বিশ্বনেতা বঙ্গবন্ধু: মোদির জীবপ্রেম!

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ২০ আগস্ট, ২০১৯ at ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ
37

অধুনালুপ্ত যুগোস্লভিয়ার প্রেসিডেন্ট ও মহান জনক মার্শাল টিটো ছিলেন জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম কান্ডারি। জোটের এক শীর্ষ বৈঠকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সাথে টিটোর একান্ত বৈঠক হয়। টিটো ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট অনুরাগী। বৈঠকে তিনি জানতে চান, বঙ্গবন্ধুর শক্তি এবং দূর্বলতা কী? এক সেকেন্ড দেরি না করে বঙ্গবন্ধুর উত্তর,
বাংলার মানুষের প্রতি ভালবাসা আমার শক্তি এবং আমার সবচে’ বড় দুর্বলতাও এটা, আমি তাদের অনেক বেশি ভালবাসি। অকৃত্রিম ভালবাসার মূল্য খুব কম সময়ের মাঝে শোধ করতে হয়েছে, বঙ্গবন্ধুকে! দু’মেয়ে বাইরে থাকায় ভাগ্যগুণে বেঁচে গেলেও সপরিবারে ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাকান্ডের নির্মম শিকার হয়েছেন জাতির মহান জনক। দুর্ভাগ্য, তাঁকে সমূলে বিনাশ করেছে, তাঁর অনেক বেশি ভালবাসার ধনেরা! প্রথমবারের মত জাতিসংঘের আয়োজনে বঙ্গবন্ধুর ৪৪তম শাহাদাত বার্ষিকী পালনকালে ১৫ আগষ্ট জাতিসংঘে সার্বিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি তাঁর ভাষনে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রীর বাণীতে লেখা এই সত্য নতুন করে তুলে ধরেন। বাংলার মানুষের জন্য বঙ্গবন্ধুর এতো গভীর ভালবাসা থাকলেও বাঙালির তা ধারণের যোগ্যতাই ছিলনা। তাইতো অন্ধকারের হায়েনারা খুব সহজে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে ১৫ আগষ্টের পবিত্র ভোরে অন্তঃসত্তা পুত্রবধু এবং শিশুপুত্রসহ ঠান্ডামাথায় খুন করে ভালবাসার ঋণ শোধ করেছে! জাতি হিসাবে এতবড় লজ্জার ভার বহনের সাধ্য বাংলা কেন পুরো বিশ্বব্রম্মান্ডেরও নেই। বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর বিশ্বস্ত সহযোগী জাতীয় নেতাদের খুন করে টানা ২১ বছর পাকিস্তানের প্রঙিতে দেশ চালানো হয়। সৌভাগ্য, বঙ্গবন্ধু কন্যারা বাইরে থাকায় বড়বোন শেখ হাসিনা ফিনিঙ পাখির মত আবারো দল ও দেশকে জাগিয়ে তোলেন। তাঁর নেতৃত্বে দেশ এখন বিশ্ব মানচিত্রে উন্নত দেশের অভিযাত্রায় অনেক দূর এগিয়ে। অবিশ্বাস্য উন্নয়ন অভিযাত্রা থমকে দিতে ঘরের শত্রুরা অতীতের চে’ আরো বেশি সক্রিয়। বাইরের শত্রুদের চেনা যায়- সতর্ক থাকা যায়। কিন্তু ঘরের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা বর্ণচোরা শত্রুদের সনাক্ত করা খুবই কঠিন। যার মূল্য বঙ্গবন্ধু সপরিবারে জীবন দিয়ে শোধ করেছেন। এরকম ইঙ্গিত এখন স্পষ্ট। গুজবের ঢেউ,কল্লাকাটা ভূত, ধানের মূল্য নিয়ে কৃষকের ক্ষোভ, সড়কে ধান ফেলে দেয়া, দুধের সীসা বিতর্ক জটিলতায় বিক্রি করতে ব্যর্থ খামারিদের মহাসড়কে দুধ ঢেলে দেয়া, সর্বশেষ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম উৎস কোরবানির শত শত কোটি টাকার কাঁচা চামড়া ক্রেতার অভাবে সড়ক পাশে ফেলে দেয়ার ঘটনা ‘৭৪ এর কৃত্রিম লবণ সঙ্কট ও দুর্ভিক্ষের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ঘরের ভেতরে শক্ত অবস্থানে থাকা বিভীষণ চক্র এসবের জন্য দায়ী কিনা, খুঁজে বের করার সময় হয়েছে। যদি তাই হয়, ‘ভালবাসা’র অযোগ্য এসব পরজীবিদের দ্রুততম সময়ে নির্মূল জরুরি। কারণ আমরা জননেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ন্যূনতম ক্ষতিও চাইনা। দেশ আবার অন্ধকারের ঘূর্ণাবর্তে তলিয়ে যাক, কল্পনা করতেও বুক কাঁপে! আশা করি সুপ্রিম কমান্ড লুটেরা দানব, জোকার, চামচা,বর্ণচোরা ভন্ড নির্মূল অভিযানে মনোযোগ দেবেন।
