বেড়ার ঘরে আসমানের আলো

সুমি সৈয়দা

শুক্রবার , ১২ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ
30

:মাই,ও মাই আইজকা আমারে মুরগীর গোশতো দিয়া ভাত দিবা,নইলে খামুনা নিলুফার ঘরে ঢুকা মাত্র আসমানের কথাগুলো কানে এলো তার।
ক্লান্তিতে নুয়ে যাচ্ছিলো শরীর। বিকাল চারটা বাজতে চললো তার পেটে কিছু পড়েনি এখনো,গোসলটাও সারতে পারেনি আজ।
মাঝে মধ্যেই একেক বাসাতে কাজের চাপ বেশি পড়ে তখন ফাঁক পায়না সে একটুও।
মেয়ে দুইটা সকালের ভাত, ডাল আর মরিচ ডলে খেয়ে নিয়েছিলো আরো আগে।
তারা বেরিয়ে পড়েছে ফুলের মালা বিক্রি করতে।
সব জায়গায় ফুলের মালা সবসময় বেচা হয়না, কিছু কিছু রাস্তায় গাড়ি জ্যামে পড়লে বা সিগন্যালে দাঁড়ালে মাঝে মাঝে হয়। তবে পরিশ্রম করতে হয় বেশি তখন। রোদ মাথায় নিয়ে মেয়ে দুটো গাল লালচে পুড়ে দৌড়ে দৌড়ে ফুলের মালা হাতে ছুটে এ মাথা থেকে ও মাথা।
কোনো মতে নিলুফার হাতের জিনিসগুলো ঘরের এক কোণায় রেখে তারে ঝুলানো শাড়িটা টেনে নিলো,
: ও মা,মা, আমারে আইজকা কিন্তু গোসতো দিবা কইলাম, প্রত্যেকদিন ডাইল আর বাসি তরকারি দিয়া ভাত খাইতে মন চায়না। ও মা কথা কও না ক্যা?
আসমানের দিকে চোখ লাল করে তাকালো নিলুফার।পেট মাথা জ্বলছে সমানে।
: চুপ করবি ছেমড়া? হারাদিন কাম কইরা না খাইয়া বাইত আইলাম তোর খাওন খাওন হুনবার লাইগা? কথা পাড়িসনা বেশি, মাতা গরম আছে।
কোনকথাই আসমানের কানে যায়না। সে নাক টেনে টেনে তাও বলছিলো,
:আপা আর চুমকি মরিচ দিয়া ভাত খাইতে কইছে,আমি খাই নাই। আমার খিদা লাগছে,মাই।
আমারে খাইতে দে।
নিলুফার ঝাঁজ গলায় বলে উঠলো,
যা দেখ বেগুনের তরকারি আনছি এক বাসাতুন,ওইটা দিয়া অহন খা, রাইতে মুরগীর ঠ্যাঙ,কইজা রানমু তহন ভালামত খাইস।
: না ওগুলান দিয়া ভাত খামুনা,বালা তরকারি দেও।
আসমানের ঘ্যান ঘ্যানানি আর সহ্য হইলোনা নিলুফারের।
ঘুরে এসেই চকিতে বসা আসমানের চুলের মুঠি ধরে পিঠের উপর কয়েকটা কিল বসিয়ে দিলো।
মারতে মারতে বলতে লাগলো
: হারামজাদা,কথা কানে যায়না?খালি খাওন খাওন করোছ,কোত্থেইক্যা তোগো খাওন আনমু।
বাইর হ ঘর তুন। যা আনছি তা দিয়া খাইলে খা,নইলে বাইর অইয়া যা। কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করবিনা। মাইরা আড্ডি গুড্ডি ভাইঙ্গা হালামু। আমারে শ্যাষ কইরা দিতাছোত তোরা।
আরো কয়েকটা বসিয়ে দিয়ে গজগজ করতে করতে নিলুফার কাপড় নিয়া গা ধুতে বেরিয়ে গেলো।
আসমান কতক্ষন সুর করে কাঁদলো,এরপর কান্না থামিয়ে বাঁকা ,সরু হওয়া ডান পা টা টেনে ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে বস্তির ঘর থেকে বের হয়ে গেলো।
সমস্ত হাতের কাজগুলো শেষ করে গুছিয়ে রাখলো নিলুফার।
