‘বৃষ্টি হলে সব ভিজে, শুধু শূন্য বুকটা ভিজে না ’

তানভিরুল মিরাজ রিপন

মঙ্গলবার , ১৫ অক্টোবর, ২০১৯ at ৫:২৬ পূর্বাহ্ণ
44

রাষ্ট্র জুড়ে চলছে অনিয়ম, চলছে অত্যাচার, অন্যায়। কেউ থামাতে পারছে না। থামানোর কথা যদি কেউ বলে তাঁর চাকরি থাকে না, তাঁর প্রাণ থাকে না, বাড়ি ঘর রাতারাতি ভেংগে চুরমার, রাতারাতি আগুনে ভস্মীভূত হয়ে যায়। কেউ এসে ডাকাতি করছে শান্তি, কেউ এসে কানের গোড়ায় একজন স্বাভাবিক মানুষকে মাইক দিয়ে মিথ্যে বানোয়াট উন্নয়নের কথা শুনিয়ে কান ঝালাই করে দিচ্ছে। লাখো মানুষের স্বপ্নকে ভেংগে চুরমার করে দিচ্ছে অদৃশ্য একটি দানব। আইন করছে লুটেপুটে খাওয়ার, আইন করছে কথা না বলতে পারার। মানুষ আর কথা বলে না, বলতে ভয় পায় বলে কথা বলে না। তবে, সকল অনিয়মের, ডাকাতের দলেরা জানে যে, ‘ভয় পাওয়ার আরেক নাম শক্তিশালী হওয়া।’ মানুষের ভয় দীর্ঘদিন ধরে লালিত হতে থাকলে সেটি বিপ্লবের। সেটি চির নূতনেরে ডেকে আনে।
এতোক্ষণ যে ভূমিকা রচনা করলাম, তাঁর ভেতরে ঢুকতে হলে, একটি সংলাপ হয় দরজা, দরজা আকারটি হয়েছে, ‘ভালোবাসারা যখন মুখোমুখি হয়, তখন পৃথিবীর ঐ মুহূর্তটি ছাড়া অন্যসব অকারণে ঘটে, অকাজের জন্যই চলমান।’ এরপরও পৃথিবী ছেড়ে কেউ কি অন্য, আর কোনো মানুষ্য জীবন পেতে পারে? সম্ভব এও? জানি না।
বলছিলাম শক্তিমান নাটক লেখক মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘ক্যাপ্টেন হুররা’ আজ চট্টগ্রাম শিল্পকলায় মঞ্চায়ন হয়েছে সেটির কথা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক ও সভাপতির নাট্য নির্দেশনায় নাটকটি চরিত্রগুলো জীবন্ত হয়ে হাঁটছে, কথা বলছে। অনিয়মগুলোর পুঞ্জীভূত চরিত্রায়ন করে সমাজকে স্পষ্ট করে দিয়েছে চরিত্রগুলো।
সংলাপ মানুষকে নিশ্চিত তাড়িত করবে কারণ সংলাপের সাথে আমাদের নিত্য নৈমিত্তিক জীবন ও যাপনের একটা দৃঢ় যোগসূত্র রয়েছে। সামপ্রতিক সময়ে রাষ্ট্র ব্যাপী যেভাবে ইট ও কংক্রিটের অভিযান চলছে উন্নয়নের নামে তারই স্বরূপ তুলে এনেছেন সুনীল আর ইরার যুগল মূহুর্তের সংলাপগুলো। স্বপ্নের অনেক ধরনের ব্যাখ্যা থাকলেও মানুষতো তার পৃথিবী ছাড়া একটি নিঃশ্বাসের দূরত্ব রেখে ভাবতে পারে না। পৃথিবীর সাথে জীবনের দূরত্ব নিঃশ্বাসের সমান। সেজন্য বলছে ‘যুদ্ধের যত জায়গা পৃথিবীতে রয়েছে,কিন্তু দুটো একসাথে বসে শান্তিতে কথা বলবার জায়গাটুকু নেই।’
আসলেই নেই আজকাল প্রেমিক যুগল পার্কে বসে আড্ডালাপ করলে, কিংবা বন্ধু বন্ধুর জন্য পার্কে বসে অপেক্ষা করলে গ্রেফতার হতে হয়। কারন পুঁজির উত্থান এতটা বেশি হয়েছে যে কেউ যদি পার্কে বসে আলাপ করে,রেস্তরায় না গিয়ে। এতে করে রাষ্ট্রের অর্থে আঘাত ঘটে। সুতরাং গ্রেফতারই মুখ্য।
