ব্রতচারী ডা.শাহ আলম এবং…

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ২৯ অক্টোবর, ২০১৯ at ১০:১৬ পূর্বাহ্ণ
27

প্রিয় দেশ বেশ অসুস্থ! সেবা ও চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা চলছে। বিলম্বে হলেও সরকার প্রধানের উদ্যোগটি প্রশংসা পেতেই পারে, যদি বড় বড় কেউকেটাদের সাইজে আনা সম্ভব হয়। ইতোমধ্যে সরকারি দলের তৃণমূল পর্যায়েও শুদ্ধিকরন কর্মসূচির জোর হাওয়া বইছে। সমস্যা হচ্ছে, খোদ প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে এমন কিছু ক্ষমতাধর ভিআইপি ”মেদ ও ঝুড়িবহুল বৃক্ষ’ আছেন, লোভ- ভোগ ভাইরাস তাঁদের পুরোটাই হজম করে ফেলেছে। ব্যাঙ্ক, শেয়ার মার্কেটসহ বড় বড় আর্থিক অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির সাথে সরাসরি বা পরোক্ষ যোগ এঁদের আছে বলে অভিযোগ প্রচুর। তবুও কেউ কেউ সরকারি ও দলীয় শুদ্ধির পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর বকলমে টানা বয়ানও ঝাড়ছেন। অবশ্য বড় পদের অলঙ্কার হিসাবে তাঁদের এসব ওয়াজ শুনাতেই হয়। বিশ্বাস, চলমান গোছগাছে একটু শৃঙ্খলা ফিরলে এরাও মাড়াইকলে পড়বেন।
এরমাঝে ফেনীর সোনাগাজি মাদ্রাসা ছাত্রী চাঞ্চল্যকর নুসরাত জাহান রাফি হত্যার বিচারকাজ ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইবুনালে দ্রুততার সাথে শেষ হয়েছে। স্মরণকালের ভয়ঙ্কর পুড়িয়ে হত্যা মামলায় ১৬ আসামীর ফাঁসির রায় দিয়েছেন আদালত। দ্রুততম সময়ে মামলাটির বিচার সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। ভোলার ফেসবুক মেসেঞ্জারে পবিত্র ধর্ম নিয়ে জঘন্য কুৎসা ভাইরাল হওয়ার পর দায়ীদের আটক করা হলেও ভোলাসহ দেশব্যাপী সামপ্রদায়িক উম্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে। ভোলার বোরহানুদ্দিনে পুলিশের সাথে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে সংঘর্ষের ঘটনায় ৪ জন নিহত ও পুলিশসহ শতাধিক আহত হন। যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও মর্মান্তিক। পরপরই সামপ্রদায়িক সহিংসতার কাল মেঘ ছড়িয়ে পড়ে দেশের আকাশে। হেফাজতে ইসলামও দীর্ঘ নীরবতার পর রাজপথে নামে। সরকার দক্ষতা ও কঠোর হাতে পরিস্থিতি সামাল দিলেও ভয় এখনো কাটেনি। কারণ, ফেসবুক অপ ব্যবহারের খেসারত বারবার জাতিকে দিতে হচ্ছে।
এত ঘটনা- দুর্ঘটনার মাঝে চট্টগ্রামের কুমিরা বাইপাশে একজন মহান মানবতাবাদী চিকিৎসক হত্যাকান্ডের ঘটনাটি মিডিয়ায় খুব একটা আলোড়ন তুলতে পারেনি। শিশু বিশেষজ্ঞ ডা,শাহ আলম সৌদি আরবে লোভনীয় অঙ্কের বেতনে চিকিৎসক হিসাবে কাজ করতেন। সীতাকুণ্ডের কুমিরা গ্রামের এই চিকিৎসক টাকা ও খ্যাতিকে পদচাপা দিয়ে ফিরে আসেন নিজের গ্রামে। আত্মীয় স্বজনের কাছে তাঁর সিদ্ধান্ত হঠকারি মনে হলেও ডা. শাহ আলম ব্রতে অটল ছিলেন। টানা ৩০ বছর সৌদি আরবে শিশু বিশেষজ্ঞের কাজের আকর্ষণ ও অর্থ তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি। গ্রামের মানুষ ও শিশুদের জন্য তাঁর মন কাঁদত। তাঁর স্বপ্ন, গ্রামে অসুস্থ শিশুদের সেবা দেবেন বাকি জীবন। গড়ে তুলবেন শিশু হাসপাতাল ও পরিচর্যা কেন্দ্র। প্রয়োজনীয় অর্থ জমা হতেই তিনি ৫৮ বছর বয়সে নাড়ির টানে ছুটে আসেন নিজের গ্রামে। সীতাকুণ্ডের ছোট কুমিরায় গড়ে তোলেন, ‘বেবি কেয়ার প্রাইভেট লিঃ’ নামে একটি হাসপাতাল। হাসপাতাল থেকে মাত্র কয়েক শ’ গজ দূরে তাঁর গ্রামের বাড়ি। