বাজার পরিস্থিতি প্রশাসনের নখদর্পণে রাখতে হবে

বুধবার , ২৪ এপ্রিল, ২০১৯ at ১০:২২ পূর্বাহ্ণ
40

আমাদের বাংলাদেশের নাগরিকদের বড়ই দুর্ভাগ্য যে রমজান এলেই বাজার হয়ে ওঠে অস্থিতিশীল। আজাদীর ২০ এপ্রিল সংখ্যায় বলা হয়েছে, রোজার আগেই উর্ধ্বমুখীভাব রয়েছে মাছ, সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারে। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে দামও। যদিও রমজানে বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা ধরনের পদক্ষেপ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। বাজারকে স্বাভাবিক রাখার জন্য পণ্যের আমদানিও বাড়ানো হয়েছে। ৬ এপ্রিল আজাদীতে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, বাজার, স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার কঠোর নজরদারি রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি এবার প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকেও বাজার মনিটরিং করা হবে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। বাজার নিয়ে যেন কেউ কারসাজি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এ কথা অনস্বীকার্য যে, বর্তমানে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে যে সমস্যা প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটা হলো ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি। স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও এদেশের বেশিরভাগ মানুষের অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য আসেনি। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যগুলোর দামের ঊর্ধ্বগতিতে জনজীবন পর্যুদস্ত হয়ে ওঠে। চাল, ডাল, তেলের মতো অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যাদির মূল্য বাড়তে থাকে। বলা যেতে পারে, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনে একটা চিরন্তন ও বৃহৎ সমস্যা। এ জন্য আমাদের দেশের মতো দেশে মূল্য বৃদ্ধির সংবাদ বড় কোনো ঘটনা নয়, বরং স্বাভাবিক ও স্বতঃসিদ্ধ এক নিত্য সত্য বিষয়।
আমাদের দেশে কী কী কারণে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়? বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তন্মধ্যে আছে চাহিদা ও যোগান, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও উৎপাদন ঘাটতি, অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি, চোরাচালান, বৈদেশিক রফতানি, কর বৃদ্ধি, কালো টাকার দৌরাত্ম্য, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি, সংরক্ষণ, সরবরাহ ও বন্টনে অব্যবস্থা এবং বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি।
পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। আমাদের বাংলাদেশে অধিক দামে পণ্য ক্রয় করার সামর্থ্য আছে মুষ্টিমেয় লোকের। তাই যেসব কারণে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে, তার প্রভাব সবটাই বৃহদাংশ জনগণের ওপর পড়ে। অধিক ব্যয় করার যোগ্যতা এদেশের অধিকাংশ মানুষের নেই। ফলে বাধ্য হয়ে ব্যয় কমাতে হয়। পণ্যমূল্য বৃদ্ধির অনেকগুলো কারণের মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি। আকস্মিক ও কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধিতে মজুতদার, মুনাফাখোর, ফটকাবাজ, চোরাচালানি ইত্যাদি অসাধু ব্যবসায়ীদের স্বার্থান্বেষী ভূমিকা থাকে। এরা সুযোগ বুঝে হঠাৎ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাজার থেকে গায়েব করে গোপনে মজুত বাড়াতে থাকে। ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়ে পড়ে। শুরু হয়ে যায় কালোবাজারি। পণ্যের জন্য চাহিদা বৃদ্ধি পেলে কিংবা হা-হুতাশ শুরু হলে এই সুযোগে তারা দাম বাড়ায় এবং অল্প অল্প করে মজুত বাজারে ছাড়ে। ব্যবসায়ীদের অসাধু মনোভাব ও নৈতিকতাবর্জিত হীন উদ্দেশ্য এ জন্য দায়ী। এ কথা মনে রাখা জরুরি যে, মানুষের জীবনবোধের সঙ্গে নৈতিকতার একটি অবিচ্ছেদ্য ও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। কারণ মানুষ প্রাণিজগতের সদস্য হলেও পশু নয়। মানুষের প্রথম সাধনা হলো মনুষ্যত্ব অর্জনের সাধনা। সেই সাধনার লক্ষ্য এমন কিছু বিশেষ গুণাবলি অর্জন, যা মানুষকে ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, উচিত-অনুচিত বিচার করার শক্তি দেয় এবং মন্দ, অন্যায় ও অনুচিত কাজকে পরিহার করে নৈতিক আদর্শের অনুবর্তী করে তোলে। এই নৈতিক মূল্যবোধের আশ্রয়েই গড়ে উঠেছে মানবসমাজ। ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দকে তাই নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন হতে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে। এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন তাঁদের উদ্বুদ্ধ করতে পারে।
বিশ্বের নানা দেশে উৎসব উপলক্ষে মূল্য ছাড়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কেবল আমাদের দেশে তা উল্টো। প্রধানমন্ত্রীর দফতর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিভাগীয় কমিশনার বা জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হলেও রমজান মাসে তার বাস্তবায়ন হয় কম। মনিটরিং টিম গঠন করে বাজার তদারকির ব্যবস্থার পরও অসাধু ব্যবসায়ীরা তাদের হীন তৎপরতা চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। বাজার পরিস্থিতি যাতে প্রশাসনের নখদর্পণে থাকে, সেজন্য নিয়মিত বাজার পরিদর্শনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। অসাধু ও ঠক ব্যবসায়ীরা যাতে কোনো সুযোগ গ্রহণ করতে না পারে, তার জন্য কঠোর হতে হবে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা সৎ ও তৎপর থাকলে কেউ কারসাজি করার সুযোগ পাবে না।