বিভ্রান্তির পেছনে কী?

ইউএস-বাংলার বিমান দুর্ঘটনা

বুধবার , ১৪ মার্চ, ২০১৮ at ৬:৪২ পূর্বাহ্ণ
256

শতাধিকবার ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণের অভিজ্ঞতা যার রয়েছে, সেই আবিদ সুলতানের পরিচালনার মধ্যে কীভাবে ইউএসবাংলা এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হলো, তা প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে বৈমানিকদের কাছে। বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে ইউএসবাংলার বৈমানিকদের শেষ মুহূর্তের যে কথোপকথন ইন্টারনেটে ঘুরছে, তাতে দুই পক্ষের ভুল বোঝাবুঝি স্পষ্ট। পাহাড় ঘেরা কাঠমান্ডুতে ত্রিভুবন বিমানবন্দরের ঝুঁকিপূর্ণ উত্তর প্রান্ত বা রানওয়ে ২০ দিয়ে না নামতে বৈমানিকদের প্রতি সাধারণ নির্দেশনা রয়েছে বিমান সংস্থাগুলোর। কিন্তু সোমবার বিধ্বস্তের আগে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নির্দেশনা না শুনে ওই রানওয়ের দিকেই কেন যাচ্ছিল ইউএসবাংলার উড়োজাহাজটি, তা এখন বড় প্রশ্ন।

বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ রুটে দুটি ফ্লাইট চালিয়ে কাঠমান্ডু রওনা হওয়ার আগে আবিদ সুলতান কি বিশ্রাম চাচ্ছিলেন? সেই প্রশ্নও ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে। কাঠমান্ডুতে অবতরণের সময় উড়োজাহাজটি কি আবিদ সুলতান চালাচ্ছিলেন, নাকি নবীন পাইলট পৃথুলা রশিদের হাতে ছিল সেই ভার, তার উত্তরও এখনো স্পষ্ট নয়। খবর বিডিনিউজের।

বাণিজ্যিক যাত্রা শুরুর চার বছরের মধ্যে অন্তত তিনটি দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলার পর বড় এই দুর্ঘটনার পেছনে ইউএসবাংলার কোনো গাফিলতি আছে কি না, সেই বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথাও বলছেন অনেকে।

সোমবার ত্রিভুবন বিমানবন্দরে বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান সংস্থাটির উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় অর্ধশত নিহতের ঘটনাটি এখন দেশজুড়ে আলোচিত। কী কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটল, তার কারণ খুঁজছেন সবাই।

ককপিটে বিভ্রাট কেন?

ত্রিভুবন বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে বৈমানিকের কথোপকথন ধরে বিশ্বব্যাপী এভিয়েশন নিরাপত্তার তথ্য সরবরাহকারী সংস্থা জ্যাকডেক বলছে, কোন দিকে নামবে সে বিষয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে পাইলটদের দিক থেকে।

বাংলাদেশের অভিজ্ঞ একজন পাইলট বলেন, ত্রিভুবন বিমানবন্দরে বেশিরভাগ ফ্লাইট নামে দক্ষিণ দিক থেকে। উচ্চতা, বাতাস ও ভৌগলিক অবস্থানের কারণে উত্তর দিক থেকে নামাটা ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি জানান, ১০ বছর আগেই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স থেকে তাদের পাইলটদের নির্দেশনা দেয়, যেকোনো পরিস্থিতিতেই উত্তর দিক (২০) থেকে যেন বিমান নামানো না হয়।

কথোপকথনের ওই অডিও থেকে বোঝা যায়, ইউএসবাংলার ফ্লাইটটি (বিএস ২১১) যখন পৌঁছায়, তখন রানওয়ে ০২ এ আরেকটি উড়োজাহাজ ছিল। তখন তাকে অপেক্ষায় রাখা হয়। এরপর নিয়ন্ত্রণ কক্ষ পাইলটের কাছে জানতে চাওয়া হয়, তিনি কোন দিক দিয়ে নামতে চান, রানওয়ে ০২, না রানওয়ে ২০।

পাইলট তখন বলেন, তিনি রানওয়ে ২০ ধরতে চান। তখন তাকে অনুমতি দেওয়া হয়। শেষ সময়ে পাইলট বলে ওঠেন, তিনি রানওয়ে ০২ এ নামতে যাচ্ছেন, যদিও এর আগে তিনি উল্টো দিকে নামার অনুমতি চেয়ে আসছিলেন। এরপর পরক্ষণেই রানওয়ের পূর্ব পাশে বিধ্বস্ত হয় উড়োজাহাজটি।

ইউএসবাংলা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ আবার ত্রিভুবনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। তারা বলছেন, পাইলটকে ভুল বার্তা দেওয়া হয়েছিল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশের অভিজ্ঞ এক পাইলট বলেন, পাইলটকে দক্ষিণ দিক (০২) থেকে নামতে বলা হয়েছে। পাইলটও নিশ্চিত করেছেন ০২। তারপরও তিনি উত্তর দিক থেকে বিমান নামানোর চেষ্টা করেছেন।