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি ক্লিনিকটি চালু হয়। আশপাশের গ্রামের শিশুদের নামমাত্র বা বিনামূল্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা সেবা দিতেন তিনি। বাসা নগরীর চান্দগাঁও আবাসিকে। প্রতিদিন ভোরে লোকাল বাস বা টেম্পোয় চেপে ক্লিনিকে আসতেন। সারাদিন শত শত শিশুকে টানা চিকিৎসা দিতেন। উন্নত চিকিৎসা সেবা দিয়ে গ্রামের অস্বচ্ছল শিশুদের সুস্থ করাই ছিল, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসাবে ডা. শাহ আলমের ব্রত বা মিশন। টানা ১০ মাস অনেক কষ্ট সহ্য করে বাস,টেম্পোয় চেপে নগর থেকে আসা-যাওয়া করে ব্রতকে বাস্তবতার জমিনে নিয়ে আসেন। লোভ ভোগের ভাইরাস তাঁর ব্রতকে লুটে নেয়ার কোন সুযোগ পায়নি। চাইলেই তিনি কোটি কোটি টাকা, দামি গাড়ি, নগরীতে প্রাইভেট ক্লিনিক, ঢাকা চট্টগ্রামে একাধিক অভিজাত বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারতেন। বাতানুকূল চেম্বারে রোগীপিছু ৮০০/১০০০ টাকা ফি নিতে পারতেন। সবকিছুই হাতের মুঠোয় ছিল তাঁর। কিন্তু পেশাগত মিশন তাঁকে লোভ, বিলাস, ব্যসন থেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখে। এটাই কী তাঁর অপরাধ! কেন একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ হয়েও তাঁর কোন ব্যাক্তিগত গাড়ি নেই! কেন তিনি সৌদি আরবের লোভনীয় আয় দিয়ে গরীব দুস্থ শিশুদের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা দিতে গ্রামে হাসপাতাল গড়লেন? তাঁর গাড়ি থাকলে, ব্যক্তিগত সহকারি বা গানার থাকলে তাঁকে রাতে লেগুনায় চেপে বাসায় ফিরতে হয়না! ছিনতাইকারীরা তাঁর ব্যগ নিয়ে টানাটানি করার কথা ভাবতেই পারতোনা! ছুরি মেরে খুণ করে নির্জন স্থানে তার পবিত্র লাশ ফেলে রাখার সুযোগ কী তারা পেত? কখনোইনা। তিনি রাতে এসি রুমে চেম্বার সেরে মোটা টাকা পকেটে ভরে নগরীর অভিজাত ক্লাবে বিনোদিত হতে পারতেন। তিনি সৌদি আরব থেকে উড়ে এসে গ্রামে খুললেন কিনা হাসপাতাল! ঢাকায় না, চট্টগ্রামে না! ধনীর সন্তান রোগী বা মোটা টাকা তাঁর টার্গেট নয়, টার্গেট গরীব শিশুদের স্বল্প বা বিনা খরচে সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেয়া। দিয়েছেনও হাজার হাজার শিশুকে। কোন অখ্যাত কোম্পানির মেডিক্যাল প্রতিনিধিকে তাঁর হাসপাতালের সীমানা মাড়াতে দেন নি। প্রতিদিনই হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ছিল। হাসি মুখে অক্লান্ত মানুষটি তাদের সেবা দিয়েছেন। তো এখন কী হবে? শিশুদের ভরসার সুর্যটিতো চিরতরে নিভিয়ে দিল হিংস্র ছিনতাইকারীর ছোরা!
হায় দেশে ডাক্তারদের শক্তিশালী সংগঠন বিএমএ আছে। আছে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞদের সংগঠন (বিপিএ)। কিন্তু গ্রামের দুস্থ শিশু স্বাস্থ্যসেবায় নিবেদিত ডা.শাহ আলম খুনের কোন আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদসূচি চোখে পড়েনি। খুনীদের বিরুদ্ধে রাস্তায় মিছিল নামেনি। বড় কোন ঘাঁই উঠেনি দেশজুড়ে! অথচ ভুল চিকিৎসায় কোন শিশু বা রোগী মৃত্যুর প্রতিবাদ বা মামলা হলে চিকিৎসক সংগঠনগুলো একযোগে কাজ বন্ধ করে দেয়, বন্ধ করে দেয় সব চিকিৎসা সেবা, সরকারি হাসপাতাল! ডা. শাহ আলম নগরীর বিলাসবহুল জীবন ও অভিজাত ক্লিনিক, চেম্বার ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’ নন বলেই কী তাঁর নিষ্ঠুর খুন এমন অবহেলায় ডুবে গেল? কী বলবেন চিকিৎসক বন্ধুরা! হ্যাঁ তাঁর খুনীরা ধরা পড়েছে। মূল অপরাধী ক্রসফায়ারেও গেছে জঅই এর দ্রুত তৎপরতায়। এরাতো সব ছিঁচেল! কিন্তু ডা. শাহ আলমদের মত মানবতার ব্রত বা মিশনে নিবেদিতদের নিরব সেবা তাঁর নির্মম খুনের সাথে সাথে ভয়ঙ্কর হুমকির মুখে পড়ে গেল, জাতির এই ক্ষতি মেরামত করার দায় কার? ডা. শাহ আলম আর ফিরবেন না! কিন্তু তাঁর হাসপাতাল ঘিরে কুমিরা এলাকার অসহায় হাজার হাজার শিশুর মুখের হাসি যে চিরতরে নিভে গেল, কেইবা আবার তা ফুটিয়ে তুলবে?

x