বৈচিত্র্যময় নান্দনিক শিক্ষা

শামসুদ্দীন শিশির

শনিবার , ২ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:৩৬ পূর্বাহ্ণ
45

শিশুদের হাসিমাখা মুখ আমাদের প্রাণস্পন্দন। শিশুদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদেরই। তাই সুন্দর পরিবেশে গড়ে ওঠা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগ্য শিক্ষকের কাছে প্রকৃত শিক্ষার হাতেখড়ি দিতে আমরা বদ্ধপরিকর। আমরা সবাই জানি শিশুর বয়স চার বছর পেরিয়ে গেলে তাকে শিশু শ্রেণিতে ভর্তি করানো হয়। একান্ত পারিবারিক পরিবেশ ছেড়ে কিছু সময়ের জন্য সে স্কুলে যায়। স্কুলের প্রথম দিন শিশু শিক্ষার্থীর হাতে ফুল দিয়ে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বরণ করে নিলে শিক্ষার্থী আনন্দিত হবে। প্রথম স্কুলের প্রথম দিনটি অন্যরকম ভালো লাগা নিয়ে কাটাবে সে। এই প্রথম মা-বাবা অথবা বাড়ির অন্য কোনো পরিচিতজনের হাত ছেড়ে স্পর্শ করবে নতুন হাত যা তার শিক্ষকের। শিক্ষকের হাতের স্পর্শটি যদি শিশু শিক্ষার্থীটি মা বা প্রিয়জনের হাতের স্পর্শের মতোই অনুভব করে তাহলে তো কোনো কথাই নেই। তাহলে প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার জন্য শিশু শিক্ষার্থীটি আগ্রহী হবে। অনেক বেশি ভালো লাগা অনুভব করবে সে কারণ তার সমবয়সী বন্ধুদের পড়ার ও খেলার সাথী হিসেবে পাবে। মায়ের আদরমাখা কথা ও ভালোবাসার মানুষ শিক্ষককেও পাবে। সেই ক্ষেত্রে পরিপাটি পোশাক বিশেষ করে শাড়ি পরিহিত শিক্ষককে বেশ পছন্দ করবে শিশুটি কারণ তাকে মায়ের মতোই মনে হবে তার। শিশু শিক্ষার্থীকে পড়ালেখা শেখানোর ক্ষেত্রে ছেলে শিক্ষকরাও বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন। সেই ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, পরিষ্কার জামা-কাপড় বিশেষ গুরুত্ব রাখে।
সকল শিক্ষকের ক্ষেত্রেই উচ্চারণের শুদ্ধতা, বাচনভঙ্গী, হাস্যোজ্জ্বল চেহারা অপরিহার্য। বর্ণমালা শেখানোর ক্ষেত্রে ছড়ার মতো সুর তুলে শেখানো গেলে শিক্ষার্থীরা বেশ ভালোভাবে পাঠদান ও পাঠ গ্রহণের বিষয়টি উপভোগ করবে। যেমন: অ-তে অনেক বড় হবো। আ-তে আকাশে উড়ে বেড়াবো। ই-তে ইচ্ছে করে প্রজাপতি হতে। ঈ-তে ঈগল পাখির মতো ডানা মেলবো। এভাবে বর্ণগুলো পড়ানোর সময় শিক্ষক উপযুক্ত দেহভঙ্গী প্রদর্শন করলে চমৎকারভাবে শিশু শিক্ষার্থীরা পড়াগুলো বুঝতে পারবে ও দীর্ঘদিন মনে থাকবে তাদের।
স্কুলের পরিবেশ সুন্দর হওয়া বাঞ্ছনীয়। সামনে ফুলের বাগান, খেলার মাঠ শিশু শিক্ষার্থীদের স্কুলের যাওয়ার আগ্রহের বাড়তি উপকরণ হিসেবে উপস্থাপিত হবে। শ্রেণি কক্ষগুলো সুন্দর করে সাজানো-গোছানো থাকলে স্কুলে সময় কাটানোকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেবে শিশু শিক্ষার্থীরা। স্কুলে যাওয়ার জন্য নিজ থেকে আগ্রহী হবে। শ্রেণিকক্ষের ভেতরটা নানান ফুল, ফল, পাখি, মাছ ইত্যাদির ছবি দিয়ে সাজিয়ে রাখলে দেখতে দেখতে শিশুরা এগুলোর নাম শিখবে। শ্রেণিকক্ষের বাইরের দেয়ালে স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার, সংসদ ভবন সহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার ছবি এঁকে রাখলে শিশু শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই এগুলোর সাথে পরিচিত হতে পারবে। শ্রেণিকক্ষের বাইরে দেয়ালের উপরের অংশে বিখ্যাত ব্যক্তিদের ছবি, ভাষা শহীদ, বীর শ্রেষ্ঠ, জাতীয় কবি, বিশ্বকবি, বেগম রোকেয়া, নবাব ফয়জুন্নেছা এমন বিজ্ঞজনদের ম্যুরাল আঁকা থাকলে বিদ্যালয়ের সৌন্দর্য যেমন বৃদ্ধি পাবে তেমনি শিক্ষার্থীরা বিখ্যাত মানুষ সম্পর্কে ব্যাপক ধারণা লাভ করতে পারবে।
এ সবকিছু নির্ভর করবে মূলত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা পর্ষদ, প্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষকদের আন্তরিকতার ওপর। দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন হলেই আনন্দময় শিক্ষাগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আনন্দময় শৈশব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। শ্রেণিকক্ষকে আনন্দময় করে তোলার জন্য শিক্ষককে পাঠদানে বৈচিত্র্য আনতে হবে। বৈচিত্র্যপূর্ণ পাঠদানের জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ আবশ্যক। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষক বিভিন্ন পদ্ধতি ও কৌশল শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর বয়স ও চাহিদা বিবেচনা করে প্রয়োগ করতে পারবেন। শিক্ষকের পাঠদানের ভিন্নতা শ্রেণিকক্ষে গ্রহণযোগ্য আবহ সৃষ্টি করবে এবং শিক্ষার্থীরা আগ্রহ নিয়ে আনন্দের সাথে শিখবে। পাঠদানে নতুন নতুন পদ্ধতি ও কৌশল ব্যবহারের সাথে শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার শ্রেণি কার্যক্রমে ভিন্ন মাত্রা যোগ করবে। বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্য রেখে নানা বর্ণের শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার শিক্ষার্থীদের পাঠে মনোযোগী করবে, জানার আগ্রহ বাড়াবে, কৌতুহলী মনোভাব নিয়ে শিক্ষকের পাঠদান উপভোগ করতে সাহায্য করবে। এক্ষেত্রে শিক্ষকের বিষয়বস্তু সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকা অত্যাবশ্যক। শিক্ষক যখনই পড়ানোর কথা ভাববেন তখনই তাকে পড়তে হবে পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি বিভিন্ন রেফারেন্স বই। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বয়সের কথা বিবেচনায় রেখে তাদের বয়স উপযোগী গল্প, উদাহরণ উপস্থাপন করবেন। নিজেকে শিক্ষার্থীদের বয়সের স্তরে নামিয়ে আনবেন। তারপর ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের সমস্যা সামধান করবেন। তবেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা সুন্দর সম্পর্ক সৃষ্টি হবে। ব্ল্যাক বোর্ড বা হোয়াইট বোর্ডের ব্যবহার শ্রেণি কার্যক্রম সঠিকভাবে সম্পাদনের অন্যতম একটি সহায়ক উপকরণ। শিক্ষক নিজে বোর্ড ব্যবহার করবেন এবং মাঝে মাঝে শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে ২/৩ জনকে বোর্ডে লিখতে বলবেন। এতে তাদের উৎসাহ বেড়ে যাবে।
সকল শিক্ষার্থীকে এক, এক করে বোর্ডে আসার সুযোগ দেবেন। বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। শ্রেণিকক্ষে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ব্যবহারের মাধ্যমে অজানা সব তথ্য, ছবি, ভিডিও ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে অথবা আগে থেকেই কম্পিউটারে ডাউনলোড করে রেখে শিক্ষার্থীদের সামনে প্রদর্শন করা হলে আনন্দের এক নতুন মাত্রা যোগ হবে। সেই ক্ষেত্রে শিক্ষককে ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ ব্যবহারে পারদর্শী হতে হবে। শিক্ষকের প্রশিক্ষণ এখানে অতীব প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠান প্রধান ও অন্যান্য শিক্ষকদের সুন্দর ব্যবহার শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের মধ্যে একটা বিনা সুতার মালা তৈরি করবে। ফলে পাঠদান ও পাঠগ্রহণের পরিবেশটিও সাবলীল ও আনন্দদায়ক হবে।
শিক্ষককে অবশ্যই মনে রাখতে হবে শিক্ষার্থীর সকল ভালো কাজের প্রশংসা করতে হবে। এতে তারা স্বউদ্যোগে পরবর্তী কাজ করবে এবং আনন্দের ভেতর দিয়ে স্কুলের সকল কাজ সম্পন্ন করবে। রবীন্দ্রনাথের কথা দিয়েই শেষ করছি। তিনি বলেছেন, ‘শিক্ষা আনন্দের, পীড়নের নয়’। তাই শিক্ষা সংক্রান্ত সকল কাজই আনন্দময় পরিবেশে চমৎকারভাবে সম্পন্ন করতে পারাটাই শিক্ষকের পারঙ্গমতা।
শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাও আনন্দময় পরিবেশে পড়ালেখার ক্ষেত্রকে বিস্তৃত করবে। শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে আমাদের সকল আয়োজন ভেস্তে যাবে। তাই শিক্ষার্থীকে আগামীর সুস্থ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আমরা সকলে মিলে আনন্দময় পরিবেশে শিক্ষার আয়োজনে সচেষ্ট হবো। আমাদের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে শিক্ষা অন্যতম। সাধারণ পরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত সকলেরই শিক্ষালাভের অধিকার রয়েছে। সেভাবেই শিক্ষা প্রসারে কাজ করবো যাতে বস্তিবাসী থেকে প্রাসাদসম অট্টালিকার সকল শ্রেণি-পেশার মানুষগুলো শিক্ষা অর্জনের সুযোগ পায়। শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত শিক্ষার্থীরা অধিকারও বঞ্চিত। তাই তাদের অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমার, আপনার, আমাদের সকলের। আমরা একটি গ্রহণযোগ্য পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে শিক্ষার্থীর আনন্দময় শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টি করবো।
লেখক: শিক্ষক প্রশিক্ষক

x