বীরুদার সাথে কোলকাতায়

দেবাশীষ বল

মঙ্গলবার , ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ১১:১৮ পূর্বাহ্ণ
1072

বীরুদার বয়েসটাকে দুই দিয়ে ভাগ করলে তবেই আমি টেনেটুনে তার সমকক্ষ হতে পারতাম অথচ বয়সের এই গালিভার লিলিপুট ব্যবধান আর প্রথমবারের মতো দেখা হওয়ার আড়ষ্টতাকে পাশ কাটিয়ে আমার সাথে উনার ব্যবহারটা এমন যেন আমি তার কতদিনের চেনা। বাবার কাকাতো ভাইয়ের একমাত্র ছেলে এই বীরুদা এসেছেন আমাদের রিসিভ করতে।
এসেছি বেড়াতে; পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কোলকাতায়; বাবার ভাষায় যাকে সাহেবি ঢঙে আগে ‘ক্যালকাটা’ বলা হতো। দুই দেশকে এক করা রেললাইনের পাঁজর ঘষে বাংলাদেশ থেকে আমাদের শিয়ালদহ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে মৈত্রী এঙপ্রেস; পুরো জার্নিটা ভালোই ছিল শুধু ইমিগ্রেশনটা বাদে। নিয়মের তোয়াক্কা না করে তাড়াতাড়ি পার করিয়ে দেয়ার নাম করে শ’তিনেক টাকার জন্য কানের কাছে দালালদের ভ্যানভ্যানানি সত্যিই বিরক্তিকর। তিতিবিরক্ত হয়ে বাবা এদের পাইকারি নাম দিয়েছে নোট-নটোরিয়াস! রাগলে বাবার মাথায় শিব্রাম ভর করে আর আমরা কিছু মজার মজার সব নাম শুনতে পাই।
প্ল্যাটফর্মে নেমে ইতিউতি তাকাতেই দেখি লম্বা মতন একটা লোক আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। এটাই সুভাষ জেঠুর ছেলে বীরুদা। বাবা-মাকে প্রণাম করে জিজ্ঞাসা করলেন ‘পথে কিছু অসুবিধে হয়নি তো তোমাদের? পাঁচটায় এসে পৌঁছানোর কথা , ট্রেন লেট ছিল নাকি?” “না নাহ, মৈত্রী বেশ স্মুথ, ইমিগ্রেশনটাই একটু ননসেন্স” বাবার স্বভাবসুলভ জবাব, তারপর আমাকে দেখিয়ে বললেন ‘এটাই তোর ছোট ভাই শুভ্র।” বীরুদার হাসি প্রথমবারের মতো দেখতে পেলাম , তারপর আমাকে অবাক করে দিয়ে পকেট থেকে একটা কিটক্যাট বের করে বাড়িয়ে দিলেন। “নে ধর, কোলকাতায় লেট এর পুরষ্কার চকলেট” , তখনো দাদার মুখে মুচকি হাসি। চকলেটটা বুঝে নিয়ে হাসিটা ফেরত দিলাম। বাবার মুখে কত কি শুনেছি দাদার সম্পর্কে। একসময়ের ডাকসাইটে ক্রিকেটার বীরুদা এখন বায়োলজির নামকরা শিক্ষক, উনার মতো ট্যালেন্টেড মানুষ নাকি আমাদের বংশে আর একটাও নেই, স্ট্রাগল করে উনার এতদূর আসাটা সবার জন্য শিক্ষণীয়। আবার খুব নাকি পাহাড়ও ভালবাসেন । কোন মানুষকে নিয়ে এতো ইনফরমেশন নিয়মিত পেতে থাকলে মস্তিষ্ক নিজ দায়িত্বে তার একটা ইমেজ তৈরি করে নেয়। আমার মাথায়ও দাদার একটা কাল্পনিক চেহারা ছিল; সেটার সাথে মেলাতে গিয়ে দেখি বাস্তবের মানুষটার সাথে বিস্তর মিল। একহারা গড়ন, বুদ্ধিদীপ্ত চোখ, সাবলীল আচরণ, চোখের নরম দৃষ্টি মিলিয়ে ভীড়ের মধ্যেও আলাদা করে চিনতে পারার মতো ব্যক্তিত্ব। পোশাকেও রুচির ছাপ স্পষ্ট – পরনে ছাইরঙা গ্যাবারডিন প্যান্টের সাথে গাঢ় রঙের টিশার্ট,পায়ের বুট আর কোমরের বেল্ট দুটোই ব্রাউন; কাপড়চোপড়ে বেশ কয়েকটা রঙ থাকলেও কোনটাই চিৎকার করছে না দেখে মুগ্ধতা আরেক ডিগ্রি বাড়লো। (পরের দিনগুলোতে সেটা গুণিতক হারে বেড়েছে)
