বড় চ্যালেঞ্জ নালা-খালের ওপর দিয়ে যাওয়া সার্ভিস লাইন

নগরীর জলাবদ্ধতা

হাসান আকবর

সোমবার , ১৫ জুলাই, ২০১৯ at ১০:০৫ পূর্বাহ্ণ

নগরজুড়ে বিস্তৃত বিভিন্ন নালা এবং খালের উপর দিয়ে বিস্তৃত সার্ভিস লাইনই চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ওয়াসা, গ্যাস এবং কোন কোন ক্ষেত্রে বিদ্যুতের সার্ভিস লাইন বেহাল অবস্থা সৃষ্টি করছে। শত শত কোটি টাকা খরচ করে খাল খনন কিংবা ব্রিজ উঁচু করা হলেও জালের মতো বিস্তৃত সার্ভিস লাইনগুলো অপসারণ করা না হলে সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না। আবার লাখ লাখ সার্ভিস লাইন অপসারণ করাও বেশ কঠিন একটি বিষয়। অপরদিকে নগরের পানি দ্রুত খালে নেমে যাওয়ার জন্য সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ক্রাশ প্রোগ্রাম হাতে নেয়া হচ্ছে। এই প্রোগ্রামের আওতায় নগরীর ষোলশহর দুই নম্বর গেটে বায়েজিদ রোডে নতুন কালভার্ট নির্মাণ এবং হালিশহর এলাকায় নতুন করে ড্রেন তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গতকাল কাতালগঞ্জ এলাকায়ও একটি ড্রেন খনন করে পানি প্রবাহ বাড়ানো হয়েছে।
ভারী বর্ষণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা চট্টগ্রাম মহানগরীর অবস্থা নাজুক করে তুলেছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকা রাতে দিনে প্লাবিত হচ্ছে। নগরজুড়ে থৈ থৈ করছে পানি। জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করতে গিয়ে সেনাসদস্যসহ সংশ্লিষ্টদের নিকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে গ্যাস এবং ওয়াসার সার্ভিস লাইন। নগরীর দুই লাখেরও বেশি ভবনে গ্যাস এবং ওয়াসার লাইন নেয়া হয়েছে। সড়কের মূল সরবরাহ লাইন থেকে ওয়াসা এবং গ্যাস পাইপ লাইন ভবনে নেয়ার সময় কোথাও খাল, কোথাও বড় নালা কোথাও বা ছোট নালা পার করে নেয়া হয়েছে। আর যেখানে এই সার্ভিস লাইন অতিক্রম করেছে সেখানেই পানি প্রবাহে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে। এভাবে হাজার হাজার বাধা পাওয়া পয়েন্টই নগরীকে সকাল-সন্ধ্যা ডোবানোর ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে। নালা বা ড্রেনের পানি খালে না যাওয়ার পেছনে এসব লাইনে আটকে থাকা ময়লা আবর্জনা বড় প্রতিবন্ধকতা।
সম্প্রতি নগরীর প্রবর্তক মোড়ে ব্রিজটি উঁচু করার জন্য ভাঙ্গা হয়। সেখানে দেখা যায় যে ব্রিজের নিচে অন্তত পাঁচ ফুট জায়গায় বিস্তৃত রয়েছে কয়েক হাজার জিআই পাইপ। আর এসব পাইপের সাথে জড়িয়ে আছে লক্ষ লক্ষ বোতল এবং পলিথিনসহ বিভিন্ন বর্জ্য। পাইপের সাথে আটকে থাকা বর্জ্যের পাহাড় ডিঙ্গিয়ে পানি প্রবাহ ঠিকঠাক রাখা খবুই কঠিন। শুধু এই একটি ব্রিজই নয়, নগরীর প্রতিটি ব্রিজের তলাতেই কয়েক ফুট বিস্তৃত রয়েছে হাজার হাজার পাইপ। বাসার সামনের ছোট্ট ড্রেনটিও রক্ষা পায়নি এসব পাইপের কবল থেকে। নগরীর প্রতিটি সার্ভিস পাইপকে নালার উপরে তোলা কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা নিরসনে নিয়োজিত প্রকৌশলীদের