ভারতের নাগরিক সংশোধনী আইন এবং শিবপ্রসাদ-নন্দিতার ‘গোত্র’

শৈবাল চৌধূরী

মঙ্গলবার , ৩ মার্চ, ২০২০ at ৫:৪৪ পূর্বাহ্ণ
84

দিল্লি এখন এক রক্তাক্ত নগরী। প্রাচীন এ শহর জ্বলছে আবার হিংসার আগুনে।
ভারত সরকারের নেয়া নাগরিক সংক্রান্ত নানা রীতিনীতির কারণে পুরো উপমহাদেশ জুড়ে এখন বিশৃঙ্খলা। বিশেষ করে বাংলাদেশ ভারত ও পাকিস্তান জুড়ে একটা অপমানজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এই উপমহাদেশে সাতটি ধর্মের অনুসারীদের হাজার বছরের সহাবস্থান। চারটি ধর্মের উৎপত্তি এ অঞ্চলে। বাকি তিনটি ধর্মও এ অঞ্চলে এসে এ অঞ্চলের জল হাওয়ায় মিলে মিশে গেছে তাও হাজার বছর ধরে। জরথ্রুস্থ বাদী ধর্ম অর্থাৎ পারসিক ধর্ম খোদ পারস্য তথা ইরান থেকে বিলুপ্ত হয়ে আশ্রিত ও রক্ষিত হয়েছে এ উপমহাদেশে। প্রধান দুটি ধর্মানুসারীদের মধ্যে মূলত রাজনৈতিক উস্কানি ও উন্মাদনার কারণে বিভিন্ন সময় সংঘর্ষ-হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বটে, তারপরেও উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি অবস্থান করে চলেছে। অবশ্য অভিপ্রয়াণ (মাইগ্রেশন) এবং অভিবাসন (ইমিগ্রেশন) বিশেষ করে অভিপ্রয়ান যে ঘটছে না তা নয়। এইকাজ শত শত বছর ধরে এতদঅঞ্চলে ঘটে চলেছে। এটা যে কেবল ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর থেকে ঘটছে তা নয়। আর বিশ্বের ইতিহাসে তাকালে আমরা অভিপ্রয়াণের ঘটনা যুগ যুগ ধরে দেখতে পাই। পৃথিবীর প্রত্যেকটি ধর্মেই অভিপ্রয়াণ এবং অভিবাসনের ব্যাপারটি লক্ষ্যণীয়। পুরো পৃথিবীটাইতো মানবজাতির। যে মানুষ যে দেশে গিয়ে স্থিত হয়ে সুখী হয় তার বাসভূমিতো সেটাই। অবশ্য এর জন্যে নিয়মসিদ্ধ আইন কানুনের প্রয়োজন। কিন্তু সে তো মানুষেরই জন্যে। আইন কানুনের জন্যে তো আর মানুষ নয়। আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ার মতো বিশাল বিশাল দেশগুলো গড়ে উঠেছে অভিপ্রয়াণ ও অভিবাসনের মধ্য দিয়ে।
ভারতের বর্তমান সরকার নাগরিকত্ব নিয়ে বর্তমানে যেসব কায়দা কানুনের অবতারণা করেছেন তা ভারতের হাজার বছরের সহমর্মিতা, আতিথেয়তা, সহনশীলতার মানবিক ঐতিহ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। মূলত যে ধর্মের অনুসারীদের কোণঠাসা করার চেষ্টা করা হচ্ছে সে সম্প্রদায়ের অবদান এই উপমহাদেশে কোনো ক্ষেত্রে কম নয়। সংগীত, সাহিত্য, স্থাপত্য, খাদ্য, পরিচ্ছদ, ভাষা, অর্থনীতি, বাণিজ্য, চলচ্চিত্র সবক্ষেত্রেই এই সম্প্রদায়ের রয়েছে গৌরবজনক ভূমিকা। এই ধর্ম ভারতীয় উপমহাদেশে এসে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুণ্ন রেখেও মরমিয়া রূপ ধারণ করেছে। মুষ্টিমেয় কিছু দুস্কৃতকারীর কার্যকলাপের কারণে পুরো সম্প্রদায়কে অভিযুক্ত করার কোনো অবকাশ নেই। এই ধরনের দুষ্কৃতকারী সব সম্প্রদায়ের মধ্যেই বিরাজমান। আশেপাশের প্রতিবেশী দেশগুলোই তার প্রমাণ। তাছাড়া এসবের নেপথ্যে যে রয়েছে আন্তর্জাতিক স্বার্থান্বেষী মহলের উদ্দেশ্যমূলক রাজনৈতিক মদদ এটাতো সকলেরই জানা।