কুশল পর্ব শেষে স্টেশন থেকে বেরিয়ে একটা উবার ঠিক করে আমাদের চারজনের দলটা রওনা দিলাম জেঠুদের বাড়ি। ফোর সিটার গাড়িতে বীরুদা বসেছে সামনে, ড্রাইভারের পাশে; পেছনে আমি, বাবা আর মা। জানালার বাইরে যা কিছুই দেখি তাতেই যেন নতুনত্ব খুঁজে পাই। আমাদের গাড়িটা বড়বাজার ক্রস করে যখন সবে হাওড়া ব্রিজে উঠেছে, সামনের সিট থেকে ঘাড় ফিরিয়ে বীরুদা বললেন, “কোলকাতার রাস্তা কেমন লাগছে রে তোর? বাংলাদেশের মতোই তো?” জানালা দিয়ে আসা গঙ্গার বাতাস খাচ্ছিলাম, দাদাকে কিছু একটা বলার জন্য মুখ খোলার আগেই বাবা বলে উঠলেন, “কোলকাতায় এটা ওর প্রথম আসা। তুই সময় করে ওকে শহরটা একটু ঘুরিয়ে দেখাস তো।”
‘ও তুমি চিন্তা কোরো না কাকু। ওকে আমি ঠিক দেখিয়ে আনবো সব।‘ তারপর আমার দিকে চেয়ে আদরমাখা গলায় বললেন, ‘আমার ভাইটা প্রথমবার কোলকাতা এসে সব ঘুরে দেখবে না তা কি হয়’। স্নেহের আভাস আর বেড়ানোর গন্ধ একসাথে পেয়ে মনটা নেচে উঠলো।
বাসায় পৌঁছতেই বিরাট হইচই। বাংলাদেশ থেকে তার ভাই প্রথমবারের মতো ছেলেকে নিয়ে বেড়াতে এসেছে বলেই কিনা কে জানে জেঠুদের স্নেহোচ্ছাসটা দেখার মতো হলো, কিছুটা অস্বস্তিরও। সদ্য কলেজে উঠেছি, ভালো ছাত্র বলে স্কুলে স্যার ম্যাডামদের কাছ থেকে মাথায় হাত বুলানো আদর অনেক পেয়েছি, তবু এখানে জেঠিমা আর দিদি যখন গালে চুমু দিয়ে আদর করে দিলেন, ভীষণ লজ্জা লাগলো।
শহরতলীর দোতলা এই বাড়িতেই জেঠু, জেঠিমা,বীরুদা আর কৌশিকীদিকে নিয়ে চারজনের নন্দী পরিবারটা থাকে। হাল আমলের ডিজাইনে তৈরি বাড়ির পুরোটাই পাকা, সামনের বড় উঠোনটায় কোথাও কোথাও ইট-সিমেন্টের দেখা মিললেও অধিকাংশ জায়গায় মাটির দাপটই বেশি। নিচের তলায় থাকেন জেঠু জেঠিমা আর দিদি, ওপর তলা পুরোটাই দাদার দখলে। জামাকাপড় ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে নিতেই চায়ের টেবিলে ডাক পড়লো ।
