বাড়বকুণ্ডের ‘লাল গয়াম’

লিটন কুমার চৌধুরী : সীতাকুণ্ড

সোমবার , ২৯ জুলাই, ২০১৯ at ৪:২৮ পূর্বাহ্ণ
174

বাড়বকুণ্ড মধ্যম মাহমুদাবাদ গ্রামের পেয়ারা চাষী মোঃ নুরুল আবছার অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করে আর্থিক দৈন্যতার কারণে লেখাপড়া বাদ দিয়ে বন বিভাগ থেকে লিজ নিয়ে বাড়বকুণ্ড পাহাড়ে পেয়ারা চাষ শুরু করে। কঠোর পরিশ্রম করে পাহাড়ি টিলায় পেয়ারা চারা রোপণ করে পাঁচবছর পর থেকে বাগানে পেয়ারা ধরতে শুরু করে।
তিনি জানান, ৪০শতক জায়গায় পেয়ারা বাগান করতে জঙ্গল পরিষ্কারসহ মোট ৩০হাজার টাকা খরচ পড়ে। তিন বছর পর পেয়ারা ধরতে শুরু করলে মাত্র তিন মাসে ৭০হাজার টাকার পেয়ারা বিক্রি করে। তিনি জানান, পেয়ারা চাষ করেই তাদের ১০জনের পরিবারের ভরণ পোষণ চলছে। শুধু তিনি নন, পেয়ারা চাষই এখানকার অধিকাংশ মানুষের জীবন-জীবিকার একমাত্র অবলম্বন।
বাড়বকুণ্ড পাহাড়ে গিয়ে দেখা যায়, পেয়ারার আঞ্চলিক নাম ‘গয়াম’। সীতাকুণ্ড এলাকার প্রায় ২০কিলোমিটার পাহাড়ী অঞ্চল জুড়ে গড়ে উঠেছে পেয়ারা বাগান। অনেকে বংশানুক্রমিক পাহাড়ে পেয়ারা চাষ করে আসছে। আষাঢ় থেকে ভাদ্র-এই তিন মাস এলেই চাষীদের চোখে-মুখে আনন্দের চিহৃ দেখা যায়। এখানকার লোকজন পেয়ারা চাষ করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছে।
সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ডের উৎপাদিত সুস্বাদু ‘লাল পেয়ারা’ এখন দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। সরকারি উদ্যোগ ও সহযোগিতায় এখানকার পেয়ারা চাষীরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।
সীতাকুণ্ডে দুই ধরনের পেয়ারার চাষ হলেও বাড়বকুণ্ডের লাল পেয়ারা নামে চাষে কৃষকদের উৎসাহ বেশি। স্থানীয় চাষীদের ভাষায় এই পেয়ারার নাম ‘আঞ্জির পেয়ারা’। এই পেয়ারার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, বাইরে হলুদ অথবা সবুজ আর ভেতরটা লালচে গোলাপী, আকারে খুব একটা বড়না হলেও স্বাদে অতুলনীয়। যে কোনো পেয়ারাতেই ভিটামিন ‘সি’ থাকলেও লাল পেয়ারায় ‘সি’ এর সাথে অতিরিক্ত আছে ভিটামিন ‘এ’। এ মন্তব্য উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সুভাস কান্তি নাথের। প্রায় ২০কিলোমিটার পাহাড়ি এলাকায় পেয়ারার চাষ হলেও একমাত্র বাড়বকুণ্ড এলাকায় স্বল্প পরিসরে চাষ হওয়া লাল পেয়ারার সুস্বাদু আর নজরকাড়া রঙের কারণে ইতোমধ্যে খ্যাতিলাভ করেছে।
কৃষিবিদদের মতে, লাল পেয়ারা একটি বিশেষ প্রজাতির পেয়ারা, তাই আর্কষনীয়। আর চাষীদের কথায়, চাহিদা এবং লাভ দুটোই আছে তাই চাষ করি। বাড়বকুণ্ড পাহাড়ে গেলে বাগানে চাষীদের ব্যস্ততা দেখে মনে হয় সারাদেশেই যদি লাল পেয়ারা চাষ হতো এই পেয়ারা রফতানি করেই দেশ হয়ত কোটি কোটি টাকা আয় করত। চাষী ছমিউল হক বলেন, এই পেয়ারা চাষ করে আমরা প্রচুর লাভবান। এই চাষে মাত্র তিন মাস সময় দিয়ে এর লাভ থেকে সারাবছর সংসার খরচের টাকা আয় করি। তিনি বলেন, তার দু’একর জমিতে বাগান পরিষ্কারসহ ২০টাকা খরচ করে ৬০হাজার টাকার মত লাভ হয়েছে।