মাথায় টেনশান তো ছিলোই তবুও মেয়ে দুটিকে রাতের খাবার খাইয়ে শুইয়ে দিলো।
সারাদিন হেঁটে হেঁটে ফুল বিক্রি করে ক্লান্ত হয়ে পড়ে দুজনেই।দুটো পয়সার জন্য পরিশ্রমটা বেশি হয়ে যায় তাদের জন্য।
বাড়িতে বাপের সাথে থাকতো যখন তেমন কোন কাজকর্ম করতে হয়নি মেয়েদের কে। কাছের প্রাইমারী স্কুলে পড়তে যেতো ।ওদের দাদী বাড়ির কাজ সামলাতো।
নিলুফারের জামাই তখন এমন অসুস্থ হয়ে পড়েনি,সংসারটা চালাতে পারতো।
যখন নানান রোগ তাকে কাবু করে ফেলছিলো ,মাটি কাটা,জমি চাষের মত কাজ সে আর ঠিক মত করতে পারছিলোনা।অভাব অনটন বেড়ে যাচ্ছিলো তখন নিলুফার মেয়ে দুটিকে নিজের কাছে নিয়ে এলো।
বাসাবাড়িতে দিতে তার মন সায় দিলো না,নিজে সকাল বিকাল কঠিন পরিশ্রম করে বুঝতে পারে রুগ্ন শুকনো মেয়ে দুটি এত কাজের ভার নিতে পারবেনা তাই হালকা কাজে লাগিয়ে দিয়েছে সে ।পাশের বস্তিতে থাকা রানু বুজির মেয়েটার সাথে কাজে যায় তারা,ফুলের মালা নিয়ে রাস্তায়,পার্কে ,ফুটপাতে বিক্রি করে যা পায় নিয়ে আসে।
নিলুফার এবার চিন্তিত হয়ে পড়লো। এত রাত হয়ে গেলো আসমান ঘরে ফিরছে না। রাত করে আগেও ফিরতো তাই বলে এত রাত তো কখনো হয়নি।
ছেলেটাকে আজ সে মারলো রাগের মাথায়,খিদা পেটে নিয়ে কোথায় গেলো কে জানে।
মাথাটা আজকাল গরম থাকে প্রায় তার। বাসাবাড়ির বেগম সাহেবদের মনমতো কাজ করতে যেয়ে তার শারীরিক চাপটা বেশি হয়ে যায়। দু একদিন কামাই দিলে যে কথা শুনতে হয় তাতে কাজ করতে ইচ্ছা করেনা,সংসারের চাহিদার কথা মাথায় রেখে শত অসুখেও মুখ বুজে কাজ করে যায় নিলুফার।
আসমান ও মাঝে মধ্যে ভিক্ষা করে টুকটাক পয়সা এনে মাকে দেয়। ছেলেটা ভালো খেতে চায় নিলুফার পারেনা তাকে তার সাধ মতো খাওয়া দিতে,রাগ করে,কাঁদে আসমান অবুঝের মত।
আজ এক বাসার খালাম্মা ফার্মের মুরগীর পা,মাথা কলিজা গিলা দিয়েছিলেন। উনি প্রায় এগুলো জমিয়ে নিলুফারকে দিয়ে দেয়। নিলুফার আলু দিয়ে কশিয়ে ঝাল করে রান্না করেছিলো আজ সেটা। আসমানের জন্য কলিজা মাথা বেশ কিছু আলাদা করে তুলে রেখে মেয়ে দুটিকে নিয়ে নিজেও ভাত খেয়ে নিয়েছিলো।
ভাবলো রাগ পড়লে আস্তে ঘরে ফিরবে ছেলেটা।
এখনতো অনেক রাত হয়ে গেলো তবু আসমানের ফিরার নাম নেই। চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়লো নিলুফার।
কয়েকবার বস্তি ঘরের বাইরে যেয়ে হেঁটে এলো,রাস্তায় কতক্ষন দাঁড়িয়ে দেখলো দুরে কাউকে দেখা যায় কিনা। নাহ,চারিদিক সুনসান ক্লান্ত রাত। নিরিবিলি হয়ে পড়েছে বস্তিবাসীর সীমানা। সারাদিন উদয়স্ত ঘামঝরা পরিশ্রম করা মানুষগুলো রাত হলে আর ধরে রাখতে পারেনা নিজেদের ক্লান্ত শরীরকে। দুচোখ ভরে ঘুম নামে ,শরীর এলিয়ে দেয় মাটিতে চাদর বিছিয়ে,নয়তো চকিতে পাতলা কাথার বিছানায়।
