বাঙালির আজ শোকের দিন

বুধবার , ১৫ আগস্ট, ২০১৮ at ৮:১৭ পূর্বাহ্ণ
74

বাঙালি জাতির ইতিহাসে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এক কলঙ্কিত অধ্যায়। দেশের স্বাধীনতাবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে ঘাতকচক্রের হাতে ধানমণ্ডির নিজ বাসভবনে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান শাহাদত বরণ করেন। একই সঙ্গে শহীদ হন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশুপুত্র শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, সহোদর শেখ নাসের, কৃষকনেতা আবদুর রব সেরনিয়াবাত, যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনি ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, বেবী সেরনিয়াবাত, সুকান্ত বাবু, আরিফ এবং আব্দুল নঈম খান রিন্টু। এ নৃশংস ঘটনা কেবল আমাদের ইতিহাসে নয়, পৃথিবীর ইতিহাসেও বিরল। শুধুমাত্র একজন রাষ্ট্রনায়ককে হত্যা করা নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে মুছে ফেলা এবং পরাজিত শক্তিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করাই ছিল হত্যাকারীদের উদ্দেশ্য।

আজ সেই শোকাবহ ১৫ আগস্ট। জাতীয় শোক দিবস। ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক দিন। আমাদের দুঃখ, কষ্ট আর বেদনার দিন। ১৯৭৫ থেকে পনের আগস্ট বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে পরিগণিত। তবে আমাদের দুঃখ কিছুটা হলেও হ্রাস পাবে এ জন্যে যে, আমরা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করতে পেরেছি এবং জাতির কপালে কলঙ্কের যে কালিমা লেপ্টে ছিল, তা মোচন করতে সক্ষম হয়েছি। পনের আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পর জাতির যে দায়বদ্ধতা ছিল, সেই দায়মুক্তি ঘটলো বিচার কাজের মাধ্যমে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি। তাঁকে বাদ দিয়ে দেশকে কল্পনা করা যায় না। যতদিন পদ্মা, মেঘনা, যমুনা প্রবাহিত হবে, এ ভূখণ্ডে জনপদে মানুষের বসবাস থাকবে, ততদিন পর্যন্ত অমর হয়ে থাকবেন এই মহান নেতা। তাঁর অবদান গগনচুম্বী। তাঁর সাফল্য প্রশ্নাতীত। তাঁর স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব, চরিত্রবৈশিষ্ট্য ও নেতৃত্বগুণে তিনি কোটি মানুষের একচ্ছত্র নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন অতিমাত্রায় সাহসী, নির্লোভ, আপসহীন ও তেজস্বী নেতা। তিনি জীবনে কারো কাছে মাথা নত করেন নি। ভয়, সংশয় ও প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে ওঠে সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন পরিচালিত করেছেন। বাঙালির ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রশ্নে তিনি সব সময়েই সোচ্চার ছিলেন। বলিষ্ঠ কণ্ঠে আদায় করে নিতেন সকল দাবি।

এমন এক অবিসংবাদিত নেতাকে হত্যা করা হলো সপরিবারে, যা শুধু নৃশংস নয়, নারকীয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড স্বতঃস্ফূর্ত কোনো ব্যাপার ছিল না বা তাৎক্ষণিক অসন্তোষের কোনো কারণও নয়। তাহলে শুধু তাঁকে হত্যা করা হতো, পরিবারপরিজনকে নয়। অনেক ভেবেচিন্তে পরিকল্পনা করে তাঁকে হত্যা করা হয়। যারা খুন করেছিল আজ প্রশ্ন উঠতে পারে তারা কি প্লানটেড ছিল? সবচেয়ে বড় আশ্চর্য ও দুঃখের বিষয় যে, এ হত্যাকাণ্ডের যাতে কোনো বিচার না হয়, তার সমস্ত ব্যবস্থা করা হয়। শুধুতা নয়, যারা হত্যার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিদেশে পাঠিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছে।

১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত ইতিহাসের একটি ধারা ছিল, যা পৃথক ছিল প্রাক ১৯৭১ সালের ধারা থেকে। প্রাক ১৯৭১ সালের ধারাটির অন্য একটি নাম দিয়েছেন ইতিহাসবিদ ড. মুনতাসীর মামুন। তিনি একে বলেছেন ‘ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি ধারা’ বা ‘পাকিস্তানি মানস ধারা’। এ ধারার বিরুদ্ধে আমরা সংগ্রাম করেছি, বাঙালি জাতীয়তাবাদী ধারা প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছি। এ দেশের বাম, মৃদু বাম, মধ্যপন্থি, যাদের আমরা প্রগতিশীল বা লিবারেল বলি, তারা এ ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁরা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এ ধারাটিকে পুষ্ট করে পরিণতির দিকে নিয়ে যান। ১৯৭২ সালের সংবিধান এ ধারার জয় সূচিত করে।

এ ধারা বা বাংলাদেশ ধারার জয়ের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানি ধারা যে নিঃশেষ হয়ে যায়নি, তার বহিঃপ্রকাশ পনের আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড। এ বর্বরতম হত্যাকাণ্ডের পর এ দেশে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হলো প্রাক ১৯৭১ ধারা। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত চলেছে এর চর্চা। কিন্‌তু আনন্দ বা কিছুটা স্বস্তির সংবাদ এই যে, দেরিতে হলেও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে। এটা জাতির জন্য বড় দায় ছিল। এর মাধ্যমে আমরা বলতে পারি, আমরা পরাজিত ব্যক্তির প্রতিভূ নই। আমরা আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টার হত্যার বিচার কাজ সম্পন্ন করেছি। এখন কেবল সজাগ থাকতে হবে, সেই পরাজিত শত্রুরা যেন আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। যেন ওরা ছড়াতে না পারে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প। জয় হোক প্রগতির। অব্যাহত থাক তাদের ধারাবাহিক যাত্রা।

x