ব্যক্তি যখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমষ্টি ব্যক্তিত্বরহিত

গৌরবের জায়গা থেকে একটু একটু করে কেউ কেউ সরে যাচ্ছে?

ঋত্বিক নয়ন ও জাহেদুল কবির

বৃহস্পতিবার , ১৮ জানুয়ারি, ২০১৮ at ৫:৪৬ পূর্বাহ্ণ
226

গত মঙ্গলবার নগরীতে প্রকাশ্যে এক কলেজিয়েট স্কুলের এক ছাত্র খুন হবার পর নগড়জুড়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনার পর চলছে নানামুখী আলোচনা ও বিশ্লেষণ। অভিভাবক মহল শংকিত, নগরবাসী আতংকিত। কারণ ঠুনকো ঘটনায় এভাবে প্রকাশ্যে খুন কেউ মেনে নিতে পারছেন না। স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এর আগে ছোট খাটো কিছু ঘটনা ঘটলেও এভাবে প্রকাশ্যে এরকম খুনের ঘটনা খুব বেশি নেই। এর আগেও কলেজিয়েটের এক ছাত্র খুন হয়েছিল ২০১০ সালে। প্রশ্ন আসছে স্কুলগামী ছেলে মেয়েদের মধ্যে মানবিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ, মায়ামমতা কেন লোপ পাচ্ছে, কেন হিংস্র হয়ে উঠছে এক শ্রেণির শিক্ষার্থী। এই বিষয়গুলো আরো বেশি করে ভাবিয়ে তুলছে সবাইকে এই কারণে যে, সাম্প্রতিককালে এ ধরনের বড় দুটি ঘটনা ঘটলো কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিয়ে। অদেখা কোন বিরোধ এমন রক্তাক্ত ঘটনার জন্ম দেয় এটা বিশ্বাস করতে চাইছেন না শিক্ষক অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট কোন মহল। কারো কারো ধারণা কলেজিয়েট স্কুল তার পূর্বের আকাশ ছোঁয়া গৌরব ও ঐতিহ্য থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। একসময় সোনার টুকরো ছেলে গড়ার এই প্রতিষ্ঠান এখন এই ধরনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নকারী ঘটনার সম্মূখীন হচ্ছে। নগরীর আরো কিছু নামি দামী সরকারি বেসরকারি স্কুলেও শিক্ষার্থীদের কারো কারো অধঃপতনের কথা শোনা যায়। এসব অভিযোগ অভিভাবক মহলের। ঐতিহ্যবাহী এই স্কুলটি জাতিকে উপহার দিয়েছে ড. ইউনূস, জামাল নজরুল ইসলামসহ অনেক সোনার টুকরো সন্তান। কলেজিয়েট মানেই যেখানে আভিজাত্য ও উজ্জ্বল ভাবমূর্তির উপমা সেখানে এখন জানি কেমন হয়ে যাচ্ছে এ স্কুলের গৌরব। অভিভাকদের অভিযোগ সাম্প্রতিককালে স্কুল কর্র্তৃপক্ষ কোথায় যেন মনোযোগ হারিয়েছে। নাম প্রকাশ না করা একজন অভিভাবক বলেন এখন শিক্ষকরা কোথায় যেন একটা ফাঁক রাখছেন। সেটা হয়ত কোচিংয়ের জন্য। ক্লাসে পড়ানোর চেয়ে ব্যাচ পড়াতেই আগ্রহী। ক্লাস না হওয়ার ফাঁক থাকাতে শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ ক্যাম্পাস ছেড়ে অন্যত্র যাচ্ছে। সেই সাথে লেগেছে স্কুল পর্যায়ে রাজনীতির ঢেউ। তার মতে যারা ভাল করে তারা মূলত ভালো শিক্ষার্থী। বাকিটা পরিবারের কোচিং দৌড় ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল। ছেলেদেরকে ক্লাসমুখী রাখা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতায় জাগ্রত করার দায়িত্ব স্কুলেরও কোন অংশেই কম নয়।