সন্ধ্যার দিকে বড়রা যখন খোশগল্পে মশগুল, আমি আর দাদা তখন ক্রিকেট নিয়ে জমিয়ে আড্ডা মারছি দাদার রুমে। দাদার রঞ্জি ট্রফি খেলার দিনগুলোর কথা শুনে আশ্চর্য হলাম। প্রথম পরিচয়ের দূরত্ব যদি কিছু থেকেও থাকে এক ধাক্কায় ঘুচে গেলো। সন্ধ্যার দিকে দাদা গেলেন বিয়ের নিমন্ত্রণে, যাবার আগে বইয়ের কালেকশনটা ঘুরে দেখতে বললেন। স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি একসাথে এতো বই স্কুল লাইব্রেরি ছাড়া আর কোথাও দেখিনি, ব্যক্তিগত সংগ্রহে তো নয়ই। দশ বাই দশ ফিটের রুমটার চারদেয়ালে কায়দা করে তৈরি করা বইয়ের তাকগুলো একরকম উপচে পড়ছে শ’খানেক বইয়ে। এতো বই একসাথে একটা মাত্র রুমে থাকার পরও সাজিয়ে রাখার গুণে গাদাগাদি ভাবটা একেবারেই নেই, বরং কোথায় যেন একটা শিল্পের ছোঁয়া আছে বলে মনে হয়। থাকবে নাইবা কেন; কে নেই এই ঘরে! একজনের গায়ে আরেকজন হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন রবিঠাকুর, শরৎ , শেঙপিয়ার, ইয়েটস, ফ্রস্ট, সুনীল, তারাশঙ্কর , প্রেমেন্দ্র মিত্র থেকে শুরু করে হাল আমলের রিচার্ড ডকিন্স, পিটার রোবাক, মারকেজ, মুরাকামি, স্টিফেন কিং, লি চাইল্ড, উইলবার স্মিথ সহ আরও অনেকেই। এতো এতো বিচিত্র বিষয়ের এতো এতো বই দেখে আমার মতো বইপোকা খুশি হবে স্বাভাবিক। তবে এখানে বড়দের ভারি বইয়ের সংখ্যাই বেশি। আমার পছন্দের কিছু আছে কিনা খুঁজছি, হঠাৎ দেখি ডানদিকের দেয়ালের র‌্যাকে দাঁড়িয়ে আছেন কিংবদন্তী গল্পবাজ ঘনাদা । ভদ্রলোককে তাক থেকে পেড়ে ফ্লোরে পাতানো বিছানায় শুয়ে আয়েশ করে পড়তে শুরু করলাম। তারপর কখন যে ঘুমিয়ে গেছি টেরও পাইনি।
পরেরদিনের সকাল পুরোটাই বড়দের মুখে ওদের পুরোনো দিনের গল্প শুনে আর ঘনাদার কাণ্ডকীর্তি পড়ে কেটে গেলো। গল্প শুনতে আর পড়তে বরাবরই ভালো লাগে তবু তক্কে তক্কে আছি দাদার বাড়ি ফেরার অপেক্ষায়; আজকে আমাকে বেড়াতে নিয়ে যাবার কথা।
ঘড়ির কাঁটা চারটার দাগ ছুঁইছুঁই করছে এমন সময় দাদা এলেন, কিছুক্ষণ পরই বেরিয়ে পড়লাম কোলকাতা দর্শনে।
ঠিক হল প্রথমে আমরা কলেজ স্ট্রিট যাবো। বাড়ি থেকে মিনিট পাঁচেক হেঁটে দুজনে বাসে উঠলাম। দাদার কাছে আগেরদিন পাহাড়ের গল্প শুনতে চেয়েছিলাম, সেকথা মনে করিয়ে দিতে বীরুদা শুরু করলেন তার পর্বত অভিযানের গল্প। দেশে বাবা বলেছিলেন বীরুদা পাহাড় খুব ভালবাসে, যেটা বলেনি সেটা হল দাদা পুরোদস্তুর একজন পর্বতারোহী, অভিযান করে ফেলেছেন বেশ ক’টা! শিবলিং, কামেট, আমা দাব্লাম আরো কি কিসব নাম বললেন; আমার দৌড় অবশ্য এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা,অন্নপূর্ণার নাম জানা পর্যন্তই; বীরুদার গল্প থেকে এই ধরনের অভিযান নিয়ে অনেক কিছু জানলাম। পর্বতে কতো বিচিত্র অভিজ্ঞতা দাদার- কখনো তুষারঝড়ে পড়ে দিক হারানো, কখনো তুষারধ্বস থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যাওয়া, অসুস্থ সঙ্গীকে দড়িতে বেঁধে হিমবাহ পার হওয়া, চূড়ায় পৌঁছানো পর আনন্দে চিৎকার করে গান করা, আরো কতো কি!
