপনে খরচাপাতি করছে না। তবে পুস্প ছাড়া ভালবাসাবাসির এই মহান দিবসে (!) আরও নানাবিধ উপহার সামগ্রী আদানপ্রদান হয়। ভালোবাসা দিবস উদযাপনে যিনি বা যারা মনস্থ করেন তাঁদেরকে আলোচনা পরিকল্পনা অনেক কিছু করে রাখতে হয় আগেভাগেই। বাজেট তথা অর্থবরাদ্দের বিষয়টা মাথায় রাখতে হয় সবার শুরুতে। অতি আগ্রহী যারা তাদের কাছে এই দিবসের মূল্য সীমাহীন। এই দিবস পালন করতে ব্যর্থ হলে ভালোবাসা তো হারিয়ে যাবেই, সেই সঙ্গে মান-সম্মান, এমনকি জীবনও!
ভাবনার বিষয় হচ্ছে- এই অতি আগ্রহীর সংখ্যা নেহাত কম নয় আমাদের সমাজে, বরং দিনকে দিন বেড়ে চলেছে, ঠিক যেমন করে বাড়ছে আমাদের প্রবৃদ্ধি ও জাতীয় মাথাপিছু আয়ের হার। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ, সমাজে, পরিবারে, হাটে-মাঠে-ঘাটে সর্বত্র দিবস পালনের ছড়াছড়িকে কারও কাছে আজকাল আর বাড়াবাড়ি বলে মনে হয় না। নাটকীয় কায়দায় ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ আর উপস্থাপন কেবল বিনোদন জগতের তারকাদের জীবনমঞ্চে থেমে নেই। আমার আপনার মতো সাধারণ নাগরিক, আমজনতাও চায় রুপালি পর্দার তারকাদের মতো করে দৃশ্যমান ভালোবাসা উদযাপন করতে, ওদেরই মতো করে উপভোগ করতে জীবনটাকে। সেই উপভোগে যে স্বস্তি থাকে না, শান্তি হারিয়ে যায়, এমনকি হারিয়ে যায় সত্যি ভালোবাসাও- প্রতিদিন ভাঙনের গল্প শুনে শুনেও সে বিষয়টা কেউ তলিয়ে দেখতে চায় না।
বস্ত্রকর্মী নারীর ঘরের মানুষকে ফাঁকি দিয়ে অন্য একজনকে উপহার দিতে যাওয়ায় অনেক প্রশ্ন উঠে আসে। হাড়-মাংস পানি করা টাকা ওর। যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে নিষিদ্ধ অভিসারে যাচ্ছিল সে ভালোবাসা দিবসের বাসন্তী প্রভাতে, সে-অর্থে তার পরিবারের এক সপ্তাহের খাওয়া খাদ্য দিব্যি চলে যেতে পারত। আবার, সমাজের দোহাই দিয়ে যাকে নিষিদ্ধ ভালোবাসা বলা হচ্ছে, হয়তোবা সেই তার প্রকৃত ভালোবাসা। এমনও হতে পারে, স্বামীটি আসলে সত্যিকার ভালোবাসার মানুষ নয়। বাধ্য হয়েই হয়তো জীবন যাপন করে যাচ্ছে তার সঙ্গে। আবার এমনও হতে পারে, অন্য মানুষটি হয়তো তাকে সম্মোহিত করে ফেলেছে, নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে লোভে ফেলেছে। সমাজ ধর্ম, নৈতিকতা সব ভুলে তাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে নারীটি।
না, মেয়ে বলে পক্ষপাতিত্ব করছি না মোটেও। নারী জাগরণ, নারী স্বাধীনতা, নারী মুক্তি- নানান নামে নারী জাতির জীবন ও ভাগ্য বদলের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন বেগম রোকেয়া ও আরও অনেকে আজ থেকে শত বছর আগে, সবই কী তবে অসার, অন্তঃসারশূন্য? সমাজটা যেন এক পা এগোয়, আবার পিছিয়ে যায় কয়েক পা। রোকেয়াদের কথা, শিক্ষা, ও দর্শন কারও মনে ছোপ ফেলেনা, কাউকে স্বপ্ন দেখায় না, অথচ ফেইসবুক ইউটিউবের শিক্ষা সবাই লুফে নেয় চকিতেই। একজন পোশাক শ্রমিক রোকেয়া’র দর্শন ধারণ করে আত্মমর্যাদাবোধ অর্জন করবেন, সেকথা ভাবাটা হাস্যকর হয়তো, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের রঙিন জগত যে তাকে তাদেরকে অতি সহজেই মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলে। এর ফলাফল কিংবা পরিণাম কী? ভালোবাসা দিবসে ঘরভাঙার খবরের কোন তালিকা বা পরিসংখ্যান আছে কী না, কে জানে?
মেয়েরা ঘরের বাইরে যাবে, কাজ করবে, পরিবারের অভাব মোচনে অবদান রাখবে। একইসঙ্গে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সামজিক মর্যাদা লাভ করবে। এ-প্রজন্মের কীর্তি আরও খানিকটা এগিয়ে নিয়ে যাবে পরের প্রজন্ম। সেটা না করে একটুখানি বাইরের হাওয়া গায়ে লাগলেই, কিছু টাকা হাতে এলেই যদি নিজের চিরচেনা আটপৌরে জগত ফেলে চিত্রপুরীর তারকাদের মতো করে চলাফেরা করার সাধ জাগে, তাহলে কেমন করে দিন বদলাবে?
