বিটিভি চট্টগ্রামকে ঘিরে সবসময় সক্রিয় অশুভ চক্র

স্বার্থের বেলায় সবাই সরব, স্বার্থ ফুরোলেই চুপ

কাশেম শাহ

বৃহস্পতিবার , ১৬ জানুয়ারি, ২০২০ at ৫:৩৮ পূর্বাহ্ণ
29

বিটিভি চট্টগ্রামকে ঘিরে একটি অশুভ চক্র সবসময় সক্রিয় থাকে। কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার পরিবর্তনের সাথে সাথে চক্রের মানুষগুলোও পরিবর্তন হয়ে যায়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেখা মিলছে এমন চিত্রের। ফলে এখানে কোনো জেনারেল ম্যানেজারই দীর্ঘ সময় ধরে সেবা দিতে পারেন না। এর জন্য স্বয়ং জেনারেল ম্যানেজারদের দুর্বলতাও অনেকাংশে দায়ী। ঢাকা থেকে বদলি হয়ে আসার কিছুদিনের মধ্যেই ‘সিন্ডিকেট’ সদস্যদের দ্বারা আবৃত হয়ে পড়েন তিনি। ফলে অনুষ্ঠানের সূচি বরাদ্দ, শিল্পী সম্মানি নির্ধারণসহ নানা জটিলতার জালে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায় জেনারেল ম্যানেজারদের। আর এর কুফল ভোগ করতে হয় দর্শকদের। নির্মিত হয় রুচিহীন, শিল্পবোধহীন অনুষ্ঠান। সাথে আবার কারো কারো ব্যক্তিগত বিষয়ও জড়িয়ে যায় টেলিভিশনের সাথে। আর্থিক কেলেংকারি তো আছেই বিভিন্ন আমলে  নারী কেলেংকারির মতো অভিযোগও পাওয়া যায় কেন্দ্রের সর্বোচ্চ ব্যাক্তিটির বিরুদ্ধে। ফলে তৈরি হয় অস্থিরতা। বিটিভি চট্টগ্রামের সদ্য সাবেক জেনারেল ম্যানেজারকেও তাই দুদকের একাধিক মামলা নিয়ে চট্টগ্রাম ছাড়তে দেখা যায়। তবে সবচেয়ে অবিশ্বাস্য বিষয় হচ্ছে, এরকম বিতর্কিত ব্যক্তিকে টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট ছিল শিল্পী-কলাকুশলীদের একটি অংশ। তারা পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে স্বপদে বহাল রাখার আবদারও করেন। এসব সুবিধাভোগী শিল্পী কলাকুশলীরাই কখনো কখনো আবার কোনো কোনো জেনারেল ম্যানেজারের পদত্যাগ চেয়ে সংবাদ সম্মেলন, সভা-সমাবেশ করেন।
প্রতিষ্ঠালগ্নে ১৯৯৬ সালে চট্টগ্রামে অর্থসহ নানা কেলেঙ্কারীর কারণে মনোজ সেন গুপ্তকে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছিল। তখন তিনি ছিলেন এ কেন্দ্রের প্রযোজক। পরে ঢাকা কেন্দ্রে যোগ দিয়ে ১৯৯৮ সালে দুর্নীতির দায়ে বরখাস্ত হন। সে সময় তিনি বিটিভির প্রযোজক। ২০০৮ সালে প্রযোজক হিসেবে অবসর নেওয়া মনোজ সেনগুপ্ত ২০১৬ সালে আবারো চট্টগ্রামে প্রোগ্রাম ম্যানেজার হিসেবে চুক্তিতে নিয়োগ পান। পরে ভারপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজারের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এরপর ২০১৭ সালে মেয়াদ শেষ হলে আরো এক বছরের মেয়াদ বাড়ানো হয়। তবে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে বিতর্কের হাত থেকে বাঁচতে পারেননি তিনিও। ২০১৮ সালের ৭ মে অনিয়ম-দুর্নীতিসহ ১২টি অভিযোগ এনে মনোজ সেন গুপ্তসহ চার জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ১০ মে মেয়াদ শেষ হলে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়। মনোজ সেনগুপ্তের সময় যারা সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন, তারাই ২০১৬ সালে তৎকালীন জিএম জাঁ নেসার ওসমানের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতাসহ নানা অভিযোগ এনে সংবাদ সম্মেলন করেন।
স্বার্থ আদায়ে সংবাদ সম্মেলন
২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে ‘সম্মিলিত শিল্পী সমাজ, চট্টগ্রাম’-এর ব্যানারে এক সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনটির সভাপতি ও অভিনয়শিল্পী পংকজ বৈদ্য। সংবাদ সম্মেলনে ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক মনোজ সেনগুপ্তকে অপসারণ, স্থায়ী মহাব্যবস্থাপক নিয়োগ, দুর্নীতির তদন্তসহ ১০টি লিখিত দাবি উপস্থাপন করা হয়। এতে বলা হয়, মহাব্যবস্থাপক যোগদানের পর থেকে কেন্দ্রের অসংখ্য গুণী শিল্পীকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করা হচ্ছে। অযোগ্য লোকেরা টাকার বিনিময়ে নিয়মিত অনুষ্ঠান করছেন। মানহীন অনুষ্ঠানের কারণে দিন দিন সিটিভি দর্শকপ্রিয়তা হারিয়েছে। সিটিভিতে ছয় ঘণ্টার নাম করে চার ঘণ্টা পুরোনো অনুষ্ঠান প্রচার করা হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সম্মিলিত শিল্পী সমাজ চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক ফরিদ বঙ্গবাসী, সংগীত পরিচালক এম এম নজরুল ইসলাম, দিলীপ দাশ, অভিনেতা সজল চৌধুরী, গীতিকার ফারুক হাসান প্রমুখ।