মোদিকান্ডঃ “Manvs wild” ডিসকভারি চ্যানেলের ইর্ষনীয় জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। বেশ ক’বছর ধরে বৃটিশ রয়েল নেভির আহত ছত্রীসেনা বেয়ার গ্রিলস এটার এ্যঙ্কর। তার সাহস, পেশাদারিত্ব, যে কোন পরিস্থিতি-পরিবেশের সাথে লড়াই করে টিকে থাকার রোমহষর্ক ঘটনা একজন দুর্বল মানুষকেও উদ্দীপ্ত করে। যখন যা পাওয়া যায়, তা দিয়ে পুষ্টি সংগ্রহ করেন তিনি। সাপ, ব্যাঙ,বিষাক্ত পোকামাকড় যাই হোক, ঘেন্নাপিত্তি বেমালুম ভুলে নিজে পাথর ঠুকে বা অন্য কোন উপায়ে আগুন জ্বেলে পুড়িয়ে বা কাঁচাই খেয়ে ফেলেন।
হ্যাঁ, গ্রিল একলা না! তাঁর সাথে ক্যামেরা ক্রূসহ নিরাপত্তা কর্মীরা থাকে। অস্ত্রপাতিও। কিন্তু অনুষ্ঠান উপভোগ করার সময় দর্শক-শ্রোতার ওসব খেয়াল করার ইচ্ছে বা গরজ নেই। বুদ হয়ে রোমাঞ্চকর ও ভয়াবহ সব কীর্তি দেখেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, জুনিয়র বুশ, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্‌লাদিমির পুতিনের মত বিশ্বনেতারা তাঁর সাথে অভিযানে সামিল হয়েছেন। সর্বশেষ সংযোজন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সাধারণত গ্রিলস যখন যে দেশের দুর্গম অঞ্চলে অভিযানে যান, তখন সংশ্লিষ্ট সরকার বা রাস্ট্র প্রধানকে সাথে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানান। সবাই দাওয়াত কবুল করেন না, নানা রাষ্ট্রীয় ব্যস্ততায়। মোদিজি কবুল করেন। বেশ কিছুদিন আগে উত্তরাখণ্ড রাজ্যের জিম করবেট ন্যাশনাল পার্কে অনুষ্ঠানটি ধারণ করা হয়। প্রচার করা হয় ১২ আগষ্ট মুসলিমদের অন্যতম বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহার দিন।
যখন কাশ্মীরে বিক্ষুব্ধ মুসলিমরা ঈদ জামাতের পর বিক্ষোভ মিছিল করছিল, ঠিক তখনি! বিক্ষোভকারিদের উপর নিরাপত্তা বাহিনী ছররা গুলি ও বেধড়ক টিয়ার গ্যাসের শেল ছুঁড়ছিল একদিকে। অন্য দিকে ডিসকভারিতে প্রধানমন্ত্রী মোদিজীর বীরত্ব প্রদর্শনী! যদিও জম্মু-কাশ্মীরে টি ভি সমপ্রচার বন্ধ থাকায় সেখানে মোদিজি ম্যাজিক গায়েব ছিল।
বেয়ার গ্রিলস নেভিতে থাকতে দুর্ঘটনায় পড়ে মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলেন। প্রায় দেড় বছর বিছানায় ছিলেন। তিনি আবার সুস্থ হবেন, হাঁটাচলা করবেন, এটা ছিল প্রায় অবিশ্বাস্য ঘটনা। কিন্তু প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তি ও মনোবল তাঁকে সুস্থ করে তোলে এবং ডিসকভারির সবচে’ বিপজ্জনক অনুষ্ঠানের এ্যঙ্করের দায়িত্ব নেন। তাঁর অনুষ্ঠান যারা দেখেন,বিস্তারিত ব্যাখ্যা অপ্রয়োজনীয়।
আসা যাক মোদি এপিসোডে। মোদিকে নিয়ে যেদিন অনুষ্ঠান রেকর্ডিং হয়, তিনি ‘কপ্টারে উড়ে পার্কের নির্দিষ্ট স্থানে নামেন। এর আগে হাজারখানেক ব্ল্যাক ক্যাটসসহ বিশেষায়িত কমান্ডো দল পার্কের বিভিন্ন স্থানে টেলিস্কোপিক গান নিয়ে অবস্থান নেন। বলা হচ্ছে, মোদি গহীন অরণ্যে পাঁচ মাইল হেঁটে বেয়ারের নানা প্রশ্নের মজার মজার উত্তর দেন। হাতে তৈরি ভেলায় চড়ে নদীও পার হন। এসময় গ্রিলস তাঁর কাছে জানতে চান, মোদি ছেলেবেলায় কখনো ভয় টয় পেয়ে নার্ভাস হয়েছেন কিনা?
