বেলাল মোহাম্মদ : মৃত্যুহীন প্রাণ

শৈবাল বড়ুয়া

শুক্রবার , ৮ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:৪২ পূর্বাহ্ণ
30

বেলাল মোহাম্মদকে আমি তখন অব্দি সামনা-সামনি কখনো দেখিনি। কিন্তু রেডিওতে তাঁর কণ্ঠস্বর শুনতে পেতাম নিয়মিত। ১৯৬৫ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের সীমানায় ভারতীয় আক্রমণের ফলে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। সমগ্র দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে চট্টগ্রামবাসীরাও জরুরি আইনের আওতাধীন হয়ে পড়ে। যুদ্ধকালীন নিরাপত্তার জন্য রাতে সমগ্র নগরী নিষ্প্রদীপ রাখার ঘোষণা জারি হয়। সে সময় রেডিও পাকিস্তানের চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে রাত আটটায় পুঁথি পাঠের আদলে নিয়মিত খবর পড়তেন বেলাল মোহাম্মদ। তাঁর সুললিত কণ্ঠের খবর পাঠ তখন অনেক শ্রোতার মতো আমাকেও বিশেষভাবে আকর্ষণ করেছিল। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম তিনি একজন স্বভাব কবি, যিনি মুহূর্তেই ছন্দ সৃষ্টি করতে পারেন।
এর অনেক পরে তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ এবং পরিচয়। ১৯৬৭ সালে রেডিও পাকিস্তান চট্টগ্রাম কেন্দ্রের আগ্রাবাদস্থিত ভবনে গিয়েছিলাম একটি সাহিত্য অনুষ্ঠানে অংশ নিতে। সরাসরি প্রচারিত অনুষ্ঠান শেষে স্টুডিও থেকে বেরিয়ে চোখে পড়ল করিডরে কয়েকজন আলাপ করছিলেন। সেখানেই আমার পূর্ব পরিচিত একজন নিয়ে গেলেন বেলাল মোহাম্মদের কাছে। আমি তাঁকে সালাম দিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম। তিনি হাত বাড়িয়ে সম্ভাষণ জানালেন। আমি তাকিয়ে আছি তাঁর দিকে। পরনে সাদা লুঙ্গি আর গায়ে সাদা ফতুয়া। ফর্সা গায়ের রঙ। হাসিখুশি, সহজ-সরল অবয়ব। প্রথম সাক্ষাতেই তাঁর অন্তরের অনাবিল ছোঁয়া পেলাম। সেই সাক্ষাতের দিনেই তিনি বললেন, তোমরা যারা চট্টগ্রামে লেখালেখি চর্চা করছ তাদের সবাইকে স্বাগত জানাই। সে সময় চট্টগ্রামের বাটালি রোডে ডা. শফির বাসভবনে প্রতি মাসে অন্তত একদিন সাহিত্য সভার আয়োজন হতো।
বেলাল মোহাম্মদ সেদিন উপস্থিত সব সাহিত্য কর্মীদের আমন্ত্রণ জানালেন ডেন্টিস্ট শফির বাসভবন অর্থাৎ ‘মুশতারি লজ’-এ। আমরা পুলকিত হলাম। বেলাল ভাইয়ের এ আহ্বান আমাদেরকে একটি নতুন বার্তা দিল। আমরা অর্থাৎ তরুণ কিছু সাহিত্য কর্মীরা যেন আলোকিত একটি পথের সন্ধান পেলাম।
এরপর হতে মুশতারি লজের বৈঠকখানা সে সময়ের তরুণ সাহিত্যসেবীদের এক মিলন ক্ষেত্র হয়ে যায়। প্রসঙ্গত এ ব্যাপারে শহীদ ডা. শফি এবং বেগম মুশতারি শফির বদান্যতা বিশেষভাবে স্মরণীয়।
প্রায় অর্ধ শত বছর আগে তৎকালীন চট্টগ্রামের মতো একটি মফস্বল শহরে সে সময়ের সাহিত্য কর্মীদের এক মঞ্চে জড়ো করার ক্ষেত্রে বেলাল মোহাম্মদ এবং আবুল কাশেম সন্দ্বীপের অবদান অবশ্যই স্মর্তব্য। কেননা আজ অর্থাৎ বর্তমান সময়ে প্রতিষ্ঠিত অনেক লেখক, কবি, সাহিত্যিক বিভিন্ন মত নির্বিশেষে সে সময় মুশতারি লজে সাহিত্য সভায় অংশ নিতেন।
সাহিত্য সভার অনুষ্ঠানে বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন বেলাল মোহাম্মদ। কিন্তু বয়োকনিষ্ঠ আমরা তাঁকে ‘বেলাল ভাই’ সম্বোধন করতাম। কবি বেলাল মোহাম্মদ সহাস্য আন্তরিকতায় সায় দিয়েছিলেন বলেই তাঁর সাথে আমার এক মধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