একইভাবে মান্দারি টোলা গ্রামের হানিফ ৫০হাজার টাকা খরচ করে দুই লাখ টাকা, আতর আলী ও কামাল উল্ল্যা ৬০হাজার টাকা খরচ করে ২লাখ টাকা, সেলিম উল্ল্যা ২০হাজার টাকা খরচ করে ৭০হাজার টাকা, আলিম উল্ল্যা ২০হাজার টাকা খরচ করে ৮০হাজার টাকা, আবুল বশর বাবুল ৩০ হাজার টাকা খরচ করে এক লাখ টাকা আয় করেছে।
জানা যায়, মান্দারী টোলা গ্রামের শতকরা আশিজন লোক পেয়ারা চাষ করেই জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। তবে তারা জানান, অন্যান্য বছরের চেয়ে পেয়ারার বাম্পার ফলন হলের চাষীরা বাজারে পেয়ারার মূল্য পাচ্ছেনা।
কৃষি বিভাগ সুত্রে জানা যায়, উপজেলার প্রায় ৩’শ একরের মত এলাকায় পেয়ারা চাষ হলেও শুধুমাত্র বাড়বকুণ্ড এলাকায় লাল পেয়ারার চাষ হয়। মজার ব্যাপার হলো, ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্বেও লাল পেয়ারা চাষ কেন সমগ্র উপজেলায় বিস্তৃত নয়, তার উত্তর দিতে গিয়ে কৃষক এবং কৃষি বিভাগ ভিন্ন মত পোষণ করেন। কৃষি বিভাগের মতে, লাল পেয়ারা চাষে সাধারণ পেয়ারার চেয়ে বেশি সময় লাগে তাই কৃষকরা অধৈর্য হয়ে পড়ে। অন্যদিকে চাষীরা জানান, চাহিদার কারণে আমরা লাল পেয়ারা চাষে বেশি আগ্রহী কিন্তু মাটি ও প্রকৃতির কারণে বাড়বকুণ্ডের বাইরে এই পেয়ারা চাষে উল্লেখযোগ্য অর্জন সম্ভব হচ্ছেনা। তারপরও সমপ্রতি উপজেলার জোরামতলে কয়েক একর জমিতে লাল পেয়ারা চাষ করে সফলতা আসেনি।
বাড়বকুণ্ডের লাল পেয়ারাকে ঘিরে এখানকার বাজারগুলো জমজমাট তাকে। খুব ভোরে চট্টগ্রাম মহানগরীর অবস্থানের কারণে সেখান থেকে পাইকাররা এসে এই পেয়ারা নিয়ে যায়। শুধু মহানগরীর নয়, আশপাশের অনেক উপজেলা এমনকি বাস-ট্রেনেও হকারদের বাড়বকুণ্ডের ‘লাল পেয়ারা’ বলে চিৎকার করে পেয়ারা বিক্রি করতে দেখা যায়।
উপজেলার বাড়বকুণ্ড, মোহন্তের হাট, শুকলাল হাট, কুমিরা বাজার ও দারোগারহাট বাজার সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিদিন ভোর থেকে চাষিরা দলে দলে বাগান থেকে পেয়ারা তুলে পেয়ারার ভার কাঁধে নিয়ে আসতে থাকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন বাজারগুলোতে। পাইকারি ব্যবসায়ীরা এখান থেকে কমমূল্যে কিনে ট্রাকযোগে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাচ্ছে।
এব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাফকাত আহমেদ বলেন, এই পেয়ারা চাষ করাটা কঠিন কিছু না। মাটি বা প্রকৃতির বিশেষত্বের কারণে এটা অন্যত্র চাষ হয় না একথা ঠিক না। সঠিক নিয়মে লাগালে বা পরিচর্যা করলে এর ফলন এই অঞ্চলে খুবই ভাল হবে।

x