তবে কলেজিয়েট স্কুলে শিক্ষকরা বলছেন, এইসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। স্কুল কলেজ মিলে বর্তমানে প্রায় আড়াই হাজার ছাত্র আছে। ছাত্ররা স্কুলকলেজে সর্বোচ্চ ৪৫ ঘণ্টা সময় কাটায়। বাকি সময়টাতে তাদের পরিবারকেই দেখভাল করতে হবে। তবে আদনানের মতো এই রকম একজন মেধাবী মুখ অকালে ঝরে পড়া কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। সে নবম শ্রেণীতে ক্লাশ শুরু হওয়ার পর থেকে সে মাত্র একদিন বিদ্যালয়ে আসে। এই দিনগুলোতে সে কেন আসেনি কিংবা কী করতো, কার সাথে মিশতো এসব তার পরিবারই ভালো বলতে পারবে। এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখন আগের মতো শিক্ষার্থীদের বিরশুদ্ধে শাসন করা যায় না। এটাও একটা বড় সমস্যা।

কলেজিয়েট স্কুলের কয়েকজন শিক্ষক জানান, চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল চট্টগ্রামের একটি ঐতিহ্যবাহী স্কুল। এখানে সন্তানদের ভর্তি করানোর জন্য প্রত্যেক অভিভাবক মুখিয়ে থাকেন। এই স্কুলে পাঠদান থেকে শুরশু করে সার্বিক পরিবেশ অন্য যেকোনো স্কুলের চেয়ে আলাদা। স্কুল ছাত্র খুনের ঘটনাগুলো শিক্ষকদের জন্য খুবই পীড়াদায়ক। এই স্কুলে দেশের মেধাবীরা পড়ে থাকে। চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে মাধ্যমিক পরীক্ষায় গত ২০০১ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মোট ১৫ বার সেরাদের সেরা হয়েছে কলেজিয়েট স্কুল। এই সময়কালীন শুধুমাত্র ২০১২ সাল বাদে প্রতিবছর সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলেছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া পঞ্চম শ্রেণীর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিএসসি) ও অষ্টম শ্রেণীর জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষাও একই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। এই স্কুলে পড়েছেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুছ, প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ, বিশিষ্ট পদার্থ বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ অধ্যাপক ড. জামাল নজরশুল ইসলাম এবং গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনসহ আরো অনেক কৃতী সন্তান। কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক দেবব্রত দাশ বলেন, আমাদের পক্ষে সবাইকে নজরদারি আসলেই দুঃসাধ্য। যেহেতু ছাত্ররা সবচেয়ে বেশি সময় পরিবারে কাটায় সুতরাং পরিবারকে খোঁজ খবর রাখতে হবে, তাদের সন্তান কি করছে, কার সাথে মিশছে। যে ছেলে খুন হলো, সে অত্যন্ত মেধাবী একজন ছেলে। পঞ্চম শ্রেনীতে বৃত্তি পেয়েছে। জেএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ৫ পেয়েছে। জেএসসি পরীক্ষা শেষ গত বছরের ১৬ নভেম্বর। সেই হিসেবে এ বছরের জানুয়ারির ১ তারিখ পর্যন্ত সে এক মাস ১৪ দিন সময় পেয়েছে। এ সময়টা সে কাদের সাথে মিশেছে, কি করেছে এটি তার পরিবার ভালো বলতে পারবে। আরেকটি বিষয়, নবম শ্রেণীর ক্লাশ শুরু হয় ১ জানুয়ারি। এরমধ্যে সে মাত্র একদিন স্কুলে আসে। এতোদিন কেন আসলো না, সেটি আমরা আসলে জানি না। এরকম একটি মেধাবী ছেলে অকালে ঝরে পড়া কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। সে কোন অপরাধে জড়িয়ে পড়েছিল কিনা সেটাও খতিয়ে দেখতে হবে।

