বাংলাভাষা-সংস্কৃতির হালচিত্র

মযহারুল ইসলাম বাবলা

বুধবার , ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ at ৮:০৩ পূর্বাহ্ণ
140

ফেব্রুয়ারি মাস আমাদের ভাষার মাস। যেমন মার্চ স্বাধীনতার মাস, ডিসেম্বর বিজয়ের মাস। ধর্মীয়ভাবেও সংযম সাধনার রোজার মাসও রয়েছে। সার্বিক প্রচারণায় আমরা এখন ভাষার মাসের ভেতর রয়েছি। ভাষার মাস প্রচারণা বাস্তবতা বর্জিত। রোজার মাসের পর আর রোজা থাকে না। কিন্তু ভাষাতো সার্বক্ষণিক এবং প্রতিমুহূর্তের বিষয়, ভাষাকে মাসে সীমাবদ্ধ করা তো রীতিমত উপহাসতুল্য। ভাষার মাস, স্বাধীনতার মাস, বিজয়ের মাস প্রচারণা বাস্তবিকই হাস্যকর। তথাকথিত ভাষার এই মাসে প্রতিবছর সবচেয়ে আড়ম্বরপূর্ণ মাসব্যাপী বইমেলা আয়োজন করে থাকে বাংলা একাডেমি। এই বইমেলা নিয়ে আবেগউচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে আমাদের গণমাধ্যম হতে বিশিষ্টজনেরা পর্যন্ত। আবেগের এই স্রোতে মাতৃভাষা নিয়ে আবেগস্তুতির যেন সীমাপরিসীমা থাকে না। প্রাণের মেলা, হৃদয়ের মেলা, ভালোবাসার মেলা, নানা বিশেষণে ভূষিত করা হয় বইমেলাকে। বইমেলা প্রকৃতই যে চিত্তবিনোদনের, ভোগবিলাসের, উৎসবআনুষ্ঠানিকতার মেলা নয়, অনিবার্যই জ্ঞানের মেলা। এটা সর্বাধিক বস্তুনিষ্ঠ ও বাস্তবানুগ। এটা স্বীকার করতেই হবে। জ্ঞান বিতরণ ও জ্ঞান আহরণের সুযোগ সৃষ্টিতে বইমেলা গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণও বটে। জ্ঞানের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বাহন বই। প্রকাশকেরা হরেক বই নিয়ে হাজির হয় বইমেলায় জ্ঞান বিতরণে, আর পাঠকেরা বই ক্রয়সংগ্রহ করে জ্ঞান আহরণে সুযোগপ্রাপ্ত হয়। বইতো পণ্য নয়। অনিবার্যই জ্ঞানের বাহন। জ্ঞানের অনুশীলনে বইয়ের বিকল্প বলে কিছু নেই। অথচ এই জ্ঞানের বইমেলাকে চিত্তবিনোদনের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাচেতনায় অতিমাত্রায় আবেগউচ্ছ্বাসে আমরা ভেসে বেড়াই। আবেগউচ্ছ্বাসের চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে অঙ্গীকার না থাকায় শুধুমাত্র আবেগ তাড়িত চিন্তার জগতে বই স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে না। আবেগ বাস্তবিকই ক্ষণস্থায়ী, এই আছেএই নেই। কিন্তু চেতনাগতদৃষ্টিভঙ্গির অঙ্গীকার স্থায়ী। এই সত্যটি মানতেই হবে।

