বুয়েটের ২৫ ছাত্রের বিরুদ্ধে চার্জশিট

আবরার হত্যা : বিচার দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালে

আজাদী ডেস্ক

বৃহস্পতিবার , ১৪ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:০০ পূর্বাহ্ণ
204

বুয়েটছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় ২৫ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেছেন, এই ২৫ জনের মধ্যে ১১ জন আবরারকে হত্যায় সরাসরি অংশ নেয়। আর সেখানে উপস্থিতি এবং অন্যভাবে সম্পৃক্ততার কারণে বাকি ১৪ জনকে অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়েছে। তিনি বলেন, শিবির হিসেবে সন্দেহের বিষয়টি ছিল আবরারের ওপর নির্যাতনের ‘একটি কারণ’। আসলে বুয়েট ছাত্রলীগের ওই নেতাকর্মীরা অন্যদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য উচ্ছৃঙ্খল আচরণে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। গতকার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম
আদালতে এই অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গোয়েন্দা পরিদর্শক ওয়াহিদুজ্জামান। পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের অতিরিক্ত উপ কমিশনার জসিম উদ্দীন জানান, অভিযোগপত্রে মোট ২১টি আলামত, ৮টি জব্দ তালিকা যুক্ত করা হয়েছে।
অভিযোগপত্র আদালতে জমা পড়ার আগে মিন্টো রোডে পুলিশের গণমাধ্যম কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আসেন অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল। তিনি বলেন, অভিযোগপত্রের আসামিদের মধ্যে ১৯ জনের নাম এজাহারেই উল্লেখ ছিল। পুলিশ তদন্তে নেমে আরও ৬ জনের সম্পৃক্ততা পেয়েছে। অভিযোগপত্রের ২৫ আসামির মধ্যে চারজন পলাতক। তাদের মধ্যে -জিসান, এহতেশামুল রাব্বি তানিম ও মোর্শেদ এজাহারভুক্ত আসামি। আর মুজতবা রাফির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে তদন্তে। মনিরুল জানান, অভিযোগপত্রে মোট ৩১ জনকে সাক্ষী রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে বাদীপক্ষের ৬ জন ছাড়াও বুয়েটের সাতজন শিক্ষক, ১৩ জন শিক্ষার্থী এবং ৫ জন কর্মচারী রয়েছেন। খবর বিডিনিউজের।
এদিকে আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার বিচার দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালে হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। আলোচিত এই মামলায় পুলিশ অভিযোগপত্র দেওয়ার পর গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের একথা জানান তিনি। আবরার হত্যাকাণ্ডের পর বুয়েট শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে দ্রুত বিচারের দাবি উঠেছিল। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে যে কোনো মামলা ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করা না গেলে আরও ৪৫ দিন সময় নিতে পারে আদালত।
এখন বিচার শুরুর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে মামলাটি দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের আবেদন আসতে হবে। দ্রুত এই বিচার শুরুর আশা প্রকাশ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালও। আইনমন্ত্রী বলেন, এটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আবেদন আসতে হয়, আবেদন আসলে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এ মামলা (নিষ্পত্তি) করার জন্য আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে এবং দ্রুততার সাথে করার জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এ বিচারকার্য করব। বিচার শেষ হতে কত সময় লাগতে পারে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার করা হলে এ বিচার প্রথম সময় হচ্ছে ৯০ দিন, এর পরে হচ্ছে ৩০ দিন, সর্বমোট ১২০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন না করতে না পারলে পরে আরও ১৫ দিনের সময় আছে অর্থাৎ ১৩৫ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করতে হবে। ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত হত্যার বিচার দ্রুত শেষ করার বিষয়টি দেখিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, জনগণ চেয়েছে নুসরাত হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত করার জন্য, সেটাও সম্পন্ন করা হয়েছে, এরকম অনেক বলা যাবে। এখন দায়িত্ব বর্তেছে আবরার হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত শেষ করতে হবে।
