বাংলা ভাষার ব্যবহারে অধিকতর সচেতন হতে হবে

ওমর ফারুক চৌধুরী জীবন

শুক্রবার , ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৫:১১ পূর্বাহ্ণ
16

ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার দিক থেকে আমরা প্রধানত বাঙালি। কিন্তু জাতিগত ভাবে আমরা বাঙালি হলেও আমাদের এই বাঙালি জাতিসত্তার চূড়ান্ত উন্মেষ ঘটে ১৯৫২ সালে রক্তঝরা আন্দোলনের মাধ্যমে। বায়ান্নর এই রক্ত কেবল মুখের ভাষা বাংলার জন্যে ঝরেছে তা কিন্তু নয়। বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানিদের জাতিবৈরী আচরণ ছিল প্রকট। পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানীদের মধ্যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত পার্থক্য ছিল ব্যাপক। পূর্ব পাকিস্তানের ধর্মীয় জীবন ছিল উদারনৈতিক ও মানবতাবাদী। পক্ষান্তরে পশ্চিম পাকিস্তান ছিল বর্বর, ধর্মান্ধ ও গোড়া প্রকৃতির। পাকিস্তানের দুইটি অংশের মানুষের ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক ছিল ভিন্ন ভিন্ন। এমনকি শারীরিক গড়নেও ছিল ভিন্নতা। সেকারণেই বাঙালিদের প্রতি তাদের জাতিবৈরী মনোভাব প্রকাশ পেত সর্বক্ষেত্রে। বাঙালির সংস্কৃতি চর্চা পাকিস্তানীদের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছিল। তাই তারা আঘাতটা হানে ভাষার উপরে। স্বৈরাচারী আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসে রোমান হরফে বাংলা লেখার জন্য ‘ভাষা সংস্কার কমিটি’ গঠন করে। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী অনুষ্ঠান পালনে বাধা দেয়া হয়। ১৯৬৭ সালে বেতারে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাঙালির প্রতি ভাষা সংস্কৃতির বৈষম্য পরে রাজনৈতিক বৈষম্যে রূপ নেয়। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলার ছাত্রসমাজ এই বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন আন্দোলনের ডাক দেয়। বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে রূপ নেয় ১৯৫২ সালে। ২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলার সূর্য সন্তান রফিক, বরকত, আব্দুস সালাম, আব্দুল জব্বারের রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। অবশেষে তীব্র বিক্ষোভের মুখে পাকিস্তান সরকার নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। মাতৃভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাঙালি জাতি এগিয়ে যায় চূড়ান্ত মুক্তি একাত্তরের পথে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে পাকিস্তানীদের শাসন শোষণ হতে মুক্তি লাভ করে। মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে নয়মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহিদ ও দুই লাখ নারীর আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ মে ইউনেস্কো আমাদের ভাষা এবং ভাষা শহীদদের সম্মানে ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ কে আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা দিবসের মর্যাদা দেয়।
বাঙালি সংস্কৃতির পাশাপাশি, ইংরেজি সংস্কৃতি, হিন্দি সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বা মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে আরব্য সংস্কৃতিসহ নানান ধরনের জগাখিচুড়ি মার্কা সংস্কৃতির লালন করছি আমরা। পাশ্চাত্য সংস্কৃতি আমরা শুধু মাত্র উপভোগ নয় বরং মগজে ধারণ করে ফেলেছি। ধর্মীয় কারণে আরব্য সংস্কৃতি ধারণ করে আছে বিশাল একটা জনগোষ্ঠী। সেটা কেবল ধর্মীয় কারণ তা বলা যাবে না। পৃথিবীর অনেক দেশই তাদের সংস্কৃতির প্রচার প্রসার ও বিপণন করছে। চীনারা যেমন করছে। পৃথিবীর একনম্বর স্থান দখল করে থাকা চাইনিজ বা ম্যান্ডারিন ভাষাকে তারা প্রসার করছে চমৎকার ভাবে। চীনারা তাদের রাষ্ট্রীয় কাজ কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যে তো বটেই, এমন কি পররাষ্ট্রনীতিতেও নিজেদের ভাষার অগ্রাধিকার দিচ্ছে বেশি। চীনারা ব্যবসায়িক বা রাষ্ট্রীয় কারণে অন্য কোন ভাষা রপ্ত করবে না মোটেও। আপানার প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে আপনাকেই চীনা ভাষা শিখতে হবে। এক্ষেত্রে ভারতীয় এককাঠি সরেস। মজার ব্যাপার হল; ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিন্দি হলেও গোটা ভারতে এ ভাষার তেমন প্রভাব নেই। ভারতের একেকটি প্রদেশে এক একটি ভাষা। কিন্তু ভারতের বাইরে এই হিন্দি ভাষার ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে অচিরেই ‘হিন্দি’ ভাষা যে কোনো সময় ২য় স্থান