আমাদের দেশে জাতীয় নানা উৎসবপার্বণে মেলা হয়। এছাড়া হালে বিভিন্ন দিবসকে কেন্দ্র করেও অজস্র দিবস পালনের হিড়িকও লক্ষ্য করা যায়। যেগুলোর বাহুল্য পূর্বে কখনো ছিল না। গত দেড়দুই যুগে আমাদের জাতীয় জীবনে যুক্ত হয়েছে অনেক আরোপিত বিজাতীয় দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতাসমূহ। যার সঙ্গে একুশের বইমেলার চেতনাগত কোনোই মিল নেই। অমিলই সর্বাপেক্ষা। মেলা মূলত আনন্দপূর্ণ ভোগউপভোগের মেলাবিশেষ। কিন্তু একুশের বইমেলা আমাদের সামগ্রিক জ্ঞান আহরণে ঋদ্ধ হতে সর্বাপেক্ষা সাহায্যকারী মেলা। বই ভিন্ন তো জ্ঞানার্জনের অন্যকোনো বিকল্প নেই। তাই সাধারণ অন্যসব মেলার সঙ্গে বইমেলাকে একাকার করা হবে চরম গর্হিত মানসিকতার প্রকাশ। বইমেলা প্রাণের মেলা হিসেবে গণ্য হতে পারে যদি তার সঙ্গে চেতনাগত অঙ্গীকারের সমন্বয় ঘটে। নয়তো এসমস্ত স্তুতি তামাশাপূর্ণ বলেই প্রমাণিত হবে। আমাদের মাত্রাতিরিক্ত আবেগউচ্ছ্বাসে চেতনার স্থানটি অন্তসারশূন্যতায় বইমেলা এবং মাতৃভাষার আনুগত্যের মৌলিক অঙ্গীকারটি ঢাকা পড়ে যাবে। আমাদের সামগ্রিক জীবনাচারে মাতৃভাষাকে অবজ্ঞার অজস্র দৃষ্টান্ত ইতিমধ্যে স্থাপিত হয়েছে। যেগুলো কাঙিক্ষত ছিল না। স্বাধীনদেশে তেমন শঙ্কারও ন্যূনতম সম্ভাবনার কথা ছিল না। অথচ বাস্তবে সর্বক্ষেত্রে মাতৃভাষার বহুল ব্যবহার ক্রমেই সংকুচিত ও কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।

ভাষার এই মাসে অত্যন্ত দুঃখবেদনার সঙ্গে বলতে হয় আমরা ক্রমেই ঔপনিবেশিক ভাষার পাশাপাশি হিন্দি ভাষাসংস্কৃতির আগ্রাসনে মাতৃভাষাকে রীতিমত উপেক্ষাই করে চলেছি। অতীতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বাংলার পরিবর্তে চাপিয়ে দেয়া উর্দু ভাষাকে আমরা ত্যাগেআত্মত্যাগে প্রবলবেগে প্রতিরোধ করতে পেরেছিলাম। মাতৃভাষা পরিত্যাগে উর্দু ভাষা গ্রহণ করিনি। অথচ বিনা চাপাচাপিতে এখন হিন্দি ভাষা সানন্দে আমাদের গোটা সমাজে ব্যাপক ভাবে বিস্তার লাভ করেছে। আমাদের হিন্দি প্রীতিতে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা গত ১০ জানুয়ারি খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে বিশ্ব হিন্দি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতির ভাষণে বলেছেন, “বাংলাদেশের প্রচুর মানুষ টেলিভিশনে নিয়মিত হিন্দি ভাষার সিরিয়াল ও চলচ্চিত্র দেখেন। বাংলাদেশে হিন্দি ভাষার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ হিন্দি ভাষা বোঝেন, তবে লিখতে ও পড়তে পারেন না। যাঁরা হিন্দি ভাষাসংস্কৃতি সম্পর্কে আরও বিস্তৃত জানতে আগ্রহী তাঁদের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে হিন্দি বিভাগ বড় সুযোগের সৃষ্টি করেছে। এতে বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের মধ্যেকার সম্পর্ক আরও দৃঢ় ও গভীর হবে।” আমাদের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই হিন্দি ভাষার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত।

