বিশ্বজুড়ে সাইকো: পাঠ খরার ঔষধি

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ২৭ আগস্ট, ২০১৯ at ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ
22

ব্রাজিলের কট্টর ডানপন্থী প্রেসিডেন্টের উৎসাহে কিছু মাফিয়া কর্পোরেট আমাজান শেষ করে দিচ্ছে। পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত আমাজান বিশ্বের বৃহত্তম রেইনফরেস্ট। চিরহরিৎ অরণ্যটি পৃথিবীর ৩০% কার্বন ডাই অঙাইড শোষণ ও প্রায় ২৫% অঙিজেন যোগান দেয়। সাধারণত বারোমাস বৃষ্টিপাত হওয়ায় বিশাল অঙিজেন ভাণ্ডারটি সবসময় ভিজা থাকে। তাই প্রকৃতিক দাবানলের সম্ভাবনা খুব কম। জুন-আগস্টে বৃষ্টিপাত তুলনামূলক কম। আর এই সুযোগটাই নিয়েছে মাফিয়া ভূমিদস্যু। কয়েকমাসে আমাজান অরণ্যে অন্য সময়ের তুলনায় ৮৭% এর বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। হাজার হজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রাজধানী সাও পাওলো দুদিন ধোঁয়ায় ডুবেছিল। লাতিনের অনেক দেশেও ধোঁয়ার মেঘ ছড়িয়ে পড়ে। রাত নামে দু’ঘন্টা আগে। আমাজন সম্পর্কে যাদের সামান্য ধারণা আছে, তাঁরা জানেন, বিশাল রেইনফরেস্টের অনেক জায়গায় মাটিতে আলো ঢুকেনা। ঘন সবুজ বিশাল বৃক্ষরাজির ডালপালা ঢেকে রাখে বন। গভীর বনে দিন-রাত একাকার। মানুষের পদচাপ পড়েছে ১০% এর কম অংশে। কিন্তু সামপ্রতিক স্যাটেলাইট ছবিতে ভয়ঙ্কর সব দৃশ্য দেখা গেছে। বড় বড় গাছ উপড়ে ফেলে আগুন দিয়ে বনভূমির গহীন অনেক অংশে টাক ফেলে দেয়া হয়েছে। চাষাবাদের জন্য ফাঁকা জমিতে নামানো হয়েছে ট্রাক্টর। এতে পরিস্কার, কৃষি জমি বাড়ানোর প্রেসিডেন্সিয়াল ঘোষণা বাস্তবায়ন করছে দেশটির বন মাফিয়া। কিন্তু প্রেসিডেন্ট নিজের দায় অস্বীকার করে বলেছেন, এটা দাবানলের ঘটনা অথবা কোন দুর্বৃত্ত দায়ী থাকলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এরমাঝে পরিবেশবাদীরা পৃথিবীজুড়ে তীব্র প্রতিবাদে নেমেছেন। আমাজানের বনভূমি রক্ষা না হলে পুরো পৃথিবী দ্রুত পরিবেশ বিপর্যয়ের শিকার হবে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড কেনার বায়না ধরে ডেনমার্কের কড়া ঝাড়ি খেয়ে দেশটিতে নির্ধারিত সফরসূচিও বাতিল করে দেন। প্রায় ৯০% গভীর বরফে ঢাকা বিশাল দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। প্রচুর মূল্যবান খনিজ ও মৎস্য সম্পদের ভাণ্ডার দ্বীপের জনসংখ্যা ৫০ হাজারের মত। গ্রিনল্যান্ডের বরফ স্তর ভেঙে গেলে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাবে। ডুবে যাবে উপকূলীয় বহু অঞ্চল। কিন্তু ইউরোপ, রাশিয়া, চিনে সামরিক খবরদারির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র এটার নিয়ন্ত্রণ পেলে প্রচুর অমূল্য সম্পদও পেয়ে যাবে। তাই এত লোভ! ট্রাম্প আরো একটা চড় খেয়েছেন বৃটিশ নিয়ন্ত্রিত খুদে দেশ জিব্রাল্টারের কাছে। দেড় মাস আগে ই ইউ’র নিষেধাজ্ঞার আওতায় ইরানি সুপার ট্যাঙ্কার গ্রেস-২ আটক করে বৃটিশ রয়েল নেভি। আবার ইরান হরমুজ প্রণালির কাছ থেকে আটক করে দুটো বৃটিশ ট্যাঙ্কার। তীব্র উত্তেজনার এক পর্যায়ে বৃটিশ ট্যাঙ্কার ছেড়ে দেয় ইরান। ওদিকে জিব্রাল্টার আদালত ইরানি সুপার ট্যাঙ্কারটি ছেড়ে দেয়ার আদেশ দেয়। ২১ লাখ ব্যরেল তেলবাহী গ্রেস-২ নাম পরিবর্তন করে ‘আদরিয়ন দরিয়া’ নামে নোঙর তোলার সময় ট্রাম্প ওটা তাদের হাতে তুলে দেয়ার আহবান জানান। কিন্তু কানে নেয়নি জিব্রাল্টার। ভূমধ্য সাগর হয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাত্রা করে ট্যাঙ্কারটি। বুঝুন অবস্থা! একদিকে পৃথিবীকে শ্বাসরুদ্ধ করে মারার তালে ব্রাজিলের কট্টর প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্প একের পর এক ভুল করে আছাড় খাচ্ছে শিশুর হিসিতে। বৃটিশ নয়া প্রধানমন্ত্রীর ম্যানার নিয়েও ব্যস্ত মিডিয়া। প্রতিবেশির কথাতো আগেই বলেছি। হংকং নিয়ে চিনের অবস্থাও যাচ্ছেতাই। কথা হচ্ছে, বিশ্ব রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের দণ্ডধারীরা বেশিরভাগ মানসিক বিকারগ্রস্ত হলে সামনেতো ঘোরতর অন্ধকার! সুন্দর গ্রহটির হবে কী?

