বাংলা ও বাঙালি

শৈবাল চৌধূরী

মঙ্গলবার , ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ
56

বিশ্বের চতুর্থতম ভাষা এখন বাংলা। একসময় সপ্তম স্থানে থাকলেও জনসংখ্যা স্ফীতির কারণে এই ভাষা উপরে উপরে উঠে এসেছে। ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ কিংবা হিন্দি এসব ভাষায় যারা কথা বলতে অভ্যস্থ তাদের সকলের মাতৃভাষা এসব ভাষা নয়। ঔপনিবেশি, রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক কারণে এসব ভাষায় অনেকেই কথা বলেন কিংবা বলতে বাধ্য হন। কিন্তু তাদের অনেকেরই স্বতন্ত্র মাতৃভাষা রয়েছে।
বাংলার হিসাবটি মাতৃভাষামূলক। প্রায় ৪০ কোটির মতো বাঙালির মাতৃভাষা বাংলা। যাদের মূল অবস্থান বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায়। এরমধ্যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা এবং পশ্চিম বঙ্গ ও ত্রিপুরার রাজ্যভাষা হিসেবে বাংলা স্বীকৃত। এছাড়া ভারতের বিহার, ঝাড়খন্ড, উড়িষ্যা, মেঘালয়, আসাম এসব রাজ্যের দ্বিতীয় ভাষা বাংলা। প্রচুর বাঙালি এসব রাজ্যে রয়েছেন। এছাড়া সমগ্র ভারতবর্ষ এবং বিশ্বের সর্বত্র বাঙালিরা বসবাস করছেন স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে। তাদের সংখ্যাও বিশাল। সব মিলিয়ে বাংলা রীতিমত আন্তর্জাতিক একটি ভাষা।
বাংলা জাতিসংঘ স্বীকৃত ভাষা। বাংলাদেশের যে কোনো প্রতিনিধি কিংবা আমন্ত্রিত অতিথি জাতিসংঘে বাংলায় বক্তৃতা দেওয়ার অধিকার রাখেন। ইউনেস্কো বাংলাকে বিশ্বের সবচেয়ে শ্রুতিমধুর ও ধ্বনিব্যঞ্জক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ ভাষার প্রতিটি বর্ণের উচ্চারণ এবং প্রতিটি উচ্চারণের বর্ণ রয়েছে। বাংলায় ১১টি স্বরবর্ণ ছাড়াও রয়েছে বেশ কয়েকটি অল্প প্রাণ বর্ণ। এসব বৈশিষ্ট্য বিশ্বের অনেক শীর্ষস্থানীয় ভাষার নেই। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, বিশ্বের সর্বশীর্ষস্থানীয় ভাষা ইংরেজির স্বরবর্ণ মাত্র ৫টি।
সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলার শীর্ষ অবদান। এসব অবদান আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত।
বিশ্বের একমাত্র দেশ বাংলাদেশ, যার জন্ম মূলত তার ভাষার অধিকার অর্জনের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। এই দৃষ্টান্ত দ্বিতীয় রহিত। সম্ভবত বিশ্বের বৃহত্তম বই মেলাটিও ঢাকার একুশের বই মেলা। এই মেলার আরো একটি বৈশিষ্ট্য, শুধু বাংলা এবং বাংলাদেশের বই এই মেলায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে। মেলাটি এদেশের ভাষা আন্দোলনের স্মরণে আন্দোলনের মাসটিতেই অনুষ্ঠিত হয়। সবকিছু মিলিয়ে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অবদান ও গুরুত্বের একটি বৈশ্বিক অবস্থান রয়েছে। কিন্তু তার নিজের মানুষের কাছে তার প্রতি প্রকৃত আদর, মমতা ও ভালোবাসা কতটুকু সেটা আজ এক বড় প্রশ্ন। বাংলা ভাষার চর্চা আজ রীতিমত হুমকির সম্মুখীন। এর প্রধান কারণ আমাদের মনোজাগতিক ঔপনৈবিশকতা ও হীনমন্যতা। শুদ্ধ ও সুন্দর করে নিজের মাতৃভাষা বলার চাইতে বিদেশি কোনো ভাষায় কথা বলাতেই আমরা গৌরববোধ করি। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই বিদেশি ভাষাটি বলি ভুলভাবে যা অনেক ক্ষেত্রে হাস্য উদ্রেক হয়ে ওঠে। কথায় কথায় ইংরেজি শব্দের অপব্যবহার গত বেশ কিছু দিন ধরে একটা তথাকথিত ‘স্মার্টনেস’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘সো’ ‘বাট’, ‘অবভিয়াসলি’, ‘দেন, ‘ইভন’, ছাড়া কথাই বলে না আমাদের তরুণ সমাজ যাদের মধ্যে মিডিয়া ক্রিকেট তারকা থেকে শুরু করে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক এমনকি রাজনীতিকরাও রয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই এদের কথা বলার ধরণ সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করে। আমি বেশ কয়েকজন বাস সহকারীকেও দেখেছি এভাবে কথা বলতে! বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামে। সবচেয়ে দু:খজনক বয়োজ্যেষ্ঠরাও যখন এভাবে কথা বলেন। এর উদাহরণ সংসদ অধিবেশন থেকে টিভির টকশো সর্বত্র।