সহকর্মীরা জানান, বাংলাদেশ এয়ারফোর্সের সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট আবিদের বিমান বাহিনীতে মিগ২১ চালানোর অভিজ্ঞতাও রয়েছে। তার সময়কালে সব থেকে ‘ব্রাইট অফিসার’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। নেপালে বিধ্বস্ত ইউএসবাংলার ড্যাশ ৮কিউ৪০০ এয়ারক্রাফটটি ক্যাপ্টেন আবিদই কানাডা থেকে বাংলাদেশে উড়িয়ে এনেছিলেন।

আবিদ সুলতানের ৫ হাজার ঘণ্টা ফ্লাইট চালানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। ১৭০০ ঘণ্টা অভিজ্ঞতা রয়েছে ড্যাশ ৮কিউ৪০০ চালানোর। শতাধিকবার তিনি ত্রিভুবনে বিমান ওঠানামা করিয়েছেন। দুর্ঘটনা কবলিত উড়োজাহাজে আবিদের সঙ্গে ছিলেন নবীন পাইলট পৃথুলা। দুজনেই মারা গেছেন এই দুর্ঘটনায়।

ত্রিভুবনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বিমানবন্দর, যেখানে গত বছরগুলোতে ২২টির বেশি দুর্ঘটনায় ৫০০ এর বেশি মানুষ নিহত হন, সেখানে পাইলট ও সহকারী পাইলটের উড়োজাহাজ চালানোর অভিজ্ঞতা দেখা হয়। যেমন বাংলাদেশ বিমানের ক্ষেত্রে পাইলট ও সহকারী পাইলটের দুজনের ন্যূনতম ৫০০ ঘণ্টার অভিজ্ঞতার দরকার হয়। এছাড়া রুট সিমুলেটর ও রুট সিমিনারাইজেশন করতে হয় এবং দুটি রুট প্রশিক্ষণ দিতে হয় এবং একটি রুট চেক দিতে হয়।

আবিদের অভিজ্ঞতায় ঘাটতি না থাকলেও সহকারী পাইলট পৃথুলার কত ঘণ্টা ফ্লাইট চালানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে তা জানাতে চাননি ইউএসবাংলার মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম। তবে বাংলাদেশি ওই পাইলট বলেন, আমি শুনেছি, ফার্স্ট অফিসারের (পৃথুলা) কাঠমান্ডুতে এটা প্রথম ফ্লাইট।

কথোপকথনের সূত্র ধরে তিনি বলেন, কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে প্রথম সহকারী পাইলট কথা বললেও অবতরণের আগে পাইলট নিজে কথা বলছিলেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিএওর নিয়ম অনুযায়ী, যিনি বিমান পরিচালনা করবেন নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি কন্ট্রোল টাওয়ারের সঙ্গে কথোপকথন চালাতে পারবেন না। তাহলে পাইলট (আবিদ) নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে কথা বলছিলেন মানে হলো, নবীন সহকারী পাইলট বিমান পরিচালনা করছিলেন। অথবা পাইলট নিজে কথা বলছিলেন, আবার বিমানও পরিচালনা করছিলেন। তিনি বলেন, ত্রিভুবন বিমানবন্দরের ঝুঁকি বিবেচনা সচরাচর সহকারী পাইলট দিয়ে সেখানে উড়োজাহাজ অবতরণ করানো হয় না।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা পৃথুলা উড্ডয়নের ডিগ্রি নিয়েছেন আরিরাং এভিয়েশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে। তিনি ২০১৬ সালের জুলাই মাসে ইউএসবাংলায় যোগ দেন।

আবিদ কি ক্লান্ত ছিলেন?

ইউএসবাংলার এই ফ্লাইটের প্রধান বৈমানিক আবিদ কাঠমান্ডুতে ফ্লাইট নিয়ে রওনা হওয়ার আগে অভ্যন্তরীণ রুটে দুটি ফ্লাইট চালিয়েছেন। কথোপকথনের সূত্র ধরে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই পাইলট বলেন, স্বভাবতই তিনি (আবিদ) ছিলেন ক্লান্ত। কথোপকথনেও তাকে সেকরমই মনে হয়েছে। বিমান বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সচরাচর কাঠমান্ডু দিয়ে পাইলটের দিন শুরু করা হয়। তারপরও তার ফ্লাইং আওয়ার থাকলে অন্য রুটে পাঠানো হয়। কিন্তু অন্য রুটে ফ্লাইট চালানোর পর কখনোই কাঠমান্ডু পাঠানো হয় না।

ইউএসবাংলার কামরুল বলেন, আইসিএরও নিয়ম অনুযায়ী একজন পাইলট দিনে ১১ ঘণ্টা ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারেন। আবিদ সুলতানের ক্ষেত্রে সেটা হয়নি।

