বাংলা নববর্ষের সাথে ইলিশের কী সম্পর্ক?

ডা. আবু মনসুর মোঃ নিজামুদ্দিন খালেদ

রবিবার , ১৪ এপ্রিল, ২০১৯ at ৭:২১ পূর্বাহ্ণ
287

পহেলা বৈশাখ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত রঙিন লিখাগুলো পড়লে চোখে এক ধরনের প্রশান্তির ঘুম নেমে আসে। মনে হয় পহেলা বৈশাখে এক সময় এদেশের কৃষককুল কতইনা আনন্দ করতেন। তারা তাদের দিন শুরু করতেন পান্তা-ইলিশ খেয়ে। তারপর সারাদিন কাটাতেন অনেক আনন্দ-ফূর্তিতে। কিন্তু আসলে ব্যাপারটি কি তাই? না, এই সময়টা কখনোই এদেশের কৃষকদের জন্য সুখের সময় ছিল না। চৈত্র ছিলো কৃষকের দায় পরিশোধের মাস। বৈশাখ জমিদার-মহাজন,দোকানদার, পাওনাদার সাহা-শুঁড়ি-মুতসুদ্দি-আড়তদারদের আদায় উসুলের মাস। আদায় উসুলের প্রজা নিঙড়ানো এই তৎপরতাকে পাওনাদার গোষ্ঠী সুকৌশলে আড়াল করে নাম দিয়েছিলেন ‘পুণ্যাহ’ । চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহে ঢাক-ডোল পিটিয়ে ঘোষণা দেয়া হতো সালতামামিতে খাজনা শোধ করলে বকেয়ার জন্য প্রজাদের সুদ দিতে হবে না। চৈত্র মাসের শেষ দিন অনুষ্ঠিত হতো চড়ক উৎসব। চড়ক উৎসব মানে পিঠে বড়শি গেঁথে চড়কে মানুষ ঘুরানোর উৎসব। উদ্দেশ্য সেইসব প্রজাদের জানান দেয়া যে, খাজনা পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাদেরও একইভাবে পিঠে বড়শি গেঁথে চড়কে ঘুরানো হবে। হতদরিদ্র প্রজারা জমিদারের ভয়ঙ্কর শাস্তির কথা মনে করে নিজেদের সর্বস্ব বিক্রি করে খাজনা শোধ করত। অবশেষে আসত পুণ্যাহ’র দিন। এদিন খাজনা আদায় শেষে নিঃস্ব প্রজারা ‘মহামান্য জমিদার মহাশয়’কে একঝলক দর্শনের সুযোগ পেত এবং তারপর ‘দয়াশীল’(!) জমিদারের পক্ষ থেকে সর্বহারা প্রজাদের মিষ্টিমুখ করানো হতো। এই হলো অতীতে এই সময়ে আমাদের কৃষককুলের প্রকৃত অবস্থা। একে তো খাজনা আদায় শেষে নিঃস্ব অবস্থা, তার উপর বৈশাখের খরায় কোন ফসল হতো না। ফলে কৃষকের হাতে পয়সাও থাকতো না। সুতরাং এসময়ে তাদের পক্ষে ইলিশ খাওয়া সম্ভব হতো না। সুতরাং এটা মোটেও সত্যি নয় যে, এদেশের কৃষকরা নববর্ষ উদ্‌যাপনে পান্তা-ইলিশ খেয়ে বছর শুরু করতো। ধানের দেশ, গানের দেশ বলে বাংলাকে রূপকথার সুখী দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও এদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কিন্তু চিরকাল ভাতের জন্য কষ্ট পেয়েছে। ভাতের অভাববোধ থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে পান্তা। তাও আজকের ইলিশ-পান্তা নয়। চৈত্রের ঝড়ে পড়ে থাকা আম কুড়িয়ে সেই আম ভাতের সঙ্গে ভর্তা বানিয়ে খাওয়া হতো। যার নাম দেয়া হয়েছিল আমানি। এই আমানিই ছিল কৃষকের পান্তা যা খেয়ে সে মাঠে যেত হালচাষ করতে। দুপুর বেলায় পান্তা খেত কাঁচা মরিচ আর পিয়াজ দিয়ে। ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকলে কখনো পাতে একটু শুঁটকি, বেগুন ভর্তা কিংবা আলু ভর্তা জুটতো। তাই বলা যায় এদেশের হতদরিদ্র কৃষকদের জীবনে বৈশাখের সাথে ইলিশের কোন সম্পর্ক কখনোই ছিল না।
