বাথটাবে ঘুমিয়ে পড়ার আগে

ফারজানা শারমীন সুরভি

মঙ্গলবার , ১১ জুন, ২০১৯ at ১০:৫৭ পূর্বাহ্ণ
196

বাড়ির পেছনে একটা বাগান আছে। বাগানটাতে একটা কবর খুঁড়ছি। দেখতে হাবা-গোবা ধরনের বাঙালি মেয়ে হওয়ার অনেক সুবিধা। এই যে আমি এত ঠাণ্ডা মাথায় কবর খুঁড়তে পারি, সেটা কারো পক্ষে কল্পনা করা অসম্ভব! আমার গায়ে শক্তি বেশি নেই। একটানা কবর খুঁড়তে পারি না।
বাগান করার জন্য সার, কোদাল, পানির বালতি, গাছের চারা- এইসব হাবিজাবি এনে রেখেছিলেন আমার শ্বশুর। আমার শ্বশুরবাড়ির মানুষজনের কোনো শখ বেশিদিন টেকে না অবশ্য! সব শখ পূরণের জন্য তাঁরা ছেলের বউয়ের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন। কিছু দিন আগে শ্বাশুড়ি বললেন, তাঁর নাকি খুব আমের মোরব্বা খেতে ইচ্ছা হচ্ছে! মোরব্বা খাওয়ার রুচি বা পেট কোনোটাই তাঁর এ বয়সে নেই। কিন্তু তিনি মনে করেন, ছেলের বউদেরকে রাজ্যের কাজ দিয়ে বসিয়ে রাখলে সংসার সুখের হয়। মেয়েমানুষ যতো কাজের চাপে থাকবে, কুটনামি করার সময় ততো কম পাবে। আমি ভালো বউ। তাই কিছু না বলে চুপচাপ আমের মোরব্বা বানিয়েছি। একবার ভেবেছিলাম, আমের মোরব্বার মধ্যে থুতু মিশিয়ে বাড়ির সবাইকে খাইয়ে দিব। আমার সাহস কম। তাই শেষমেশ থুতু গিলে ফেলেছি। ঘাড় গুঁজে চিনির শিরা ঘন করে ঢেলে দিয়েছি টুকরো টুকরো করে কাটা আমে।
মুগ্ধ হয়ে বাড়ির কাজের বুয়ার উঁচু মাথা দেখি। নিজের জন্য মায়া হয় তখন! আমার শাশুড়ি একবার ‘অই, ফকিন্নির বাচ্চা! আঁচলে বাইন্ধে কী নিয়ে যাইতেসিস রান্না ঘর থেকে’- এই কথা বলে নিজের খানদানের তেজ দেখাচ্ছিলেন। সাথে সাথে ক্লাস ফাইভ পাস কাজের বুয়া পানির বালতি লাথি মেরে ফেলে হুঙ্কার দিয়ে কাজ ছেড়ে চলে যায়। আমি কলেজে পড়েছি। তবে এখন আমি ভালো বউ! তাই পড়াশোনা ভুলে মেরুদণ্ড বিক্রি করে বিয়ে বসেছি!
মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার কপালটা খুব খারাপ! বিয়ের আগে ইডেন কলেজে পড়তাম। ইকোনোমিঙে। পড়া শেষ করতে পারলাম না। ভালো ছেলে দেখে আম্মা তাড়াহুড়া করে বিয়ে দিয়ে দিল। অবশ্য উপায় কী? আব্বা মারা গেল যে! তখন মামারা আম্মাকে বললো, আমাকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দিতে। আমি কালো। বাবা নেই। আমার সহজে বিয়ে হবে না। তাই ছেলেদের ঢাকায় বাড়ি আছে- এরকম সুপাত্রের প্রস্তাবে আম্মা না করার কোন কারণ দেখেনি। বিয়ে নিয়ে আমার মধ্যে কোন উত্তেজনা ছিল না। আমি ভালোবাসতাম তিন্নিকে। ওকে বিয়ে করা সম্ভব ছিল না। বাংলাদেশের মতো নব্বই ভাগ মুসলমানের দেশে একটা মেয়ে আরেকটা মেয়েকে বিয়ে করতে পারে না! আমেরিকাতে জন্মালে হয়তো যাকে ভালোবাসতাম, তাকেই