নিলুফার কোনমতে নিজেকে সজাগ রাখছিলো।
সেই কোন ভোর বেলায় বিছানা ছাড়তে হয় তাকে,রাতে মরার মত ঘুমিয়ে আবার ফজরের আজানের সময় উঠতে হয়।
আজ ছেলের চিন্তায় তার ঘুম,ক্লান্তি হাওয়া হয়ে গেলো।
আসমানের বয়স এগারো শেষ হয়ে বারো তে পড়লেও রুগ্ন অসুস্থ ছেলেটাকে সাত আট বছরের ছেলে মনে হয়।
নিলুফারের প্রথম একটা ছেলে হয়েছিলো,পাঁচ মাস বয়সে প্রচন্ড নিউমোনিয়া হয়ে সে সন্তানটি মারা যায়।
এরপর রুমকি আর চুমকি মেয়ে দুটি হওয়ার এক বছর পরই আসমানের জন্ম।
কিন্তু জন্ম থেকেই ছেলেটা কপালদোষে বিকলাঙ্গ। ডান পায়ের পাতা বাঁকা,হাঁটু থেকে পাতা পর্যন্ত সরু হয়ে গিয়েছে পা।
নিলুফার নিজের কপালের দোষ দেয়,এছাড়া আর কি করবে সে।অভাব অনটন,দৈন্যতা নিয়ে তাদের জীবন কাটাতে হচ্ছে,এর উপর বছর বছর সন্তান জন্মদান,সুস্থ বাচ্চা কিভাবে হবে।
নিলুফারের ছেলে মেয়ে গুলো তাই সারাবছর অসুখ বিসুখ নিয়েই বড় হচ্ছে।
পাশের ঘরের নুরুল কে ঘুম থেকে তুলে জিজ্ঞেস করলো নিলুফার,আসমান ওর সাথে বড় বাস্তায়,দুরের ব্রীজে যায়। ব্রীজের উপর বাঁকা পা দেখিয়ে ভিক্ষা করে।
পা টা নিয়ে জোরে হাঁটতে পারেনা সে।নুরুল চলে যায় তার কাজে,আসমান বসে থাকে। সবসময় টাকা পয়সা পায়না,তবে মাঝে মাঝে ব্রীজের নীচে প্রাইভেট কার থেকে কেউ কেউ দয়াপরবশ হয়ে টাকা দেয় ওর হাতে।
গত মাসে নতুন একটা শার্ট এনে দেখালো নিলুফারকে। খুশীতে চোখ মুখ উজ্জ্বল। তার শার্টটা নরম হয়ে গিয়েছিলো,কয়েক জায়গা দিয়ে ফেঁসেও গিয়েছিলো।নতুন নীল রঙের শার্টটা পেয়ে আনন্দে হাসছিলো ছেলেটা।
ভিক্ষা খুঁজতে যেয়ে একটা গাড়ির ভেতর থেকে কোন খালাম্মা নাকি হাত বের করে আসমানের দিকে শার্টটা বাড়িয়ে দিয়েছিলো।
নুরুল ঘুম ঘুম চোখে জানালো বিকেলের দিকে বড় রাস্তায় আসমানের সাথে একবার দেখা হয়েছিলো,সে ভিক্ষা খুঁজছিলো ,নুরুলের সাথে কোন কথা হয়নি। নুরুলকে দেখেও সামনে আসেনি তাই সে ও আর কথা না বলে কাজে চলে গিয়েছিলো।
এতক্ষনে যেন নিলুফারের বুকটা ভার হয়ে আসছিলো, চিন্তায়, টেনশানে, কষ্টে, দুঃখে।
কই গেলো ছেলেটা। সারা বিকেল,সন্ধ্যা কাটিয়ে রাত নামলো আসমানের দেখা নেই। কার কাছে যাবে, কোথায় খোঁজ নেবে।
ভাবলো এত রাতে হয়তো কোথাও পড়ে ঘুমিয়ে গেছে।
সকাল সকাল উঠে কাজে যাওয়ার আগে বের হবে, বড় রাস্তায়, ব্রীজের উপর,যেখানে যেখানে আসমান থাকে।
ঘরে ঢুকে ছেলের কথা ভাবতে ভাবতে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলোনা নিলুফার, ক্লান্তিতে, শ্রান্তিতে ঘুমে ঢলে পড়লো।
বাইরের হৈ চৈ তে নিলুফারের ঘুমটা ভেঙে গেলো।
কি সুন্দর স্বপ্নটা দেখছিলো আর হাসছিলো। কতদিন এমন একটা সুখের স্বপ্ন সে দেখে না । আজ এত অল্প ঘুমের মধ্যে কি মনভরা স্বপ্ন দেখে ফেললো।