প্রাচীন কোন গ্রন্থেও পান্তা-ইলিশ খাওয়ার কোন নিদর্শন পাওয়া যায় না। চতুর্দশ শতকের শেষ ভাগের একটা বই, প্রাকৃত ভাষার গীতি কবিতার সংকলিত গ্রন্থ ‘প্রাকৃত পৈঙ্গল’ এ আছে- ‘ওগগারা ভত্তা গাইক ঘিত্তা’। অর্থ হলো খাঁটি ঘি সহযোগে গরম ভাত। এতে অনুমান করা যায় যে, সেকালে স্বচ্ছল বাঙালির রীতি ছিল গরম ভাত ঘি সহযোগে খাওয়া। ভাতের সঙ্গে আর কী খেত?
‘ওগগারা ভত্তা রম্ভা পত্তা গাইক ঘিত্তা দুদ্ধ সজুক্তা
মোইলি মচ্ছা নালিত গচ্ছা দিজ্জই কান্তা পুনবস্তা!’
মানে হল, যে রমণী কলাপাতায় গরম ভাত, গাওয়া ঘি, মৌরলা মাছের ঝোল, নালিতা মানে পাটশাক প্রতিদিন পরিবেশন করতে পারেন, তার স্বামী পূণ্যবান! মোট কথা ভাত সাধারণত খাওয়া হত শাক সহযোগে। নিম্নবিত্তের প্রধান খাবারই ছিল শাক! বৃহধর্মপুরান মতে রোহিত (রুই), শফর (পুঁটি), সকুল (সোল) এবং শ্বেতবর্ণ ও আঁশযুক্ত মাছ খাওয়া যাবে। অথচ ইলিশের কথা কোথাও উল্লেখ নেই।
বাংলা নববর্ষে ইলিশ খাওয়ার এই রীতি মূলত চালু হয়েছে খুব সম্প্রতি। রমনার বর্ষবরণ উৎসব এবং চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা জমে উঠার পরে যখন এখানে প্রচুর লোক সমাগম হতে থাকে তখন আশে পাশে মেলা বসে যায়, সাথে কিছু খাবার দোকানও।। মাটির সানকিতে পান্তা-ইলিশ খাওয়া এসব দোকানীদের আবিষ্কার । আর পান্তা-ইলিশ খাওয়ার এই নব আবিষ্কৃত রেওয়াজটা এদিন যারা ক্ষণিকের জন্য বাঙালি হয়ে যান কিংবা বাঙালি হতে দিগ্বিদিক ছোটেন তারাই লুফে নিয়েছেন সবার আগে।। পহেলা বৈশাখের এদিনে শহরের কোথাও হাঁটার জায়গাটুকু পর্যন্ত থাকে না। ফ্যাশন হাউজের জমকালো পাঞ্জাবী-শাড়িতে পুরোদুস্তর বাঙালি সেজে বৈশাখের এই দিনে একশ্রেণীর মানুষ সকালে পান্তা, শুঁটকি ভর্তা আর ইলিশ খান। অথচ বছরের অন্যদিনগুলোতে এরাই বলেন পান্তা আর শুঁটকিতে নাকি লাখ লাখ ব্যাকটেরিয়া জন্মে। তাই এসবের ধারে কাছেও যান না তারা। কারো ঘরে কখনো মুড়িমুড়কি, নিমকি, জিলাপি দেখলে এরাই বলেন এগুলো সেকেলে খাবার। বৈশাখ চলে গেলে সব যেন শেষ হয়ে যায়। ধুয়ে মুছে যায় যেন সব বাঙালিয়ানা। আর মাঝখানে শেষ হয়ে যাচ্ছে আমাদের প্রিয় মৎস সম্পদ ইলিশ।
অতএব একথা দৃঢ়তার সাথে বলা যায়, বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপনের ঐতিহ্যের সাথে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার কোন সম্পর্ক নেই অর্থাৎ বৈশাখের সাথে ইলিশের কোন সম্পর্ক নেই । বরং এদিন কত ধরনের ভর্তা করা যায়, শাক- সবজি রান্না করা যায়- এসব হতে পারে। তাই এসময় চড়া দামে ইলিশ কেনার প্রতিযোগিতায় শামিল হওয়া কতটা সমীচীন এবং মানবিক তা আমাদের নতুন করে ভেবে দেখা দরকার। কয়েক বছর আগে ঢাকার বিভিন্ন বাজারে ১লা বৈশাখের আগে দুই কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হয় প্রতিটা দশ থেকে চৌদ্দ হাজার টাকা দরে। এক