এর আগে একই বছরের ২৯ জানুয়ারি তৎকালীন জিএম জাঁ নেসার ওসমানের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ এনে তদন্ত দাবি করেছেন চট্টগ্রাম বেতার ও টেলিভিশন শিল্পী কল্যাণ সংস্থা নামে একটি সংগঠনেরর নেতারা। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন তাহের।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, শুরু থেকেই চক্রান্ত, কর্তাব্যক্তিদের দায়িত্বহীনতা ও দুর্নীতির কারণে চট্টগ্রামবাসীর আকাঙ্খা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ বেতারে চট্টগ্রামের শিল্পীরা ঢাকায় অনুষ্ঠান করতে পারলেও বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের শিল্পীরা পারছে না অভিযোগ করে তিনি বলেন, তাহলে কী চট্টগ্রাম কেন্দ্র বাংলাদেশ টেলিভিশনের অধীনে নয়?
চট্টগ্রাম কেন্দ্রের শিল্পী নির্বাচনী পরীক্ষা সরাসরি বিটিভি ঢাকা কেন্দ্র থেকে সমপ্রচারিত হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, এরপর দেড় দশক অতিবাহিত হলেও এখনো শিল্পীদের তালিকাভুক্তির জন্য অডিশন হয়নি। অথচ এটা চট্টগ্রামের শিল্পীদের প্রাণের দাবি। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেমন অডিশন প্রয়োজন ঠিক তেমনি শিল্পীদের গ্রেডেশন জরুরি।
শিল্পীদের সম্মানী পরিশোধ করতে নির্দিষ্ট কাঠামো রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিন্তু ঢাকা-চট্টগ্রামের শিল্পীদের সম্মানীতে ব্যাপক তারতম্য। ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর মাত্র ১৬ বছরে সাদাকালো থেকে রঙিন সমপ্রচার করতে সক্ষম হলেও ১৯ বছরে পরও বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রকে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। চট্টগ্রাম কেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গ রূপ না পাওয়ার পেছনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অনিয়ম-দুর্নীতিকে দায়ী করে সংস্থার সাধারণ সম্পাদক বলেন, বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রের অনিয়ম-দুর্নীতি অতীতের সব রেকর্ড ছেড়ে গেছে। গত চারমাস ধরে সুরকার, সঙ্গীত পরিচালকদের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ওই টাকা দিয়ে জিএম’র নিয়োগপ্রাপ্ত প্রযোজক, এডিটর সহযোগীদের বেতন দেওয়া হচ্ছে। নিয়োগপ্রাপ্ত এসব প্রযোজক, এডিটর, ক্যামেরাম্যান, মেকাপম্যানদের কাজের কোন অভিজ্ঞতা নেই। সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে সংস্থার সভাপতি কায়সারুল আলম, সহ-সভাপতি শেখ শহীদুল আনোয়ার, মো. মোস্তফা কামাল, সহ-সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন মাহমুদ খান, উপদেষ্টা নাজমুল আবেদীন চৌধুরী, মৃণাল ভট্টাচার্য, জয়নাল আবেদীন, ফাহিম উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।
মজার বিষয় হচ্ছে, সে সময়ে আনা অভিযোগগুলোর কোনো সমাধান না হলেও জিএম পদে পরিবর্তন আসার পরপর সে একই ব্যক্তিদের সুর পাল্টে গেছে। এসব দাবি দাওয়ার ব্যাপারেও তাদের আর কোনো উচ্চবাচ্য করতে শোনা যায় না। তারাই এখন নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা ভোগ করে ‘চোরের মায়ের বড় গলা’র মতো অন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন।
দীর্ঘদিন ধরে সুবিধাভোগিদের হাতে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্র জিম্মি থাকার পেছনে মূলত দায়ী বিটিভি কর্র্তৃপক্ষ। এসব অভিযোগ-অনিয়মের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে সংবাদপত্রে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও সেটিকে আমলে নেন না ঢাকায় থাকা কর্তা ব্যক্তিরা। তাঁরাও যতদিন পারেন এখানকার সব অনিয়মকে ‘সাপোর্ট’ দিয়ে যান। এমনকি শিল্পী কলাকুশলীদের অনেকেই বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাব্যবস্থাপক বরাবরে একাধিকবার লিখিত আবেদন করলেও এর কোনো উত্তর মেলেনি। বাংলাদেশ টেলিভিশন কর্র্তৃপক্ষ এসব অভিযোগের কোনো জবাব না দিয়ে এমনকি অভিযোগ সত্য কিনা তা্‌ও যাচাই না করে একরকম সকল অনিয়ম-দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়ে গেছেন। ফলে বিটিভি চট্টগ্রামকে ঘিরে দুর্নীতি দিনকেদিন চরম আকার ধারণ করেছে।