রুসমতকে কোলে নিয়ে গান গেয়ে ঘুম পাড়াচ্ছিলো সে,তার মু্ে‌খ আনন্দের হাসি।
নিলুফারের শরীরে তখন নতুন মা হওয়া সুখ,শাড়ির জমিনে সন্তানের গায়ের গন্ধ,পরিপূর্ণ যৌবনের নিলুফারকে সে অনুভব করছিলো।
পাঁচ মাস বয়সী রুসমত মায়ের কোলে শুয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছিলো,কি অপরূপ সে দৃশ্য, নিলুফার সদ্য ঘুম ভাঙা চোখে তা যেন সরাতে পারছিলো না।
বস্তির দরজা খুলে বের হলো সে। এত লোকজন কেন তার ঘরের সামনে বুঝে উঠতে পারছেনা নিলুফার। এখনো পুরোপুরি সকাল হয়ে ওঠেনি, হালকা অন্ধকারের চাদর বিছানো চারপাশটা ঘিরে।
রানুবুজি চিৎকার করতে করতে নিলুফারকে জড়িয়ে ধরলো, মনার মা,শবনম,মরিয়ম সব তাকে ঘিরে বিলাপ শুরু করে দিলো, সে তো কিছুই বুঝতে পারছেনা। কি হলো এদের, কার কি হলো কেউ তো কিছু বলছে না।
নিলুফার স্বপ্নটা থেকে বাস্তবে নিজেকে এনে দাঁড় করালো, পুরো বস্তিবাসী জেগে উঠেছে,সব তার ঘরের সামনের অল্প জায়গাটুকু ঘিরে ভিড় জমিয়ে ফেলেছে।
রানুবুজি নিলুফারের হাত ধরে টেনে উঠোনটাতে নামালো
ওরে, তুই কেমনে থাকবিরে বইন, কেমনে এ কষ্ট সামলাবি, তোরে কে সামলাইবোরে নিলুফার।
রানুবুজি,ক্যান এমুন করতাছো,কওতো কি হইছে ,কেন থাকতে পারমুনা, আমার আবার কি হইলো, বুজতেছিনা ।
নিলুফার শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলতেই তার দৃষ্টি গেলো সামনের জটলার দিকে ।সবাই কি যেন ঘিরে রয়েছে। মুখ চোখ বিষাক্ত কষ্ট নিয়ে একেকজন কি দেখছে অমন করে, কারো গাল বেয়ে অশ্‌রু বেয়ে পড়ছে, কেউ হাহাকার করে কানছে, নিলুফারের কেমন যেন মাথাটা শূন্য শূণ্য লাগছিলো।
গলাটা শুকনো মনে হচ্ছিলো নিলুফারের, মুখটা তেতো তেতো লাগছে, রোজার দিনের দুপুরগুলোর মত যখন বাসাবাড়ির কাজ করতে করতে তার অমন গলা শুকিয়ে মুখ তিতা হয়ে যেতো।
হঠাৎ করেই আসমানের কথা মনে পড়লো। ছেলেটাকে খুঁজতে বের হতে হবে তার। কেমন অবসাদ লাগছিলো সারা শরীর জুড়ে হয়তো কাল রাতের কম ঘুমানোর কারনে।
ভাবতে ভাবতে জটলার কাছে এসে দাঁড়ালো সে,ভিড়ের মানুষগুলো নিলুফারকে জায়গা করে দিচ্ছিলো।
একি! এ কে মাটিতে শুয়ে আছে। সারা মুখে, শরীরে রক্তে ভাসা এ কার মুখ।
নীল শার্টটা তো আসমানের,ওরে এ যে আমার আসমান, আমার বাজান, আমার বাজানের কি হইছে,ও শুইয়া আছে কেন,ওর মুখে, শইল্যে এত রক্ত আইলো কেমনে?
নিলুফার গগনবিদারী চিৎকার করে আসমানের গায়ের উপর পড়লো।
ও বাজান, বাজান, কি হইছে তোমার? গোস্যা করছো মায়ের লগে, মা তোমারে মারছে, খাওন; দেয়নাই? বাজান উডো, তোমারে মুরগীর সালুন দিয়া ভাত দিমু,মায়ে খাওয়াই দিমু। ও বাজান কতা কওনা কেন?