এফএম ব্যান্ড রেডিওগুলোরও মারাত্মক কুপ্রভাব বিদ্যমান। এসব বেতারের মূল শ্রোতা তরুণ সম্প্রদায়। এরা ভাই, বোন, চাচা, চাচি এসব শব্দ এখন আর বলেই না। ব্রো (ব্রাদারের সংক্ষিপ্ত রূপ) সিস (সিস্টার) আংকেল, আন্টি এখন খুব সাধারণ সম্বোধন। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে এসব শব্দের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ভাই, বোন, দাদা, দিদি এসব শব্দের অর্থগত বৈচিত্র্য ইংরেজিতে নেই। আংকেল বললে স্পষ্ট হয় না, তিনি কি মামা না চাচা না খালু না ফুফা। তেমনি আন্টিরও একই দশা! আর স্যার বস, ম্যামতো রীতিমত ভীতিকর হয়ে উঠেছে। হকার, চালক, পরিচ্ছন্নতা কর্মী থেকে শুরু করে সর্বত্রই এখন এসব সম্বোধন ‘বস’ ছাড়া যা কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিংবা অফিস আদালতে বলা চলে।
প্রচারমাধ্যম বিশেষ করে টেলিভিশনের ভূমিকা এক্ষেত্রে ন্যক্কারজনক। সর্বরোগের উৎস এই মাধ্যমটি কোনো ধরনের নীতিমালার অভাবে এখন যথেচ্ছারী হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ও ভারত (পশ্চিমবঙ্গ) এর টিভি চ্যানেলগুলো বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে সর্বনাশের শেষ প্রান্তে নিয়ে যাবার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। অনুষ্ঠানের কোনো বৈচিত্র্য নেই। কেবল সিরিয়াল এবং খবর। খবরগুলোর চরিত্র সিরিয়ালের মতো। আর ভয়ংকর সব টক শো! হিন্দি চ্যানেলগুলোতো রীতিমতো আগ্রাসী। বাংলাদেশের আবালবৃদ্ধ এখন বাংলার চেয়ে হিন্দিতে স্বচ্ছন্দ। শুদ্ধ বাংলা বলার বা লেখার চাইতে শুদ্ধ ইংরেজি বলা এবং লেখার উপর অনেক অভিভাবকও জোর দেন। বিশেষ করে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের অভিভাবেকরা। অনেককে দেখা যায় প্রচুর ইংরেজি শব্দ মিশিয়ে ইংরেজি উচ্চারণে বাংলা বলেন। তারা বোঝেন না এসব আচরণের কারণে তারা কত হাস্যকর হয়ে ওঠেন।
আরেকটি উপকরণ ফেসবুক। এক ধরনের ফেসবুকীয় সংক্ষিপ্ত ভাষ্যরূপ বেশ কিছু দিন ধরে চালু হয়েছে। সংক্ষিপ্ত এই ভাষা ফেসবুকে তাড়াতাড়ি সংযোগ স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও হতে পারে। নিশ্চয় কথা বলার জন্য নয়। ফেসবুকের মতো অপার সম্ভাবনাপূর্ণ একটি সামাজিক মাধ্যমের সিংহভাগ ইতিবাচক ব্যবহারের পরিবর্তে আমরা তার অপপ্রয়োগ করে চলেছি নানাভাবে। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশে মুঠোফোন ও ফেসবুকের ব্যবহার বেশি। এদেশের মানুষ এখন কাজের চাইতে কথায় বড় হয়েছে। কথা বেচে এদেশের মোবাইল কোম্পানিগুলো ফি বছর হাজার কোটি টাকার মুনাফা করে। বাংলাদেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর রিয়েলিটি শো ও গানের অনুষ্ঠানগুলো যে রকম কদর্যভাবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে তাতে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষাই অপমানিত হয়। দুঃখের বিষয় আজকাল এসব ভাষায় টিভি নাটকের সংলাপ, বইপত্রও লেখা হচ্ছে।
