বাংলা সাহিত্যে কয়েকটি ‘খল’ চরিত্র

করবী চৌধুরী

শুক্রবার , ১৫ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:২৩ পূর্বাহ্ণ
98

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘চোখের বালি’ উপন্যাসে বলেছেন, “উগ্র বিষ শরীরে প্রবেশ করিলে পাঁচমিনিটের মধ্যেই তাহার চরমফল শেষ হইতে পারে, কিন্তু বিষ মনে প্রবেশ করিলে মৃত্যুযন্ত্রণা আনে,- মৃত্যু আনেনা’।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই উক্তি সাহিত্যের ‘খল’ চরিত্রের পক্ষে প্রযোজ্য। কারণ আমরা দেখেছি, উপন্যাসের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নায়ক- নায়িকার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ককে বিচ্ছেদ্য করা বা নায়ক-নায়িকার মননচিত্তে একটা সন্দেহমূলক ভাবের উদ্রেক করাটাই হচ্ছে এই খল চরিত্রগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য। কখনো কখনো এই চরিত্রগুলোর
প্রধান উদ্দেশ্য। কখনো কখনো এই চরিত্রগুলো তাদের হীন কার্যকলাপের দ্বারা নায়ক-নায়িকার জীবনে চিরবিরহ ঘটিয়ে দেয়। সৃষ্টি করে এক বিষম সংকুল পরিস্থিতির।
গল্পের গাঁথুনির মধ্যে এমন এক সময়ের অবতারণা হয় যখন নায়ক-নায়িকা কেউই সেই চরিত্রের অস্তিত্ব টের পায়না। তারা অনুভব করতেও পারেনা যে, অদৃশ্য এক ঘুণপোকা তাদের সম্পর্কটাকে একটু একটু করে আলগা করে দিচ্ছে। যে দুটি হৃদয় সবরকমের প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও একসাথে থাকার শপথ করেছিল, তাদের সেই পবিত্র শপথকে কে এমন বিপথে পরিচালিত করল? এ’রকম তো হওয়ার কথা ছিল না! কিন্তু এই বিভক্তির কারণ উপলব্ধি করার জন্য যে মানসিক সুস্থিরতার প্রয়োজন হয় তার কিছুই আর উভয়ের মধ্যে অবশিষ্ট থাকেনা।
সাহিত্যে নায়ক-নায়িকার মনের এই টানাপোড়েন যে রহস্যময় চরিত্র দ্বারা চালিত হয়,- সেটা হলো ‘খল চরিত্র’।
প্রাচীন ‘মঙ্গলসাহিত্য’ থেকেই আমরা এরকম খলচরিত্রের সাথে পরিচিত হয়ে আসছি। তা সে মধ্যযুগের ‘মনসামঙ্গল’ বা ‘চন্ডীমঙ্গল’, কিংবা অষ্টাদশ শতকের রায়গুনাকর ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ই হোক, অথবা ‘ময়মনসিংহ গীতিকাই’ হোক!
‘চণ্ডীমঙ্গল’এ ‘খুলনা’ চরিত্রটা খলচরিত্র হিসেবে বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য। লহনার প্রতি খুলনার যে খলসুলভ ব্যবহার, তা আমাদের সংসারজীবনেরই কোন এক খলস্বভাবা রমণীর কথাই মনে করিয়ে দেয়। ‘মনসামঙ্গল’এ দেবী হয়েও ‘মনসা’ নিজেই খলসুলভ ব্যবহার করেছে চাঁদ সওদাগরের প্রতি। আবার ‘অন্নদামঙ্গল’এ ‘দক্ষ’ চরিত্রটাও একটা খলচরিত্র হিসেবে আত্মপরিচয় লাভ করেছে। যে কিনা আপন কন্যা সতী এবং জামাতা শিবের সাথে চরম বিমাতাসুলভ আচরণ করেছে।
গীতিকাব্য ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ তেও খলচরিত্রের দেখা মেলে। এখানে’ মহুয়া’পালাটিতে ‘হুমরা’ চরিত্রটি খলচরিত্র হিসেবে পাঠকের কাছে সমাদৃত হয়েছে।
সাহিত্যে সময়বদল হলো, ঘটনাবদল হলো, কিন্ত খল চরিত্রের কোনরূপ বদল হলোনা।
