বুলবুলে নিহত ১৭, কয়েক হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত

ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

আজাদী ডেস্ক

মঙ্গলবার , ১২ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:১৪ পূর্বাহ্ণ
26

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের দমকা হাওয়ায় গাছ ও ঘর চাপা পড়ে উপকূলীয় দশ জেলায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে খুলনা, বরগুনা, পটুয়াখালী ও গোপালগঞ্জে দুজন করে এবং ভোলা, শরীয়তপুর, পিরোজপুর, মাদারীপুর, বরিশাল ও বাগেরহাটে একজন করে মারা গেছেন। এছাড়া দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলাগুলোতে উপড়ে গেছে বহু গাছ, বিধ্বস্ত হয়েছে কয়েক হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি। ভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লক্ষাধিক হেক্টর জমির ফসল। অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কয়েকলাখ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন।
৪ লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন : বুলবুলের তাণ্ডবে খুলনা বিভাগের পাঁচ জেলায় চার লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে বলে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ওজোপাডিকো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ওজোপাডিকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শফিক উদ্দিন বলেন, খুলনা বিভাগের পাঁচ জেলায় ৩২টি ফিডারের আওতায় চার লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে বুলবুলের আঘাতে। বিদ্যুতের তারের ওপর গাছ পড়ে এবং ট্রান্সফরমার নষ্ট হয়ে এই বিপর্যয় দেখা দিয়েছে বলে তিনি জানান। অধিকাংশ স্থানে বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়িতে পানির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। পানি-বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক বাড়িতে রান্নাও চলছে না। জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার্থীরা বিপাকে পড়েছে।
পটুয়াখালীতে ২৮১০ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত : বুলবুলের তাণ্ডবে পটুয়াখালীতে বিধ্বস্ত হয়েছে দুই হাজার ৮১০টি ঘরবাড়ি। গত রোববার সকালে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক (ডিসি) মতিউল ইসলাম চৌধুরীর স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে ২৮ হাজার ৫০৮ হেক্টর ফসল, দুই হাজার ৮১০টি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত, গবাদি পশু নিখোঁজ ও ক্ষতি ২০টি, এক হাজার ৪২৮টি হাঁস-মুরগি, দুই লাখ এক হাজার ৩০০টি গাছপালার ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ রয়েছে। খবর বিডিনিউজ ও বাংলানিউজের।
খুলনায় ২ হাজার ঘর বিধ্বস্ত : খুলনার কয়রা ও দাকোপ উপজেলায় প্রায় দুই হাজার ২৬৫টি ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে পাঁচ শতাধিক পুকুর ও মাছের ঘের। গত রোববার খুলনা জেলা প্রশাসন ও দাকোপ উপজেলা প্রশাসন এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বরিশালে পানির নিচে লক্ষাধিক হেক্টর জমির ফসল : বুলবুলের আঘাতে পানিতে তলিয়ে গেছে বরিশালের লক্ষাধিক হেক্টর জমির ফসল। যদিও এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে পারেনি কৃষি অধিদপ্তর। গতকাল সোমবার কৃষি অধিদপ্তরের বরিশাল জেলা কার্যালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলার দশ উপজেলায় ১ লাখ ৩৩ হাজার ৭৪২ হেক্টর জমিতে ফসল আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৫ হাজার ২শ’ ৭০ হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। জেলা কৃষি অফিসের দেওয়া তথ্যনুযায়ী, শুধুমাত্র আমন ধান রোপণ করা হয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ৫৩ হেক্টর জমিতে। আর বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে ১ লাখ হেক্টর জমির ধান। এছাড়া ২ হাজার হেক্টর বিভিন্ন ধরনের সবজি, ১ হাজার ৩শ’ ৫০ হেক্টর খেসারি ডাল, ১শ’ ৮০ হেক্টর ধনিয়া, ৪শ’ ৬৬ হেক্টর কলা, ৩শ’ হেক্টর পেঁপে ও ১ হাজার ৩শ’ ৪০ হেক্টর জমির পান পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে।
বুলবুলকে ঠেকিয়েছে সুন্দরবন : অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল উপকূল অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় ঢাল হিসেবে কাজ করেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন। ফলে লোকালয়ে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির শঙ্কা অনেকটাই কমে এসেছে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদ ও বনকর্মীরা । বুলবুলের শক্তি যখন সর্বোচ্চ মাত্রায় ছিল, তখন ঘণ্টায় দেড়শ কিলোমিটার গতির বাতাস নিয়ে উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছিল এ ঝড়। তবে উপকূল অতিক্রম করার আগে আগে এর শক্তি কিছুটা কমে আসে। ঘণ্টায় ১১৫ কিলোমিটার থেকে ১২৫ কিলোমিটার বেগের বাতাসের শক্তি নিয়ে শনিবার রাত ৯টায় বুলবুল পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সাগর দ্বীপ উপকূলে আঘাত হানে। এরপর রোববার ভোর ৫টার দিকে এ ঝড় যখন সুন্দরবনের কাছ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ-খুলনা উপকূলে পৌঁছায়, তখন খুলনার কয়রায় বাতাসের গতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৯৩ কিলোমিটার ছিল বলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক সামসুদ্দিন আহমেদ জানান। তিনি বলেন, সুন্দরবন এ ঘূর্ণিঝড়ের বাতাসের গতিবেগ কমিয়ে দিয়েছে। খুলনা অঞ্চলে যখন এসেছে, ততক্ষণে অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে। এ কারণে বাংলাদেশে ততটা ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। সরাসরি এলে ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি হতে পারত। ক্রমশ দুর্বল হয়ে বুলবুল স্থল নিম্নচাপে পরিণত হলে রোববার সকালে দেশের তিন সমুদ্রবন্দরকে মহাবিপদ সংকেত নামিয়ে স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

x