এদিকে প্রকাশ্যে এসব খুনের ঘটনা ঘটলেও বাধা দিতে কেউ এগিয়ে আসছে না। সবাই কেমন জানি ব্যক্তি কেন্দ্রিক। ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে মানবতা ও বিবেকবোধ। গৌরবের জায়গা থেকে একটু একটু করে সবাই যেন সরে যাচ্ছে। অথচ বাঙালির ঐতিহ্য এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনার সাক্ষ্য দেয় না। আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অনুযায়ী, আমাদের সমাজ ব্যবস্থা অনুযায়ী পরস্পরের বিপদে আমরা সবসময় এগিয়ে গেছি। তবে কি ‘ইতিহাস সবসময় সত্যিটা বলে না।’ কথাটিই ঠিক? ভূপেন হাজারিকার সেই কালজয়ী গানের কলির মতো নৈতিকতার স্খলন দেখেও মানবতার পতন দেখেও নির্লজ্জ অলস ভাবে বয়ে চলবে রক্ত গঙ্গা? ব্যক্তি যদি ব্যক্তি কেন্দ্রিক সমষ্টি যদি ব্যক্তিত্ব রহিত তবে শিথিল সমাজকে ভাঙার দায়িত্বটা কে নেবে? যারা দায়িত্ব নেওয়ার কথা তারাই যে মুল্যবোধের অব য়ে জর্জরিত। মঙ্গলবার জামালখানে স্কুল ছাত্র আদনান হত্যাকান্ডইতো প্রথম কিংবা একমাত্র ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক সময়ে এমন নৃশংস ঘটনা ঘটেছে একের অধিক। নালাপাড়ায় ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত হত্যা, কদমতলীতে পরিবহন ব্যবসায়ী হারশুণ হত্যা, রেয়াজউদ্দিন বাজারে ছাত্রলীগ নেতা ইয়াছিন হত্যা কিংবা তার আগে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে সোহেল হত্যা এমন ঘটনা দিন দিন বাড়ছেই।

এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বারে বারে শিউরে উঠেছেন বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. অনুপম সেন। তিনি আজাদীকে বলেন, আমি অবাক হয়ে ভাবি, পরিবার থেকে মূল্যবোধের কী শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, স্কুল কলেজেই বা আমরা কী শিক্ষা দিচ্ছি? আমরাতো ব্যর্থ। একের পর এক ঘটনা ঘটছে, একেক জন ফ্রাংকেস্টাইন হয়ে সমাজের ভিত ধরে টান মারছে। এই যদি অবস্থা হয় তবে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা টিকে থাকাতো কঠিন। একটা ছেলেকে মারতে ছুটছে কয়েকজন, আশে পাশে কেউ এগিয়ে আসছে না। সামান্য মতের অমিল হলে, কথা কাটাকাটি হলে, ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলে খুন করছে। যাকে খুন করছে বা যারা খুন করছে, তাদের বয়সের পার্থক্যও খুব বেশি নয়। এদের যারা নিয়ন্ত্রণ করছে, যারা ব্যবহার করছে তাদের অবশ্যই ধরা উচিত এবং দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দেওয়া উচিত। যদি প্রয়োজন হয় আইন বদলাতে হবে, তবু এমন ব্যবস্থা করতে হবে যেন সহজে জামিন না পায়। ইতালিতে, আমেরিকায় এ ধরনের পরিস্থিতি কঠোর হস্তে সামাল দিয়েছিল সে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আমাদের দেশেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক অবদান রয়েছে। মূল্যবোধের অব য় কালে তাদের শক্ত হাতে মোকাবেলা করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, অভিবাবকরা সন্তানদের কোথায় নিয়ে যেতে চাইছি তা ভাবার সময় বয়ে যাচ্ছে। আমাদের সামাজিক সম্পর্ক লোপ পেতে যাচ্ছে। মা বাবা সন্তানকে নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। অধিক হারে নাগরিক জীবনে মাইগ্রেশন সামাজিক অভিবাবক শূণ্য করেছে আজকের প্রজন্মকে। যে ছাত্রটি কালকে একজন প্রকৌশলী কিংবা চিকিৎসক হবে সে কিনা তার বন্ধুকে খুন করে ঠান্ডা মাথায়? একজন সুনাগরিকের জন্য নাগরিক ও মানবিক মূল্যবোধগুলো বিকাশের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

