বেগম রোকেয়ার শিক্ষা দর্শন

ড. আনোয়ারা আলম

সোমবার , ৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:৩৭ পূর্বাহ্ণ

বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যু ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর। অবরোধ যুগে বসবাস করেও তিনি নিজের ব্যক্তি সত্তাকে বিকশিত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। ‘আত্মসচেতন সত্তা মাত্রই বড় কোন ক্ষেত্র, উচ্চতর কোন কোন আদর্শের জন্ম দেয়’- ‘সময়ের প্রবাহে অগ্রসর চিন্তার সাথে যুক্ত করে রোকেয়া হয়ে ওঠেন এক ঐতিহাসিক সত্তা। ১৯০৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয় রোকেয়ার প্রথম গ্রন্থ মতিচূর (প্রথম-খ)। দক্ষিণারঞ্জন মিত্র এ গ্রন্থের একটি দীর্ঘ আলোচনা লিখেছিলেন- ‘বঙ্গ সাহিত্য সম্ভারে এ শ্রেণির সর্বপ্রথম গ্রন্থ মতিচূর অমূল্য রত্নখণ্ড। . . . মতিচূর পড়িতে পড়িতে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কমলাকান্ত’, লোক রহস্য এবং কালী প্রসন্নের ‘ভ্রান্তি বিনোদ’ মনে পড়ে। . . . মতিচূর শুধু হিন্দু- মোসলেম সমাজকে নহে, সর্বশ্রেণির পাঠককে ভাবতরঙ্গে আলোড়িত করিয়াছে। মুসলমান মহিলা লিখিত সর্বপ্রথম বাঙলা গ্রন্থের এ ক্ষমতা কত দূর বিস্ময়কর, তাহা ভাষায় বুঝানো সুকঠিন’। (রোকেয়া রচনাবলী, পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত নতুন সংস্করণ ডিসেম্বর ২০০৬, বাংলা একাডেমি, পৃ. ৫৬২)
বেগম রোকেয়ার প্রথম ইংরেজি রচনা, ব্যঙ্গ রসাত্মক রূপক রচনা ঝঁষঃধহ্থং উৎবধস প্রকাশিত হয় মাদ্রাজ থেকে কমলা সাতমিয়া নামান ও সরোজিনী নাইডু সম্পাদিত ওহফরধহ খধফরবং গধমধুরহব পত্রিকায় ১৯০৫ সালে- গ্রন্থ রূপ লাভ করে ১৯০৮ সালে। ১৯০৮ সালের ডিসেম্বরে একটি সমালোচনায় বলা হয়েছিল-‘ডব যধাব ভড়ঁহফ ধ মবহঁরহব চষবধংঁৎব রহ ঃযব চবৎংঁধষ ড়ভ ঃযব নড়ড়শষবঃ. ওঃ ংববসং ঃড় ঁং ঃযধঃ গৎং. জ. ঝ. ঐড়ংংধরহ ঃযব ধনষব ধঁঃযড়ৎবংং রং ধ ষধফু ড়ভ যিড়স ধহু হধঃরড়হ সধু নব ঢ়ৎড়ঁফ.্থ (পূর্বোক্ত-পৃ.৫৮৭)
মতিচূর (দ্বিতীয়-খ) প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালে। এতে প্রবন্ধ, রূপকথা ও গল্পসহ বিভিন্ন ধরনের রচনা পদ্মরাগ উপন্যাস ১৯২৪ সালে- নকশা জাতীয় রচনার ‘সংকলন’ অবরোধবাসিনী ১৯৩১ সালে-এছাড়া বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর অনেক ইংরেজি ও বাংলা প্রবন্ধ, ছোট গল্প, কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল- এছাড়া লিখিত অনেক অভিভাষণও ছিল। তাঁর সমস্ত সাহিত্য কর্মের মূল দর্শন ছিল নারীর সমতা ও মুক্তি।
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জীবৎকাল (১৮৮০-১৯৩২) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিশ শতকের প্রথম দশকে তাঁর সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বের উত্থান ঘটে। তাঁর চিন্তা চেতনার প্রসারও ঘটে এ সময়ে। তখন থেকেই তিনি লেখক- সমাজকর্মী- শিক্ষাব্রতী সহ নানা ভূমিকায় এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি আধুনিক, বাস্তববাদী, যুক্তিসিদ্ধ ও বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তা চেতনার স্বাক্ষর রেখেছেন।