বেলাল ভাইয়ের কাছে একদিন জানতে চেয়েছিলাম পুঁথি পাঠের মতো সুর-তাল-লয় সংক্রান্ত বিষয় তিনি কিভাবে রপ্ত করেছিলেন! বেলাল ভাই হেসে দিলেন। হয়তো বা তিনি ভাবতে পারেন নি। হঠাৎই এ ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হবেন। তামাশা করে বললেন, চাইলে আমি এখনি সব ধরনের গানই গেয়ে শোনাতে পারি। কিন্তু সে জন্যে সঙ্গীতের পরিবেশ লাগবে। তারপরই গলা খাঁকারি দিয়ে পল্লীগানের সুর তুললেন পরম মমতায়। সত্তর দশক সময়কালে চট্টগ্রাম শহর এখনকার মতো জনবহুল ছিল না। বর্তমান সময়ের মতো আট তলা দশ তলা এত উঁচু ভবনও ছিল না। শুধুমাত্র একটি উঁচু ভবন ছিল। ফিরিঙ্গীবাজার রোডে পি. কে সেনের সাততলা। আর ছিল সুপরিসর উন্মুক্ত স্থান। সবুজ ঘাসে মোড়ানো বিস্তৃত খোলা মাঠ। আমরা তরুণ বয়সি কয়েকজন অবসরে মিলিত হতাম। নিরবচ্ছিন্ন সাহিত্য আড্ডা চলতো। বেলাল ভাই আমাদের সেই আড্ডায় যোগ দিতে চলে আসতেন। খোলা মাঠে সবুজ ঘাসের শত রঞ্জিতে আমাদের সাথে তিনি বসে পড়তেন অবলীলায়। আমাদের মধ্যমণি তখন কবি বেলাল মোহাম্মদ।
সে সময় রেডিওতে সাহিত্য অনুষ্ঠানে অংশ নিতাম। এছাড়াও আমার রচিত কিছু শিশুতোষ নাটিকা প্রচারের সুবাদে বেলাল ভাই একদিন আমাকে সোৎসাহে বললেন রেডিওতে পূর্ণকালীন পাণ্ডুলিপি লেখক হিসেবে যোগ দেবার জন্যে। বেলাল ভাই তখন পূর্ণকালীন পাণ্ডুলিপিকার পদে রেডিওতে নিয়োজিত ছিলেন। আমি তখন সবেমাত্র উচ্চ মাধ্যমিক পড়ছিলাম। ফলে বেলাল ভাইয়ের সেই অভিপ্রায় পূরণ করতে পারলাম না।
বহতা নদীর মতোই সময় বয়ে চলছিল। ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক সরকার নির্বাচনের এই ফল মেনে নিতে গড়িমসি শুরু করে। ফলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেয়। বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ এর ৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সারাদেশ পশ্চিম পাকিস্তানি সেনারা বাঙালি নিরীহ জনগণকে নির্বিচারে হত্যা করে এবং ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। ইতোমধ্যে ২৬ মার্চ সূচনালগ্নে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এসব ঘটনাপ্রবাহে বেলাল মোহাম্মদ এক অকুতোভয় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই সাহসী পদক্ষেপের ফলে বেলাল মোহাম্মদ একটি নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় মুহূর্তে কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠায় সমর্থ হন। পরে তা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র রূপে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নয় মাসব্যাপী কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের পর ১৯৭২ এর গোড়ার দিকে তিনি স্বাধীন দেশে ফিরে আসেন এবং নবগঠিত রাষ্ট্রীয় ‘বাংলাদেশ বেতার’-এ যোগ দেন। ১৯৭৪ সালে স্নাতকোত্তর শেষে আমি সরকারি ভূমি জরিপ বিভাগে যোগ দিই। ১৯৭৬-এ চট্টগ্রামে সন্দ্বীপ উপজেলায় ভূমি জরিপ শুরুর সময় সন্দ্বীপের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে একটি মত