বাংলা সাহিত্যের ভিত্তিমূলের মাটি চট্টগ্রাম থেকেই উৎসারিত

ঋত্বিক নয়ন

বৃহস্পতিবার , ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৩:৫৫ পূর্বাহ্ণ
34

আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ভিত্তিমূলের মাটি চট্টগ্রাম থেকে উৎসারিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে চট্টগ্রাম অনেক দিয়েছে। চট্টগ্রামে যুগে যুগে সাম্প্রদায়িক সমপ্রীতি অটুট ছিলো। তারই ফলশ্রুতি হিসেবে চট্টগ্রাম অনেক উজ্জ্বল বাংলা সাহিত্য সুকৃতি প্রদান করেছে।
ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, হোসেন শাহের আমলে পরাগল খাঁ’র সময়ে এখানে ব্যাপক বাংলা ও সংস্কৃতির চর্চা শুরু হয়েছে। পরাগল খাঁ সংস্কৃত ও বাংলাভাষা জানতেন। পরমেশ্বরকে তিনি বাংলায় মহাভারত অনুবাদের আদেশ করেন। অবশ্য পাঠান সুলতানরাও সংস্কৃত ঘেঁষা বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। ফলে চট্টগ্রামের লস্কর বা শাসনকর্তারা সে সময় বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে মজবুত করেছেন।
চট্টগ্রামের কবি নবীন সেন উনবিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যকে নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন, তিনি পলাশীর যুদ্ধ কাব্যে বাঙালি চরিত্র সিরাজদ্দৌলা, মোহনলাল, মীরমদন, সৃষ্টি করে প্রথম বাঙালি বীর রূপায়ণও ঘটিয়েছেন নবীন সেন। মুন্সী আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ বাংলার লুপ্ত সম্পদ উদ্ধার করে জাতিকে ঐতিহ্য উজ্জ্বল জীবনানুভূতি ও প্রেরণা উন্মুখ সংস্কৃতি ঐতিহ্য দান করেন। তাছাড়া শাহ মোহাম্মদ ছগির, দৌলত উজির বাহরাম খান, কাজী দৌলত এবং মহাকবি আলাওলের যোগ্যস্থান এবং তাঁদের সাহিত্য-সিংহাসনও তিনি দান করে যান। তাই বলা যায় আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ভিত্তিমূলের মাটি চট্টগ্রাম থেকে উৎসারিত হয়েছে।
আধুনিক চেতনাবোধে, আধুনিক রাজনৈতিক পরিধারায় সাধারণ মানুষের হাসি-কান্না জড়িত করে রমেশ শীল দেশকে মাতিয়ে ছিলেন। এদেশের ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বাঙালি মানসে যে সাড়া এসেছিলো চট্টগ্রামের প্রগতিশীল মহলও সে চেতনার একটা রূপ দিতে সক্ষম হয়েছিলেন আলাদা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করে। কবি মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী রচনা করেছিলেন একুশের প্রথম কবিতা।
চট্টগ্রামের জীবনধারার বিস্ময়কর বৈচিত্র্যের পরিচয় আজো বহন করে চলেছে তার সাহিত্য ও সংস্কৃতি। আধুনিক ভাষা ও সাহিত্যের নিত্য নতুন পরিমার্জন ও আঙ্গিক বদল হলেও চট্টগ্রামের লোক জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে আজও তার সাহিত্যের ভিত্তি অনড় ও অটুট রয়েছে। ড. আহমদ শরীফের অনুসরণে বলা যায়, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলমানের রচনা বলতে প্রায় সবটাই তো চট্টগ্রামের দান, এমন কি বাংলাদেশের যে কোন অঞ্চলের চাইতে চট্টগ্রামের হিন্দুর দানও কম নয়।
মধ্যযুগের ধর্মপ্রধান সাহিত্যের যুগে রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানের একটি বলিষ্ঠ ধারা গড়ে উঠেছিল। এ ধারায় চট্টগ্রামের কবিগণের অবদান অত্যন্ত উজ্জ্বল। প্রাচীন ভারতীয় উপাখ্যান বিদ্যা আর প্রণয়ের রূপক কাহিনী অবলম্বনে রচিত বিদ্যাসুন্দর কাব্যের মাধ্যমে সম্ভবত চট্টগ্রামে এ ধারার সূচনা।
বাংলা সাহিত্যে জ্যেতিষ শাস্ত্র সম্বন্ধীয় কাব্য রচনার পথিকৃৎ চট্টগ্রামের কবি মোজাম্মিল। তাঁর এ জাতীয় দু’টো কাব্য- সায়াৎনামা ও নীতিশাস্ত্র বার্তা। এছাড়া মধ্যযুগের মুসলিম বাংলা সাহিত্যের একমাত্র রূপক কাব্য রচনার গৌরব চট্টগ্রামের কবি মুহম্মদ খান।