বিয়ে করতে পারতাম। আমাদের সমাজে তো বিয়েটা আসলে ভালোবাসার জন্য হয় না! হয় সমাজে মুখ বাঁচানোর জন্য! তাই বিয়ে করে আম্মাকে মুক্তি দিতে চেয়েছিলাম কেবল! আমার স্বামীর মধ্যেও বিয়ে নিয়ে কোন উত্তেজনা ছিল না। এটা তার দ্বিতীয় বিয়ে। প্রথম স্ত্রী মারা গিয়েছিল। সেই মেয়েটার নাম ছিল সুরাইয়া। পা পিছলে বাথরুমে পড়ে যায়। তিন মাসের প্রেগন্যান্ট ছিল।
বিয়ে করে আসার পর থেকে নিয়মিত মাথা নিচু করে মুখ ঝামটা খেতাম। আমার স্বামী খুব রাগী। মাঝে মাঝে পানি ভরতি গ্লাস ছুঁড়ে মারতো মুখের দিকে। একবার ফুলদানি ছুঁড়ে মেরেছিল। কি ভয়ংকর কথা! মরে যেতাম যদি! সবসময় মাথায় ঘোমটা দিয়ে থাকতাম। মাথা থেকে ঘোমটা কখনো সরে গেলে, শ্বাশুড়ি পিঠে কিল দিতেন। মাঝে মাঝে যখন উনার মেজাজ ভালো থাকত, তখন তিনি ফিসফিস করে আমার কাছে একটা নাতির আবদার করতেন।
এই মহিলার আবদার পূরণ করতে গিয়ে প্রতি রাতে স্বামীর সাথে আমাকে ঘুমাতে হত। লোকটার মুখ থেকে সবসময় সিগারেটের একটা কটু ঘ্রাণ আসতো। বমি পেত আমার। খুব বমি পেত! পুরুষের গায়ের গন্ধে সবসময় বমি পায়! দম বন্ধ করে তবু লাশের মতো শুয়ে থাকতাম। পা ফাঁক করে ছাদের সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে তিন্নির কথা চিন্তা করতাম। তিন্নিকে আদর করতে কি যে ভালো লাগতো! আমার মুঠোর মধ্যে তিন্নি কেমন আইসক্রিমের মতো গলে যেত! সবাই জানতো, ও আমার ছোটবেলার বান্ধবী। বিয়ের আগে তিন্নির বাসায় বেড়াতে যাওয়ার অনুমতি ছিল আমার। সেরকম একেকটা দিনে, তিন্নি আর আমি মাঝে মাঝে আদর শেষে দুইজন দুইজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতাম। কখনো ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতাম, ‘ন্যায় অন্যায় জানি নে, শুধু তোমারে জানি’। সারাক্ষণ একটা ভয়ের মধ্যে থাকতাম আমরা দুইজন। নব্বই ভাগ মুসলমানের দেশ এটা! লোকজন যদি জানতে পারে যে- একটা মেয়ে আরেকটা মেয়ের সাথে প্রেম করছে, তবে একসাথে জবাই দিবে দুইজনকে।
গায়ে হলুদের দিন তিন্নিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছিলাম। তিন্নির স্বামী শুকনা মুখ করে পাশে দাঁড়িয়েছিল। আর কাউকে ধরে কিন্তু কাঁদিনি। এমনকি আমার মরা আব্বার কথাও মনে পড়েনি বিয়ের সময়ে। বিয়ের পরে তিন্নির সাথে আর দেখা হয়নি। এই দোতলা বাড়িটা জেলখানার মতো। একবার ঢুকলে আর বের হওয়া যায় না। মাথা নিচু করে থাকা বাঙালি বউদের বাপের বাড়ি যেতে গেলেও শ্বাশুড়ির অনুমতি নেয়া লাগে। তিন্নির সাথে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করিনি। ও নিষেধ করেছিল। সে সংসারী হতে চায়। কোনো ঝামেলাতে পড়তে চায় না!