ইতোপূর্বে গত ৫ অক্টোবর নগরীর নালাপাড়ায় খোলা রাস্তায় পিটিয়ে খুন করা হয় ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত বিশ্বাসকে। চলে যাওয়ার সময় হত্যাকারীরা ফাঁকা গুলি ছুড়ে এলাকায় আতঙ্ক ছড়ায়। খুনিরা ধরা না পড়ায় হতাশ তার মা বাবা। পুলিশ বলছে এ হত্যাকান্ডের মুল পরিকল্পনাকারী ও নেতৃত্ব দানকারীদের ধরতে অভিযান চলছে। কিন্তু খোঁজ মিলে নি। তবে বাস্তবতা হলো, পুলিশের এ অজুহাতকে যেন বিদ্রুপ করতেই নগরীর লালখান বাজার এলাকায় এক আওয়ামীলীগ নেতার জন্মদিনে উপস্থিত ছিলেন আসামিদের অনেকেই।

কিশোর অপরাধ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. গাজী সালাউদ্দিন দৈনিক আজাদীকে বলেন, সামাজিক মূল্যবোধের অভাবে এই সমাজে বেড়ে ওঠা এইসব কিশোরেরা অপরাধ প্রবণ হয়ে উঠছে। এছাড়া দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি পারিবারিক অসেচতনতা এর জন্য দায়ী। দুষ্ট বন্ধুদের প্রভাব, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, শিশুদের সঠিক পরিচর্যার অভাব, মৌলিক চাহিদা পূরণ না হওয়া, স্যাটেলাইট চ্যানেলও সমানভাবে দায়ী। আরেকটি বিষয়বর্তমানে অনেক অভিভাবক আছেন যারা সস্তান যা চায়, তাই দিয়ে তাকে সন্তুষ্ট করতে চান। এতে সন্তান আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সমাজের উচ্চবিত্ত পরিবারের অনেক কিশোর সঙ্গদোষে অথবা অ্যাডভেঞ্চার করতে গিয়ে এমন সব অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে, যা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়। কিশোর বয়সে দামি ফোন ব্যবহারের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার, রাত জেগে মোবাইল ফোনে কথা বলা এবং নতুন নতুন বন্ধু তৈরির সাথে ধীরে ধীরে অসৎ সঙ্গে মিশে যাওয়াকে দায়ী করেছেন মনোবিজ্ঞানীরা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আফজাল হোসেন দৈনিক আজাদীকে বলেন, সাধারণত ১৩ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে একজন কিশোরের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক নানা পরিবর্তন হয়। এসময় কিশোরের মনে নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আকর্ষন বাড়ে। কেউ এসময় সিগারেট খাওয়া শুরু করে। পরবর্তীতে গাঁজা, হিরোইন, ইয়াবা সেবন শুরু করে। এসময় অভিভাবকদের গুরুত্বপূর্ণ অভিভাবকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হয়। কিশোর বয়সে কারো সাথে যদি ঝগড়া হয়, তখন তারা অতিরিক্ত প্রতিশোধপরায়ন হয়ে উঠে। প্রতিশোধপরায়ন হয়ে তারা একসময় খুনের ঘটনা ঘটায়। কিশোরদের মস্তিষ্ক পরিপক্ক না বলে ঘটনার পরবর্তী পরবস্থিতি তারা আঁচ করতে পারে না। তবে পুরো বিষয়টি অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে। সন্তান কি করছে সেটি খেয়াল রাখা তাদের দায়িত্ব। আবার বাবামায়ের মধ্যে পারিবারিক কলহ থাকলেও সন্তানেরা বিপথগামী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড (মাউশি)’র চট্টগ্রাম অঞ্চলের আঞ্চলিক উপপরিচালক ও কলেজিয়েট স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো: আজিজ উদ্দিন দৈনিক আজাদীকে বলেন, আদনান খুনের ঘটনার পর থেকে আমার হৃদয়ে রক্ত রণ হচ্ছে। এইরকম একটি ঘটনা, ২০১০ সালে কলেজিয়েট স্কুলে প্রধান শিক্ষক থাকার সময়ে ঘটেছে। সেই সময় সৌমেন নামে এক ছাত্রকে ছুরিকাঘাত করে খুন করা হয়। আমরা কী শিক্ষা দিচ্ছি বাচ্চাদের। যে বাবা মা তিলে তিলে নিজের সন্তানকে মানুষ করার জন্য যুদ্ধ করছেন, তাদেরকে আমরা কি উপহার দিচ্ছি। এ ঘটনা তাদের পরিবারগুলোকে আজীবন ভোগাবে। এখন বিভিন্ন স্কুল পর্যায়েও রাজনীতি হয়। রাজনীতিক দলগুলোর প্রতি আমার অনুরোধ, আপনারা ১৮ বছরের নীচে কাউকে ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত করবেন না। স্কুলের একজন ছেলে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যায়, সে তখন কোনটি ভালো কোনটি খারাপ এই বিষয়টি তার মাথায় খেলে না।

