বাস্তবতার বিমূর্ত গল্প

লুসিফার লায়লা

মঙ্গলবার , ২৯ অক্টোবর, ২০১৯ at ১০:১৭ পূর্বাহ্ণ
10


প্রকাশিত হবার ইচ্ছে মানুষের আদিমতম বাসনা। সৃষ্টিশীল মানুষের ক্ষেত্রে এ-বাসনার আকাঙ্ক্ষা এতটাই অপ্রতিরোধ্য যে সে চাইলেও থেমে যেতে বা তাকে থামিয়ে দিতে পাওে না কোন কিছুই কোন অবস্থাতে শিল্পী রূপালী রায় সেই অপ্রতিরোধ্য সৃষ্টিশীল সত্তার নাম। ছেলেবেলা থেকে ছবি আঁকার প্রতি পক্ষপাত থাকা সত্ত্বেও নিজের শিল্পী সত্তাকে প্রকাশ করবার জন্যে মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন নাচকে। বলা বাহুল্য নৃত্য পৃথিবীর প্রথম ভাষা মানুষ যার ভেতর দিয়ে প্রথম নিজেকে প্রকাশের চেষ্টা করেছে। নিজেকে প্রকাশ করবার জন্যে তো বটেই নিজেকে বিকশিত করবার আধার হিসেবে নাচকে তিনি বেছে ছিলেন। হঠাৎ দুর্ঘটনায় শারীরিকভাবে আঘাত প্রাপ্ত হয়ে নৃত্য শিল্পীর জীবন থেকে তাঁকে সরে দাঁড়াতে হয়। এই সরে দাঁড়ানোতে তাঁকে সাময়িক ভাবে থমকে যেতে হয়েছে কিন্তু সে সাময়িক অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পথ তিনি খুঁজতে চেষ্টা করেছেন। মনে মননে মেধায় যিনি প্রকৃত অর্থেই সৃজনশীল। তাঁর স্থবিরতা খুব সাময়িক, তাঁর নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হবার সম্ভাবনাই চুড়ান্ত সত্য। ছেলেবেলার ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহকে জাগিয়ে দিয়ে ছোট ছোট কাজ করতে করতেই বুঝিবা তাঁর প্রস্তুতি সম্পন্ন করে নিচ্ছিলেন শিল্পী। সে প্রস্তুতির সাথে যুক্ত হয়েছে তার এক বন্ধুর উৎসাহ, তিনি নতুন করে মেতে উঠলেন ছবির জগতে ।
প্রাতিষ্ঠানিক শিল্প শিক্ষার ভেতর দিয়ে যেহেতু তিনি আসেননি ফলে তার নিজেকে তৈরি করবার প্রক্রিয়াও খানিকটা আলাদা। কিন্তু শিল্পী হবার যে মানসিক প্রস্তুতি সেটি তার মধ্যে শুরু থেকেই প্রবলভাবে ছিল। নিবিড় পর্যবেক্ষণ, গভীর উপলব্ধি, বুদ্ধিবৃত্তিক মনন এবং সংবেনশীল সত্তা এইসব গুণ তার সহজাত, ফলে চিত্রশিল্পী হয়ে ওঠার লক্ষ্যে বাকি প্রাথমিক প্রাতিষ্ঠানিক ধারণাগুলো তাকে আয়ত্ত্ব করতে হয়েছে নতুন করে। শিল্পী অসিত পালের কাছে টানা চার বছর শিখেছেন , শিল্পী সমীর আইচের কাছেও শিখেছেন কিছুকাল। তারপর আর থেমে থাকেননি রূপালী, নিয়ত চর্চার ভেতর দিয়ে নিজেকে নির্মাণ করেছেন। অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্পী হবার সুবাদে যে সব প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয় এখনো, রূপালী রায়কেও সেসব পথ পাড়ি দিয়ে আসতে হয়েছে। নতুনকে সহজে আহবান জানাবার মত সহজ পরিবেশ এখনো সম্পুর্ণ হয়ে পারেনি আমাদের এদিকের শিল্প ক্ষেত্রে । যদিও একথা আমরা প্রায় সকলেই জানি যে একাডেমি পাশ করে বেরুলেই শিল্পী হয়ে ওঠা যায়না । শিল্পী হয়ে ওঠার জন্যে যে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং উপলব্ধির সমন্বয় ঘটা জরুরী সেটা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সম্ভব নয়। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে শিল্পী গণেশ হালুই বলেছিলেন ‘জীবন দিয়ে উপলব্ধি করতে না পারলে বিমূর্ত হোক বা বাস্তবধর্মী হোক কোনটাই শিল্প হবেনা।’