ভারতের হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি জনরায়ে ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকা সফরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করে গেছেন হিন্দি ভাষাতেই। আমাদের বিজ্ঞ শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, জাতীয়তাবাদী নেতামন্ত্রী এবং দক্ষিণপন্থি রাজনীতিকেরা মোদির হিন্দি বক্তৃতায় মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে মোদির হিন্দি ভাষণে আনন্দউচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই মাতৃভাষার বিরুদ্ধে নবাগত পাকিস্তান রাষ্ট্রের গভর্নর জেনারেল জিন্নাহ’র ঘোষণার পর মুহূর্তে সর্বপ্রথম প্রত্যক্ষ প্রতিবাদ জানিয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে ১৯৪৮ সালে জিন্নাহ বলেছিলেন, “উর্দু, একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।” জিন্নাহ তাঁর ভাষণ উর্দুতে নয়, ইংরেজিতে দিয়েছিলেন। এমনকি এরপূর্বে রেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহ’র দেয়া ভাষণটিও তিনি ইংরেজি ভাষায়ই দিয়েছিলেন। জিন্নাহ’র কঠোর এই ঘোষণার পরক্ষণে জোর প্রতিবাদ জানিয়েছিল উপস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ‘নোনো’ বলে। জিন্নাহ’র মাতৃভাষা গুজরাটি। গুজরাটি শিয়া মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ছিলেন জিন্নাহ। তিনি ছিলেন না ধার্মিক, ছিলেন না উর্দুভাষীও। পরবর্তীতে এই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে, ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের প্রত্যাখ্যানে। এবং এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনসংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতিতেই বহু ত্যাগআত্মত্যাগেই স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র জন্মলাভ করে।

ধর্মীয় বিভাজনে অর্থাৎ দ্বিজাতিতত্ত্বে খণ্ডিত ভারতবর্ষে ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ আওয়াজটি আজাদ পাকিস্তান রাষ্ট্রের একবছর অতিক্রান্তে পূর্ব বাংলায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। পূর্ব বাংলায় ক্রমেই প্রত্যাখ্যাত হয় ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্ব। মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্রজনতার মিছিলে পুলিশের গুলি বর্ষণে প্রাণ হারায় বেশ ক’জন ছাত্রজনতা। বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে পূর্ব বাংলার ছাত্রসহ সকল শ্রেণিপেশার মানুষ। পরিণতিতে বাংলা ভাষা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদাপ্রাপ্ত হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার ৯৫ শতাংশ মানুষের ভাষা কিন্তু উর্দু ছিল না। উর্দু ভাষার বর্ণমালা আরবিফার্সি বর্ণমালার আদলের কারণে ধর্মীয় অনুভূতি তখন অতিমাত্রায় ক্রিয়াশীল ছিল বলেই পশ্চিম পাকিস্তানিরা ধর্মীয় আনুগত্যে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা রূপে গ্রহণে দ্বিধা করেনি। নিজেদের মাতৃভাষা বিলোপে করেনি প্রতিবাদও। অথচ পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল একাধিক জাতি। যাদের ভাষাসংস্কৃতিও ছিল ভিন্ন ভিন্ন। যেমন পাঞ্জাব, উত্তরপশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ (বর্তমান খাইবার পাখতুনখোয়া), কাশ্মীর, সিন্ধু, বেলুচিস্তান। এই পাঁচ প্রদেশ নিয়েই অতীতের পশ্চিম পাকিস্তান অর্থাৎ আজকের পাকিস্তান রাষ্ট্র। পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা উর্দু। এছাড়া বিভিন্ন জাতিসত্তার পাঞ্জাবি, সিন্ধি, সারাইকি, পশতু, বেলুচি, ব্রাহুই ইত্যাদি ভাষা স্বস্ব জাতির মাতৃভাষা রূপে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে থাকলেও; উর্দু ভাষার চাপে ওই সকল ভাষা ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে বিলীন হবার পথ ধরে। পাকিস্তানের ভূখণ্ডের সীমানা থেকে প্রায় দুইহাজার মাইল দূরত্বের পূর্ব বাংলা একমাত্র প্রদেশ। পূর্ব বাংলার বাঙালি জাতি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চাপিয়ে দেয়া উর্দু ভাষা গ্রহণ না করে নিজেদের মাতৃভাষাকে বিলুপ্তির হাত হতে রক্ষা করেছিল, ত্যাগআত্মত্যাগে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পথ ধরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ রাষ্ট্র আমরা পেয়েছি। রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হয়েছে। অথচ সর্বস্তরে বাংলা ভাষার অবাধ প্রচলনে নানাবিধ সীমাবদ্ধতা আজও দূর করা সম্ভব হয়নি।