আসমানের নিস্পৃহ, নিথর হয়ে যাওয়া
ছোট্ট শরীরটা বুকের মধ্যে নিয়ে চেপে ধরে নিলুফার। রক্তে ভেজা থেতলে যাওয়া মুখ মুখের সাথে লাগিয়ে নিলুফার প্রলাপ বকতে থাকে। রুমকি, চুমকি মায়ের দুপাশে বসে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে।
নিলুফারের আকাশ ফাটানো চিৎকার করা কান্নায় পুরো বস্তিবাসী কেঁদে আকুল হয়ে যাচ্ছিলো। এ শোক, অনাকাঙ্ক্ষিত দুঃখ কিভাবে এ মা সামলাবে ভাবছিলো মানুষগুলো।
দাঁড়ানো পুরুষদের মধ্যে আলোচনা হচ্ছিলো কি করে আসমান শেষ রাতের দিকে ঘুম ঘুম চোখে পা ছেঁচড়ে বড় রাস্তা পার হতে যেয়ে দ্রুতগামী ট্রাকের তলায় পড়ে যায়।
এক্সিডেন্টের ঘটনাটা শুনার জন্য ভিড় জমে যায় যে বলছিলো তাকে ঘিরে। একেকজন একেক প্রশ্ন করছিলো, কে আসমানকে দেখলো, কে বুঝলো এ যে বস্তির ল্যাংড়া ছেলেটা, নানান ধরনের আফসোস মেশানো কথা বলছিলো মানুষেরা বড় করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে।
সকালটা যেন হঠাৎ করেই নেমে এলো সবার অগোচরে।চারিদিক ফর্সা হয়ে গেলো। আকাশে লালচে রঙের আবির গোলা আলো।
মানুষজনের ভিড় বাড়তে লাগলো, কেউ কেউ কাজের জন্য বেরিয়েও যাচ্ছিলো একটু উঁকি ঝুঁকি দিয়ে দেখে।
কোলের মধ্যে আসমানের রক্তাক্ত থেতলা দেহটা নিয়ে নিলুফার বিলাপ করতে করতে হঠাৎ করেই হাত পা ছেড়ে দিলো। অবসাদ আর ক্লান্তি এসে তার সারা শরীর অবশ করে ফেলছিলো।
চোখ মুখ উল্টে নিলুফার মাটিতে গড়িয়ে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেলো।
ধড়মড়িয়ে জেগে উঠলো নিলুফার। একি! ঘামে গরমে চপচপা হয়ে ভিজে চুপসে গেছে শরীর। গাল বেয়ে চোখের জলে একাকার সে।বুকের ভেতর পাথর চাপা কষ্ট।
ক্রমাগত দরজায় ধাক্কা ,ক্ষীন কণ্ঠের আওয়াজে তার মরার ঘুম ভেঙেছে।
তাও শরীরে একবিন্দু শক্তি পাচ্ছেনা, তখনো থরথর করে কাঁপছিলো।
দরজা খুলতে ভয় লাগছে । কি দেখবে আবার সে ভাবছিলো নিলুফার।
ভয়ানক স্বপ্নটা তাকে অবশ করে ফেলেছে।এত বাস্তব কেউ স্বপ্ন দেখে? কি দেখলো সে ভাবতেই পারছেনা। বুকের ধুকধুকানির শব্দ পর্যন্ত সে শুনতে পারছিলো।
আবারো দরজায় ধাক্কা,কে যেন ডাকছে তাকে মনে হচ্ছে অনেক দুর থেকে আওয়াজটা আসছে।
আঁচল দিয়ে চোখ মুছে দ্রুত উঠে দাঁড়ালো নিলুফার।
মনটা শক্ত করে দরজার কাছে গেলো। বাইরে সকাল হওয়ার তোড়জোড় বস্তিবাসীর। কলপাড়ে বাসন, কলস, বালতি নিয়ে হুড়াহুড়ি । সব জেগে যার যার কাজ শুরু করেছে ।
নিলুফার দরজাটা খুলেই চমকে দেখে,আসমান দাঁড়িয়ে। অবসন্ন, ক্লান্ত, মলিন চেহারায় কোনমতে বাঁকা পাটি মাটিতে লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
হঠাৎ নিলুফারের কি হলো,আচমকা আসমানকে বুকের কাছে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। সে কি বাঁধছাড়া কান্না ।
সাতরাজার ধন মানিক পাওয়ার আকুল কান্না। এ এক আনন্দ অশ্‌রুর ধারা।
: মা, ও মা, কি হইছে তোমার,অমন করতাছো কেন? কানতাছো কেন,মা?
অবাক হয়ে আসমান মায়ের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলো।
নিলুফার বিশ্বাস করতে পারছেনা আসমান সুস্থ শরীরে ফিরে এসেছে তার কোলে। তার আসমান, তার খুশী, নিলুফারের কোল জুড়ে সুখের জোয়ার, এ যেন ঈদের চাঁদ ।
তার দুঃস্বপ্ন কুয়াশায় মিলিয়ে গেলো আসমানকে পেয়ে। নিলুফারের ভাঙা ঘরে আসমান ঈদের আনন্দ নিয়ে এলো।

x