বাংলার ইতিহাসের এক অস্থির সময়ের গল্প কাসিদ

লেখকের কথা

আজাদী প্রতিবেদন

শুক্রবার , ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৫:০৬ পূর্বাহ্ণ
37

পলাশীর যুদ্ধ সম্পর্কে সাধারণ বাঙালির জ্ঞান আনোয়ার হোসেন অভিনীত সিরাজউদ্দৌলা চলচ্চিত্র এবং ‘১৭৫৭ সালে মীরজাফর জগৎ শেঠ উমিচাঁদ রাজবল্লভ রায়দুর্লভ প্রমুখ বাঙালির বিশ্বাসঘাতকতায় পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়- এই আপ্ত বাক্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এর বাইরে পলাশীর বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসের সাথে খুব কমসংখ্যক বাঙালিই পরিচিত। এর মূল কারণ হলো পলাশীর ঘটনা নিয়ে যে সমস্ত ইতিহাস কিংবা সাহিত্য রচিত হয়েছে তার বেশির ভাগই ব্রিটিশ শাসিত পরাধীন ভারতবর্ষের লেখক বা ঐতিহাসিক কর্তৃক রচিত। উনবিংশ কিংবা বিংশ শতাব্দীর পরাধীন বাঙালি মানসের স্বাধীনতাকামী চেতনার প্রতিফলন ঘটেছে এসব রচনায়। যার ফলে ইতিহাস বস্তুনিষ্ঠ না হয়ে হয়ে উঠেছে একটি জাতীয়তাবাদ নির্মাণের প্রকল্প। উপন্যাস হিসেবে ‘কাসিদ’ এর বিরল ব্যতিক্রম।
কাসিদের প্রচ্ছদে লেখা হয়েছে ‘পলাশীর যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত’। কিন্তু এটা তার থেকে অনেক বেশি কিছু। উপন্যাসটির ফোকাসের জায়গাটা পলাশীর যুদ্ধ কিংবা সিরাজের পরাজয় হলেও ‘সন্ধ্যে বেলার প্রদীপ জ্বালানোর আগে সকাল বেলায় সলতে পাকানো’র মত লেখক শুরু করেছেন মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের চিত্র দিয়ে। এরপর বর্ণিত হয়েছে ঘরকুনো হিসেবে একদা পরিচিত ইংরেজ জাতির সমুদ্র ভীতি কাটানোর গল্প, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গঠন, ভারতবর্ষে তাদের বহির্বাণিজ্যের সূচনা পর্ব। শুধুমাত্র ইংরেজ নয় লেখক একই সূত্রে গেঁথেছেন পাশ্চাত্য নৌশক্তি তথা পর্তুগীজ ভাস্কো-দা-গামা কর্তৃক ভারতবর্ষের নৌপথ আবিষ্কার, ভারতবর্ষে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য শক্তিসমূহের মধ্যকার দ্বন্দ্বের সংক্ষিপ্ত অথচ সামগ্রিক ইতিহাস।
পাশ্চাত্য শক্তিসমূহের বাণিজ্য কিংবা রাজনীতি বিস্তারের ইতিহাসের পাশাপাশি উপন্যাসটিতে উঠে এসেছে বাংলার ইতিহাসের এক অস্থির সময়ের গল্প। ইতিহাস থেকে আমরা জানি সম্রাট আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি এবং ধর্মীয় নীতি ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্য পতনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আওরঙ্গজেবের মৃত্যু পরবর্তী সময়ে মারাঠা শক্তির লুণ্ঠনক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল প্রায় সমগ্র মোঘল সাম্রাজ্য। তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে নি বাংলা। ফলে আলীবর্দির শাসনকালের প্রায় সবটুকু সময় কেটেছে বর্গিদের আক্রমণ রুখতে। ঔপন্যাসিক দেখিয়েছেন কীভাবে এইসব আক্রমণ বাংলার রাষ্ট্রীয় দুর্বলতাটুকু বহিঃশত্রুদের কাছে উন্মোচন করেছে। বাংলার সামগ্রিক বাণিজ্যের আভ্যন্তরীণ রূপরেখা ও বাণিজ্যিক দ্বন্দ্বের চিত্রগুলিও লেখক তুলে এনেছেন ক্ষমতার দ্বন্দ্বের প্রেক্ষিত হিসেবে।