রূপালী রায় কাজ করেন বিমূর্ত বাস্তবতা নিয়ে , ছাপচিত্রের ধরণে আঁকা টেকনিকের স্বতন্ত্র ব্যবহার তার নিজস্বতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আমাদের নিত্যকার দেখা, শোনা এবং স্পর্শেও যে জগৎ তাকে ভেঙে নিয়ে নতুনভাবে উপস্থাপনের যে প্রয়াস শিল্পীরা চালান তাই মূলত বিমূর্ত শিল্প। মূর্ত এবং বিমূর্ততার ইলিউশানের ভেতর নিজের উপলব্ধিকে প্রকাশ করবার তাগিদ আমরা দেখতে পাই শিল্পী রূপালী রায়ের কাজে। সাধারণ চোখের দেখার বাইরে যে আরো আরো বেশি কিছু দেখার তাগিদ থাকে চিত্রশিল্পীর ভাবনায় তারই আভাস মেলে রূপালী রায়ের ছবিতে। মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্টগুলোকে নিয়ত গড় করে দেখবার কারণেই তার ছবির বড় অংশ জুড়ে রয়েছে নিজের এবং অন্য মানুষের মনোজগত। আর রয়েছে আমাদের চেনা প্রকৃতি যা রূপালীকে মানুষের মতই আবিষ্ট করে রাখে। তাঁর বিষয় ভাবনার বৈচিত্র এবং পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা তাঁর ছবির দর্শকদের ভাবনার খোরাক যোগায়। ফেমিনিটি, ট্রেপট, ইনোএনডো সিরিজের কাজগুলোতে আমরা দেখব মানুষের মনের নানা অবস্থার ছাপ রয়েছে। মানুষের নিজের ভেতরকার ভাঙচুর, নিজের তৈরি করা যশ খ্যাতির জগতের ভেতর ক্রমশ জড়িয়ে গিয়ে হাঁসফাঁস করতে থাকা মন, নিজেকে প্রকাশ করবার আরোপিত পন্থার সাথে চলা দ্বন্দ্ব সহ নানা মনোজাগতিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াকে মূর্ত হতে দেখি এইসব কাজে। আবার তাঁর নেচার বা ল্যান্ডস্কেপ শিরোনামের কাজ গুলোতে তিনি তাঁর চেনা প্রকৃতিকে এঁকেছেন ব্যক্তিগত উপলব্ধি দিয়ে। কাজ করেছেন দেবী দুর্গাকে নিয়েও। দক্ষিণ ভারতীয় লোকশিল্পের আঙ্গিকের সাথে নিজের আঙ্গিককে মিলিয়ে নিয়ে এঁকেছেন দুর্গা সিরিজ। নারী শক্তির উদযাপনের যে জোয়ার এসেছে সমাজে রাষ্ট্রে তার প্রতিফলন যেমন কাজগুলোতে দেখা যায়, তেমনি রয়েছে নানান অবস্থায় নারীর দ্বিধা বিভক্ত মন আর চিরাচরিত মাতৃরূপেন সংস্থিতা।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকায় শুরুতে যে দ্বিধা কাজ করত সেসব কাটিয়ে এখন তিনি আঁকেন নিজের আনন্দে। তাঁর ভাষায় ‘মন যেভাবে চেয়েছে সেভাবেই তুলে ধরেছি।’ আর আলাপচারিতার এক ফাঁকে জানালেন ছবি না এঁকে একটা দিনও পার করা অসম্ভব তার পক্ষে। বোধ করি শিল্প চর্চার প্রতি এই দুর্মর আকাঙ্ক্ষাই তাঁকে যথার্থ অর্থে শিল্পী করে তুলেছে। রবীন্দ্রনাথ বাঙালির ভাবনার জগতের নিত্য সহচর, জীবনের নানা ভাবনায় দর্শনে, দৃষ্টিভঙ্গিতে রবীন্দ্রনাথ আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখেন , রূপালী রায়ের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। তার নিত্যকার জীবনে তো বটেই তাঁর শিল্প ভাবনাও রবীন্দ্রনাথের প্রভাব রয়েছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের এই প্রভাব সত্ত্বেও রূপালী রায় তার শিল্পকে স্বতন্ত্র ভাষায় উপস্থাপনের ক্ষেত্রে দারুণভাবে সক্ষম। এ-মাসের ১৭ থেকে ১৯ অক্টোবর এই ভারতীয় চিত্রশিল্পী রূপালী রায়ের একক চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে ‘চিত্রভাষা’ গ্যালারি। এখানে তাঁর নানা বিষয় ও মাধ্যমে আঁকা বাইশটি চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে। নানা মাধ্যমে কাজ করতে স্বত:স্ফূর্ত শিল্পীর নিজের বিশেষ প্রিয় কালি কলম, এছাড়াও প্রাকৃতিক রং এবং ভাস্কর্য শিল্পেও তার ব্যাপ্তি রয়েছে। তিন দিন ধরে চলা এই প্রদর্শনী শিল্পীদের তো বটেই সাধারণ দর্শকদের কাছেও ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে।

x