ভারতে দৃষ্টি সবার উত্তর প্রদেশে

লোকসভা নির্বাচন

মঙ্গলবার , ১৪ মে, ২০১৯ at ৬:২৭ পূর্বাহ্ণ
232

লোকসভা নির্বাচনে শেষ ধাপের ভোটগ্রহণ বাকি থাকতেই শুরু হয়ে গেছে নানা হিসাব-নিকাশ। কে ক্ষমতায় যাবে কিংবা কোন দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে- সবকিছুর বিশ্লেষণে গুরুত্ব পাচ্ছে উত্তর প্রদেশের ভোটের ফলাফল। ভোটার, পর্যবেক্ষকরা বলছেন, যেহেতু উত্তরাঞ্চলীয় এই বৃহৎ রাজ্যে বিভিন্ন অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর বসবাস, আর তাদের ভোটই রাজ্যের মোট ভোটের অর্ধেকের বেশি। সেক্ষেত্রে তাদের ভোটই দেখাবে নতুন সরকার গঠনের পথ। এর বাইরেও রয়েছে নানা সমীকরণ। লোকসভার মোট ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ৮০টি উত্তর প্রদেশে। গত ১১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া নির্বাচনের আগের ধাপগুলোয় এই প্রদেশের ৬৬ আসনে ভোট শেষ হয়েছে। বাকী ১৪ আসনের ভোট হবে আগামী ১৯ মে শেষ পর্বে।
স্থানীয় দুইজন পর্যবেক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে উত্তর প্রদেশের ৪৭ আসন নির্ধারণ করবে কোন দল লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। এসব আসনে এবার বিরোধী জোট একাট্টা হয়েছে। উত্তর প্রদেশের রাজধানী লখনৌর একটি বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা জাফর জিলানী বলেন,
এই রাজ্যে আপনি ঘুরে দেখুন, দেখবেন এখানে হিন্দু, মুসলিম, যাদব সমপ্রদায় যেমন আছেন তেমনি শহর পেরিয়ে গেলেই দেখবেন হিন্দু সমপ্রদায়ের বিভিন্ন অনগ্রসর গোষ্ঠীর বসবাস। শুধুমাত্র যাদব, দলিত ও মুসলিম সমপ্রদায়ের ভোটই এই প্রদেশের মোট ভোটের ৫০ শতাংশের বেশি। খোদ লখনৌ আসনে যিনিই প্রার্থী হন তাকে অবশ্যই মুসলিমদের ভোট পেতে হয়। গতবার দেখা গেছে কট্টর হিন্দু জাতীয়বাদী সমর্থিত বিজেপির রাজনাথ সিংকে মুসলমানদের ভোটই জিতেয়েছে। ভোটের জন্য তাকে মুসলমানদের নির্বাচনী সভায় গিয়ে পাগড়ি মাথায় দিতে হয়েছে, শেরওয়ানি পরতে হয়েছে।
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে উত্তর প্রদেশে বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএর ফলাফল ছিল চমকপ্রদ। ৮০ আসনের মধ্যে তাদের জোট পেয়েছিল ৭৩টি, যার ৭১টিই বিজেপির। এছাড়া পাঁচটি আসন সমাজবাদী পার্টি এবং দুইটি কংগ্রেসের। খবর বিডিনিউজের।
এবার উত্তর প্রদেশে বিজেপিকে ঠেকাতে মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি (বিএসপি) ও অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি (এসপি) জোট করেছে। যাকে বলা হচ্ছে ‘গাটবন্ধন’।
ভারতের নিম্নবর্ণের হিন্দু সমপ্রদায় দলিতদের রাজনৈতিক ‘আইকন’ মায়াবতী। তিনি চারবার ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। নিজ সমপ্রদায়ের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয় এই নেত্রী কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও প্রভাবশালী। একইভাবে কংগ্রেসও এবার আসন বাড়াতে প্রিয়াংকা গান্ধীকে সাধারণ সম্পাদক করে প্রদেশের নির্বাচনী দায়িত্ব দিয়েছেন।
লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞানের ছাত্র অজিত সেনগুপ্ত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘ভারতের নির্বাচনে ভোটের হিসাবটা সহজ নয়। আপনি হোটেলে যান, রাজনৈতিক দলের অফিসে যান কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে যান- সব জায়গায় দেখবেন একটাই কথা উত্তর প্রদেশ কি বলছে? অর্থাৎ এই প্রদেশের ৮০ আসনের ভোটের রেজাল্ট কী বলে। অংকটা এখানে শেষ নয়। কারণ উত্তর প্রদেশে নানা সমপ্রদায় ও অনগ্রসর গোষ্ঠীর বসবাস হওয়ায় জনসংখ্যাভিত্তিক ভোট বহুভাবে বিভক্ত। তাই অন্ধের মতো বলতে পারবেন না কে বা কারা কেমন ভোট পেয়েছেন।
নয়াদিল্লির সিআর পার্কের দুই নম্বর মার্কেটের একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের মালিক প্রসূন চক্রবর্তী বলেন, ‘অতীতের অভিজ্ঞতায় আমি যতটুকু বুঝি- উত্তর প্রদেশে যে দলটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে সেই দলই লোকসভা তথা সরকার গঠন করবে। ধরুন গোটা ভারতে কোনো একটি দল ভালো ফল করেছে কিন্তু উত্তর প্রদেশে ফলাফল খারাপ- এরকম হলেও আমি বলতে পারি সেই দল ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। বলতে পারেন কেন বলছি? আমি এতকিছু বুঝি না- তবে বুঝি ৮০ প্রতিনিধির এই প্রদেশের ভোটে নানা সমীকরণ রয়েছে। এই কারণে দেখা গেছে উত্তর প্রদেশ জেতা মানেই দিল্লি জেতা, আর দিল্লি জেতা মানে ভারত পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া। একই কথা বলেন পূর্ব দিল্লির একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষিক মিতালী মুখার্জি।
তিনি বলেন, ‘অতীতে দেখা গেছে, উত্তর প্রদেশই ক্ষমতা নির্ধারণ করে। বিজেপি বেশি আসন পেয়েছে গতবার, প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। কংগ্রেস বেশি আসন পেয়েছে এর আগের বার, কংগ্রেস থেকে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন ড. মনমোহন সিং। এরও আগে রাজীব গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধী। ভোটের ফলাফল কোন রাজ্যে কেমন তা না খুঁজে আগে দেখুন উত্তর প্রদেশে কে বেশি আসন পাবে। তা হলে পরিষ্কার হয়ে যাবে কে বা কারা ক্ষমতার চাবি পাবেন। কোন দল জিতবে এমন প্রশ্নে মানবাধিকার কর্মী রমেশ রায়ের পর্যবেক্ষণ একটু অন্যরকম।
তিনি বলেন, ‘আমি প্রান্তিক ভোটারদের মধ্যে যে উৎসাহ দেখেছি, তাতে এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে বিজেপি গতবারের মতো সব নিয়ে যেতে পারেনি। উত্তর প্রদেশে তাদের আসন কমে গেছে বলে মনে হচ্ছে। এখন ফলাফল দেখলেই বোঝা যাবে কত কমেছে বিজেপির আসন। গত ১১ এপ্রিল লোকসভা নির্বাচন শুরু হওয়ার পর ১৮, ২৩ ও ২৯ এপ্রিল এবং ৬ ও ১২ মে ভোট হয়েছে। আগামী ১৯ মে সপ্তম পর্বেল ভোট গ্রহণের পর ফলাফল ঘোষণা হবে ২৩ মে।

x