ব্রিটিশ রাজপরিবারের জার্মান বংশ পরিচয় (১৭১৪-১৯১৭)

ডা. দিলীপ দে

শনিবার , ৫ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:০১ পূর্বাহ্ণ
278

ক্রিস্টমাস সবে শেষ হলো। ব্রিটিশ রাজ পরিবারের রেওয়াজ হচ্ছে- রাজ প্রাসাদে আসা নানা উপহার সামগ্রীর মোড়ক ক্রিস্টমাস ইভ্‌ তথা ক্রিস্টমাসের আগের দিন সন্ধ্যায় উন্মোচন করা। এই যে রীতি বা অভ্যস্ততা অনুসরণ করে অন্যান্যবারের মতো এবারের ক্রিসমাসেও ইংল্যান্ডেশ্বরী রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ও ব্রিটিশ রাজ পরিবার উপহারের মোড়ক উন্মোচন করে থাকবেন- সেই রেওয়াজের উৎপত্তি জার্মানিতে। ব্রিটেনের রাজ পরিবারে এ’ জার্মান রেওয়াজ চালু করেন মহারাণী ভিক্টোরিয়া’র (জ.১৮১৯- মৃ.১৯০১, শাসনামল.১৮৩৭-১৯০১, ভারতের অধিশ্বরী. ১৮৭৬-১৯০১) জার্মান বংশোদ্ভুত স্বামী প্রিন্স এলবার্ট(জন্ম ১৮১৯ বিবাহ- ১৮৪০,মৃত্যু ১৮৬১)। ব্রিটিশ রাজ পরিবার সব সময়ে প্রাচীন ঐতিহ্য আভিজাত্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল: তাঁরা চিরকাল নিজেদের স্বাতন্ত্র না হারিয়ে দীর্ঘ ধারাবাহিকতায় চলে আসা ইউরোপীয় রাজ পরিবারগুলোর প্রিন্সদের সঙ্গে বহুক্ষেত্রে তাঁদের রাজকন্যাদের বিবাহ দিয়েছেন, মহারাণী ভিক্টোরিয়া তাঁদের একজন। স্বভাবতই স্বামী প্রিন্স এলবার্টের জার্মান রাজ পরিবারের নাম অনুসারে মহারাণী ভিক্টোরিয়ার রাজ পরিবারের পরবর্তী বংশের নাম ও পরিচয় স্থির হয়-সাক্সে-কোবার্গ এন্ড গোথা, তাদের সন্তান-পরবর্তী রাজা ৭ম এডোয়ার্ড (জ.১৮৪১-মৃ.১৯১০,শাসনকাল-১৯০১-১৯১০)ছিলেন এই বংশের। অপরদিকে মহারাণী ভিক্টোরিয়ার নিজের বংশ পরিচয় ছিল জার্মানির হ্যানোভার বংশ, তিনি যুক্তরাজ্যে তথা ইংল্যান্ড স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডে সেই বংশের শেষ শাসক। তাঁর আগের কয়েক পুরুষ ছিলেন ধারাবাহিকভাবে জার্মানির একই হ্যানোভার বংশীয়। এদের প্রথম জন ছিলেন হ্যানোভার বংশীয় যুবরাজ এবং উত্তরাধিকার সূত্রে ১৭১৪ সালে ইংল্যান্ডের রাজায় পরিণত হওয়া- প্রথম জর্জ। ভিক্টেরিয়া’র পিতা প্রিন্স এডোয়ার্ড ছিলেন উপরোক্ত রাজা প্রথম জর্জের পৌত্র তৃতীয় জর্জের চতুর্থ সন্তান। ১৮৩৯ সালে ভিক্টোরিয়ার পিতার আগের তিন ভাই বংশধর না রেখে মারা গেলে এবং ইতোপূর্বে ১৮২০ সালে পিতা প্রিন্স এডোয়ার্ড, ‘ডিউক অফ কেন্ট’ এর মৃত্যু হলে কুমারী ভিক্টোরিয়া সিংহাসনে আরোহণ করেন। তবে উত্তরাধিকারী যে একেবারে ছিলনা তাও নয় যেমন তার পূর্বসূরী গ্রেট ব্রিটেন ও আয়ারল্যন্ড এবং হেনোভারের রাজা- পিতৃব্য ৪র্থ উইলিয়ামের (জ.১৭৬৫-মৃ১৮৩৭, শাসনকাল-১৮৩০-১৮৩৭) দশ সন্তানের মধ্যে মাত্র দুজন ছিল বৈধ (জার্মান স্ত্রী ইউ.