বঙ্গবন্ধু: পাঠ খরা নিরাময়ের যোগ্য অষুধ!

বাংলা, ইংরেজি ভাষা ছাড়াও বঙ্গবন্ধু জাপানি, ফরাসি ভাষাও চর্চা করতেন। ইংরেজিতে তাঁর দখল, চমৎকার বাচন এবং ইডিয়ম প্রয়োগের দক্ষতায় বৃটিশ রাজনীতি পন্ডিতরাও বিস্মিত হতেন। বিশ্ব-সাহিত্য,সংস্কৃতি থেকে শুরু করে রাজনীতির গতি-প্রকৃতি, ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, দর্শনসহ সব বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর অগাধ পাণ্ডিত্য, সবখানে তিনি আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসতেন। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন শীর্ষ সম্মেলন ও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে প্রদত্ত ভাষণ, বিশ্বসেরা মিডিয়াগুলোয় দেয়া সাক্ষাৎকার পড়লে দেখলে-শুনলে স্পষ্ট হয়ে যাবে, বঙ্গবন্ধু কতো বড় মাপের জ্ঞানী ও দূরদর্শী নেতা ছিলেন! আমাদের কোন কোন তথাকথিত জ্ঞানপাপী, সবজান্তা তাঁর একাডেমিক শিক্ষা ও জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা নিয়ে খোঁচা দিলেও তিনি এড়িয়ে গেছেন। তিনি জানতেন, কচুঝাড়ের সাথে বটবৃক্ষের লড়াই হয়না! তাই করুণার পাশাপাশি উল্টো ‘পুরস্কার ভিক্ষা’ দিয়েছেন ওঁদের! এটা ঠিক,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকতে ভার্সিটির ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারিদের ন্যায্য দাবির পক্ষে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ায় তাঁকে অন্যায়ভাবে বহিষ্কার করা হয়। তারপর বাংলা ভাষার দাবিতে জিন্নাহকে চ্যালেঞ্জ করায় ঢুকতে হয় জেলে। এরপরের ইতিহাস চর্চা অনর্থক। কারণ, তা সবার জানা। সময়ের দাবিতে এসব কথা বলতে বাধ্য হয়েছি।
বঙ্গবন্ধু শুধু একটি রাষ্ট্রের নির্মাতা নন, তাঁর ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বসেরা অমর কাব্য কেবল নয়, তাঁর উচ্চারিত প্রতিটি শব্দেই কবিতার ব্যান্‌জনা, ছন্দ ও সূরের ঝংকার ধ্বনিত হতো। ইংরেজি শব্দ ও বাক্য আরো বেশি প্রান্‌জল,বাঙময় ও জীবন্ত! কীভাবে! আসলে বঙ্গবন্ধু ছিলেন বড় মাপের পাঠক। জীবনের অর্ধেকের বেশি কেটেছে কারাগারে। এক কারাগার থেকে আরেক কারাগারে ছিল বঙ্গবন্ধুর রুটিন ভ্রমণ। এমন কী সকাল-সন্ধায়ও! কারাগারের নিঃসঙ্গ জীবনে বই ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রিয় বন্ধু। জেল পাঠাগারের সব বইতো ছিলই। বেগম মুজিবসহ পরিবারের সদস্য, রাজনৈতিক বন্ধুরাও তাঁকে দেখতে গেলে বই অবশ্যই সাথে থাকতো। কারা কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দিলে কিছু ঢুকতো, বাকিগুলো নয়। এভাবে দেশ ও বিশ্ব সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস মনিষীদের জীবনী হয়ে