২০১৯ সালে শিবপ্রসাদ নন্দিতা জুটি নির্মাণ করেছেন তাঁদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ছবি ‘গোত্র’। এই জুটির প্রতিটি চলচ্চিত্রই জন সচেতনতামূলক। হৃদয়গ্রাহী কাহিনী কাঠামোর মধ্য দিয়ে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেন আমাদের সমাজ পারিপার্শ্বিকতার নানা অসংগতির চিত্র। এঁদের একেকটি চলচ্চিত্র যেন আমাদের চোখের সামনে একেকটি আয়না।
ভারতের ‘নাগরিক কাণ্ড’ নিয়ে তোড়জোড় চলেছে ২০১৯ সালের প্রায় পুরোটা জুড়ে। শেষ দিকে আইন জারি হয়। শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায় ‘গোত্র’ ছবিটির কাজও করেছেন ২০১৯ সালে। ২০১৯ এর ২৩ আগস্ট ছবিটি মুক্তি পায়। সে সময় নাগিরক কান্ড নিয়ে ভারতে বাকবিতন্ডা শুরু হয়েছে। নানা জায়গায় চলছিল প্রতিবাদ। ঠিক ঐ সময়েই ছবিটি মুক্তি পায়। ‘গোত্র’ ছবির প্রতিপাদ্য বিষয় সাম্প্রদায়িকতার অবসান। অত্যন্ত রক্ষণশীল এক হিন্দু প্রৌঢ়া এবং খুনের দায়ে শাস্তিভোগ করা এক মুসলমান যুবকের সম্পর্ক নিয়ে গোত্র ছবির কাহিনী রেখা আবর্তিত। তারেক আলি নামের যুবকটি খুনের দায়ে শাস্তি ভোগ করার পর নিজেকে সংশোধনের মাধ্যমে নতুন করে জীবন শুরু করতে চায়। থানা থেকে শর্ত দেয়া হয় থানার কাছাকাছি কোথাও থেকে কিছু একটা করতে যাতে করে থানায় নিয়মিত হাজিরা দিতে পারে। কাকতালিয়ভাবে সে নিকটবর্তী এক বিশাল বাড়ির কেয়াটেকারের চাকরি পায়। এই বাড়ির মালিক রক্ষণশীল এক হিন্দু প্রৌড়া মুক্তি দেবী, যার একমাত্র পুত্র অনির্বান মাকে ছেড়ে বিদেশে থাকে। নিজের সুবিধার্থে তারেকের ধর্মীয় ও খুনী পরিচয় গোপন রেখে মায়ের ও বাড়ির দেখাশোনা করার জন্যে তারেককে ‘তারক’ সাজিয়ে নিয়োগ দেয়।
নানা টানা পোড়েন ও অবজ্ঞা অবিশ্বাসের শেষে মুক্তি দেবী ও তারকের মধ্যে একটি সম্পর্ক গড়ে উঠতে থাকে। এদিকে বিশাল বাড়িটির উপর প্রোমোটারের নজর পড়ে। বাড়ি ছাড়তে অনিচ্ছুক মুক্তি দেবীর উপর প্রোমাটারের আক্রোশ বৃদ্ধি পায়। ঠিক এসময়টাতেই তারেক আলীর ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ হয়ে পড়ে মুক্তি দেবীর কাছে। সব মিলে এক তালগোলের সৃষ্টি হয়। তারেককে বাড়ি থেকে বের করে দেন মুক্তি দেবী। অসহায় তারেক আশ্রয় নেয় বাড়ির আঙিনায়। সে প্রোমাটারের সমস্ত ষড়যন্ত্র ও আক্রোশকে সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করে মুক্তি দেবী এবং বাড়িটিকে রক্ষা করে। মুক্তি দেবীও ধীরে ধীরে তারেককে মেনে নেন। দেখা যায় ধর্মীয় পরিচিতির কারণে নয়, প্রকৃত পরিচয় গোপন করার কারণেই মুক্তি দেবী তারেককে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন। মুক্তি দেবী নিজের পুত্রের মতোই তারেক আলীকে বুকে টেনে নেন। তারেকের ‘তারক’ পরিচয় মিথ্যে হয়ে যায়। মুক্তি তারেককে নিজের পরিবারের তাঁর দ্বিতীয় সন্তান হিসেবে গ্রহণ করে ‘মানবত্বের গোত্রে গোত্রান্বিত করে নেন। খুঁজলে এরকম ঘটনা সারা উপমহাদেশ জুড়ে অনেক পাওয়া যাবে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মাটিতে ভিন্নভাবে এরকম অনেক ঘটনা ঘটেছে। ১৯৭১ পরবর্তী নানা দুর্ঘটনার সময়ও এ ধরনের ঘটনা অনেক ঘটেছে এদেশে। সারা উপমহাদেশ জুড়ে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। অর্থাৎ এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়কে আশ্রয়ের হাত, সহযোগিতার হাতও বাড়িয়ে দেয়।