বেগম রোকেয়ার আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল নারীর সার্বিক মুক্তি এবং সমতা অর্জন। তবে তিনি কাজ করেছেন মূলত নারী শিক্ষার প্রসার ও অবরোধ প্রথা বিলোপকে সামনে রেখে। ইউরোপ আমেরিকার নারীবাদী আন্দোলনের প্রথম তরঙ্গ ছিল মুখ্যত দার্শনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু রোকেয়ার দর্শন ছিল সৃজনশীল ও বুদ্ধিভিত্তিক চর্চার পাশাপাশি তার বাস্তব অনুশীলন- যা তিনি করেছেন সাংগঠনিক কার্যক্রমের মধ্যে দিয়ে। ভারতীয় উপমহাদেশের পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় এ আন্দোলনকে দ্বিতীয় পর্যায়ে ফেলা যায়- সতীদাহ প্রথা বাতিল ও বিধবা বিবাহ চালুর আন্দোলন হচ্ছে প্রথম পর্যায়- রোকেয়ার স্বসম্প্রদায় যাদের নিয়ে তিনি কাজ করেছেন- সেই মুসলিম সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ছিলেন পথিকৃত।
রোকেয়া শিক্ষাকেই নারীমুক্তির প্রথম ও প্রধান অবলম্বন হিসেবে আঁকড়ে ধরেছিলেন এবং এর জন্য প্রাণপাত করেছেন- প্রথমে লেখনী এবং একই সাথে প্রতিষ্ঠা করেছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন। তিনি বলেছেন, ‘শিক্ষা বিস্তারই এসব অনাচার নিবারণের একমাত্র উপায়। শিক্ষা দর্শন হচ্ছে কি শেখাব এবং যা শেখাব তা কেন শেখাব? এ বিষয়ে একটা সুসংহত রূপ হচ্ছে শিক্ষা দর্শন- প্লেটো-রুশো-হাবার্ট, জন ডিউই রাসেল এরা সবাই এই বিষয়টিই যুক্তিপূর্ণভাবে উপস্থাপন করেছেন বিভিন্ন গ্রন্থে- রোকেয়ার শিক্ষা দর্শন ও বিভিন্ন প্রবন্ধে- গল্পে- উপন্যাসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তিনি পরিবারে পুত্র ও কন্যার শিক্ষা অর্জনে সমান অধিকারের কথা যেমন বলেছেন- তেমনি বলেছেন- প্রকৃত সুশিক্ষা চাই যাহাতে মস্তিষ্ক ও মন উন্নত হয়’। আর প্রকৃত শিক্ষা তাঁর মতে- কোন সম্প্রদায় বা জাতি বিশেষের অন্ধ অনুকরণ নয়-মানুষের মধ্যে সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত স্বাভাবিক জ্ঞান বা ক্ষমতা অনুশীলন বা ব্যবহারের মাধ্যমে এই ক্ষমতা বাড়ানো যায়- শিক্ষক দার্শনিক ফ্রয়েবেলও বলেছেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য ব্যক্তিত্বের বিকাশের উপায় প্রাণহীন নয়- মন্তেসরি শিক্ষা পদ্ধতির ড. মারিয়া মন্তেসরি শিক্ষা দর্শনের সঙ্গেও রোকেয়ার দর্শন তুলনীয়- রোকেয়ার কাছে ‘মস্তিষ্ক ও মন উন্নত করতে পারাটাই হচ্ছে শিক্ষিত জনের মূল্যায়নের মাপকাঠি- প্লেটোর মতে-শিক্ষা বলতে সেই প্রশিক্ষণকে বুঝি যা উপযুক্ত অভ্যাস বা অনুশীলনের মাধ্যমে শিশুর মধ্যেকার প্রাথমিক সহজাত গুণাবলীর প্রতি দেওয়া হয়।