কাছে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্বে থাকা সেনাবাহিনীর প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল শাহ আলী গতকাল দৈনিক আজাদীর সাথে আলাপকালে সমস্যাটি প্রকট বলে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, লাখ লাখ পাইপ। এই পাইপের সাথে আটকা পড়া বর্জ্যের কারনে খাল এবং নালার কার্যকারিতা হারিয়েছে। এগুলো উদ্ধার করা অনেক কঠিন একটি কাজ উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট অপর একজন প্রকৌশলী বলেছেন, প্রতিটি বাড়ির গ্যাস এবং পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে লাইনগুলো উপর দিয়ে নিয়ে যাওয়া সত্যিই একটি কঠিন কাজ। অথচ এই কঠিন কাজটি সম্ভব না হলে জলাবদ্ধতার কবল থেকে নিস্তার মিলবে না। আপাতত ব্রিজ উচু করলেও পাইপগুলো যথাযথভাবে স্থাপন না করলে দীর্ঘস্থায়ী সুফল পাওয়া যাবে না। উচু করা ব্রিজের তলা দুয়েক বছরের মধ্যে আবারো জঞ্জালে ঢেকে যাবে।
এদিকে জলাবদ্ধতা নিরসনের মেগা প্রকল্পে নেই এমন কিছু কার্যক্রমে হাত দিয়েছে সেনাবাহিনী। জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য ক্রাশ প্রোগ্রাম হিসেবে কাজগুলো করা হচ্ছে। এই কাজের অংশ হিসেবে নগরীর দুই নম্বর গেটে নয়া একটি খালের মতো কাটা হবে। বিদ্যমান আট ফুট চওড়া একটি খালের পাশে অন্তত ১৫ ফুট চওড়া করে রাস্তা কেটে তাতে বঙ কালভার্ট করে দেয়া হবে। ষোলশহর দুই নম্বর গেট কবরস্থানের পাশে রাস্তার উপর দিয়ে খালটি কেটে নিকটস্থ খালের সাথে মিলিয়ে দেয়া হবে। এতে ষোলশহর দুই নম্বর গেট থেকে সন্নিহিত এলাকার পানি অনায়াসে চশমা খালে গিয়ে পড়বে বলেও প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল শাহ আলী জানান। তিনি বলেন, ষোলশহর দুই নম্বর গেটে বায়েজিদ রোডে আমরা একটি বঙ কালভার্ট নির্মাণের কাজ শুরু করবো। জনগনের ভোগান্তি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রেখে এই কালভার্ট নির্মাণ করা হবে । তিনি বলেন, বিদ্যমান বঙ কালভার্টটি এলাকার বিপুল পরিমান পানি সরাতে পারছে না। এখন দুইটি কালভার্টের মাধ্যমে পানি সরানো হবে। নয়া এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সুফল মিলবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অপরদিকে নগরীর হালিশহর এ ব্লক এলাকায় সিটি কর্পোরেশনের নির্মিত একটি রাস্তায় কোন ড্রেন না থাকার কথা উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বলেন, রাস্তাটির দুই পাশে আমরা বড় করে ড্রেনের মতো করে কেটে দেবো। যাতে সহজেই পানি মহেশখালে গিয়ে পড়ে।
এদিকে গতকাল দুপুরে নগরীর কাতালগঞ্জ এলাকার পার্কভিউ হাসপাতালের সন্নিকটে একটি ড্রেন দখলে নিয়ে করা মাইক্রো স্ট্যান্ড উচ্ছেদ করা হয়েছে । সেনাবাহিনীর সদস্যরা ড্রেনটি উদ্ধার করে স্কেভেটর দিয়ে বেশ কিছু অংশ খনন করে চার ফুট চওড়া ড্রেনটিকে হিজরা খালের সাথে মিলিয়ে দিয়েছে। এতে কাতালগঞ্জসহ সন্নিহিত এলাকার পানি প্রবাহে গতিশীলতা আসবে বলেও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

x