এবারে একটু ভিন্ন প্রসঙ্গ। গৃহকর্মী নির্যাতনের খবর সবার জানা, কারণ প্রচার মাধ্যমে প্রতিদিনই এ সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হয়। কিন্তু যে গৃহকর্মী নির্যাতিত হয় না, তার গল্প কেউ কী শুনতে চান? আমার এক নিকটাত্মীয়ের গৃহকর্মীকে দেখে যে কেউ বলবে বাড়ির মেয়ে। পোশাকে, আচরণে নিজ মেয়ের সঙ্গে কোন ফারাক নেই। কেবল বিদ্যালয়ে পড়তে পাঠানো হয় না। তা পুষিয়ে দেন গৃহকর্ত্রী ঘরে বসেই; সময় পেলে ওকে পড়াতে বসেন। দিনে দিনে বাজারের ফর্দ লিখতে পারে, সহজ গল্পের বই পড়তে পারে বানান করে। সব চাহিদা এখানেই পূরণ হয়, বেতনের টাকায় হাত দিতে হয় না। একদিন তার ইচ্ছে হল- বেতনের জমানো টাকা থেকে স্মার্টফোন কিনবে বার হাজার টাকায়, কারণ মনের মতো করে ছবি তুলতে পাওে না, ইউটিউবে গান শুনতে পাওে না, যদিও টেলিভিশনে পছন্দের অনুষ্ঠানমালা নির্বিঘ্নে দেখা হয়। গৃহকর্ত্রী বাধ সাধেন। দামী মুঠোফোন নয়, বরং কিছু গয়না কিনে রাখার পরামর্শ দেন। গৃহকর্মী নাখোশ। রীতিমত রাগান্বিত। পুরোনো মুঠোফোন হাতে ফকিরের মতো লাগে নিজেকে। এই কষ্ট সইতে পারে না। ক্ষণে ক্ষণে মেজাজ দেখায়। গৃহকর্তীর সন্তানদের ধমকধামকও দিয়ে ফেলে।
ভিন্ন প্রসঙ্গের এই গল্পটা বলা এজন্যই যে প্রযুক্তির আশীর্বাদ গ্রহণ ও ধারণ করার মতো মানসিক বিবেচনাবোধ আমাদের দেশের বেশীরভাগ মানুষের আজও হয়নি। তাছাড়া উন্মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির কল্যাণে কূটচাল ও অস্বাভাবিক সম্পর্ক অবলম্বনে নির্মিত অন্যদেশীয়, এমনকি আজকাল স্বদেশের টেলিভিশনে প্রচারিত মেগা ধারাবাহিক নাটকগুলোও বিভ্রান্ত করছে সাধারণ মানুষদের। কিন্তু প্রযুক্তি এখন সহজলভ্য; হাতের মুঠোয় আকাশ এবং পৃথিবী এমনভাবে চলে এসেছে যে সবাই দিশেহারা হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তির হাতছানিতে অনেকেই দায়দায়িত্বের কথা ভুলে যেতে বসেছে, যার পরিণতিতে সামাজিক, পারিবারিক ও আত্মিক বাঁধনগুলো হালকা হয়ে আসছে। কেবল পোশাক শ্রমিক বা গৃহকর্মীরাই নয়, সমাজের ওপর তলায় কিংবা মাঝের সিঁড়িতে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর বড় একটা অংশ স্বাভাবিক বোধবুদ্ধি হারিয়ে অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে, কেবল রূপালি পর্দার তারকাদের অনুকরণ করতে গিয়ে।
আগামী প্রজন্মের জন্য সুস্থির সমাজ চাইলে সচেতনতার বিকল্প নেই। সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সামাজিক বিপ্লব চাই, নতুবা একটুখানি রাশ টেনে ধরা চাই। আমাদের পরিবারগুলো, সমাজ ও অনেক দাম দিয়ে কেনা রাষ্ট্রটিকে বাঁচাতে হবে। আমাদের সন্তানদের জন্য একটা বাসযোগ্য শান্তির বাংলাদেশ গড়তে হলে এই বিপ্লবে সামিল হতে হবে সবাইকে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে ভালবাসতে জানে সে কখনও নির্দয় হয়না, প্রতারক হয় না। কেবল একজন ব্যক্তিকে নয়, সবাইকে ভালবাসতে হবে। নিজের চারপাশ, সমাজ, রাষ্ট্র ছাড়া সবাই যে যার কাজকে ভালবাসবে, মাটিকে ভালবাসবে, প্রকৃতিকে ভালবাসবে, পৃথিবীটাকে ভালবাসবে। সত্যি ভালোবাসা মানুষকে সঠিক পথে চলতে শেখায়। ভ্যালেন্টাইন বা ভালোবাসা দিবসে এমন প্রতিজ্ঞা করলে কী দারুণ একটা ব্যাপার হয়!