সাম্প্রদায়িকতার বীজ এই উপমহাদেশের মাটিতে এখনো লুকিয়ে রয়েছে। জলবাতাস আলো পেলে বীজগুলো চারা দিয়ে ওঠে। যেমনটি গত বছর দু’য়েক ধরে আবারো হয়ে চলেছে ভারতে। স্বাভাবিকভাবেই তার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবেশী অন্যান্য দেশেও যেখানে দুই সম্প্রদায়ের নিয়ত বসবাস। যে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে এই উপমহাদেশের বিভাজন তার অসারতা প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে। তারপরেও তার রক্তবীজ এখনো সমূলে উৎপাটিত হয়নি।
শিবপ্রসাদ নন্দিতা উট পাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে না থেকে মাথা উঁচু করে প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন চলচ্চিত্রের মতো শক্তিশালী মাধ্যমে। ফলে ‘গোত্র’ হয়ে উঠেছে হিমশীতল করা এক উন্মত্ত সময়ের দর্পণচিত্র। যা কেবল এখনকার এই অবিশ্বাসী সময়ের জন্যেই প্রাসংগিক নয়, প্রাসংগিক প্রতিটি দিনের জন্যে।
‘গোত্র’ চলচ্চিত্রের অভিনয়াংশ অত্যন্ত স্বচ্ছন্দ ও স্বতঃস্ফূর্ত। প্রত্যেকেই দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। তবে মুক্তি দেবী ও তারেক আলীর চরিত্রে অনসূয়া মজুমদার ও নাইজেল আক্কারা প্রাণছোঁয়া অভিনয়ন করেছেন। তেমনি সাবলীল সাহেব মুখোপাধ্যায় (অনির্বান), মানালি দে (ঝুমা), খরাঞ্জ মুখোপাধ্যায় (প্রোমোটার) ও অম্বরীশ ভট্টাচার্য (পুরোহিত)। শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায় কৃত কাহিনী, চিত্রনাট্য ও (চিত্রনাট্য মূলত নন্দিতার লেখা) ও পরিচালনা স্বভাবতই মানসম্পন্ন তাল মিলিয়ে কাজ করেছেন চিত্রগ্রাহক সুপ্রিয় দত্ত, সম্পাদক মলয় লাহা, সংগীত পরিচালক অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়।
নাগরিক সংশোধনী আইন (এনআরসি, সিএএ এবং এনপি আর) জারীর সময় ভারত সরকার আশ্বাস দিয়েছিলেন, এসবের ফলে কোনো সাম্প্রদায়িক বিভক্তি, নির্যাতন কিংবা সহিংসতার সৃষ্টি হবে না। কিন্তু কার্যত তার কোনো বাস্তবধর্মিতা পরিলক্ষিত হলো না। একটি সম্প্রদায়কে নিষ্ঠুরতা ও অবজ্ঞার মুখে ঠেলে দেওয়ার সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অমানবিক চিত্র ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে যা দেশটির ভবিষ্যতকেই হুমকির মুখে কেবল ফেলে দেবে না বিশ্বজুড়েই এর মন্দ প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে। ভারত তার সহনশীলতা ও সহমর্মিতার হাজার বছরের গৌরবময় ঐতিহ্য থেকে মুখ থুবড়ে পড়বে।
গত মাস দুয়েক ধরে মনে হচ্ছিল ব্যাপারটি মিইয়ে এসেছে। কিন্তু মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের ভারত সফরকালীন সময়েই খোদ ভারতীয় রাজধানীতেই কাকতালীয়ভাবে সহিংসতা পুনরায় শুরু হয়েছে। কে জানে সত্যিই এটা কাকতালীয় কিনা।
আমাদের প্রার্থনা শুভ বুদ্ধির জয় হোক, জয় হোক মানবতার, জয় হোক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির। স্থুল বিভাজনের অবসান ঘটুক। একই বৃতে দুটি কুসুম সুন্দরভাবে ফুটে থাক প্রতিদিন।