নারী শিক্ষা বিস্তারই ছিল রোকেয়ার জীবনের প্রধান কর্তব্য কাজ। স্বামীর মৃত্যুর পরই (অক্টোবর, ১৯০৯) তিনি ভাগলপুরে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন-শুধু ছাত্রী শিক্ষা বাড়ানো নয়- বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ওপর গুরুত্ব দেন। ঐ সময়ে তিনি সরকারকে এ বিষয়ে লেখেন এবং তাঁর প্রচেষ্টায় সরকারিভাবে ১৯১৯ সালের শেষভাগে কলকাতায় একটি মুসলিম মহিলা ট্রেনিং স্কুল স্থাপন করা হয়।
শিক্ষাদান পদ্ধতির ক্ষেত্রে বেগম রোকেয়া বাস্তববাদী ও প্রয়োগবাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছিলেন। ‘ যে না বুঝিয়া থাক, আমাকে জিজ্ঞাসা কর আমি বুঝাইয়া বলি’। এ বক্তব্যে শিক্ষণ শিখন প্রক্রিয়ায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর ভূমিকা সম্পর্কে তাঁর মতামত যে কতটা আধুনিক তা বোঝা যায়। কেবল পর্যবেক্ষণ নয়, শিক্ষা লাভের পদ্ধতি হিসেবে অনুসন্ধান, শ্রেণিকরণ ও পরীক্ষণের ওপরও গুরুত্ব প্রদান করেন। একই সাথে শিক্ষকদের ভূমিকা বিষয়ে বলেন, আন্তরিকতাপূর্ণ, হাসি খুশি, সহিষ্ণু এবং যে কোন বিষয়ে জানার ও জ্ঞান রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। একইভাবে যেমন বাট্রেন্ড রাসেল- ‘শিক্ষকের উচিত তার শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা’।
শুধু মানসিক শিক্ষা নয়- শারীরিক শিক্ষার গুরুত্ব দিয়ে মেয়েদের লাঠি খেলা, ছোরা খেলাসহ যাঁতায় আটা প্রস্তুত বা ঢেঁকির সাহায্যে ধানভানা সহ সার্বিক কাজে পারদর্শী হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। অবসর বিনোদনে সৃজনশীল কাজ যেমন ছবি আঁকা ও গান শেখার বা নাচ-আবৃত্তি ইত্যাদি বিষয়গুলোও তাঁর পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফ্রয়েবেল বা ডিউই ও একইভাবে সৃজনশীলতার চর্চার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
শিক্ষার লক্ষ্য, বিষয়বস্তু, পদ্ধতি ও পরিবেশ সম্পর্কে রোকেয়ার বক্তব্য পর্যালোচনা করলে গভীর উপলব্ধিতে তিনি মানুষের মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির কথা বলেছেন, একই সাথে তাঁর মতে শিক্ষার কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত গুণাবলী বিকাশের সাথে সুনাগরিক হওয়ার লক্ষ্যে সমকালীন দার্শনিক জন ডিউই ব্যক্তিতান্ত্রিক লক্ষ্য ও সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্য-দুই দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় সাধন করেছেন শিক্ষার সাথে গণতন্ত্রের নিবিড় সম্পর্কের ধারণা প্রবর্তন করে। এখানে উল্লেখ্য রোকেয়ার কাছে ব্যক্তির সুসামঞ্জস্য উন্নয়ন প্রাধান্য পেয়েছে।
পরিশেষে বলতে হয়- সাহিত্যিক ও সমাজ সেবীর পাশাপাশি রোকেয়া ছিলেন সত্য দ্রষ্টা।- মননশীল ও প্রাগ্রসর মানসিকতাসম্পন্ন শিক্ষা দার্শনিক। বিশ শতকের প্রথম সিকিভাগের মধ্যে তিনি শিক্ষা বিষয়ের যেসব বক্তব্য রেখেছেন সে ধরনের বক্তব্য সেই সময়ের এবং পরের দশকের পাশ্চাত্য দার্শনিকদের মধ্যে পাই। সেসব দিক নির্দেশনা অনুসরণ করে প্রতীচ্য অনেক দূর এগিয়ে গেলেও- আমরা কি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পেরেছি?
লেখক : সাহিত্যিক; সাবেক অধ্যক্ষ, আগ্রাবাদ মহিলা কলেজ

x