শাশুড়িকে নাতি উপহার দেয়ার জন্য নিয়মিত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হল। পিরিয়ড মিস করার পরে চেক করে দেখলাম, প্রেগন্যান্সি টেস্ট পজিটিভ। খুব আনন্দিত ছিলাম না। আবার ঠিক কষ্টও পাইনি। কেমন জানি একটা শূন্যতা বোধ হচ্ছিল! তিন্নির একটা মেয়ে বাচ্চার খুব শখ ছিল। আমার প্রেগন্যান্সির খবর স্বামীকে জানানোর পরে, সে রাগ-রাগ মুখ করে তাকিয়ে থাকল। কিছুটা অবাক হয়েছিলাম! শ্বাশুড়ি খুশি হলেন। আদর-যত্ন অবশ্য কিছু বাড়লো না। সবাই আমাকে বললো, পেটে বাচ্চা নিয়ে ঘর মুছলে নাকি সিজার করা লাগে না! প্রেগন্যান্ট অবস্থায় যতো খাটনি করবো, বাচ্চা নাকি ততো আরামে হবে! নরমাল ডেলিভারির জন্য সবাই আমাকে প্রস্তুত করতে শুরু করলো। শ্বাশুড়ি হাতে তাবিজ বেঁধে দিলেন। তাঁর রাজপুত্রের মতো নাতি চাই।
বিশ সপ্তাহ পরে পরিস্থিতিতে একটা পরিবর্তন দেখা গেল। সেদিন ডাক্তার আপার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। পেটের বাচ্চাটা মেয়ে শুনে, আমার স্বামীর ঠোঁটে রাগে ফেনা জমছিল। আমার শাশুড়ির দুই ছেলে। এক ছেলে কুয়েতে থাকে। বিয়ে হয়নি। আর আমার স্বামী ছোট ছেলে। আমি আসলে বুঝতে পারিনি যে, ছেলে বাচ্চা এদের এত পছন্দ! তাহলে ঠিক ঠিক আমি ছেলে বাচ্চা হওয়ার দোয়া মুখস্থ করতাম সারাদিন! আমি আমার আব্বার একটাই মেয়ে ছিলাম। আব্বা বলতো, ‘মেয়েরা আল্লাহর বরকত!’ ছোটবেলায় তো আর জানতাম না, আব্বার মিথ্যা কথা বলার স্বভাব ছিল!
বাসায় আসার পরে আমার শ্বাশুড়িও মুখ কালো করে ফেললেন। ছেলের সাথে কিছুক্ষণ গুজুর-গুজুর ফুসুর-ফুসুর করলেন। এরপর শ্বাশুড়ি আম্মার ছেলে এসে আমাকে বললো, পেটেরটাকে মেরে ফেলতে হবে! তিন্নি জীবনে থেকে চলে যাওয়ার পরে কাঁদিনি। কিন্তু সেদিন কাঁদলাম। ইচ্ছা হচ্ছিল, শহরের সবাইকে ফোন দেই। তারপর চিৎকার করে বলি, ‘আমি একটা সাইকোর সাথে থাকি। এক বিছানাতে ঘুমাই। আমার পেটে ঘুমায়ে থাকা লক্ষ্মী বাচ্চাটাকে এই সাইকোটা মেরে ফেলবে! তোমরা আমাকে বাঁচাও! আমার মেয়েটাকে বাঁচাও! ’
সেসময় থেকেই চিন্তাটা শুরু হয়।
আমি বারো ভূতের জন্য ইফতার বানাই।
মাথার মধ্যে গানের মতো গুনগুন করে, ‘বিষ খাওয়ায়ে মেরে ফেললে কেমন হয়?’
আমি শাশুড়ির মাথায় নারিকেলের তেল দেই।
মাথার মধ্যে গানের মতো গুনগুন করে, ‘বিষ খাওয়ায়ে মেরে ফেললে কেমন হয়?’
স্বামী ‘মাগি’ বলে গালি দেয়।
মাথার মধ্যে গানের মতো গুনগুন করে, ‘বিষ খাওয়ায়ে মেরে ফেললে কেমন হয়?’
সবাইকে বিষ খাওয়ায়ে মেরে ফেলতে ইচ্ছা করে আমার!