কে. এবং হেনোভারের রাণী এডিলেইড অফ সাঙে মেইনিংজেন এর গর্ভজাত) এবং শৈশবেই মৃত, বাকি ৮ অবৈধ সন্তানের মাতা ছিলেন অভিনেত্রী ডরোথিয়া জর্ডান, এ সন্তানরা বেঁচেও ছিলেন তবে অবৈধ হওয়ার কারণে সিংহাসনে বসার যোগ্য বিবেচিত হননি। ভিক্টোরিয়া ১৮৪০ সালে বিয়ে করেন জার্মানী বংশোদ্ভুত প্রিন্স এলবার্ট অফ সাঙে-কোবার্গ এন্ড গোথা’কে। অপর দিকে ভিক্টেরিয়ার মা-ও ছিলেন জার্মান, প্রিন্সেস ভিক্টোরিয়া অফ সাক্সে-কোবার্গ সালফেল্ড, আর মায়ের নামে তাঁর নাম রাখা হয় ভিক্টোরিয়া। মায়ের দিক থেকে স্বামী এলবার্ট ছিলেন তাঁর আপন মামতো ভাই। অন্যদিকে এলবার্টের মা ছিলেন জার্মানির প্রিন্সেস লুসি(১৮০০-১৮৩১) অফ সাক্সে-গোথা- এটেনবার্গ, অর্থাৎ পিতৃ বংশের দিক থেকে বতর্মান ব্রিটিশ রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ প্রিন্সেস লুসির ষষ্ঠ অধঃস্তন বংশধর। প্রসঙ্গতঃ, ভিক্টোরিয়র পিতৃব্য রাজা চতুর্থ উইলিয়াম পর্যন্ত তাদের হেনোভারীয় বংশ যুগপৎ হেনোভার ও ইংল্যান্ড শাসন করলেও একই বংশের শেষ শাসক ভিক্টোরিয়া কেবল ইংল্যান্ড শাসন করেন। ভিক্টোরিয়ার স্বামী এলবার্টের মৃত্যু হয় মাত্র ৪২ বছর বয়সে। তাঁর মৃত্যুতে ভিক্টোরিয়া গভীরভাবে শোকগ্রস্ত হন,দীর্ঘকাল লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান এবং সেই থেকে আজীবন কালো কাপড় পরেন। এলবার্ট মূলতঃ দীর্ঘসূত্রী একটা পেট ব্যথায় মারা যান মর্মে জানা যায়। ডাক্তার শেষ দিকে বলেন তাঁর রোগটি টাইফয়েড। এর বছর খানেক আগে জার্মানিতে তিনি ঘোড়ার গাড়ি থেকে পড়ে আঘাত পান যাতে একটি ঘোড়াও মারা যায়। তবে পরবর্তী যুগের চিকিৎসকদের কেউ কেউ বলেছেন তিনি সম্ভবতঃ পেটের পীড়াজনিত ক্রোন্স্‌ ডিজিস, অথবা ক্যান্সার কিম্বা কিডনী রোগে মারা গিয়েছিলেন। এলবার্ট ছিলেন দাস প্রথা বিরোধী এবং ব্রিটিশদের বৈদেশিক নীতিতে অন্যরাজ্যে হস্তক্ষেপের বা মাথা ঘামানোর চলমান বিষয়টি তিনি পছন্দ করতেন না। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তৃতির ওই যুগে তার এই উদার নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী সবার পছন্দ হওয়ার কথা নয়। তবে তাঁকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হয়েছিল এমন কোন ইতিহাস নেই বা তেমন কিছু উদঘাটিতও হয়নি। তাঁর পত্নী সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার ধারণা ছিল, অতিশয় কাজের চাপে এবং পুত্র এডোয়ার্ডের একটি নারী ঘটিত সমস্যার মানসিক চাপে আঘাত পেয়ে তিনি মৃত্যু বরণ করেছিলেন। ১৮৬১ সালের গ্রীষ্মে যখন ১৯ বছর বয়স্ক ‘প্রিন্স অফ ওয়েলস’ এলবার্ট এডোয়ার্ড (পরবর্তীতে তিনিই রাজা ৭ম এডোয়ার্ড নামে খ্যাত) আয়ারল্যান্ডের কারাহ্‌ ক্যাম্পে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর গ্রেন্ডিয়ার গার্ড (১৬৫৬ খ্রি- চলমান)নামক রাজ পরিবার সংশ্লিষ্ট এক পদাতিক বাহিনীর সাথে দশ সপ্তাহের জন্য প্রশিক্ষণ রত ছিলেন তখন পেশায় অভিনেত্রী নেলী ক্লিফডেন নামক নারীর সঙ্গে তাঁর সংসর্গ হয়।