দখল করে নিতে পারে। এর কারণ হচ্ছে তাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। ভারতীয় সিনেমা, গান, সিরিয়ালগুলো ভারতের বাইরের দেশগুলোতে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। ভারতীয় সিনেমার নায়ক নায়িকারা বিদেশে তাদের সংস্কৃতির ব্র্যান্ড এম্বেসেডরে রূপান্তর হয়েছে। আমাদের সামাজিক এবং পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো বিদেশি সংস্কৃতির দখলে চলে যাচ্ছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দেশ ভারত। স্বাভাবিক ভাবেই তাদের কৃষ্টি সংস্কৃতির প্রভাব আমাদের উপরে পড়েছে। আমাদের কথায় বার্তায় চাল চলনে ভারতীয় সংস্কৃতি ও হিন্দি ভাষার ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। আমাদের দেশে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল দেখা হয়। শিশুরা অনর্গল হিন্দি ভাষায় কথা বলতে পারে। শুধু কথা নয়, হিন্দি সিরিয়ালগুলো দেখে সেখানকার কালচার রপ্ত করে ফেলছে। আরেকটা প্রজন্ম আছে, তারা পাশ্চাত্য বা ইংরেজি সংস্কৃতিকে নিত্য সঙ্গী করে ফেলছে। স্কুলসমূহে ক্লাস পার্টি থেকে শুরু করে নিউ ইয়ার পার্টি, হ্যালোইন পার্টিগুলো বাঙালির আধুনিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। পাশ্চাত্যের সব দিবসই এখন প্রজন্মের কাছে উপভোগ্য- ভ্যালেন্টাইন-ডে, হাগ-ডে, কিস-ডে, চকলেট-ডে ইত্যাদি থেকে শুরু করে বার্থ-ডে পর্যন্ত। স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে পর্যন্ত হিন্দী গানের তালে তালে শিক্ষার্থীরা নাচানাচি করছে। বিদেশি সংস্কৃতি আমরা নিছক বিনোদনের জন্যে উপভোগ করতে পারি কিন্তু সেটাকে লালন করতে পারি না।
বিশ্ব যখন একটি গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে, সেখানে তথ্য ব্যবস্থার অবাধ প্রবাহের কারণে বৈশ্বিক চিন্তা-চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ঘটেছে এবং সমাজ কাঠামো ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গঠন প্রকৃতির পরিবর্তন হচ্ছে। এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবন, পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণ ও খাদ্যাভ্যাসেও ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। বাঙালি সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বিনষ্ট হচ্ছে। পশ্চিমা ভোগবাদী সংস্কৃতির সাথে নিত্য পরিচয় ঘটছে। আমাদের সংস্কৃতি আমাদেরকেই ধারণ লালন করতে হবে। বাঙালির নিজস্বতাকে বাঙালিদেকেই প্রচার প্রসার করতে হবে। ‘বাংলা’ কেবল মুখের ভাষাতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেল। বাংলাকে আমরা ব্র্যান্ডিং করতে পারছি কই। কিছুদিন পর সেটাও অবশিষ্ট থাকবে না হয়ত। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘বাঙালি ভদ্রলোক সন্তানরা পরস্পর কথা বলে ইংরেজিতে, চিঠিপত্র লেখে ইংরেজিতে, এবং হয়তো সেদিন বেশি দূরে নয়, যখন লোকে দুর্গাপূজার আমন্ত্রণপত্রও ইংরেজিতে লিখবে।’ আমাদের ভাষা সংস্কৃতির স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ও স্বার্থকে সমুন্নত রাখার চেষ্টা করতে হবে। বিদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসন মোকাবিলা করে টিকে থাকতে হলে দেশীয় সংস্কৃতির লালন প্রবর্ধন করতে হবে। আমরা যেন বিদেশি সংস্কৃতির মাঝে হারিয়ে না যাই, নিজেদের বিলিয়ে না দেই। জাতিগতভাবে আমাদের সমৃদ্ধি অর্জন করতে হবে সবার আগে আমাদের অন্তরে জাতীয়তাবোধ জাগ্রত হতে হবে। সর্বাগ্রে দেশকে, দেশজ বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে।
অন্য ভাষার অযাচিত মিশ্রণ, যত্রতত্র ভাষায় অশুদ্ধ ব্যবহার, উচ্চারণগত ক্রুটি, অনলাইন পোর্টাল গুলোর অসাবধানী বানানরীতির কারণে ভাষার বহুমাত্রিক বিকৃতি হচ্ছে। অবস্থা এমন হয়েছে যে, অশুদ্ধটাই এখন রীতি হয়ে গেছে। বিশেষ করে অনলাইন অশুদ্ধ শব্দ ও বানানে ছেয়ে গেছে। টেলিভিশনে নাটক সিনেমায় ‘উচ্চারণ-বিকৃতি’ উদ্বেগের বিষয়। এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে শিশুরা ভুল বাংলা শিখবে, ভাষা স্বকীয়তা হারাবে। লিখনে, পঠনে বাংলা ভাষা ব্যবহারে অধিকতর সচেতন হতে হবে। প্রতিবছর একুশ আশে আর আমরা এসব প্রসঙ্গ টেনে আনি কিন্তু আবার ভুলে যাই। একুশ কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। আমাদের মায়ের ভাষাকে রক্ষা করতে যে সকল তাজাপ্রাণ বিসর্জন হয়েছে। সেদিনের সেই রক্তস্নাত আন্দোলনে যাদের বীরত্বগাথা তাদের সকলের প্রতি অতল শ্রদ্ধা। জয় হোক বাংলার।
লেখক : প্রাবন্ধিক, সংগঠক।