এত কিছুর মধ্যেও আনন্দে মনটা ভরে ওঠে, যখন শুনি আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওনে বাংলা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পায়। যখন শুনি উগান্ডা কঙ্গোসহ আরো কয়েকটি আফ্রিকান দেশে বাংলা ভাষা জনপ্রিয়। অবশ্য এর নেপথ্যে রয়েছে এসব দেশের জাতিসংঘ শান্তি মিশনে নিয়োজিত বাংলাদেশের সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তারা। এখন দেখি প্রচুর অবাঙালি বাংলা শিখছেন এদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। যখন দেখি বই মেলায় প্রচুর নবীন তরুণের সমাগম। যখন দেখি বেশিরভাগ বই-এর রচয়িতা তরুণ প্রজন্মের লেখক। যখন শুনি নিম্ন আদালতে এখন মামলার রায় দেওয়া হচ্ছে বাংলায়। উচ্চ আদালতেও এই নিয়ম চালু হয়েছে। ফেসবুক করতে গিয়ে যখন দেখি রোমান হরফে বাংলা লেখার চল অনেক কমে গেছে। পথে ঘাটে ইংরেজি লেখা সাইনবোর্ড কমছে এটাও স্বস্তিদায়ক। শেষ করবো আমার এক তরুণ বন্ধুর গল্প করে। আমার বন্ধুটির নাম ড্যানিয়েল হিউবার্ট ডিকস্টা। ডাক নাম রিক। ধর্মে ক্রিশ্চান। রংপুর মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস পড়া শেষ করেছে। বাড়ি সাতক্ষীরায়। আমার এই উদীয়মান চিকিৎসক বন্ধুটি এত চমৎকার বাংলা বলে আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি। এক বর্ণও ইংরেজি কিংবা অন্য শব্দের মিশেলে কথা বলে না। লেখেও চমৎকার। সাধারণত আমরা মনে করি আমাদের দেশের ক্রিশ্চান সম্প্রদায়ের মানুষেরা বাংলা বলেন না, বাংলা সংস্কৃতির প্রতি তাঁদের অনুরাগ কম। যদিও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তাঁদের অনেক অবদান রয়েছে যা আমরা কমই জানি। যা হোক, ড্যানিয়েলের প্রচন্ড ভালোবাসা তার দেশের শিল্প সংস্কৃতির প্রতি। তাদের বাড়ির প্রাত্যাহিক খাবার দাবারও আটপৌরে বাঙালি ঘরানার। দেশের প্রতি তার প্রচন্ড মমত্ববোধ। দেশের হালচাল নিয়ে তার অনেক চিন্তাভাবনার কথা সে নিয়মিত জানায়। বিদেশ প্রীতি নেই। চিকিৎসা শাস্ত্রে আরো উচ্চশিক্ষা নিয়ে যে দেশেই তার পেশাদারি কাজ করে যাবে, এই তার বাসনা। আমি বাংলায় কম্পোজ করতে জানতাম না। ফেসবুক করতাম রোমান হরফে বাংলা লিখে। স্বভাবতই ড্যানিয়েলের সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগটা টেলিফোনে। সে আমাকে নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করে বাংলায় কম্পোজ করা শিখিয়েছে। শিখিয়েছে নানারকম নেতিবাচক বিষয়কে ইতিবাচক করে ভাবতে। সে নিয়মিত সাতক্ষীরায় তার গ্রামের বাড়িতে যায়। গ্রামের প্রতি তার প্রচুর ভালোবাসা। আমার এই বন্ধু আমাকে শিখিয়েছে জীবনকে কতটা ভালোবাসতে হয়, শিখিয়েছে কতটা শ্রদ্ধাশীল ও যত্নবান হতে হয় নিজের ভাষা, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের প্রতি।
আরেক বিদেশিনী, যিনি আমাদের বাঙালি বধু, ক্যাথরিন লুক্রেশিয়া শেপার, যাকে আমরা ক্যাথরিন মাসুদ হিসেবে চিনি। যিনি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা, বাংলাকে ভালোবাসে, বাঙালি চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদকে ভালোবেসে তাঁর ঘরনী হয়ে এদেশের চলচ্চিত্র সাংস্কৃতিকে ঔজ্জ্বল্য এনে দিয়েছেন। তিনি যখন বলেন, ‘আজ বাংলা ভাষাকে নিজের করতে পেরে গর্ব হয় আমার। কারণ, এই ভাষা সব ভাষার প্রতি মানুষের ভালোবাসার প্রতিনিধিত্ব করে। বাংলা ভাষার সৌন্দর্যে আমি মুগ্ধ হই বারবার। ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগের ইতিহাস স্মরণ করে রোমাঞ্চিত হই। যে ইতিহাস অহংকারী না হয়ে বরং ভাষার বৈচিত্র্যকে শ্রদ্ধা জানায়, দুয়ার খুলে দেয় মানবতার।’
নিশ্চয় এসব সুখকর অভিজ্ঞতা, অনেক হতাশা অনেক দুঃখকে প্রশমিত করে। সাহস যোগায়, ভালোবাসা যোগায়, নির্ভরতা যোগায়। আরো ভালোবাসতে শেখায় নিজেকে, নিজের ভাষাকে নিজের দেশকে।