এই গ্রেন্ডিয়ার গার্ডরাই নেলী ক্লিফডেনকে ইংল্যন্ড থেকে আয়ারল্যান্ডে আনিয়ে নেন। ইংল্যান্ডে উভয়ের একবার দেখা সাক্ষাৎ হয়েছিল। ১৯ বছর বয়স্ক ডিউকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের কাগজপত্রে দেখা যায় ১৮৬১ সালের এর সেপ্টেম্বরের ৬ ৯ ও ১১ তারিখ এন সি আদ্যাক্ষরের এক নারী প্রিন্স এডোয়ার্ডেও সঙ্গে দেখা করেছিলেন। জনশ্রুতি এমন যে তারা এ তিন রাত এক সঙ্গে কাটান। এ খবর লন্ডনে প্রাসাদে পৌঁছায়। পুত্রের এবম্বিধ সংবাদে শংকিত এলবার্ট ভিক্টোরিয়াকে নিয়ে ক্যাম্ব্রিজে এডোয়ার্ডের সঙ্গে দেখা করতে যান এবং বৃষ্টিতে ছেলের সঙ্গে একান্তে হাঁটেন, এ বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে বাক্যালাপ হয়, এর দু সপ্তাহ পরেই এলবার্টের মৃত্যু হয়। ভিক্টোরিয়া ভেঙে পড়েন এবং ছেলে এডোয়ার্ডকে এ মৃত্যুর জন্য দায়ী করেন এবং তাঁর বড় মেয়েকে লিখেন, I never can, or shall, look at him without a shudder , অর্থাৎ- ‘আতংকগ্রস্ত না হয়ে আমি তার দিকে আর কখনো তাকাতে পারবো না।’ অবশ্য ৭ম এডোয়ার্ড পরে ডেনমার্কের রাজকন্যা আলেকজান্দ্রাকে বিয়ে করেন এবং ব্রিটেনে তার প্রায় দশ বছরের রাজত্বই সাক্সে-কোবার্গ এবং গোথা বংশের একমাত্র শাসনকাল, কারণ এর পরে তাঁর পুত্র ৫ম জর্জের আমলেই এটি হাউস অফ উইন্ডসর এ রূপ নেয়। প্রসঙ্গতঃ, মহারাণী ভিক্টোরিয়ার উপরোক্ত চিঠিতে উল্লেখিত সর্ব জ্যেষ্ঠ কন্যার নামও ভিক্টোরিয়া (ভিক্টোরিয়া এডিলেট মেরী লুসিয়া) যাঁর বিয়ে হয়েছিল জার্মান সম্রাট ও প্রুসিয়ার রাজা তৃতীয় ফ্রেডরিক(১৮৩১-১৮৮৮, শাসনকাল ৯৯ দিন)এর সঙ্গে এবং যার ছেলে দ্বিতীয় উইলহাম তথা ফ্রেডারিক উইলহাম ভিক্টর এলবার্ট (জ.১৮৫৯-মৃ.১৯৪১, শাসনকাল ১৮৮৮-১৯১৮) ছিলেন শেষ জার্মান সম্রাট বা কাইজার। ১৭১৪ সালে নিঃসন্তান অবস্থায় ইংল্যান্ডের রাণী এ্যান এর মৃত্যু ঘটে। আর এর সাথে সাথে স্টুয়ার্ট রাজবংশেরও অবসান ঘটে। তাঁর অন্ততঃ পঞ্চাশ জন নিকটাত্মীয় উত্তরাধিকারী হবার যোগ্য ছিলেন, তবে ধর্মাচরণে তাঁরা ছিলেন ক্যাথলিক। স্বভাবতই তাঁদের কেউ ব্রিটিশ সিংহাসনে বসতে পারলেন না। কারণ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পূর্বাহ্নে আইন পাশ হয়েছিল যে ব্রিটিশ সিংহাসনের বসার পূর্বশর্ত হলো একজন উত্তরাধিকারীকে অবশ্যই প্রোটেস্টান্ট হতে হবে। কাজেই এঁরা বাদ পড়লেন। এমতাবস্থায় জার্মানির হেনোভারের প্রোটেস্টান্ট রাজপুত্র প্রথম জর্জ লুড্‌উইগ্‌ (১৬৬০-১৭২৭) ব্রিটিশ রাজ সিংহাসনের অধীশ্বর হিসেবে অধিষ্ঠিত হলেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাণী এ্যান এর কালের ব্রিটিশ ‘স্টুয়ার্ট রাজপরিবার’ এর নাম বদলে যায়, এবং পরিণতি পায় প্রথম জর্জ লুডউইগের হেনোভারস্থ রাজপরিবারের নামে তথা জার্মানীর ‘ব্রান্সইউক লুনেভার্গ হেনোভার’ হিসেবে, আর এতে করে ‘ওয়েল্‌ফ’ এবং ‘এস্টে’-র সমৃদ্ধ জার্মান প্রাচীন রাজ বংশগুলোর সাথে ব্রিটিশ রাজ পরিবারের আত্মীয়তার সংযুক্তি দৃঢ়তর হয়ে উঠে। রাজা প্রথম জর্জ ছিলেন রাণী এ্যানের সেকেন্ড কাজিন অর্থাৎ তাদের পিতা ও মাতা ছিলেন আপন মামাতো-পিসতুতো/ফুফাতো ভাইবোন। এ্যান এর মৃত্যুর পর ১৭১৪ থেকে আমৃত্যু ১৭২৭ পর্যন্ত প্রথম জর্জ ব্রিটেনের রাজা ছিলেন। এ্যানের সৎ ভ্রাতা জেমস ফ্রান্সিস এডোয়ার্ড স্টুয়ার্ট ছিলেন ক্যাথলিক, তিনি চেষ্টা করেন প্রথম জর্জকে সিংহাসন চ্যুত করতে যদিও তাঁর সে প্রচেষ্টা বিফল হয়। পরবর্তীতে তাঁর জন্মস্থান হেনোভার-এ এক অবকাশ যাপনকালে স্ট্রোকে রাজা প্রথম জর্জের মৃত্যু হলে সেখানেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। তিনি ছিলেন শেষ ব্রিটিশ রাজা যার সমাধি হয় ব্রিটেনের বাইরে। প্রথম জর্জের মৃত্যুর পরে তার সন্তান দ্বিতীয় জর্জ ব্রিটেনের সিংহাসনে বসেন তাঁর মার সোফিয়া ডরথিয়া সেলে(১৬৬৬-১৭২৬)-ও জার্মান। সেলে নাম হচ্ছে জার্মানীর নিম্নবর্তী অঞ্চল সেক্সনীর অন্তর্ভূক্ত,তাঁর মার জন্ম সেখানে। সোফিয়া’র পরিবারে অন্ততঃ সাত পুরুষের জার্মান রাজকীয় ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বর্তমান। তার দিদিমা তথা নানীর বাড়ি ফ্রান্সে। কাজেই রাজা দ্বিতীয় জর্জের শরীরেও সরাসরি কোন ব্রিটিশ রক্তের প্রাচীন ধারাবাহিকতা ছিলনা বরং তা ছিল অধিকতর জার্মান। তাঁর মা ও তাঁর পিতা প্রথম জর্জ পরস্পর নিকটাত্মীয় ছিলেন, তবে প্রথম জর্জ ও সোফিয়া ডরথিয়া সেলে’র সে বিয়ে সুখের হয়নি। বরং জার্মানীতে উভয়ে বিবাহ বহির্ভুত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। এবং সোফিয়া জীবনের শেষ ত্রিশ বছর সেলে’র এক কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। সোফিয়া আপন সন্তানদের সঙ্গে ও তাঁর পিতার সঙ্গে সাক্ষাতে বারিত হন এবং পুনর্বিবাহেও বারিত হন। আমরা যদিও কথায় কথায় ব্রিটিশ রাজ সিংহাসন থেকে খানিকটা দূরে চলে এসেছি এবং সেখানেই ফিরে যাই, তবে এতকথা বলারও একটা মাহাত্ম্য আছে। ১৭১৪ সালে প্রথম জর্জ রাজা হলে তাঁর স্ত্রী হিসেবে সোফিয়া ইংল্যান্ডের রাণী হওয়াটা দস্তুর ছিল।অথচ তা হলোনা। একটা ঝড়ো অসুখী বিবাহ সম্পর্ক সব তছনছ করে দিল। প্রথম জর্জ সময় কাটালেন তার রক্ষিতাকে নিয়ে, আর সোফিয়া ডরোথি সেলে তাঁর প্রেমিক ফিলিপ ক্রিস্টোফ ভন কোনিগ্‌সমার্ক এর সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে, এই অবস্থা কাটিয়ে উঠার মানসিক সামর্থ্য বা সদিচ্ছা উভয়ের কারো ছিলনা। এবং তাঁর স্বামী রাজা প্রথম জর্জের মৃত্যুর চার সপ্তাহ আগে