স্বাধীনতার ছেচল্লিশ বছর পরে অত্যন্ত দুঃখবেদনার সঙ্গে লক্ষ্য করা যায় হিন্দি ভাষার সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কবলে ক্রমেই মাতৃভাষাসংস্কৃতি সংকুচিত হয়ে পড়ছে। উর্দু ভাষার ন্যায় হিন্দি ভাষা আমাদের ওপর বলপূর্বক চাপানো হয়নি। হিন্দি ভাষাসংস্কৃতির অবাধ অনুপ্রবেশ ঘটেছে প্রযুক্তির কল্যাণে, বিনে বাধায়। এবং ক্রমেই হিন্দি ভাষাসংস্কৃতি অনায়াসে ঢুকে পড়েছে আমাদের ঘরেঘরে। আমাদের সমষ্টিগত টিভি দর্শকেরা হিন্দি সিরিয়ালণ্ডসিনেমায় সর্বাধিক আকৃষ্ট। শুরুতে হিন্দি চ্যানেলগুলো আমাদের দেশে বিনে পয়সায় সম্প্রচারিত হতো। মাত্রাতিরিক্ত চাহিদার সুযোগে হিন্দি চ্যানেলগুলো আমাদের ক্যাবল অপারেটররা অধিক অর্থের বিনিময়ে মাসোহারার ভিত্তিতে খরিদ করে দেশব্যাপী সম্প্রচার করে থাকে। অথচ ভারতে আমাদের দেশের একটি চ্যানেলের সম্প্রচারও কিন্তু নেই। আমাদের বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো বিনে পয়সায়ও ভারতে সম্প্রচারের সুযোগ পায়নি। বাংলাভাষী পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা এবং আসাম রাজ্যেও আমাদের চ্যানেলের অনুষ্ঠান সম্প্রচারের অনুমতি লাভ করেনি। ভারতে বাংলাদেশের ক্যাবল টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার নিষিদ্ধ বললেও অত্যুক্তি হবে না। অপর দিকে বাংলাদেশে একচেটিয়া হিন্দি ভাষার সিরিয়ালচলচ্চিত্র ক্যাবল টিভিতে ব্যাপক ভাবে সম্প্রচারিত হচ্ছে। বাংলা এবং হিন্দি ভাষার সাংস্কৃতিক বিনোদনের এই বৈষম্যেই প্রতীয়মান; ভারতীয় চানক্য বুদ্ধির কৌশলতায় হিন্দি ভাষাসংস্কৃতির দাপটে বাংলা ভাষাসংস্কৃতি কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত গভীর আস্থায় বলতে পেরেছেন, বাংলাদেশে হিন্দি ভাষার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সম্ভাবনার কথা। অথচ বহুজাতি ও ভাষাভাষীর দেশ ভারতে হিন্দি ভাষা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় আসীন। হিন্দি ভাষাও কিন্তু অপরাপর প্রাদেশিক ভাষার ন্যায় আঞ্চলিক ভাষাই। হিন্দি ভাষাসংস্কৃতির চাপেদৌরাত্ম্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ অহিন্দি ভাষার প্রদেশসমূহের চিড়েচ্যাপ্টা হবার দশা। এক্ষেত্রে দক্ষিণ ভারতের চার রাজ্যেরচার ভাষাভাষী তামিল, তেলেগু, মলায়ালম, কন্নড়ভাষীরা নিজেদের মাতৃভাষার মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করতে পেরেছে, প্রবল প্রতিরোধে হিন্দি ভাষা পরিত্যাগে। যেআমরা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক প্রবল চাপাচাপির পরও উর্দু ভাষাকে পরিত্যাগ করতে পেরেছিলাম। সেইআমরাই এখন বিনা চাপে সানন্দে হিন্দি ভাষাসংস্কৃতিকে বরণ করে নিয়েছি, মাতৃভাষাসংস্কৃতি পরিত্যাগে। এ বিষয়ে একটি গল্পের কথা মনে পড়ে গেল। গল্পটি মওলানা ভাসানী বলেছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রধান উদ্যোক্তা বেলাল মোহাম্মদকে। তাঁর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র বইতেও গল্পটি রয়েছে। গল্পটি এই রকমের : “একটা ছাগলকে তাড়া করেছিল একটা হিংস্র বাঘ। একজন মৌলভী তখন বাঘের হাত থেকে ছাগলটিকে রক্ষা করেছিলেন। মৌলভী ঘাসপাতা ইত্যাদি পুষ্টিকর খাদ্য খাইয়ে ছাগলটিকে মোটাতাজা করে তুলেছিলেন। একদিন স্বয়ং মৌলভী ছাগলটিকে জবাই করতে উদ্যত হলে ছাগলটি বলেছিল : আপনি সেদিন আমাকে বাঘের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। এখন নিজেই আমাকে জবাই করে খেতে চাচ্ছেন কেন? উত্তরে মৌলভী বলেছিলেন: বাঘ তো তোমাকে হারাম পন্থায় খেতে চেয়েছিল। আমি তো তোমাকে হালাল উপায়ে ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী জবাই করেই খাবো।” গল্পটির হারাম এবং হালালের সংজ্ঞার মধ্যেই নিহিত রয়েছে আমাদের মাতৃভাষার ওপর আগ্রাসনের প্রসঙ্গটি। স্বৈরতান্ত্রিক পন্থায় উর্দু ভাষা চাপানোর বিষয়টি এবং বিনা চাপে প্রযুক্তির সাহায্যে সুদূরপ্রসারী কৌশলে হিন্দি ভাষার সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিদ্যমান অবস্থাটি।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে আমাদের জাতীয়তাবাদী ও সমাজতন্ত্রীরা সমানতালে যুক্ত ছিল। কিন্তু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের চূড়ান্তে সমাজতন্ত্রীরা নেতৃত্ব দিতে পারেনি। সমাজতন্ত্রীরা জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম থেকে সরে শ্রেণি সংগ্রাম সংঘটনে অধিক তৎপর হয়ে ওঠে। এতে নেতৃত্বের সুযোগটি শতভাগ গ্রহণের সুযোগ লাভ করে জাতীয়তাবাদীরা। স্বীকার করতেই হবে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হতে পারেনি, জাতীয়তাবাদীদের নির্বাচনী ক্ষমতার লিঞ্ঝায়। আমাদের জাতীয়তাবাদীরা মতাদর্শিক ভাবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কখনো ছিল না। আজও নয়। অথচ বিশ্বে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন প্রকৃতই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম। স্বাধীন দেশে ক্ষমতা প্রাপ্তিতেই আমাদের জাতীয়তাবাদীদের আকাঙক্ষা পূরণ হয়ে যায়। তাদের একমাত্র লক্ষ্যই ছিল ক্ষমতা। ক্ষমতা প্রাপ্তিতে আমাদের জাতীয়তাবাদী শাসকেরা অতীতের বিজাতীয় শাসকদের ধারাবাহিক উত্তরাধিকার রূপে নিজেদের প্রমাণ দিয়ে এসেছে; অতীতের শাসকদের সংস্কৃতি মুক্তও হতে পারেনি। এই জাতীয়তাবাদী শাসকেরা কেউ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নয়। বিশ্ব পুঁজিবাদের তাঁবেদার রূপে নিজেদের অকাট্য প্রমাণ দিয়ে এসেছে। মাতৃভাষার প্রতি আমাদের শাসকগোষ্ঠীর ভূমিকা তাই বারংবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