যায় তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী। জেলের নির্দিষ্ট পত্র পত্রিকাতো ছিলই। স্বাভাবিক কারণে বঙ্গবন্ধু লেখাপড়া, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, জীবন বোধেও সমকালীন সবাইকে ছাড়িয়ে যান। শুধু স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মদাতা নন, জ্ঞানে, প্রজ্ঞায় বঙ্গবন্ধুর তুলনা তিনি নিজেই। প্রতি মুহূর্তে নিজকে ছাড়িয়ে অনন্য এক উচ্চতায় উঠে গেছেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, বাণী, সংসদীয় বক্তৃতা, বিবৃতি, বিভিন্ন বিদেশি মিডিয়ার সাক্ষাৎকার, আন্তর্জাতিক শীর্ষ বা দ্বিপাক্ষিক সম্মেলনগুলোতে প্রদত্ত সব ভাষণ সংরক্ষিত আছে কিনা জানা নেই।
যদি থাকে, এগুলো নিয়ে ব্যাপক গবেষণা ও চর্চার সময় এসেছে। বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি বক্তব্যই দীর্ঘ বিশ্লেষণ ও আলোচনার দাবি রাখে। কারণ, তিনি শুধু বাংলাদেশের জনক নন, সর্বকালের অন্যতম সেরা রাষ্ট্রনেতা, দার্শনিক এবং চিন্তাবিদও। আশা করি, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও বঙ্গবন্ধু গবেষকরা এ’ ব্যাপারে দ্রুত মনোযোগ দেবেন।
আরেকটা জরুরি বিষয় না বললে নয়। আওয়ামী লীগের বড় নেতা, মন্ত্রী, এমপি ও অন্যান্য অনেক দায়িত্বশীলের বক্তব্য, বচন, মন্তব্যসহ নানা আচরনে স্পষ্ট, সরকার ও দলে জ্ঞান, মেধা, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শীতার তীব্র খরা চলছে। প্রকৃত বঙ্গবন্ধু অনুরাগীরতো এমন ঘাটতি থাকার কথা না! মনে রাখা উচিত, বঙ্গবন্ধু এবং একমাত্র বঙ্গবন্ধু চর্চা,পাঠ, গবেষণা ও অনুসন্ধানেই আমাদের আত্ম অনুসন্ধান সম্ভব। পাঠাভ্যাস ছাড়া এটা অসম্ভব। এখন নেতারা বচন, অঙ্গভঙ্গি, পদ, ক্ষমতা ছাড়া সব ভুলে গেছেন। এতে জোকার তৈরি হয়, বঙ্গবন্ধু ভক্ত তৈরি হয়না!
যত মাতম, নর্তন-কুর্দন ও প্রচারণা সব নিজের পাতে ঝোল টানার কৌশল মাত্র! পঠনপাঠন ও জ্ঞানের টানা চর্চায় ভিতরের লোভী দানব খুন হয়, বঙ্গবন্ধুকেও চেনাজানা যায়। এই শিক্ষা বঙ্গবন্ধু নিজে দিয়ে গেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর অনুসারী দাবিদারের সুবিধাভোগী বড় অংশটা দিন দিন বোধ, মেধা,মননহীন ভূঁড়িসর্বস্ব দ্বিপদী প্রাণি হয়ে যাচ্ছে!
দেশের সারথি বঙ্গবন্ধুর যোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতি নিবেদিত নেতা-কর্মীরা সতর্ক না হলে আকাশ সমান উঁচু বিশ্বনেতা বঙ্গবন্ধুকে সঠিকভাবে চেনা ও জানা সম্ভব না। দেশ যত বেশি উন্নত হোক, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের শোষণ, বঞ্চনমুক্ত সোনার বাংলা তৈরি করতে বঙ্গবন্ধুর কর্ম ও আদর্শিক বীজ ছড়িয়ে দেয়া ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই।

x