মোদির উত্তর, হননি, ভয় টয় তাঁর নেই। নার্ভাসও কখনো না! সব পরিস্থিতি ঠান্ডা মাথায় সামলে নেন! ছোটবেলায় গাছ ভালবাসতেন। কুমিরের বাচ্চা ধরে পালন করে ছেড়ে দিতেন। বড় হয়ে তিনি হিমালয় উপত্যকায় কয়েক বছর ধ্যানও করেন। গাছের প্রাণ আছে, তাই গাছ, প্রকৃতি এবং জগতের সকল প্রাণীর প্রতিও তাঁর অপরিসীম দয়া!
ভেলা থেকে নামার পর গ্রিলস তাঁকে বলেন,আমরা যে কোন সময় বাঘের মুখোমুখি হতে পারি। বলেই তিনি নিজের তৈরি ছুরির ডগা বাঁধা বল্লমটা মোদির হাতে তুলে দেন। বল্লম হাতে নিয়ে মোদির উত্তর, আমি বাঘ-ভালুককে ভয় পাইনা। তখন মজা করে বেয়ার বলেন, ঠিক আছে বল্লমটা আমি রাখছি তাহলে? কিন্তু মহাবলী মোদির উত্তর, আমার কাছে থাক আপাতত। কী বুঝলেন জনাব? দিল্লির একটি দৈনিকের খবর, ডিসকভারি চ্যানেল অনুষ্ঠান স্যুটিং বাবদ পার্ক কর্তৃপক্ষকে ১,২০,০০০ [এক লাখ বিশ হাজার] রূপি দিয়েছে। বিশাল ব্যাপার! হাজারো কমান্ডো এবং হেলিকপ্টার নামিয়ে বন্য প্রাণির শান্তি নষ্ট করায় মোদিকে দুষছে প্রাণি সুরক্ষা ও পরিবেশবাদীরা।
কিন্তু বিজেপি নেত্রী ও মন্ত্রী বিখ্যাত প্রাণিপ্রেমি মানেকা গান্ধী চুপ! অথচ একটা বিড়াল দুর্ঘটনায় পড়লেও তিনি লম্বা বিবৃতি ঝাড়েন।
বুঝুন মোদির প্রাণি ও গাছপ্রেমের নমুনা! কাশ্মীরে নির্যাতন নিপীড়ন, গো হত্যার ভূয়া অভিযোগে নিরীহ মুসলিম খুন, দলিত খুন, খৃষ্টান আদিবাসী খুনে তাঁর কোন বিকার নেই। গো-মাতা সুরক্ষার নামে মানুষ খুনে তিনি,অমিত শাহ, যোগি আদিত্যনাথসহ উগ্র ধর্মান্ধ নেতারা খুনীদের উৎসাহিত করেন! তিনিই আবার প্রকৃতি ও প্রাণিপ্রেমে দিওয়ানা! হায়রে দিল্লির গেরুয়া ভন্ডামি! আর সাহস, উপরের বর্ণনা থেকে খুঁজে নিন, কেমন বীরকেশরী মোদিজি!

x