ঈদের এক সপ্তাহ আগে, শ্বশুর-শাশুড়ি গ্রামের বাড়িতে গেলেন। আমার স্বামী যেতে পারেনি। সব ঈদে সে ছুটি পায় না। তাদের রোস্টার করে অফিসে ডিউটি থাকে ঈদের সময়েও। শ্বশুর-শাশুড়ি গ্রামে যাওয়ার আগে তাদেরকে আশ্বস্ত করি, পেটের মেয়েটাকে মেরে ফেলব। কেন জানি সন্দেহ হচ্ছিল, আমার স্বামীর আগের বউ সুরাইয়াকে এরা মেরে ফেলেছে! সুরাইয়ার নিশ্চয়ই পেটের বাচ্চাটার জন্য মায়া পড়ে গিয়েছিল। স্বামী অফিসে যায়। যাওয়ার আগে নরম স্বরে বলে, ‘ঈদের পরে ডাক্তারের কাছে যাব আমরা। তোমার খুব বেশি কষ্ট হবে না। খুব ভাল ডাক্তার। ইনশাল্লাহ, পরের বার আমাদের ছেলে হবে।’ কিছু না বলে ঘাড় নাড়ি। আগেই বলেছি, আমি ভালো বউ। ভালো বউরা চুপ করে থাকে। কুঁজো হয়ে ঝুঁকতে ঝুঁকতে মাটিতে মিশে যায়।
শ্বশুর-শাশুড়ি গ্রামে গেলে খুব আনন্দ হয়। এই দোতলা বাড়িতে প্রথমবারের মতো একা। নিজেকে মুক্ত মনে হয়। পাখির মতো ডানা ঝাপটিয়ে জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়তে ইচ্ছা করে। জানালা দিয়ে না লাফিয়ে, বাগানে আসি। একটা কবর খোঁড়া শুরু করি। আমার স্বামীকে কি সেমাইয়ের সাথে বিষ মিশিয়ে খেতে দিব? তারপর তাকে এই মাটিতে পুঁতে ফেলব? মাটির উপরে একটা ক্যাকটাস গাছ লাগাবো? সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে থাকি। আমার কাছে মনে হয়, ক্যাকটাস গাছে অনেক সুন্দর গোলাপি-লাল ফুল হয়। আমার স্বামী এই গাছের যোগ্য না। হাজার চিন্তা করেও আমার স্বামীর ব্যক্তিত্বের সাথে যায়, এরকম একটা গাছের নাম মনে করতে পারি না। সব গাছকে নিরীহ মনে হয়!
বাগানে দাঁড়িয়ে কবর খুঁড়তে খুঁড়তে দোতলার বারান্দার দিকে তাকাই। আমার শাড়ির আঁচল মাটিতে লুটায়। তখন আম্মার কথা মনে পড়ে। যদি ধরা পড়ি, বুড়া বয়সে আম্মাকে মনে হয় সবাই মেরেই ফেলবে! আমার মতো ডাইনি জন্ম দেয়ার পাপে! তিন্নিকে দেখতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু তিন্নি তো ভালো বউ এখন। সাতকড়া দিয়ে গরুর মাংস রাঁধছে সিলেটি শ্বশুরবাড়িতে! পেটের মেয়েটার জন্য মায়া লাগে। কিন্তু নিজের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, মেয়ে মানুষ হয়ে জন্ম নেয়ার চেয়ে বড় পাপ আর কিছু নাই! শাড়ির আঁচল ঠিক করে দোতলার বাথরুমে আসি। স্বামীর রেজর থেকে ব্লেড খুলে নেই। বেসিনের উপরে আরো কিছু নতুন ব্লেড রাখা। মুঠো ভর্তি ব্লেড নিয়ে বাগানে আসি আবার।
বাগানে এসে খুব ভালো লাগে! তখন পুরো পরিকল্পনাটা ভেবে দেখি। অবাস্তব মনে হয়! ঠাণ্ডা মাথায় কোন মানুষকে খুন করা সম্ভব না আমার পক্ষে। সেটা মানুষের মতো দেখতে জানোয়ার হলেও খুন করতে পারবো না। আব্বার চেহারা মনে পড়ে। আব্বার কাছে যেতে ইচ্ছা হয়। আব্বা বলতো, ‘মেয়েরা আল্লাহর বরকত!’ আব্বা নিশ্চয় আমার মেয়ে বাবুটাকে অনেক আদর করবে। বাবুটার জন্য আব্বাকে একটা নাম রাখতে বলতে হবে!
নিজের খোঁড়া কবরে আমি শুয়ে থাকি। বাথটাবে গোসল করিনি জীবনে। কবরটাকে আমার কাছে তবু বাথটাবের মতো মনে হয়। কবরের কিনারা থেকে মাটি এনে গায়ের উপরে দিতে থাকি। মাটি আর পানিতে তো কোন পার্থক্য নেই। কেমন একটা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা, শান্তি শান্তি মাটি! ব্লেড দিয়ে হাতে কাটাকুটি খেলি। ব্যথা লাগে না। কি আশ্চর্য! কোনটা ধমনি, কোনটা শিরা- কিছুই জানি না। খালি ব্লেড টানতেই থাকি। লাল রক্ত পড়ে মাটি ভিজে যায়। কেমন সোঁদা গন্ধ আসে! তিন্নিকে শেষবারের মতোন একটা চুমু খেতে ইচ্ছা করে। ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসে।
ঠিক ঘুমিয়ে পড়ার আগে মনে হয়, পেটের বাচ্চাটা কাঁদছে!

x