সাহিত্যসম্রাট বংকিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসে প্রধান দুটি খলচরিত্র হলো, ‘দেবেন্দ্র’ আর ‘ হীরা’। দরিদ্র, অশিক্ষিত হয়েও প্রখর বুদ্ধিতে আর ব্যক্তিত্বের শক্তিতে ‘হীরা’ এক অনবদ্য খলচরিত্র। গোলাপ আতর অপহরণের মধ্যেই সে তার নারীসুলভ খলচরিত্রটা লুকিয়ে রেখেছিল। অপরদিকে ‘দেবেন্দ্র’ চরিত্রটাও এই উপন্যাসের এক দুর্দান্ত ব্যতিক্রমী খলচরিত্র! যে হীরার প্রেমকে দূরে সরিয়ে কুন্দনন্দিনীকে পেতে চায়, যাতে নগেন্দ্রনাথের সংসারে আগুন জ্বালাতে পারে। বাংলাসাহিত্যে বিরল এই দুই খলচরিত্র অসংযত প্রবৃত্তির অধিকারী হলেও বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে এরাই গল্পের গতিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসের ‘সন্দীপ’চরিত্রটা হচ্ছে অনবদ্য এক খলচরিত্র! যে নিখিলেশ আর বিমলার দাম্পত্যজীবনের চাবিকাঠিটাকে স্বাদেশিকতার মোড়কে মুড়িয়ে অত্যন্ত কৌশলের সাথে এক ভিন্নপথে চালিত করেছে। সন্দীপ তার কথার সম্মোহনের জালে জড়িয়ে নিখিলেশ-বিমলার দাম্পত্যজীবনে ছড়িয়ে দিয়েছিল বিষবাষ্প! ‘সন্দীপ’ চরিত্রটি খলচরিত্র হিসেবে বাংলাসাহিত্যে এক নবঅধ্যায়ের সূচনা করেছিল। শুধুমাত্র কথার মারপ্যাঁচে সে বন্ধু আর বন্ধুপত্নীর দাম্পত্যজীবনকে এক যুগসন্ধিক্ষণের মাঝে দাড় করিয়ে দিয়েছিল।
অমর কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘গৃহদাহ’ উপন্যাসের ‘সুরেশ’ চরিত্রটাও আমাদের কাছে খলচরিত্র হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে। মহিম তার এত প্রাণেরবন্ধু হলেও তার স্ত্রী অচলাকে কুপথে আদায় করে নিতে এতটুকু কুণ্ঠিত হয়নি সে!
মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসে রহস্যময় এক মানুষ হোসেন মিয়া এবং তার ময়নাদ্বীপ পাঠকের চিন্তাকেও ভাঁজ ধরিয়ে দেয়। ময়নাদ্বীপের মালিক হোসেন মিয়া বাংলাসাহিত্যে আর এক বিস্ময়কর খলচরিত্র। তার খলমস্তিষ্কের চিন্তাধারার ফাঁদে পড়ে মাঝি কুবেরের মতো মানুষও কপিলাকে নিয়ে ময়নাদ্বীপে পাড়ি দিতে বাধ্য হয়েছে।
এছাড়াও সমরেশ বসুর ‘টানাপোড়েন’, মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ‘ পুতুল নাচের ইতিকথা’, প্রফুল্ল রায়ের ‘কেয়াপাতার নৌকা’, বুদ্ধদেব গুহের ‘ একটু উষ্ণতার জন্য’ আশাপূর্ণা দেবীর ‘ সুবর্ণলতা’সহ বাংলাসাহিত্যের আরো অনেক উপন্যাসেই বিভিন্ন খল চরিত্রের দেখা মেলে। খলচরিত্রগুলোই মূলত উপন্যাসকে বৈচিত্র্যময় করে তোলে। কোন উপন্যাসে যদি খলচরিত্র সৃষ্টি না হয়, তাহলে ঘটনা একমুখী হয়ে পড়বে। কাহিনীও হয়ে পড়বে শ্লথ।
বলা হয়, সাহিত্য হচ্ছে সমাজের দর্পণস্বরূপ! সমাজে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা প্রাণ পায় সাহিত্যিকের কলমে। মানুষ যেমন দর্পণের মধ্যে নিজের মুখাবয়ব দেখে আপ্লুত হয় অথবা মুখাবয়বের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কোন অপ্রীতিকর চিহ্ন, যা সৌন্দর্যএর হানি ঘটায়- তাকে দেখে মানুষ যেমন বিচলিত হয়ে সে চিহ্নকে ঢেকে রাখার বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে, সাহিত্যও তেমনই। সমাজে বসবাস করা শতরঙা মানুষ এবং তাদের ভেতর অবস্থান করা চরিত্রের বিভিন্ন দিকগুলোকেই সাহিত্যিকগণ তাদের কলমের মাধ্যমে হাজির করে এমন এক মেসেজ সমাজকে দেয়ার চেষ্টা করেন যা পাঠকের ব্যক্তিগত চরিত্রের পতন ঠেকাতেও সাহায্য করে।

x