ভবন ও কলকারখানায় চাই অগ্নিনির্বাপকের ব্যবস্থা

শনিবার , ৩০ মার্চ, ২০১৯ at ৭:৫৯ পূর্বাহ্ণ
58

৩৬ দিনের মাথায় আবারো বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড। রাজধানী ঢাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তার ভয়াবহতা বিশেষ করে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন মার্কেট, অফিস, হাসপাতাল থেকে শুরু করে সব ধরনের ভবনে প্রায়ই ঘটছে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। ফলে নগরবাসীর মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘন ঘন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে রাজধানীবাসী। বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটনা মোকাবেলায় জরুরি ভিত্তিতে আগুন নেভানো বা নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যবস্থাও বেশ দুর্বল। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে সারাদেশের চেয়ে রাজধানী ঢাকাতেই বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটে বা ঘটছে।
পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর আবার আগুনে পুড়ল রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীর বহুতল ভবন এফআর টাওয়ার। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাদের মৃত্যু হয়েছে আগুনে পুড়ে কিংবা ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে। এছাড়া কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে বাঁচার চেষ্টায় লাফিয়ে পড়ে। নিহতদের মধ্যে একজন শ্রীলঙ্কান নাগরিকও রয়েছেন যিনি লাফিয়ে পড়ে বাঁচার চেষ্টা করেছিলেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে আরও ৭০ জন, তাদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশংকা করা হচ্ছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর উদ্ধারকর্মীরাও অভিযানে যোগ দেন। হেলিকপ্টার থেকেও ওই ভবনের ওপর পানি ছিটাতে দেখা যায়।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, আধুনিক নগর জীবনে যেটি সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সেটি হচ্ছে নিরাপদ পরিবেশ। যা অফিস-আদালত থেকে শুরু করে শিল্প-প্রতিষ্ঠান, কল-কারখানা, বাসা-বাড়ি সব জায়গায় দরকার নিরাপদ বাসযোগ্য পরিবেশ। নিরাপদ পরিবেশের কথা চিন্তা করলেই প্রথমেই আসে অগ্নি নিরাপদ ব্যবস্থার কথা। কেননা দেশে বড় বড় কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর এর ভয়াবহতা যে কি নির্মম তা সবাই উপলব্ধি করতে পেরেছে। ২০১৮ সালে সারা দেশে ১৯ হাজার ৬৪২টিরও বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে কমপক্ষে ১৩০ জন নিহত ও ৬৬৪ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশে দমকল বাহিনী বা ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত দমকল বাহিনীর এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। কর্মকর্তারা বলছেন, এসব অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতি হয়েছে গত বছর ৪৩০ কোটি টাকার মতো। বেশিরভাগই ঘটেছে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট, চুলার আগুন, গ্যাস সিলিন্ডার, ছুঁড়ে দেওয়া জ্বলন্ত সিগারেট ইত্যাদি থেকে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা আশঙ্কাজনকহারে বেড়েই চলেছে। ফলে জীবনহানি, অগ্নিদগ্ধ হয়ে বেঁচে থাকা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। গত বছরের সব অগ্নি দুর্ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয়েছে বিদ্যুতের শর্ট সার্কিট থেকে। এরপরই বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে গ্যাসের চুলা থেকে। রাজধানীর চকবাজার এলাকায় আগুন লেগে ৮১ জনের মৃত্যু হয়। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিবছর গড়ে ১৯ হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। গত ১০ বছরে সারাদেশে ১ লাখ ৫০ হাজার ২১৫টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৫৮ জন। আহত হয়েছেন ১২ হাজার ৮২৫ জন। ক্ষতির পরিমাণ সোয়া ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের ৬৫ থেকে ৭০ ভাগ বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারণে ঘটছে। দেশে বিদ্যুৎ ও আগুনের ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির কারণে বড় অগ্নিকাণ্ড সবার দৃষ্টি কাড়লেও প্রকৃতপক্ষে প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও আগুনের ঘটনা ঘটছে। অগ্নিকাণ্ডে বিপুলসংখ্যক মানুষের হতাহতের ঘটনা যেমন ঘটছে, তেমনি ভস্মীভূত হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। অগ্নিকাণ্ড কখন ঘটবে সে বিষয়টি অনুমান করার উপায় নেই। তবে সচেতন হলে দুর্ঘটনা অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব। এ জন্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও তার ইত্যাদি ব্যবহারের সময় পণ্যমান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। বাড়িঘর ও কলকারখানায় অগ্নিনির্বাপকের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোথাও আগুন লাগলে সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসকে জানালেও প্রাণহানি এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব।

x