বিরোধিতার পরও সিআরবিতে বেসরকারি হাসপাতাল!

৬ একর জমিতে এ হাসপাতাল গড়ে তোলা হবে

রতন বড়ুয়া

শুক্রবার , ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৪:৫৫ পূর্বাহ্ণ
567

চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের বিরোধিতার পরও নগরীর সিআরবি এলাকায় বাংলাদেশ রেলওয়ের জমিতে গড়ে তোলা হবে ৫০০ শয্যার একটি বেসরকারি হাসপাতাল এবং একশ আসনের একটি মেডিকেল কলেজ। প্রকল্পটি অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা বৈঠকেও নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে ডিপিপি প্রস্তুত ও চূড়ান্তের পর গত বছরের শুরুর দিকে প্রকল্পটি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পায়। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর এতদিন সেটি অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা বৈঠকে উত্থাপন ও অনুমোদনের অপেক্ষায় ছিল। বৃহস্পতিবারের (১৩ ফেব্রুয়ারি) সভায় এ প্রস্তাবে সরকার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন। রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে- সিআরবি এলাকায় বিদ্যমান রেলওয়ে (বক্ষব্যাধি) হাসপাতাল সংলগ্ন ৬ একর জমি জুড়ে এই হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ গড়ে তোলা হবে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশীপ (পিপিপি)’র আওতায় ৪৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রী। সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়- সরকারি জমিতে স্থাপন হলেও এই হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা হবে সম্পূর্ণ বেসরকারি (ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক) মালিকানায়। অর্থাৎ সরকারি জমিতে হলেও এই স্বাস্থ্য সেবা ও স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে চড়া দামে (বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মতোই) সেবা নিতে হবে জনসাধারণকে। স্বল্প খরচে সরকারি সেবা এখানে পাওয়া যাবে না। যার প্রেক্ষিতে সরকারি জমিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার এই প্রকল্পটির বিরোধিতা করেছিলেন চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা। এই প্রকল্পকে জনস্বার্থ বিরোধী বলেও অভিহিত করেছিলেন তাঁরা। এ নিয়ে গত বছরের ৪ জুলাই ‘ রেলের জমিতে ৫’শ শয্যার বেসরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ/মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের অপেক্ষা/এই সিদ্ধান্ত জনস্বার্থ বিরোধী-বলছেন বিশেষজ্ঞরা’ শিরোনামে একটি প্রধান প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল দৈনিক আজাদী। স্বাস্থ্য খাতের সাথে সম্পৃত্ত একাধিক জনের অভিমত তুলে ধরা হয় ওই প্রতিবেদনে।
বেসরকারি পর্যায়ে হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ স্থাপনে সরকারি জমি প্রদানের এই সিদ্ধান্তকে জনসাধারণের স্বার্থ বিরোধী বলে ওই সময় মন্তব্য করেছিলেন জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটির আহবায়ক ও মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান।
তিনি বলেন, ব্যক্তি স্বার্থের জন্যই এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে আমরা মনে করি। কারণ, এতে রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ মানুষ সুবিধা পাবে না। ব্যক্তি মালিকানাধীন এই হাসপাতালের সেবা পেতে তাদের (সাধারণ মানুষকে) আকাশচুম্বি খরচ করতে হবে। যা সকলের পক্ষে সম্ভব নয়। ওই জায়গায় হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ স্থাপন করতে হলে সরকারিভাবেই করার দাবি জানিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান।
অন্যদিকে, রেলওয়ের এই সিদ্ধান্ত কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছিলেন পেশাজীবি সমন্বয় পরিষদ, চট্টগ্রামের সভাপতি ডা. একিউএম সিরাজুল ইসলাম। ওই সময় তিনি বলেন-এটি কোনভাবেই জনবান্ধব সিদ্ধান্ত নয়। রেলওয়ে নিজেরা করতে পারতো। তাছাড়া চট্টগ্রামে বিশেষায়িত একটি হাসপাতালও নেই। সরকারি হাসপাতাল করতে জায়গা খুঁজলে পাওয়া যায় না। এখানে অন্তত বিশেষায়িত একটি হাসপাতাল করা যেতো। কিন্তু তা না করে ব্যক্তি মালিকানায় ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। এ সিদ্ধান্ত কোন ভাবেই মানা যায় না। তবে সংশ্লিষ্টদের বিরোধিতার পরও গতকালের অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রকল্পটির নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
মন্ত্রিসভা বৈঠকে অনুমোদনের পর গতকাল সন্ধ্যায় পুনরায় এই দুজন চিকিৎসকের অভিমত জানতে চাওয়া হয় আজাদীর পক্ষ থেকে।
জানতে চাইলে মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান গতকাল আজাদীকে বলেন, এটা কোন ভাবেই ঠিক হয়নি। এর মাধ্যমে সরকারি জমির উপর দিয়ে অন্যদের ব্যবসা করার সুযোগ করে দেয়া হলো। ওই হাসপাতালে রেলওয়ের স্টাফদের চিকিৎসায় বিনাখরচে যদি একশটি শয্যা বরাদ্দ দিলেও একটা কথা ছিল। কিন্তু সেটি তো হচ্ছে না। এখন সবাইকে আকাশচুম্বী দামে এই সেবা কিনে নিতে হবে।