তাঁর মৃত্যু (১৭২৬) হলেও তাঁর ভাগ্যে রাণীর পদ যে মেলেনি শুধু তা নয়,বরং মৃত্যুর পর রাজকীয় কোন অন্ত্যেষ্টি বা রাজকীয় শোকও পালিত হয়নি। কেবল রাজার পক্ষ থেকে সাধারণ নাগরিক হিসেবে তাঁর মৃত্যুর যৎসামান্য একটা ঘোষণা ছিল। সোফিয়ার প্রেমিকের নিখোঁজ হওয়া ও তাকে সম্ভাব্য হত্যার ঘটনায় রাজা প্রথম জর্জ কোন দায় না নিলেও প্রায় সবাই তাঁর দিকেই অঙুলি নির্দেশ করে। অবশ্য এর মাত্র চার সপ্তাহ পরে তার প্রথম জর্জের মৃত্যু হলে উভয়ের পুত্র দ্বিতীয় জর্জ ব্রিটিশ রাজ সিংহাসনে আরোহন করেন।
১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে আধুনিক ব্রিটিশ রাজপরিবারের ২০৩ বছরের ধারাবাহিক জার্মান বংশ পরিচয়ের(১৭১৪-১৯১৭) অবসান ঘোষিত হয়।এ যুদ্ধে ব্রিটিশরাজ ও ভারত সম্রাট ৫ম জর্জ (১৮৬৫-১৯৩৬, শাসনকাল ১৯১০- ১৯৩৬) এবং জার্মান সম্রাট/কাইজার উইলহেম ছিলেন সরাসরি পরস্পর বিরোধী পক্ষ, অন্যদিকে আত্মীয়তা সূত্রে তাঁরা একে অপরের আপন মামাতো পিসতুতো/ফুফাতো ভাই। চার বছর চার মাস স্থায়ী এ যুদ্ধে ক্ষুব্ধ ব্রিটিশ অনুভূতি ছিল জার্মানদের চরম বিপক্ষে। গোথা জি ৪ নামে একটি জার্মান সামরিক যুদ্ধ বিমান ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করে ব্রিটেনে বোমা ফেলতে শুরু করলে এই নামের বিষয়টির প্রতি ব্রিটিশ ঘরের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠে। অন্য দিকে ৫ম জর্জের আপন মামাতো ভাই রাশিয়ার জার /সম্রাট দ্বিতীয় নিকলাস ১৫ মার্চ ১৯১৭ তারিখে সিংহাসন থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন। সারা ইউরোপে রাজতন্ত্রের অবসানের পক্ষে রব উঠে। রাজা ৫ম জর্জের শাসনকাল ১৯১০ সালে শুরু হলেও, এই পটভূমিতে ১৭ জুলাই ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ রাজ পরিবারের জার্মান নাম পরিচয়
সাক্সে-কোবার্গ এন্ড গোথা একটি রাজকীয় ঘোষণার মধ্যে দিয়ে পাল্টে একটি ভিন্ন নাম তথা হাউস অফ উইন্ডসর রাখা হয় (House of Windsor- a proclamation’ )। এটা অস্বাভাবিক না হলেও গতানুগতিক হয়তো নয় কারণ রক্তের ধারায় ইতিপূর্বের নিরবচ্ছিন্ন ভাবে প্রবাহিত জার্মান বংশীয় রক্ত রয়েই গেছে। আর তাই হাউস অফ উইন্ডসর যতোই আইন সিদ্ধ হোক মূল পরিচয়টি কেউই ভুলেনি। ইতিহাসও সে কথা ভুলেনি। ব্রিটিশ রাজ পরিবারও না। তবে হয়তো, কখনো কখনো, বর্তমান প্রয়োজন- ইতিহাসের চাইতে বড় হয়ে দাঁড়ায়।কাজেই এটার- কি ও কেন- একটা গবেষণা বিষয়ও বটে। তবে, ক্রিসমাস ইভে উপহার সামগ্রীর মোড়ক খোলার জার্মান রেওয়াজটি সম্প্রীতি’র বিনি সুতোর মালা’র মতো এখনো রয়ে গেছে। সবাইকে পবিত্র বড়দিনের এবং ইংরেজি নববর্ষের প্রীতিময় শুভেচ্ছা।
লেখক : শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট, মানবাধিকার আন্দোলনের সংগঠক।

x