চন্দ্রনাথের দেওয়া একটি মানচিত্রের প্রতি সকলের দৃষ্টি, খুঁজছে সে মানচিত্র, ক্যাপ্টেন হুররা থেকে চৌধুরী সকলে, একটি নতুন দেশ, নতুন ভাবনা, নতুন বায়ু। তখন মাঝে মাঝে দেশটি হয়ে উঠছে জাহাজ, মাঝে মাঝে দেশ একটি পাড়া হয়ে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে বন। সংলাপে জীবনের সংজ্ঞাকে খুব সুন্দর বিন্যাস করেছে। জীবন শব্দটির প্রথম শব্দটি বাদ দিলে হয় ‘বন’ পরের শব্দটি বাদ দিলে হয় ‘জীব’। সুতরাং ‘জীব’ ও ‘বন’র সমন্বিতরূপই হলো ‘জীবন’।
জনজীবন অতিষ্ঠ। নাগরিকরা বিশ্বজুড়ে না নাগরিক। কাঁটাতারে বাধা পড়ছে চিন্তা, চেতনা। মানুষেরই পৃথিবী। অথচ কাঁটাতারে ভাগ হয়ে আসে সম্পর্ক, জাত, চেতনা। জেনেশুনে পান করতে হয় জাতীয়তাবাদের বিষ। মানুষ ভয়ার্থ হয়ে যাচ্ছে, বাঁচার জন্য এড়িয়ে যাচ্ছে। ‘এড়িয়ে যাওয়া মানে মুক্তি পাওয়া নয়’ মুক্তি পেতে হলে লড়তে হয়। শূন্য মন যতক্ষণ ভিজে না ততক্ষণ লড়তে হয়। তাই স্পষ্ট করেছে নাটকটি।
নাটকটিতে কৌতুক ঘরানার রূপক ও সংলাপের উপস্থিতি থাকলেও, সত্যের একটি প্রতিরূপ হিসেবে চরিত্রায়নে সকল কিছু ফুটে উঠেছে। নাটকের মঞ্চায়ন, আলোকসজ্জা, সেট এবং পোশাক ও আবহ সঙ্গীত শামীম হাসানের নির্দেশনাতে অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে।
আলম খোরশেদের উপস্থিতি পুরো অনুষ্ঠানকে আলোকময় করলেও, কিন্তু থেকে যায়, অথবা বলে একটা শব্দ সংযুক্ত করা যায়, গঠনমূলক একটি সমালোচনা বলে একটি শব্দ উঠে আসে। নাটকের শিক্ষার্থীদের কাছে শিখবার আছে, জানবারও আছে। কিন্তু তেমন কোনো প্রত্যাশিত মানুষের জোয়ার দেখা না দিলেও দর্শক ছিলো বলা চলে। এরপরেও নাটকের এই দুর্দিনেও নাটকের চর্চা চলছে, উৎসব চলছে। মন্দা কাঁটাবার একটি জোর প্রয়াস চলছে যেখানে। সেখানে নাটকের সাথে জড়িত সকল মানুষগুলোকে আগে প্রত্যাশা সবাই করেন। কিন্তু নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরাওতো পারতো শূন্য আসন ভরাট করতে। টিউশনের চেয়েও যে নাটক গুরুত্বপূর্ণ এটিরও বোধগম্যতা মনে আসা দরকার। সেটির জন্য অনেকেই জড়িত।
এরপরও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের ‘শরৎ নাট্য উৎসব’ সফল হয়েছে৷ তিনদিনের প্রতিটি নাটকই সুন্দর ও সফল নির্দেশনাতে মঞ্চায়ন হয়েছে।
তমাশা কাটাতে যদি চাও তবে আলোর মশাল হাতে নিয়ে নেমে এসো, নেমে এসো ঘোর তমশা কাটাতে। অন্তত আলোর শিখা তো হাতে নাও।

x