বিমান পরিচালনায় যুক্ত একজন বলেন, সবরাচর লম্বা দূরত্বের একটি ফ্লাইটের ক্ষেত্রে একজনকে ১১ ঘণ্টা করানো হয়। কিন্তু বারবার ওঠানামার ক্ষেত্রে পাইলট পরিবর্তন করা হয়। পাইলটের ফিটনেসের কোনো প্রতিবেদন আছে কি না, জানতে চাওয়া হলে উত্তর এড়িয়ে যান কামরুল। সর্বশেষ কবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হয়েছে, তাও জানাতে পারেননি তিনি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখা হচ্ছে, আবিদ অন্য চাকরি পেয়ে ইউএসবাংলা থেকে অব্যাহতি চেয়েছিলেন। এছাড়া কাঠমান্ডুতে না যেতে চাইলেও তাকে মতের বিরুদ্ধে পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে কামরুল বলেন, তিনি চাকরি থেকে অব্যাহতি চাননি এবং মতের বিরুদ্ধেও তাকে পাঠানো হয়নি।

সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান এম নাইম হাসান সাংবাদিকদের প্রশ্নে বলেন, কোনো পাইলটকে অপারেশনে রাখা হবে কি না, সেটা নিজস্ব ব্যাপার। এখানে কী ঘটেছে, এটা নিশ্চিত না হয়ে বলা যাবে না।

উড়োজাহাজে সমস্যা ছিল?

এই উড়োজাহাজটির দেড় দশক বয়সের কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে বললেও একে সমস্যা বলে মনে করছেন না এই শিল্প সংশ্লিষ্টরা। কানাডার কোম্পানি বোম্বারডিয়ারের তৈরি ড্যাশ ৮কিউ ৪০০ মডেলের উড়োজাহাজটি ২০১৪ সালে ইউএসবাংলার বহরে যুক্ত হয়। উড়োজাহাজটি ঠিক ছিল বলেই ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল বলে জানান সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান নাইম। উড্ডয়নের দিনও উড়োজাহাজটিতে কোনো সমস্যা পায়নি সিভিল এভিয়েশন। সিভিল এভিয়েশন থেকে এয়ারওয়ার্দি সার্টিফিকেট না পেলে কেউ ফ্লাই করতে পারবে না। এই এয়ারক্রাফটের ব্যাপারে বলতে পারি এটা সকালে দুটো সর্টিং করে এসেছে। অলরেডি এটা তো টেস্টেড। সকালে ঢাকাচট্টগ্রাম দুবার যাবার পর এটা ছিল তার তৃতীয় ফ্লাইট। উড়োজাহাজটি ভালো ছিল, এটা তো নিঃসন্দেহে প্রমাণিত।

কাঠমান্ডুতে বিধ্বস্ত হওয়া ড্যাশ ৮কিউ ৪০০ মডেলের উড়োজাহাজটি নিবন্ধন নম্বর এস২এজিইউ। এই উড়োজাহটিই ২০১৫ সালে সৈয়দপুর বিমানবন্দরের রানওয়ে থেকে ছিঠকে পড়েছিল বলে জ্যাকডেকের তথ্য। তবে কামরুলের দাবি, সেটি অন্য উড়োজাহাজ ছিল।

প্রতিযোগিতার কী প্রভাব?

যাত্রা শুরুর চার বছরও হয়নি; এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে ইউএসবাংলা এয়ারলাইন্স। আবাসন ব্যবসা গোষ্ঠী ইউএসবাংলা গ্রুপের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হিসেবে ২০১৪ সালের জুলাই মাসে যাত্রা শুরু করে ইউএসবাংলা এয়ারলাইন্স। খুব দ্রুতই তারা বাজার সম্প্রসারণ করেছে।

জ্যাকডেকের তথ্য অনুযায়ী, ইউএসবাংলার এটি তৃতীয় দুর্ঘটনা। কিছুদিন আগে চট্টগ্রামে নামার আগে ল্যান্ডিং গিয়ারে সমস্যা দেখা দেওয়ার কিছুক্ষণ আকাশে চক্কর দিয়ে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ অবতরণ করে তাদের একটি উড়োজাহাজ। সম্প্রতি সৈয়দপুর ও যশোর থেকে ঢাকা আসা পৃথক দুটি ফ্লাইটে একটি করে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। এক ইঞ্জিন দিয়ে বিমান চালিয়ে ঢাকায় অবতরণ করা হয়।

এভিয়েশন খাত সংশ্লিষ্ট একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখানে সরকারি এয়ারলাইন্সের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমে সময় ঠিক রাখার জন্য আগ্রাসীভাবে ফ্লাইট চালাচ্ছে তারা। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ থেকেও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ফ্লাইট পরিচালনা। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কুয়াশার মধ্যে বিমান বাংলাদেশ ফ্লাইট বন্ধ রাখলেও কোনো কোনো বেসরকারি এয়ারলাইন্স তার মধ্যেই ফ্লাইট চালিয়েছে।

তবে বেবিচক চেয়ারম্যান বলেন, নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কাউকে ফ্লাইট চালানোর অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। এই দুর্ঘটনার বিষয়ে তিনি বলেন, কীভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটল, সেটা নিয়ে বলার এখতিয়ার এখনো আমার নেই। নেপালের একজন প্রাক্তন সচিবের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। তারপরও আমরা তিন সদস্যের একটি দল সেখানে পাঠিয়েছি। ওই দলটিকে প্রয়োজনীয় সাহায্য সহায়তা করা হবে।

x