বিনিময় সভায় উপস্থিত হই। সেখানে বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন। এর মাঝে বেলাল ভাইকে দেখতে পাবো ধারণাই ছিল না। সভাস্থলে উপস্থিত হতেই তিনি আমাকে চিনতে পারলেন। দু’হাত বাড়িয়ে কাছে এগিয়ে এসে গভীর আবেগে জড়িয়ে ধরলেন আমাকে। সে এক নিবিড় আলিঙ্গন। পরে জানলাম বেলাল ভাই সন্দ্বীপের সন্তান। উপজেলার মুসাপুর তাঁর জন্ম গ্রাম। তিনি তখন বাংলাদেশ বেতারে সহকারী আঞ্চলিক পরিচালক। আমি চট্টগ্রামে সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার হিসেবে কর্মরত সে সময়।
তিনি আমাকে তাঁর জন্মস্থান মুসাপুর গ্রামে নিয়ে গেলেন। ঘুরে দেখালেন সাগরের করাল গ্রাসে ভিটে বাড়ি বিলীন হয়ে যাওয়া মানুষের করুণ অবস্থা। সে সময় সিলেট বেতারে কর্মরত ছিলেন তিনি। দূরে থাকার কারণে শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে না পারার দুঃখবোধ তাঁকে সব সময় পীড়া দিত। কারণ ৪০-৪৫ বছর আগে যোগাযোগ ব্যবস্থা বর্তমান সময়ের মতো এত ভালো ছিল না। সে সময় ছিল না মোবাইল ফোন। সন্দ্বীপের সাথে তখন যোগাযোগ হতো অয়্যারলেসের মাধ্যমে। এরপর দীর্ঘ বিরতিতে তাঁর সঙ্গে কয়েকবার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। তাঁর পারিবারিক কিছু বেদনার কথা জেনেছিলাম।
মৃত্যুর আগে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন বেলাল ভাইকে সম্মাননা দেবার জন্য সভার আয়োজন করেছিল। সেখানে আমি উপস্থিত হয়েছি নিতান্তই দর্শক হিসেবে। সভার আগে সামনের চেয়ারে বসেছিলেন তিন্‌ি মঞ্চে আসন গ্রহণ করার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে আমি তাঁর মুখোমুখি হলাম। বেলাল ভাই সেখানে হঠাৎ আমাকে দেখে আগের মতোই উচ্ছ্বসিত হলেন। হাত ধরে পাশে বসালেন। তিনি বেতারের চাকরি থেকে অনেক আগেই অবসর নিয়েছেন। আমিও অবসরপ্রাপ্ত। কুশল জিজ্ঞেস করতেই বললেন, প্রকৃত মুক্তি সুদূরপরাহত। আমি তাকিয়ে থাকলাম তাঁর দিকে। বার্ধক্যে মুখ আর চিবুকের চামড়া কুঁচকে গেছে বেলাল ভাইয়ের। আমি তাঁকে আর কিছু বলতে পারলাম না।
উদ্যোক্তাদের আহ্বানে তিনি মঞ্চে উঠে আসন গ্রহণ করলেন। রীতিমাফিক সবকিছু এগুচ্ছিলো। সম্বর্ধিত ব্যক্তি সম্পর্কে প্রশংসা বাক্য উচ্চারিত হলো। উত্তরীয় তাঁর গায়ে জড়ানো হলো। তিনি কিছু বলবেন। তাই মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেন ঋজু ভঙ্গিতে। উজ্জ্বল আলোর বন্যায় তাঁর শুভ্র বসন, সফেদ লুঙ্গি, মাথায় সাদা পাকা এলোমেলো চুল তাঁকে যেন আরো ধবল করে তুলল। -বেলাল ভাইয়ের এই ছবি আমার চোখে আজও অমলিন। কেননা তিনি এ রকম সহজ-সরল, সাদাসিধে জীবন যাপন করে গেছেন আমৃত্যু।
তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ চিকিৎসা শাস্ত্রের শিক্ষার্থীদের জন্য সমর্পণ করা হয়েছে। বেলাল মোহাম্মদের এই অন্তিম ইচ্ছা মানব কল্যাণকর। বিত্ত-বৈভবের প্রতি কখনোই তিনি লালায়িত ছিলেন না। তাই তাঁর জীবনের সঞ্চয় তিনি দান করে গেছেন তাঁর গ্রামের হতদরিদ্র মানুষের জন্যে। মাটি ও মানুষকে যিনি ভালোবাসেন তাঁর মৃত্যু নেই। তাঁর আছে অমরতা। কবি বেলাল মোহাম্মদ এভাবেই আমাদের মাঝে আজও বেঁচে আছেন। মরেও তিনি যেন আমাদের জন্যে রেখে গেলেন তাঁর মৃত্যুহীন প্রাণ।

x