আবরার হত্যার আসামি যারা : এজাহারের ১৯ আসামি হল- বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, সহ-সভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার, সাহিত্য সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির, ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, উপ-সমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশারফ সকাল, সদস্য মুনতাসির আল জেমি (এমআই বিভাগ), সদস্য মুজাহিদুর রহমান, সদস্য হোসেন মোহাম্মদ তোহা, সদস্য এহতেশামুল রাব্বি তানিম, শামীম বিল্লাহ, মাজেদুল ইসলাম, আকাশ হোসেন, খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর, মাহমুদুল জিসান, মোয়াজ আবু হোরায়রা, এ এস এম নাজমুস সাদাত, মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম।
এজাহারের বাইরের ৬ আসামি হল- বুয়েট ছাত্রলীগের গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক ইসতিয়াক আহমেদ মুন্না, আইন বিষয়ক উপ-সম্পাদক অমিত সাহা, মিজানুর রহমান, শামসুল আরেফিন রাফাত, উপ-দপ্তর সম্পাদক মুজতবা রাফিদ এবং মাহামুদ সেতু।
পলাতক ৪ জন হল- এহতেশামুল রাব্বি তানিম, মাহমুদুল জিসান, মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম এবং মুজতবা রাফিদ।
স্বীকারোক্তি দেয়া ৮ জন হল- মেহেদী হাসান রবিন, অনিক সরকার, ইফতি মোশাররফ সকাল, মনিরুজ্জামান মনির, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ, এ এস এম নাজমুস সাদাত এবং খন্দকার তাবাখ্‌খারুল ইসলাম তানভীর।
মারপিটে সরাসরি জড়িত ১১ জন হল- মেহেদী হাসান রবিন, অনিক সরকার, ইফতি মোশাররফ সকাল, মনিরুজ্জামান মনির, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ, শামীম বিল্লাহ, এ এস এম নাজমুস সাদাত, মুনতাসির আল জেমি, এহতেশামুল রাব্বি তানিম এবং খন্দকার তাবাখ্‌খারুল ইসলাম তানভীর।
ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত ১১ জন হল- মেহেদী হাসান রাসেল, মুহতাসিম ফুয়াদ, মেহেদী হাসান রবিন, অনিক সরকার, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মনিরুজ্জামান মনির, ইফতি মোশাররফ সকাল, মুনতাসির আল জেমি, এহতেশামুল রাব্বি তানিম, মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ এবং মুজতবা রাফিদ। এ মামলায় গ্রেপ্তার ২১ জনের মধ্যে আটজন ইতোমধ্যে আদালতে দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন; তাদের সবাই বুয়েট ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী। আবরারকে কীভাবে ক্রিকেট স্টাম্প আর স্কিপিং রোপ দিয়ে কয়েক ঘণ্টা ধরে বেধড়ক পেটানো হয়েছিল, সেই ভয়ঙ্কর বিবরণ উঠে এসেছে তাদের জবানবন্দিতে।
মনিরুল বলেন, তদন্তকালে সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, রাত ১০টার পরে আবরারকে নির্যাতন করা শুরু হয় এবং রাত ২টা ৫০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। এর আগে যদি তাকে হাসপাতালে নেওয়া হত তাহলে হয়তো এমন পরিণতি হত না। আবরারকে নির্যাতনে ব্যবহৃত পাঁচটা ক্রিকেট স্ট্যাম্প, একটি স্কিপিং রোপ, দুটি সিসিটিভি ক্যামেরার ডিভিডি, পাঁচটি মোবাইল ফোন এবং একটি ল্যাপটপ এ মামলার আলামত হিসাবে রাখা হয়েছে। আবরার নিহত হওয়ার আগে ফেইসবুকে তার শেষ পোস্টে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের করা কয়েকটি চুক্তির সমালোচনা করেছিলেন। আবরারকে কেবল শিবির সন্দেহে ডেকে নেওয়া হয়েছিল, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল- এই প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, একক কোনো কারণে নয়, শিবির করে এটি একটি মাত্র কারণ। ওরা এ ধরনের উচ্ছৃঙ্খল আচরণে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। ছোটখাটে বিষয়ে কেউ একটু দ্বিমত পোষণ করলে, কিংবা কেউ এদের বিরুদ্ধে কথা বললে, কিংবা সালাম না দেওয়ার কারণেও এই র‌্যাগিংয়ের নামে, মানে অন্যদেরকে, নতুন যারা আসবে, তাদের আতঙ্কিত করে রাখার জন্যই তারা এই কাজগুলো করে অভ্যস্ত।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এসব বিষয় হল বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দেখার কথা। কিন্তু তদন্তে পুলিশ হল কর্তৃপক্ষের ‘এক ধরনের ব্যর্থতা’ দেখতে পেয়েছে। ওই ছাত্রলীগকর্মীদের হাতে অনেকেই নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছে জানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল বলেন, কেউ মামলা করতে চাইলে করতে পারে। তা তদন্ত করে দেখা হবে।
এ বিষয়ে এক প্রশ্নে মনিরুল বলেন, অমিত সাহা এর আগেও একজনকে পিটিয়েছে। আবরারকে মারপিটের সময় সে উপস্থিত না থাকলেও তাকে ডেকে আনাসহ তার বিষয়ে খোঁজ খবর নেওয়ার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এ কারণে তাকে আসামির তালিকায় প্রথম দিকে রাখা হয়েছে।

x