কেজি ওজনের ইলিশ হলেই প্রতিটার দাম তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। ৭শ থেকে ৮শ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম ১৪শ থেকে দেড় হাজার টাকা। এখন বাজারে যে ইলিশগুলো পাওয়া যাচ্ছে তা আগে থেকে হিমাগারে সংরক্ষণ করে রাখা। নববর্ষে ইলিশের দাম অস্বাভাবিকহারে বেড়ে যায়। এ সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্য একশ্রেণীর অসাধু , মুনাফালোভী ব্যবসায়ী সারা বছর বাজার থেকে ইলিশ কিনে হিমাগারগুলোতে মজুদ করে রাখে- অধিক মুনাফা পাওয়ার জন্য। ফলে সারা বছরই বাজারে ইলিশের সংকট থাকে আর এতে সব সময় ইলিশের বাজারে আগুন লেগে থাকে, বাজার থাকে অস্থিতিশীল এবং ইলিশের দাম থাকে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। বিষয়টা একই সঙ্গে মানবতা, নৈতিকতা এবং ধর্ম বিরোধীও বটে। এ ধরণের সুযোগের সদব্যবহার কখনোই সমর্থনযোগ্য নয়। এতে করে মানুষের অধিকার হরণ হয়। অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির ফলে সামাজিক শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়। অবক্ষয় ঘটে নৈতিকতার। তাছাড়া পণ্য গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অধিক মুনাফা আদায়ের চেষ্টা একটি সামাজিক অপরাধও বটে। ধরা নিষেধ হলেও ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ জাটকা ধরা হয় মার্চ-এপ্রিল মাসেই। কারণ পহেলা বৈশাখের কারণে এ সময়ে বাজারে ইলিশ মাসের চাহিদা বেশী থাকে।আর বেশী চাহিদা মানে বেশী মুনাফা। অথচ এইসময় মাছগুলো ১০ ইঞ্চির কাছাকাছি হয়। অসময়ে সারাদেশে যদি মানুষ এভাবে ইলিশ খাওয়ার উৎসবে মেতে উঠে তবে এক সময় হয়ত ইলিশ নামের মাছটিই বিলুপ্ত হয়ে যাবে এদেশ থেকে। অথচ এদেশে মোট মৎস সম্পদের ১১ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। যার মূল্যমান প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। এদেশের মোট জিডিপির ১শতাংশ অবদান ইলিশের। প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষের জীবিকা ইলিশ মাছকে ঘিরে। তাই এই মূল্যবান মৎস সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেলে তা দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সবশেষে বলব, ইলিশের প্রজনন মৌসুম হওয়ায় পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খেতেই হবে এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসুন। পাশাপাশি আসুন এ ব্যাপারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ব্যাপক প্রচারণা চালাই। কারণ বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপনের ঐতিহ্যের সাথে পান্তা-ইলিশের কোন সম্পর্ক নেই। আপনার আমার এই মিলিত প্রয়াস মূল্যবান এই মৎস সম্পদ রক্ষায় ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করি।

লেখক : গবেষক, কলাম লেখক ও বিশেষজ্ঞ ভাইরোলজিস্ট

x