এ ধরনের ঘটনা ও প্রতিরোধে কেউ ইগয়ে না আসা প্রসঙ্গে সিএমপির এ প্রসঙ্গে বলেন, সাধারণ মানুষ সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করতে পারে সন্ত্রাসীদের। এটা যেমন ঠিক, তেমনি সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে দেখা গেছে অপরাধীদের হাতে অস্ত্র ছিল, প্রে াপটও ভিন্ন ছিল। যেমন সুদীপ্ত খুনের ঘটনা করতে যারা গিয়েছিল, তারা সংখ্যায় ভারি ছিল। কাজেই যে বা যারাই বাধা দিতে চাইতো তারও সুদীপ্তের পরিণতি বরণ করার শঙ্কা ছিল। ব্যবসায়ী হারশুনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে একটা বিশাল জমায়েতকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানেও বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতে সাহস করে নি কেউ। আদনানের ঘটনায় দেখা গেছে, ঘটনার সময় আইডিয়াল স্কুল ছুটি হয়েছে। মানুষের ভিড় ছিল। যানবাহনও ছিল বেশি। অনেকেই হয়তো ভেবেছেন যে সামান্য মারামারি বা কথা কাটাকাটি হচ্ছে। যখন রক্তাক্ত আদনানকে দৌড়ুতে দেখে তখন পেছনে একজনের হাতে পিস্তল ও অন্যজনের হাতে ছুরি ছিল। তাই এগুনোর চেষ্টা করে নি কেউ। প্রতিটি ঘটনায় আসামিদের বেপরোয়া মনোবৃত্তি এগুতে দেয় নি সাধারণ মানুষকে। পাশাপাশি সামাজিক বন্ধন আলগা হয়ে যাওয়ার বিষয়টিতো রয়েছেই। এখনো আমি বিশ্বাস করি, সাধারণ মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদে এগিয়ে এলে পুলিশের কাজ অনেক সহজ হয়ে যাবে।

আদনানের স্বজন রোবায়েত ফাহিম জানান, বাবামায়ের একমাত্র ছেলে হওয়ায় খুব আদুরে ছিলো সে। মোটেও বখাটেপনায় জড়িত ছিলো না। প্রেমঘটিত কোনো সমস্যাও ছিলো না। সিনিয়রজুনিয়র দ্বন্দের বিষয়টি বলা হচ্ছে, কিন্তু এই ব্যাপারটি আমরা নিশ্চিত না। আমরা খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। আদনানের কয়েকজন সহপাঠি জানান, খুন হওয়ার তিন চারদিন আগে থেকে সে খুব একটা বিষয় নিয়ে চিন্তিত ছিলো বলে আমাদেরকে জানায়। তবে বিষয়টি ঠিক খোলাসা করে বলেনি।

x