বাজার মনিটরিং যেন হাঁকডাকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে

বুধবার , ২২ মে, ২০১৯ at ৪:১৯ পূর্বাহ্ণ
29

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক টাস্কফোর্সের সভায় বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল মান্নান বাজার মনিটরিংসহ মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম আরো জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেছেন, চট্টগ্রামের বৃহত্তম পাইকারী বাজার খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই ও রেয়াজউদ্দিন বাজারসহ বিভিন্ন জেলার পাইকারি বাজারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত বাজার মনিটরিংসহ মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে। র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি ও আনসার বাহিনীকে বাজার তদারকিতে সহযোগিতা করার কথা বলেন তিনি। সাধারণ জনগণকে জিম্মি করে রমজানে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি করলে চিহ্নিত ব্যবসায়ীদেরকে আইনের আওতায় আনার কথা জানান তিনি।
প্রতিবছরই রমজানের আগে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যায়। সরকার ও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণের আশ্বাস দেওয়া হলেও তা কাজে দেয় না। নজরে পড়ে না নজরদারিও। এর ব্যতিক্রম ঘটেনি এবারও। বেড়েছে পণ্যের দাম। প্রত্যাশা ছিল, বিএসটিআই, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, র‌্যাব-পুলিশের ভ্রাম্যমাণ আদালত, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাজার মনিটরিং টিমসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা আগে থেকে রমজানকেন্দ্রিক পণ্যের বাজারে দাম বৃদ্ধি ও জাল-জালিয়াতি নিয়ে নজর রাখবে। ক্রেতারা মনে করে, এই নজরদারির অভাবেই ব্যবসায়ীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) বিভিন্ন প্যাকেটজাত পণ্যের দাম নিয়ে কাজ করে। ঠিকমতো প্যাকেটের গায়ে এই দাম লেখা আছে কি না, তার অতিরিক্ত কেউ দাম নিচ্ছে কি না, উৎপাদান ও মেয়াদ ঠিকঠাক উল্লেখ থাকল কি না, পণ্যে ভেজাল রয়েছে কি না-এসব বিষয়ই গুরুত্ব পায়। তবে রমজান উপলক্ষে বাজারে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি ঠিকমত নামতে পারে না। আদালতের নির্দেশনাও তারা ঠিক মত অনুসরণ করতে পারে না জনবলের অভাবে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) সাধারণ খাদ্যপণ্যের ভেজাল, পণ্য তৈরির পরিবেশসহ নানা বিষয়ে বাজার মনিটরিং করে। রোজার মাসে তাদের মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করার কথা থাকলেও এখনো পর্যন্ত তেমন সক্রিয় হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারে পণ্যের দাম বিক্রেতার খেয়ালখুশি বা মর্জি মাফিক হলে বিপত্তি দেখা দেয়। ক্রেতার সাধ্যকে অতিক্রম করে যখন পণ্যমূল্য হয়ে পড়ে অত্যধিক তখন বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে বাধ্য। চাহিদার চেয়ে পণ্যের যোগান কম হলে দাম বেড়ে যায়। আবার চাহিদার অত্যধিক পণ্য বাজারে থাকলেও দাম কমে না সহজেই। এমনিতেই একবার যে পণ্যের দাম বাড়ে, তার যোগান বেশি হলেও মূল্যহ্রাস ঘটে না। পণ্যের মূল্য ওঠা-নামা করতেই পারে। কিন্তু তার একটা সীমা-পরিসীমা যে থাকা উচিত, বিক্রেতা সেটা মেনে চলেন না। বরং অধিক মুনাফার জন্য দাম বাড়ানো, ওজনে কম দেয়ার ঘটনা অনেক পুরনো। তবে ওজন মেশিনের কারণে একালে পরিমাণে কম দেয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। কিন্তু পণ্যমূল্য নিয়ে দরদাম করার প্রবণতা বাড়ছে। ভোক্তা অধিকার আইন চালুর পর অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণে এলেও প্রবণতা হ্রাস পায়নি। মোট কথা, পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজার মনিটরিং সেল কোনো কাজে আসছে না। দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গঠন করে বাজার মনিটরিং সেল। কিন্তু এই সেল বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে ক্রেতা ও ভোক্তাদের অভিযোগ। তাদের মতে, শুধুমাত্র রমজান মাসেই বাজার মনিটরিং সেল এর কার্যক্রম চোখে পড়ে। বছরের বাকি সময় তারা থাকে অদৃশ্য।
পাইকারি বাজার আর খুচরা বাজারে পণ্যের মূল্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। অনেক সময় পাইকারি বাজারের দ্বিগুণ দামে খুচরা বাজারে দ্রব্য বিক্রি হচ্ছে। মূলত ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম বাড়িয়ে থাকে। বাজারের এই বিশৃঙ্খলা-অনিয়ম নিয়ন্ত্রণের জন্যই গঠন করা হয়েছে বাজার মনিটরিং সেল। কিন্তু মনিটরিং সেলের সদস্যরা সেই দায়িত্বটুকু পালন করছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। তাই বাজার মনিটরিংসহ মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম আরো জোরদার করার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। যেন তাঁদের কার্যক্রম হাঁকডাকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। আমরা এটাও জানি যে সারা বছর বাজার মনিটরিংয়ের বিকল্প নেই।

x