গল্প শুনতে শুনতে সময় কোনদিক দিয়ে উড়ে গেলো টেরই পাইনি, হুঁশ ফিরল কন্ডাক্টরের হাঁকে ; কলেজ স্ট্রীট পৌঁছে গেছি। নেমে দেখি এখানে চারিদিকে শুধু বইয়ের কারবার। কেউ মাথায় বই ভর্তি ঝাঁকা নিয়ে চলেছে, কারো হাতে বিশ-ত্রিশটা বইয়ের লম্বা কলাম, কোথাও ভ্যানের ওপর বইয়ের স্তুপ নয়তো কাগজের রীম। বীরুদা মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলেন ”কফি হাউজে যাবি?” যাবো না মানে! একশোবার যাবো। কফি হাউজে গিয়ে একটা টেবিলে বসে কফির অর্ডার দেয়া হল। চারিদিকে তাকিয়ে “আহ! মান্না দে-র কফিহাউজ” বলে বিড়বিড় করতেই দাদা বললেন মান্না দের কারণে কফিহাউজ ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে ঠিকই কিন্তু বহু আগে থেকেই এখানে বিখ্যাত সব লোকেরা নিয়মিত আড্ডা দিতেন। কলেজস্ট্রিট নামটার কথা উঠতেই জানলাম এই জায়গার আদিনাম ছিল গোলদীঘি, একটা সময় মীরজাফর লেন নামেও নাকি ডাকা হতো! শুনে আরও অবাক হলাম ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নাকি এই কলেজ স্ট্রিটের প্রকাশনী ব্যবসার অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন। সাধারণত কথার ফাঁকে কেউ তথ্য টথ্য দিয়ে কথা বললে আমার বড্ড বিরক্ত লাগে, কিন্তু খেয়াল করেছি বীরুদার সাথে কোলকাতায় যখন যে বিষয় নিয়েই কথা বলেছি পুরো আলাপগুলো ছিল আড্ডার মতো, অথচ তাতে ইনফরমেশনও ছিল অনেক। বিরক্তির তো প্রশ্নই ওঠে না বরং বলার ভঙ্গির কারণে দারুণ লাগতো। যেমন পরে একদিন ভাড়ের চা খেতে গিয়ে দাদার কাছ থেকে জানলাম চা শব্দটা চিনা ভাষার, এনসিয়েন্ট চায়নায় নাকি একে জো, টে, চা এসব নামে ডাকা হতো। সেখান থেকেই এশিয়ানরা নিয়েছে “চা”, পাশ্চাত্য নিয়েছে “টি”।
যাই হোক, কফি হাউজ থেকে বেরিয়ে একে একে দেখা হল সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির, বিখ্যাত ছানা মার্কেট, সত্যজিৎ রায়ের দাদু উপেন্দ্রকিশোর রায়ের কিংবদন্তী পত্রিকা সন্দেশের কার্যালয়সহ বেশ কয়েকটা জায়গা। ফেরার আগে বীরুদা দে’জ পাবলিশার্স থেকে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘টেনিদা সমগ্র’ কিনে দিলেন, বইটা আমার হাতে দিতে দিতে মুচকি হেসে বললেন “নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের আসল নাম কিন্তু তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়!” আমি তো থ!
ঐতিহ্যবাহী ট্রামে চড়ে শেষ হল সেদিনের ঘোরাঘুরি।

x