বিজয়ের আগে শেষ তিনদিন হানাদার বাহিনী ছিল পাগলা কুকুরের মতো

বাসসের গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা

শনিবার , ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৬:১৭ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেছেন, দেশে একটি দল দাবি করে, তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতাও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করার মধ্যে পার্থক্য আছে। মূলত চেতনাকেই ধারণ করতে হবে।
গতকাল শুক্রবার সকালে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক মিলনায়তনে ‘বিজয়ের শেষ ৩ দিন, কেমন ছিল চট্টগ্রাম’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) চট্টগ্রাম অফিস এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। মেয়র বলেন, বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই আছেন যারা ’৭১ এর পরে জন্মগ্রহণ করেছেন। তাদের অনেকেই আছেন, যদি এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করার জন্য হাসিমুখে জীবন উৎসর্গ করবেন। কিন্তু তারা তো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করেন। এখানে বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই। খবর বাসসের।
আলোচনায় অংশ নেন একাত্তরের ১১ বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান, মোহাম্মদ হারিছ, এবিএম খালেকুজ্জামান দাদুল, আবু সাঈদ সর্দার, জাহাঙ্গীর চৌধুরী সিইনসি, প্রফেসর মোহাম্মদ মইনউদ্দিন, ফেরদৌস হাফিজ খান রুমু সিইনসি, রেজাউল করিম চৌধুরী, মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন, মোজাফফর আহমদ ও মনজুরুল আলম মঞ্জু। সঞ্চালনায় ছিলেন বাসসের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান কলিম সরওয়ার। অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ফুল তুলে দেন মেয়র।
প্যানেল আলোচকরা বলেন, বিজয়ের শেষ তিনদিন ছিল আতংক-ভয়, উৎসব-উচ্ছ্বাসের চট্টগ্রাম। পাশাপাশি ছিল ব্যাপক গুজবও। পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাক হানাদার বাহিনী পাগলা কুকুরের মতো আচরণ করে। এসময় তাদের রসদ গোলাবারুদ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা ঘরে-ঘরে, দোকানে-দোকানে ঢুকে লুটতরাজ চালায়।
বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মেয়র বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি সম্পর্কে সবাইকে জানতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আপনি জানলেন, শুনলেন, কিন্তু আত্মস্থ করলেন না, অন্তরে ধারণ করলেন না, তাহলে এই বোঝা ও জানাটা অর্থহীন হয়ে পড়বে।
মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ হারিছ বলেন, চট্টগ্রামে ৩ ডিসেম্বর থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর, ওয়্যারলেস ও বিহারি কলোনিতে পাকিস্তানিরা বসবাস করতো। ওয়্যারলেস কলোনিতে যে বাঙালিকে তারা ধরে নিয়ে গেছে সে আর ফিরে আসে নাই। রেল দাঁড় করে বাঙালি যাত্রীদের নামিয়ে তারা জবাই করেছে। চট্টগ্রামের এসব ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়ার স্পৃহা থাকলেও সুযোগ পাইনি। তিনি তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে বলেন, তোমরা জঙ্গি থেকে সাবধান থেকো। সঠিকভাবে লেখাপড়া করো। মুক্তিযোদ্ধা-গবেষক ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, চট্টগ্রামে ফৌজদারহাট, পতেঙ্গা, আমিন জুট মিল এলাকায় কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মতে একযোগে শতাধিক অপারেশন হয়েছিল। ৩ ডিসেম্বর বন্দরের অয়েল ডিপোতে বিমান আক্রমণ হয়। আমি ভেবেছিলাম পাক বাহিনীর বিমান। তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা বলতে গেলে ছিলই না। আফসোস করতাম, হাতে যদি একটি রাইফেল থাকতো গুলি করে বিমান ফেলে দিতাম।
আবু সাঈদ সর্দার বলেন, জাতীয়ভাবে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস হলেও চট্টগ্রাম সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হয় ১৭ ডিসেম্বর। ১৪-১৭ ডিসেম্বর আমি ছিলাম আগ্রাবাদ এলাকায় মৌলভী সৈয়দের বেস ক্যাম্পে। তখন ওয়ারল্যাস ছিল না বলে খুব দূরের খবর পেতাম না। তিনি বলেন, ১৪ ডিসেম্বর ৩০০ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা একত্রিত হই মুহুরী পাড়ার বিলে। হঠাৎ একটি মাইক্রোবাস আসে। বাঙালি চালক ছিলেন। দুজন বিহারিকে পাই। তাদের ধরে মাটির দোতলায় আমাদের গোয়েন্দা সেলে নিয়ে যাই। তাদের তথ্যমতে নগরীর একটি হোটেল থেকে চারজন মেয়েকে উদ্ধার করি। কিছু অস্ত্রও পাই। ১৭ বার আমার বাড়িতে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাক সেনা নিয়ে হামলা চালিয়েছিল। জল্লাদ জাফরুল্লা ও খোকা বারবার এ বাড়িতে এসেছিল। জল্লাদ খোকা আমার মায়ের নাকে রিভলবার ঢুকিয়ে বলেছিল, তোর পোয়া হডে (তোর ছেলে কোথায়)? বলতে বলতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
পাকিস্তানি সেনাদের টর্চার সেলখ্যাত চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে প্রথম বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো মুক্তিযোদ্ধা এবিএম খালেকুজ্জামান দাদুল বলেন, চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল লালদিঘি মাঠ থেকে। সেখানে মার্চের শুরু থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নাটক হতো। পুরো নয় মাস চট্টগ্রামজুড়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। সার্কিট হাউজ ছাড়াও পুলিশ লাইন ও সাকা চৌধুরীর গুডস হিলসসহ কয়েকটি টর্চার সেল ছিল। ১৬ তারিখ সকালে সার্কিট হাউজে গিয়ে একটা ডকুমেন্ট পাই। সেখানে চট্টগ্রামের কারা আওয়ামী লীগ করেন এবং কাদের মারতে হবে তার লিস্ট উদ্ধার করি। পাকিস্তানের পতাকাটা নামিয়ে চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র শামীমসহ বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেই সার্কিট হাউজে।
ফেরদৌস হাফিজ খান রুমু বলেন, রাউজানের সিইনসি স্পেশাল হিসেবে দায়িত্বে ছিলাম। যুদ্ধকালীন ৭ অক্টোবর আমরা মদুনাঘাট আক্রমণ করি। সেই সম্মুখযুদ্ধে ৮জন পাকিস্তানি সেনা মারা যায়। একজন মুক্তিযোদ্ধাও মারা যায়। সেই স্মৃতি এখনো আমাকে কাঁদায়।
জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন বলেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষ তিনদিন মীরসরাইয়ের দক্ষিণাঞ্চলে ক্যাম্পে অবস্থান করি। এসময় শুনছিলাম প্রচুর মিলিটারি শহর অভিমুখে যাচ্ছে। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক, উদ্বেগ ও ভয় ছিল। কারণ রাজাকার, মুক্তিযোদ্ধা, সিভিল সবার হাতে অস্ত্র ছিল না। রাতে কিছু বাড়ি লুট হয়। রাজাকার আতাউস সোবহানের জল্লাদখানায় করুণ অবস্থা দেখেছি। চারদিকে মানুষের মাথার খুলি, রক্তের দাগ।

x