মধ্য উনিশ শতক থেকে বিশ শতকের প্রাক্‌ সাতচল্লিশ সাল পর্যন্ত কম-বেশি চট্টগ্রাম সাহিত্যের ইতিহাসে যাঁরা অমর, তাঁরা হলেন : কবি নবীনচন্দ্র সেন, শশাঙ্কমোহন সেন, জীবেন্দ্রকুমার দত্ত, হেমন্তবালা দত্ত, ক্ষেমেশ রক্ষিত, অন্নদাশংকর রায়, বিপিনচন্দ্র নন্দী, কাজী নজরুল ইসলাম (বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি), বসন্তকুমার কানুনগো, আশুতোষ চৌধুরী, দিদারুল আলম, ওহীদুল আলম, উমরতুল ফজল, ড. মুহম্মদ এনামুল হক, শেখ মোজাফ্‌ফর আহমদ, কবি আবদুস সালাম, নূও মোহাম্মদ সাহিত্যরত্ন, শুভাশীষ চৌধুরী, মতিউল ইসলাম, লোকমান খান শেরওয়ানী, শবনম খান শেরওয়ানী প্রমুখ।
সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতো প্রবন্ধের ক্ষেত্রেও চট্টগ্রামের অবদান অকিঞ্চিৎকর নয়। গত শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে চট্টগ্রামের মনীষীগণ কথাসাহিত্য ও নাটক বহির্ভূত নানারকমের গদ্য রচনা উপহার দিয়েছেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্তিম লগ্ন থেকেই চট্টগ্রামের লেখকবৃন্দ বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে অবদান রাখতে শুরু করেন। গত শতাব্দীর শেষ দুই দশক থেকে বর্তমান শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্ত বেশ ক’জন চট্টল মনীষী প্রবন্ধ সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন।
ইতিহাস ও ঐতিহ্য চেতনার প্রাবল্যে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ তাঁর দীর্ঘ জীবনব্যাপী সাধনায় প্রায় দু’হাজার পুঁথি সংগ্রহ করেছেন এবং আবিষকৃত পুঁথিগুলি সম্পাদনা কিংবা সেগুলি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ছ’শয়েরও বেশি গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখেছেন। এখানকার লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি ও তাই বৈচিত্র্যময়তা ভরা।
বর্তমান শতাব্দীর শুরু থেকে চট্টলসন্তানদের কারো কারো লিখিত অভিসন্দর্ভ পাশ্চাত্যের বিজ্ঞ সমাজে সমাদৃত হয়। এছাড়া অধ্যাপকদের মধ্যেও কেউ কেউ লেখালেখিতে নিয়োজিত হন। শিক্ষিত শ্রেণির একটি অংশ সংবাদপত্র ও পত্র-পত্রিকায় নিবন্ধাদি লিখতে থাকেন।
চতুর্থ দশকের অন্তিম পর্যায়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠে এবং ভারতবর্ষের বিভিন্ন কারাগার থেকে চট্টগ্রামের কয়েকজন রাজবন্দীকে মুক্তি দেয়া হয়। এসব রাজবন্দীর সাথে যুক্ত সাহিত্যমনস্করা প্রবন্ধের মাধ্যমে শুরু করেন তাঁদের রাজনৈতিক চিন্তা ও ভাবধারা তুলে ধরতে।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের ফলে সৃষ্ট তৎকালীন পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্য বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র ধারার প্রবর্তন করে। চট্টগ্রামের সাহিত্য চর্চায়ও তার প্রভাব পড়ে। ১৯৪৮ সাল থেকে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে এ-দেশের মানুষের দিনগুলো। আন্দোলনের পর আন্দোলন হয়। এই সব আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ঘটে আলোড়ন সৃষ্টিকারী গণ অভ্যুত্থান। এই সব আন্দোলন এবং গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নানামুখি কর্মসূচি, ভাবধারা, মতবাদ, আদর্শের সংঘাত ও সমন্বয় অভিব্যক্ত হয়। গোটা দেশের লেখকদের প্রবন্ধগুলোর মতো চট্টগ্রামের লেখকদের রচিত প্রবন্ধগুলোও এ সবের সাক্ষী।
স্বাধীনতা-উত্তর যুগে মাহবুব-উল-আলম, আবুল ফজল, ড. মুহম্মদ এনামুল হক, আবদুর রহমান, ওহীদুল আলম, আসহাবউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ আহমদুল হক প্রমুখ বর্ষীয়ান গ্রন্থকারবৃন্দ কয়েকটি স্মরণীয় গ্রন্থ উপহার দিয়েছেন। স্বাধীনতা-উত্তরকালে কলম ধরে গবেষণা ক্ষেত্রে বিস্ময়কর কাজ করেছেন আবদুল হক চৌধুরী।
১৯৪৭ পরবর্তী সময় থেকে নিরন্তর কাব্য সাধনায় ব্রতী ছিলেন বা আছেন অনেকেই। এছাড়া নতুন নতুন প্রতিশ্রুতিশীল লেখক এক্ষেত্রে আসছেন এবং বাংলাদেশের সাহিত্যে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখতে সচেষ্ট আছেন। চট্টগ্রামে হিন্দু বৌদ্ধ মুসলমান ও খ্রিস্টান পৃথিবীর এই চারটি প্রধান ধর্ম সমপ্রদায়ের লোকের আশ্চর্য সম্মিলন ঘটেছে। ফলে এখানকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিকাশে এক অনন্য বৈশিষ্ট্যতা লক্ষ্য করা যায়, যা বাংলার অন্যান্য স্থানে সহজে দেখা যায় না।

x