ভাষণেবচনে তারা মাতৃভাষার গুণগান যতই করুক না কেন, আদতেই আমাদের শাসকগোষ্ঠী সাম্রাজ্যবাদে অনুগত এবং বিশ্ব পুঁজিবাদের তাঁবেদার রূপেই নিজেদের প্রমাণ দিয়ে এসেছে। বিশ্বায়ন নামক দৈত্যের কবলে দুর্বলগরিব বিশ্বের ভাষাসংস্কৃতির নাকাল অবস্থা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেলেও; এর বিরুদ্ধে কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি; শাসকদের সাম্রাজ্যবাদের প্রতি ওই আনুগত্যের কারণেই। অধিক ত্যাগের স্বাধীনতা কেবলই আমাদের জাতীয়তাবাদী শাসকশ্রেণির ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করেছে। কিন্তু জনগণের ক্ষমতাঅধিকার প্রতিষ্ঠা করেনি। মাতৃভাষার এই দুর্দশা থেকে পরিত্যাগের একমাত্র উপায়টি হচ্ছে বিদ্যমান ব্যবস্থার অবসান। অপরিবর্তিত ব্যবস্থায় মাতৃভাষার অমর্যাদায় কেবলই নাকিকান্না আর হতাশা প্রকাশ করা যাবে, মাতৃভাষাকে রক্ষা ও সুপ্রতিষ্ঠিত করা যাবে না। এই চরম সত্যটি আমলে নিতে ব্যর্থ হলে বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ ক্রমেই অনুজ্জ্বল হয়ে পড়বে। বিদেশি ভাষাসংস্কৃতির আগ্রাসন ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাবে। নিজ ভাষা সংকীর্ণ পরিসরে সাধারণ মানুষের ভাষায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। বাংলা ভাষা হারাবে তার ঐতিহ্যঅহংকার। সর্বোপরি ভাষা আন্দোলনের গর্বিত ইতিহাসও।

মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় এখনও যদি আমাদের টনক না নড়ে, তাহলে আগামীতে এর খেসারত গুণতে হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। হিন্দি ভাষার সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রুখতে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়া সম্ভব না হলে; আমাদের মাতৃভাষাসংস্কৃতির রক্ষা যেমন সম্ভব হবে না। তেমনি মাতৃভাষার অগ্রসরমানতা প্রবলভাবে ব্যাহত হবে। মাতৃভাষার পরিসর হয়ে পড়বে সংকীর্ণ, নিম্নমুখীপশ্চাৎপদ। সংগঠিত জনমতের ভিত্তিতে প্রতিরোধ গড়ে তোলার বিকল্প কিছু নেই। মাতৃভাষার হৃতাধিকার পুনরুদ্ধারে প্রকৃত জাতীয়তার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়া ব্যতীত এই মুহূর্তে ভিন্ন কোনো পথও খোলা নেই। নয়তো ভাষার মাস বছরান্তে আসবেযাবে, আমরা কেবল আবেগউচ্ছ্বাসে বিগলিত হবো। রাষ্ট্রে ও সমাজে বাংলা ভাষার প্রসারপ্রচলন সংকুচিত হবে। বাংলাভাষী বাঙালিরা শংকরভাষীতে পরিণত হবে। আমাদের জাতিসত্তার অস্তিত্ব বলেও বাস্তবে কিছু থাকবে না। কেননা জাতিসত্তার ভিত্তিমূলেই রয়েছে ভাষা। একমাত্র ভাষাই জাতি পরিচয় নির্ধারণের মূল চাবিকাঠি। সমষ্টিগত আন্দোলনেই বিদ্যমান ব্যবস্থার বদলে ভাষাসংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে মুক্তি লাভে সম্ভব হবে মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষা। এবং সেটাই একমাত্র রক্ষাকবচ।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

x