বইয়ের কাহিনী প্রসঙ্গে লেখক জয়দীপ দে বলেন, ইতিহাস বারবার আবর্তিত হয়। বারবার ঘটে যায় একই ঘটনা। শুধু পাল্টে যায় সময়, পাল্টে যায় নাম। আলীবর্দী খাঁ একসময় নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁর কাছে প্রত্যাখ্যাত হলেও আশ্রয় পেয়েছিলেন তাঁর জামাতা সুজাউদ্দউলার কাছে। সেই সুজাউদ্দউলার পুত্র সরফরাজ খান শঠতার শিকার হয়েছিলেন আলীবর্দি খাঁর কাছ থেকে। ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছিলেন আলীবর্দি, হত্যা করেছিলেন সরফরাজ খাঁকে। একই পরিণতির শিকার হলেন সেই আলীবদির্র উত্তরসূরি নবাব সিরাজউদ্দৌলা। সরফরাজ খাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং হত্যার ক্ষেত্রে আলীবর্দি যাদের সহায়তা পেয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ভারতবষের্র অর্থনীতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক জগৎ শেঠ। সরফরাজ খাঁ তার পুত্রবধূর অসম্মান করেছিলেন। সিরাজউদ্দৌলাও অপমান করেছিলেন জগৎ শেঠকে। ইতিহাসে উপেক্ষিত এসব ঘটনার পুনরাবর্তনের গল্প জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে উপন্যাসটিতে। ‘কাসিদ’ শব্দের অর্থ বার্তাবাহক। সরফরাজ খাঁর করুণ পরিণতির প্রতিচ্ছবির পুনরাবৃত্তির বার্তাই আমরা পাই কাসিদ উপন্যাসে। তবে ইতিহাসই কি সেই বার্তাবাহক!
ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস সাধারণত বর্ণনাত্মক। ফলে এতে চরিত্র বিকাশের পথ সীমিত। কিন্তু কাসিদ উপন্যাসে রক্তমাংসের শরীর নিয়ে জীবন্ত হয়ে উঠেছে নিম্নবগের্র অনেকগুলো চরিত্র- জগৎ শেঠের খাজাঞ্চিখানার কর্মচারী বিষ্ণুপ্রসাদ, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পক্ষের হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহন করা ভাড়াটে সৈন্য বাসু, শরীর নিয়ে ব্যবসা করা চম্পাকলি কিংবা কোম্পানির একজন সাধারণ কর্মচারী লুমিংটন। চম্পাকলির সহজ বোধ ও উপলব্ধি তো পাঠকের চেতনায় আলোড়ন তোলার মত। শুধুমাত্র নিম্নবগের্র চরিত্র নয় লেখকের সযত্ন তুলির স্পর্শ বঞ্চিত হয় নি উচ্চবগের্র চরিত্রগুলিও। মীর হাবিবের শঠতা, আলীবর্দির সংগ্রাম, মোহনলালের অন্তর্বেদনা, ঘসেটির রাজনৈতিক সক্রিয়তা, উমিচাঁদের বিশ্বাসঘাতকতার চিত্রগুলিও এতে জীবন্ত।
‘কাসিদ’ উপন্যাসে লেখক অদ্ভুত পারঙ্গমতার সাথে নিজস্ব কোন মতামতকে এড়িয়ে নির্মোহভাবে ইতিহাসের টুকরো টুকরো ঘটনাগুলো একসূত্রে গেঁথেছেন। ফলে কাসিদ হয়ে উঠেছে এদেশের আর্থ-রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের প্রামাণ্য দলিল।
গল্প বলার ক্ষেত্রে জয়দীপ দে শাপলুর একটি নিজস্ব বাচনশৈলী রয়েছে। উপন্যাসটির গঠনকৌশলেও রয়েছে অভিনবত্বের ছাপ। প্রত্যেকটি পরিচ্ছদের রয়েছে একটি করে শিরোনাম এবং প্রত্যেকটি পরিচ্ছেদই একটি স্বতন্ত্র ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ছোটগল্প। যে কোন সচেতন পাঠকই প্রত্যেকটি অনুচ্ছেদ শেষে ছোটগল্পের অপূর্ণতার অতৃপ্তির স্বাদটি অনুভব করতে পারেন। ইতিহাসের পট পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কোন ব্যক্তির ভূমিকা এবং তার কাজের প্রভাব ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হলেও পরবর্তী সময়ে তার ব্যক্তিজীবনের গল্প ইতিহাসে তাৎপর্যহীন। তখন তারা স্থান পায় জনগণের কল্পনায়, জনশ্রুতিতে। পলাশীর যুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকে সিরাজউদ্দৌলার অন্যতম বিশ্বস্ত সেনাপতি মোহনলাল কিংবা সিরাজউদ্দৌলার বংশধর নিয়ে আমাদের দেশে একাধিক জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। এসব জনশ্রুতিকে এড়িয়ে তাদের ব্যক্তিজীবনের গল্প পাঠকের আগ্রহকে তৃপ্ত করবে।
উপন্যাসটি রচনার ক্ষেত্রে ঔপন্যাসিক জয়দীপ দে ইতিহাস ও কথাসাহিত্য মিলিয়ে পঁয়ত্রিশটি গ্রন্থ ও চারটি ইতিহাসভিত্তিক ওয়েবসাইটকে তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন, যা পরিশিষ্টে উল্লিখিত। ৩০৪ পৃষ্ঠার উপন্যাসটির প্রকাশক দেশ পাবলিকেশনস। প্রচ্ছদ এঁকেছেন শিল্পী তৌফিকুর রহমান। চট্টগ্রাম অমর একুশে বইমেলার বেস্ট পাবলিকেশন্স ও হৃৎকম্পন স্টলে পাওয়া যাচ্ছে উপন্যাসটি।