আর রেলওয়ের এই জমিতে সরকার উদ্যোগ নিয়ে এ ধরণের স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারতো জানিয়ে ডা. এ কিউ এম সিরাজুল ইসলাম গতকাল বলেন, চট্টগ্রামবাসীর স্বাস্থ্যসেবায় এত সংকটের মধ্যে এমন সিদ্ধান্ত ঠিক হয়নি। আমাদের (চট্টগ্রামে) বিশেষায়িত কোন হৃদরোগ হাসপাতাল নেই, অর্থোপেডিক হাসপাতাল নেই, কিডনি রোগের চিকিৎসায় বিশেষায়িত কোন হাসপাতাল নেই। একটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হলেও ২/৩ বছরেও এর জন্য জমি মিলছে না। জমি জটিলতায় বিশেষায়িত বার্ন ইউনিটও থমকে গেছে। সবমিলিয়ে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য সেবায় প্রকট সংকট। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি এই জমিতে সরকার উদ্যোগ নিয়ে বিশেষায়িত কোন হাসপাতাল স্থাপন করতে পারতো। সেটি না করে যা করা হলো তা কোন ভাবেই জনবান্ধব সিদ্ধান্ত নয়। চট্টগ্রাম নিয়ে যেন কথা বলার কেউ নেই বলেও আক্ষেপ প্রকাশ করেন পেশাজীবি সমন্বয় পরিষদ, চট্টগ্রামের এই সভাপতি।
এ প্রকল্পের দেখ-ভাল করার দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিচালক (প্রকৌশল) গোলাম মোস্তফা। গতবছরের ৪ জুলাই আজাদীতে প্রকাশিত প্রতিবেদন তৈরি কালীন কথা হয় রেলওয়ের ওই কর্মকর্তার সাথে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়নে দরপত্র (টেন্ডার) আহবান করে রেল মন্ত্রণালয়। এতে (দরপত্রে) ৩/৪টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। তবে যাচাই-বাছাই শেষে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে শিল্প প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড গ্রুপ। অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার কমিটিতে অনুমোদনের পর দায়িত্ব প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানটির সাথে রেল মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক চুক্তি করবে। আর চুক্তির পর হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ স্থাপনের কাজ শুরু করবে দায়িত্ব প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান।
অন্যদিকে, নির্মাণ কাজ ও কার্যক্রম তদারকিতে রেলওয়ের একটি কমিটি কাজ করবে বলে জানান বাংলাদেশ রেলওয়ের যুগ্ম-মহাপরিচালক (প্রকৌশল) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদ রহমান। তবে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় (কাজে) রেলওয়ে হস্তক্ষেপ করবে না বলেও জানান তিনি। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের মতো করে চিকিৎসা সেবার যাবতীয় ফি নির্ধারণ ও আদায় করবে। এক্ষেত্রে রেলওয়ের পক্ষ থেকে হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকবে না।
চুক্তিতে যা থাকবে : বাংলাদেশ রেলওয়ের এই প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির সাথে রেলওয়ের দ্বি-পাক্ষিক এই চুক্তির মেয়াদ থাকছে ৫০ বছর। চুক্তির আওতায় হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ স্থাপনের জন্য রেলওয়ের ৬ একর জমি দেয়া হবে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানকে। দুই ধাপে এই জমি দেয়া হবে। প্রথম ধাপে ২.৪২ একর এবং ২য় ধাপে বাকি ৩.৫৮ একর জমি বুঝিয়ে দেয়া হবে। আর ৫০০ শয্যার হাসপাতালটি নির্মাণে মোট ৫ বছর সময় পাবে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে প্রথম তিন বছরের মধ্যে ২৫০ শয্যার নির্মাণ কাজ শেষ করতে হবে। আর পরবর্তী ২ বছরে শেষ করতে হবে বাকি ২৫০ শয্যার নির্মাণ কাজ। তবে একশ আসনের মেডিকেল কলেজ স্থাপনে ১০ বছর সময় পাবে প্রতিষ্ঠানটি। চুক্তির মেয়াদ (৫০ বছর) শেষে এসব প্রতিষ্ঠান রেলওয়ের মালিকানায় আসবে বলে জানিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন। গতকালের বৈঠক শেষে মন্ত্রী বলেন, এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৪৮৬ কোটি টাকা। এটি ৫০ বছর মেয়াদী হবে। এরপর চুক্তি অনুযায়ী ৫০ বছর পর হাসপাতালটি রেলের হয়ে যাবে।
রেলওয়ে যা পাবে : চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে এককালীন ৫ কোটি টাকা পাবে রেলওয়ে। আর জমির ফি বাবদ পাওয়া যাবে প্রতি বছর দেড় কোটি টাকা। অবশ্য, নির্মাণ কাজ শেষে হাসপাতালের কার্যক্রম চালুর পর এই ফি পাওয়া যাবে। প্রতি তিন বছর অন্তর এই ফি ১০ শতাংশ হারে বাড়বে। এর বাইরে কনস্ট্রাকশন সিকিউরিটি হিসেবে ৫ কোটি টাকা পাওয়া যাবে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে। যা নির্মাণ কাজ শেষে ফেরতযোগ্য।
এছাড়া চিকিৎসা সুবিধা হিসেবে হাসপাতালের নিয়মিত খরচের ২০ শতাংশ কমে চিকিৎসা সেবা গ্রহনের সুযোগ পাবেন রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
জমির অবস্থান : সিআরবি এলাকায় বিদ্যমান রেলওয়ে হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট ও দক্ষিন অংশে ৬ একর জমি জুড়ে গড়ে তোলা হবে এই হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ। এই অংশে রেলওয়ের কয়েকটি কোয়ার্টার রয়েছে। হাসপাতালের নির্মাণ কাজ শুরু হলে এসব কোয়ার্টার ভেঙ্গে ফেলা হবে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।